Profile Photo

জাহিদুর রহমান উজ্জ্বলOffline

  • বছর আগে মণ্ডল বাড়ির সাথে ঝগড়া করে মসজিদ আলাদা করলাম, আজ সেই মসজিদ বন্ধ হবে? এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমরা কি মুসলমান না? বাজনা বাজাই বলে কি আমাদের নামাজ-রোজার অধিকার নেই?’
    ​পরিবেশ থমথমে হয়ে গেল। একে একে সবাই মাচা ছেড়ে চলে গেল। হাটবার হলেও কারো পকেটে টাকা নেই, কিন্তু বাজারের প্রয়োজন তো আর থেমে থাকে না। কমল একা বসে ডোবার দিকে চেয়ে রইল। ডোবার পানি কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছে। কাদার মধ্যে এক হঁাটু পরিমাণ পানি। মাছ নেই বললেই চলে, তবুও কদম গাছের ডালে বসা মাছরাঙাটি বারবার ঘোলা পানিতে ঝঁাপ দিচ্ছে। বারবার ব্যর্থ হয়েও সে ডোবা ছাড়ছে না। কাদা পানিতে জলপেঁাকার নড়ানড়াকে মাছ ভেবে ঝঁাপ দিচ্ছে। কমল ভাবলÑএকটি পাখি যদি খাবারের খেঁাজে এভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করতে পারে, আমরা কেন পারব না?
    ​সে বিড়ি ধরিয়ে জোরে টান দিতেই কাশিতে বুক ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। তবুও সে মিটিমিটি হাসছে। মাছরাঙার এই বৃথা চেষ্টা আর বেঁচে থাকার লড়াই তার ভালো লাগছিল। জীবন মানেই তো সত্য আর মিথ্যার মিশেল। কখনও রিজিক আসে অপ্রত্যাশিতভাবে, কখনও কঠোর শ্রমেও জোটে না।
    ​কমলের মনে পড়ল শীতকালের যাত্রাপালার কথা। তার ব্যান্ডের সুরে রঙিন পোশাক পরা রাজা-রানিরা মঞ্চে কত দাপট দেখাত, রাজকীয় ডায়লগ বলতো। অথচ অভিনয় শেষ হলে গ্রিনরুমের পর্দার আড়ালে খড়ের বিছানায় আলুভর্তা আর ডাল খেয়ে তাদের রাত কাটে। এটাই বুঝি দুনিয়ার রঙমঞ্চ।

    ​স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে হঠাতৎ ‘কমল ভাই’ ডাক শুনে সে চমকে উঠল। দেখল পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা এক যুবক আর দুজন লোক। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা হবে। বুঝেই তাদের কুশলাদী জিজ্ঞেস করার পর তারা জানাল, আগামী শনিবার জীবননগর বাজারে একটি বড় মিছিল হবে, সেখানে বাদ্য-বাজনা লাগবে। কথাটি শুনে কমলের বুক ভরে গেল। সে আবেগে আপ্লুত হয়ে দরদাম ঠিক করল। দুই হাজার টাকা বায়না পেয়ে তার মনে আশার আলো দেখা দিল।
    ​শনিবার সকালে ভ্যানে করে সাতজন সহযোগীসহ সব বাদ্যযন্ত্র নিয়ে সে জীবননগরে পৌঁছাল। পার্টি অফিস জমজমাট। বড় বড় ডেকচিতে খিচুড়ি রান্না হচ্ছে। চালের চেয়ে মাংসর পরিমানটা বেশী। দুপুরে পেটভরে মাংস-খিচুড়ি খেল তারা। মিছিল শুরু হবে। চারদিক থেকে লোকজন জড়ো হচ্ছে। তাদের কাঙ্ক্ষিত নেতা দামি গাড়িতে করে এলেন। চারদিকে স্লোগান আর উল্লাস। কেও গলায় মালা পড়িয়ে দিচ্ছে, কেও ফুলের তোড়া, কেও তাদের প্রতিক নিয়ে জয়সূচক দু’আঙ্গুল দেখিয়ে মোবাইলে ছবি তুলছে। মনে হয় এলাহী কান্ড।
    ​মিছিল শুরু হলো। বড় নেতারা সামনে, আর বাদ্যকাররা দ্বিতীয় সারিতে। স্লোগানের তালে তালে তারা প্রাণপণে বাজাচ্ছে। কিন্তু বাজার প্রদক্ষিণ করে বটতলায় পৌঁছাতেই হঠাৎ গোলমাল শুরু হলো। মুহূর্তের মধ্যে বোমা, ইটপাটকেল আর ধারালো অস্ত্রের হামলা শুরু হলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হলো হুলুস্থুল। কমলরা পালানোর সুযোগ পাওয়ার আগেই তাদের ওপর হামলা হলো। মাথায় আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারাল কমল।
    ​যখন তার হুঁশ ফিরল, সে দেখল তাদের সযত্নে রাখা ঢোল, ড্রাম, ব্যান্ডপার্টি, সানাই আর করতালগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়ে আছে। তার দলের সবাই রক্তাক্ত, কেউ উঠে দঁাড়ানোর অবস্থায় নেই। ঝাপসা চোখে সে দেখল, আরেকটি মিছিল তাদের রক্তাক্ত শরীর আর ভাঙা বাদ্যযন্ত্রগুলো মাড়িয়ে সজোরে স্লোগান দিতে দিতে বাজারের পশ্চিম দিকে..

    1
    3 Comments
    • ভাঙা বাদ্যযন্ত্রগুলোর সঙ্গে কমলদের স্বপ্নও প্রতিনিয়ত ভেংগে যায়!!

    • জাহিদুর রহমান উজ্জ্বল, ‘মাছরাঙার এই বৃথা চেষ্টা আর বেঁচে থাকার লড়াই তার ভালো লাগছিল’—এ রকম গভীর জীবনবোধের সাথে মিশে থাকা আপনার লেখাটি অসাধারণ হয়েছে এবং আপনি চাইলে সামনের দিনগুলোতে এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে আরও সুন্দর সব সৃষ্টি আমাদের উপহার দিতে পারেন।

    • লেখাটির “জীবন মানেই তো সত্য আর মিথ্যার মিশেল” লাইনটি আমার খুব ভালো লেগেছে, সত্যিই বাস্তবটা বড় অদ্ভুত! আপনি এবং অন্যরাও যদি গ্রুপের সবার লেখায় একটু রিয়্যাক্ট আর কমেন্ট করেন, তবেই আমাদের আড্ডাটা আরও জমে উঠবে।

Skip to toolbar