Profile Photo

md alamOffline

  • mdalam
  • Profile picture of md alam

    md alam

    • 1 week ago

    রাজার স্বপ্ন
    জাহাঙ্গীর আলম শিমুল

    ‘স্বপ্ন মঙ্গল’ বা ‘হিং টিং ছট’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন রাজার কথা বলেন যিনি ঘুমের ভিতর স্বপ্ন দেখেন। আর ঘুম ভেঙ্গে গেলে উন্মাদের মতো তার অর্থ খোঁজেন।
    রাজা হবু চন্দ্র স্বপ্ন দেখেন। দৃশ্যটি এমন:
    শিয়রে বসে তিনটি বানর উকুন বাঁচছে। রাজা নড়তে পারছেন না। নড়তে গেলেই চড়। বানরগুলোর তীক্ষ্ণ ধারালো নখ। রাজার চোখে-মুখে সেই নোখের আঁচড়। বানরগুলো হঠাৎ মিলিয়ে যায়। এবার রাজার স্বপ্নে আবির্ভূত হয় এক বেদে। বেদের পোষা পাখিটি খাঁচায় নেই। উড়ে গেছে। বেদে কাঁদতে থাকে। হঠাৎ রাজাকে সামনে পেয়ে কোলে তুলে নেয়। রাজা হয়তো নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চান। হাত-পা ছোড়েন। তখন তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। পরদিন তিনি রাজ দরবারে গিয়ে রাতের স্বপ্নের অর্থ জানতে চান। সভাসদদের ডেকে পাঠান। গবু চন্দ্র, রাজার মন্ত্রী, রাজস্বপ্নের কোন অর্থ খুঁজে পাননা। তিনি ভেবে ভেবে চুপ হয়ে যান।

    রাজ্যময় অচলাবস্থা। ছয়-সাত দিন কারো চোখে ঘুম নেই। পেটে ভাত নেই। রাজ্যের সবাই ভেবে অস্থির। ছেলে-বৃদ্ধ, মেয়ে-পুরুষ কেউ স্বপ্নের অর্থ ভেবে পায়না। সবাই সারি সারি বসে আছে। মুখে কথা নেই। কবির ভাষায়:
    “সারি সারি বসে গেছে, কথা নাহি মুখে
    চিন্তা যত ভারী হয় মাথা পড়ে ঝুঁকে।”

    রাজা সভায় পন্ডিতদের মেলা বসে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পন্ডিতগণ শাস্ত্র দেখেন, পাতা উল্টান, কিন্তু রাজার স্বপ্নের অর্থ খুঁজে পাননা। রাজা হতাশ। তিনি সভাসদদের ম্লেছ দেশের খবর নিতে বলেন। যদি সেদেশে পন্ডিত সমাজ বলে কিছু থাকে তবে তাদের সভায় হাজির করার হুকুম দেন। ঢাকঢোল বাজিয়ে এক যবন পন্ডিত আসেন। চোখ নীল। চুল ও কপোল পিঙ্গল বর্ণের। তিনি ভূমিকা করার ধার ধারেন না। রাজকীয় শিষ্টাচার যেন তার স্বভাবে নেই। পন্ডিত রাজসভাকে ঘড়ি দেখে সময় বেঁধে দেন। অতঃপর রাজার স্বপ্নের বর্ণনা শুনে রেগে যান। বাম করতলে ডান হাতের মুষ্টি হেনে বলেন, “ডেকে এনে পরিহাস।”

    এক ফরাসি পন্ডিত। সদা হাস্যোজ্জ্বল বিদেশি। মাথা নুয়ে বলেন, স্বপ্ন স্বপ্নই। এর কোন অর্থ হয় না। কথা শুনে সবাই ‘ধিক ধিক’ করে ওঠেন। পন্ডিতদ্বয়কে ‘গন্ডমুর্খ পাষন্ড নাস্তিক’ বলে গাল দেন। নিষ্ঠুরতার এখানেই শেষ নয়। রাজা হবু চন্দ্র চোখ লাল করে হুকুম করেন:
    “হেঁটোয় কন্টক দাও, উপরে কন্টক
    ডাল কুত্তাদের মাঝে করহ বন্টন।”

    এবার মঞ্চে আসেন এক ক্ষীণকায় বাঙ্গালী। নিতান্তই খর্বাকৃতি। সাজ-সজ্জাও সাধারণ। তিনি অভিবাদন করতে জানেন না। কুশল জিজ্ঞেস করেন না। কিন্তু কথায় পারঙ্গম। বাঙ্গালী পন্ডিতের কথা শুনে সভাসদ বিস্মিত হয়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়:
    “এতটুকু যন্ত্র হতে এত শব্দ হয়
    দেখিয়া বিশ্বের লাগে বিষয় বিস্ময়।”

    গৌড় দেশীয় পন্ডিত সাহসী মানুষ। রাজার স্বপ্নের কথা শুনে মুখ গম্ভীর করে বলেন, স্বপ্নের অর্থ নিতান্তই সরল। তিনি ভগবান শিবের ত্রিনয়ন, জীবশক্তির সাথে শিব শক্তির দ্বন্দ্ব, আনবিক শক্তির সাথে চুম্বক শক্তির সম্পর্ক, জীবাত্মার সাথে জীবের চিন্তা এবং পরমাত্মার মায়ারূপে জগতে বিরাজমান থাকার মধ্যে রাজস্বপ্নের অর্থ খুঁজে পান। সভায় ‘সাধু’ ‘সাধু’ রব পড়ে যায়।
    কবিতার শেষাংশে কবির সিদ্ধান্ত এমন: ‘স্বপ্ন মঙ্গলের কথা অমৃত সমান।’ এই স্বপ্ন কথা আমাদের সকল ভুল ঘুচিয়ে দেবে। আমরা হয়তো সত্যকে মিথ্যা; আর মিথ্যাকে সত্য বলে বুঝাতে পারবো। কারণ, কবিতার ভাষায়, ‘ আমাদের যা আছে তা নেই। আর যা নেই তা আছে।’ অতএব জগৎ মিথ্যা আর মায়াময়। তবু মানুষ স্বপ্ন দেখে। আর স্বপ্নই সত্য।

    2
    3 Comments
    • Md alam, চমৎকার একটা লেখা শেয়ার করেছেন, বিশেষ করে “আমাদের যা আছে তা নেই, আর যা নেই তা আছে” লাইনটা খুব গভীর একটা কথা। রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলো যে এভাবে বর্তমান সময়ের সাথে এত প্রাসঙ্গিক হতে পারে, তা আপনার পোস্ট না পড়লে ঠিকমতো খেয়াল করা হতো না। এত সুন্দর করে পুরো বিষয়টা ব্যাখ্যা করার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

    • সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, যে কথাটা সহজভাবে বলা যায়, সেটাকেই সবাই জটিল করে ফেলছে।

    • আপনার এই চমৎকার লেখাটিতে রাজার স্বপ্নের সেই অস্থির পরিবেশ আর পন্ডিতদের অদ্ভুত সব ব্যাখ্যার বর্ণনাগুলো বেশ প্রাণবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। আমাদের এই ছোট সুন্দর দলটিতে অন্যদের লেখাগুলোতেও আপনার আন্তরিক প্রতিক্রিয়া বা ভালোলাগার কথাগুলো নিয়মিত জানালে সবার মাঝে দারুণ এক হৃদ্যতা গড়ে উঠবে।

Skip to toolbar