Profile Photo

সিরাজুল ইসলামOffline

  • sherajulislam
  • Profile picture of সিরাজুল ইসলাম

    সিরাজুল ইসলাম

    • 2 days, 3 hours ago

    আজ ২২শে অক্টোবর ,৬ কার্তিক। বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী হেমন্ত শুরু হয়ে গেছে প্রায় সপ্তাহ খানেক হলো। হেমন্ত ঋতুটি একটু অন্যরকম। বর্ষার মতো এতে বৃষ্টি -জলের উন্মাদনা নেই, আবার শীতের মতো জবুথবু রুক্ষতাও নেই।একান্ত নিজের মতো কোলাহলহীন,নি:শব্দ,চুপচাপ।

    আমি থাকি গ্রামে….একটু কাব্যিক ভাষায় বলতে গেলে থাকি শহরতলীতে(অনেকের মতে পদ্মার চরে😊)। গ্রামে থাকার কিছু বাড়তি সুবিধা আছে।শীতের আগমনের সময় সেটা খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায়।কার্তিকের ভোরে যখন প্রথম কুয়াশার চাদরটা ঘাসের ডগায় আলতো করে জমে, গ্রামের বাতাসে কেমন যেন একটা পরিচিত বিষণ্ণতা মেশানো গন্ধ ভাসে। খুব চেনা, অথচ ঠিক ছুঁয়ে ফেলা যায় না। রোদ পড়ে আসা শান্ত বিকেল, মাঠের পর মাঠ হলুদ হতে থাকা আমন ধান, আর ছাতিম ফুলের মৃদু সুবাস—সব মিলিয়ে প্রকৃতিতে যখন কার্তিক আসে, আমার মনের ভেতর অবচেতনভাবেই একজন মানুষ খুব তীব্র ভাবে জেগে ওঠেন…..তিনি জীবনানন্দ দাশ।

    বাংলা সাহিত্যে হেমন্তকে ঋতু হিসেবে অনেকেই দেখেছেন, কিন্তু হেমন্তের যে একটা নিজস্ব নিঃশ্বাস আছে, তার ধুলোমাখা একাকীত্ব আর ঘ্রাণ আছে—সেটা বোধহয় জীবনানন্দ ছাড়া আর কেউ এভাবে আমাদের মগজে এত সুচারু রুপে ঢুকিয়ে দিতে পারেননি।আমার ফেলে আসা শৈশবের কার্তিক আর অগ্রহায়ণ মানে ছিল বাড়ির উঠোনে নতুন ধানের ম ম গন্ধ, ঢেঁকির ছন্দ, নতুন চালের গুঁড়োয় বুবুর (নানী) হাতে তৈরি পিঠাপুলির আমেজ। একটু বড় হয়ে যখন জীবনানন্দের সাথে পরিচয় হলো তখন জানলাম কোলাহলমুখর লোকজ উৎসবের পাশাপাশি নবান্ন হলো প্রকৃতির এক গূঢ় রূপান্তর, মাটির সঙ্গে মানুষের একান্ত ,অদ্ভুত অথচ নিঃশব্দ বোঝাপড়া।

    “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে— এই বাংলায়
    হয়তো মানুষ নয়— হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;
    হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে….” কার্তিকের এই রূপটিকেই জীবনানন্দ তাঁর কাব্যের মূল সুর করে নিয়েছিলেন। আধুনিক বাংলা কবিতার আলো ঝলমলে প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সন্ধ্যার ধূসর পাণ্ডুলিপি, ধানের শিষের ওপর জমে থাকা শিশির, শালিকের ভাঙা বাসা, কিংবা লক্ষ্মীপেঁচার ডানা মেলার শব্দ।

    ভোরবেলা মাঝে মাঝে শিশির ভেজা ঘাসে পা ডুবিয়ে মাঠের আইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমি ধান ক্ষেতের দিকে চলে যাই। ধান কাটার পর ফাঁকা হয়ে যাওয়া মাঠের দিকে তাকালে মনের ভেতরে এক ধরনের অদ্ভুত বৈরাগ্য জাগে। এখানে ফসল ঘরে ওঠার তৃপ্তি যেমন আছে, তেমনি ফাঁকা মাঠের মন খারাপ করা শুন্যতাও আছে। এই দ্বান্দ্বিক সৌন্দর্যটাই নবান্নের আসল দর্শন। একদিকে প্রাচুর্য, অন্যদিকে নিঃশব্দ বিসর্জন। জীবনানন্দ এই রূপটিকে চিনতে পেরেছিলেন গভীর মমতায়।তাই ক্যালেন্ডারের পাতায় কার্তিক এলে কিংবা বাতাসে হালকা ঠান্ডা স্পর্শ লাগলেই মনে হয়, কোথাও যেন মেঠো পথে কুয়াশা মাড়িয়ে হেঁটে চলেছেন সেই বিষণ্ণ অথচ আশ্চর্য প্রেমিক মানুষটি। কার্তিকের এই নবান্ন, এই শিশিরভেজা ঘাস আর শান্ত হলুদ বিকেল—সবকিছু আসলে আমার কাছে জীবনানন্দেরই আরেক নাম।

    আজ আমার মতো জীবনানন্দে বুঁদ হয়ে হয়ে থাকাদের কাছে এক নিদারুণ বিষাদময় দিন! আজ থেকে ঠিক ৭২ বছর আগে ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর ট্রাম দূর্ঘটনার শিকার হয়ে এই ২২ শে অক্টোবর পরলোকে গমন করেন আমার প্রিয় কবি🥲।আমার শুধু মনে হতে থাকে হেমন্তের এই নরম রোদে যখন শিউলি ফুল ঝরে পড়ে কিংবা কার্তিকের ধোঁয়াটে কুয়াশা নামে, মনে হয় ট্রামের ধাতব শব্দের আড়ালে কোথাও আজও তিনি হেঁটে যাচ্ছেন—হাতে নক্ষত্রের আলো আর বুকে পৃথিবীর অনন্ত বিষাদ নিয়ে।

    হে নির্জনতার কবি,
    আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে রূপসী বাংলার যে ‘শঙ্খচিল-শালিখের’ নিবিড় আঁধারে আপনি হারিয়ে গিয়েছিলেন—যেখানে সমস্ত রূপ-রস শেষ হয়ে গেলে কেবল অপার প্রশান্তি আর শূন্যতা ঘিরে ধরে—সেই ঝরে পড়া ধানের ঘ্রাণ আর হেমন্তের বিষণ্ণ কুয়াশার ওপারে বসে আজও কি আপনার রূপসী বাংলাকে মনে পড়ে?
    …….নাকি মৃত্যুর ওপারে পৌঁছে জানা গেল, পৃথিবীর এই গভীরতম বিষাদ আর নক্ষত্রের আলোই শেষ পর্যন্ত সত্য ছিল?

    ©সিরাজুল ইসলাম

    3
    4 Comments
    • সিরাজুল ইসলাম, আপনার লেখায় হেমন্তের যে শান্ত ও স্নিগ্ধ ছবি ফুটে উঠেছে, তা পাঠকের হৃদয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও বিষাদের রেশ রেখে যায়। আপনার বর্ণনায় কার্তিকের কুয়াশা আর জীবনানন্দ দাশের প্রতি যে গভীর ভালোবাসা ও মমতা অনুভব করলাম, তা সত্যিই অতুলনীয়। আপনার এই সুন্দর ও সংবেদনশীল লেখাটি নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে পাঠককে আরও মুগ্ধ করুক, এই কামনাই করি।

    • আপনার লেখাটা পড়ে একদম হেমন্তের ঘ্রাণ আর জীবনানন্দের সেই বিষণ্ণতার ছোঁয়া পেলাম, দারুণ এক অনুভূতির বর্ণনা দিলেন আপনি।

    • হেমন্তের কুয়াশা, নবান্নের গন্ধ আর নিঃসঙ্গ বাংলার নীরবতায় জীবনানন্দ আজও স্মৃতির ধানসিঁড়ি বেয়ে ফিরে আসেন…..🤍🖤

Skip to toolbar