Profile Photo

রুপকথাOffline

  • RupKaTha
  • Profile picture of রুপকথা

    রুপকথা

    4 years, 8 months ago

    ছোটগল্প – মুনিয়ার বিয়ে
    ——————————
    মুনিয়ার ছোটবেলা থেকেই বিয়ে করার শখ। বিয়ে নিয়ে অনেক স্বপ্ন তার। পারিবারিক হোক আর প্রেমের, বিয়ে তার মন মত হতে হবে। একদম স্বপ্নের দেশের রাজকন্যার মত, যা দেখে সবার চোখ জুরিয়ে যাবে।

    বিয়ে তো জীবনে মানুষ একবার‌ই করে সুতরাং বিয়ে নিয়ে কেন হাজার স্বপ্ন থাকবে না? মুনিয়া তাই ভাবে।

    বাবা-মায়ের এক মাত্র সন্তান মুনিয়া। অনেক আদরের সাথে বড় হয়েছে, যখন যা চেয়েছে তাই পেয়েছে, না চাইতেও অনেক কিছুই পেয়েছে। মুনিয়া মেয়েটা ভারি মিষ্টি একটা মেয়ে। দুধে আলতা গায়ের রঙ, ডাগর বড় চোখ, লম্বা ঘন চুল, উচ্চতা ৫ ফিট ৭ আর সবার আদরের। সবচেয়ে বড় কথা, মেয়েটার মন খুব ভালো। বড়লোক বাবার বিগড়ে যাওয়া সন্তান নয় সে। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সে ছিল প্রথম। পড়াশোনা থেকে শুরু করে খেলাধূলা, ঘরের কাজ সবকিছুতে সে পারদর্শী। সবসময় সবাইকে যেভাবে পারে সাহায্য করার চেষ্টা করে। বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করাটা সে খুব ভালো করেই জানে। এক কথায় বলতে গেলে সর্বগুণে সম্পন্ন মুনিয়া, যার কারণে সবসময়‌ সবার চোখের মণি হয়েই থেকেছে। আরেকটা গুণ আছে তার যেটা তার সর্বকালীন গর্ব, তার নৃত্য।

    মুনিয়া নাচতে ভীষণ পছন্দ করে। কখনো কোথাও তেমন ভাবে নৃত্য পরিবেশনা করে নি স্কুল কলেজের কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়া কিন্তু নিজের ঘরে অবসর সময়ে পছন্দের গানে প্রায়‌ই সে নৃত্য করে থাকে। কখনো কখনো নৃত্যের ভিডিও দেখে শিখে নেয় আবার কখনো গানের ছন্দে নিজেই একটা নৃত্য তৈরি করে ফেলে।

    বিশেষ এই গুণটি থাকার ফলে তার প্রধান ইচ্ছা তার বিয়েতে সে নিজে একটা নৃত্য পরিবেশনা করবে। তার খুব ইচ্ছা তার স্বামীও তাকে সঙ্গ দিবে তার সেই নৃত্যে কিন্তু যদি নাও দেয় তাতে তার কোন মাথা ব্যথা নেই। স্বামীর উদ্দেশ্যেই তো তার নৃত্য থাকবে। চলচ্চিত্রে যেভাবে সে দেখেছে ধুমধাম নানান আয়োজনে বিয়ে কিছুটা সেরকম‌ই তার ইচ্ছা।

    স্বপ্ন দেখতে দেখতে পার হয়ে গেল অনেকগুলো বছর। কানাডা থেকে পড়াশোনা শেষ করে ফিরে এখন সে ঘরে বসা। তেমন কিছু করার নেই তার হাতে। বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ঘোরাফেরা, পরিবারকে সময় দেওয়া আর এর মাঝে বাবাকে না জানিয়ে একটা চাকরি খোঁজা, এইভাবেই তার সময় চলে যাচ্ছে।

    খুব ভালো একটা কম্পানিতে একাউন্ট্যান্ট পদে চাকরি হলো তার। বাবাকেও জানালো সে। বাবা প্রথমে ঘোর আপত্তি করে। মুনিয়ার বাবা অনেক বড় একজন শিল্পপতি, তার সকল সম্পত্তি তার মেয়ের তাহলে মেয়ের চাকরি করার দরকার কি! তার যা দরকার বাবাকে বললে তো সে পাচ্ছেই তাহলে কেন?

    এর প্রতিউত্তর মুনিয়া খুব সুন্দর করেই দিয়েছিল। সে এইবার নিজের দায়িত্ব নিজেই নিতে চায়। এভাবে বাবার উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে চায় না। সে যদি আজকে ছেলে হতো তাহলে তো তাকে উপার্জন করতে চাকরি করাই লাগতো কিন্তু মেয়ে হ‌ওয়ার ফলে তার সেটা করা লাগছে না। কয়েকদিন পরে বিয়ে হয়ে যাবে তারপর সে শ্বশুর বাড়ি গিয়ে তাদের সেবায় ব্যস্ত থাকবে। কিন্তু সে বিশ্বাস করে যে মেয়েদের জীবনটা এর থেকে বেশি কিছু হ‌ওয়া উচিত। তাদের যে কোন কিছু করার স্বাধীনতা থাকা উচিত। আর মুনিয়ার মত বড় ঘরের কেউ যদি চাকরি করে তাহলে সেটা দেখে আরো দশজন নারী অনুপ্রাণিত হবে। তারাও সাহস পাবে ঘর থেকে বেরিয়ে নিজে কিছু একটা করে দেখানোর। আর তারপরেও তার বাবা যখন মানতে চাইলেন না তখন মুনিয়া বললো তার পেছনে আনুমাণিক প্রতি মাসে যত খরচ হয় সেটা যেন তার বাবা কোন অনাথ‌আশ্রম, বৃদ্ধাশ্রমে দান করে কিংবা অগণিত অসহায় মানুষদের খাবার ও পোশাক দিয়ে সাহায্য করে। এই কথা শোনার পরে মুনিয়ার বাবার আর কিছু বলার ছিল না, মেয়ের কথা শুনে সে মুগ্ধ। সে ছোট্ট মুনিয়ে কবে এত বড় হয়ে গেল সে টের‌ই পায় নি।

    মুনিয়ার সময় কাটতে থাকে। নতুন কিছু গানে সে নাচ তুলে ফেলে, নিয়মিত নাচার কারণে তার শরীর বেশ আকর্ষনীয় হয়ে উঠে দিনে দিনে। সুন্দর এক রমনীতে পরিবর্তন হতে থাকে সে। তার বিয়ে নিয়ে কথা বার্তা চলতে থাকে। হাজার বিয়ের প্রস্তাব তার জন্য কিন্তু ছেলে পছন্দ হয় না। মুনিয়ার না, তার মায়ের। তার মায়ের কথা হলো তার মেয়ে যেমন রূপবতী এবং সর্বগুণে সম্পন্ন, তার বরকেও ঠিক তেমন কিংবা আর‌ও বেশি কিছু হতে হবে। এই যাবৎ যত প্রস্তাব আসলো কেউ‌ই মুনিয়ার ধারের কাছেও নেই। কেউ খাটো তো কারো চামরা কালো, কারো ভালো উপার্জন নেই তো কারো পরিবার ছেলের ব‌উর চাকরি মেনে নিবে না। কেউ কেউ জানে না বড়দের সম্মান কিভাবে করতে হয় আবার কেউ কেউ শুধু টাকার জন্য পাগল। মেয়ের বিয়ে নিয়ে মহা বিপদে পরেছে তার মা।

    মুনিয়ার এসব নিয়ে কোন চিন্তা নেই, সে আছে বিন্দাস। বিয়ের কথা শুরু হ‌ওয়াতে সে ব্যস্ত হয়ে পরেছে তার মন মত সবকিছু আয়োজন করা নিয়ে। আর ছেলে? মুনিয়া ভালো করেই জানে যে তার মা তার জন্য সবচেয়ে সেরা কাউকেই বেছে নিবে যাকে তার পছন্দ তো হবেই, তার সাথে সুখে শান্তিতে ঘর‌ও করতে পারবে।

    মুনিয়া শুধু বিয়ে করা নিয়েই স্বপ্ন দেখেছে, তার পরে কি হবে সে জানে না। এটা নিয়ে যে সে ভয় পাচ্ছে এমন‌ও না, তার বিয়ের উৎসবে সে যেমন মগ্ন হয়ে আছে ঠিক তেমন‌ই বিয়ের পরের জীবন নিয়েও সে অনেক আশাবাদী। সবচেয়ে বড় কথা সেই পরিবারের সকল সদস্যকে সে তার নিজের করে নিবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মাধ্যমে। এরপরে আর কোন সমস্যা হবে না বলেই সে বিশ্বাসী।

    অবশেষে তার মায়ের একটি ছেলে পছন্দ হলো। তার বাবার এক পুরনো বন্ধুর ছেলে, নাম তার আরিফ আহমেদ। পড়াশোনার পরে আমেরিকায় সেটেল হয়ে গিয়েছিল কিন্তু আরিফের চাই একজন নির্ভেজাল বাঙ্গালি মেয়ে। বিয়ের জন্য‌ই দেশে ফিরে সে এবং মন মত পাত্রি পেলে দেশেই থেকে যাবে ভেবে রেখেছে। আরিফ দেখতে যেমন সুদর্শন ঠিক তেমন‌ই অনেক মেধাবী। অল্প বয়সেই সফলতা অর্জন করেছে নিজ পরিশ্রমে, কোন রকম কারো সাহায্য ছাড়াই। সাইকোলজিতে পিএইচডি করেছে, আমেরিকায় নিজের একটা রিসার্চ সেন্টার খুলেছে আর একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হিসেবে আছে। মাঝে মাঝে নিজের রিসার্চ সেন্টারেই বসে।

    খুব‌ই ভালো ছেলে, দুই পরিবারের সবাই রাজি। আরিফের‌ও মুনিয়াকে বেশ পছন্দ হয়েছে। রূপে গুণে ভরপুর একজন বাঙ্গালি মেয়ে। দেশে থেকে যাওয়ার জন্য এর থেকে ভালো কারণ হতে পারে না বলেই মনে করে আরিফ।

    বর্তমান যুগের তারা তাই তাদের একা কিছু সময় কাটানোর অনুমতি দেওয়া হলো পরিবার থেকেই। দুজনে মেলামেশা করে একটা খুব ভালো বন্ধুত্ত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলেছে নিজেদের মাঝে। একে অন্যের পছন্দ অপছন্দ সব কিছুই জেনে নিয়েছে তারা। মুনিয়া এই প্রথম একটা কাজ করতে ভীষণ ভয় পেয়েছে। আরিফকে তার বিয়ে নিয়ে সকল স্বপ্ন, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষার কথা বলা। তার ভয় ছিল যদি আরিফ আপত্তি করে তখন তো সব শেষ। এমন নয় যে আপত্তি করলে মুনিয়া বিয়েটা ভেঙ্গে দিবে। আরিফের সকল সিদ্ধান্তকে সে সম্মান করে, তার উপরে আরিফকে তার বেশ পছন্দ‌ও হয়েছে। পরিবারের সকলের‌ও এই সম্পর্কে মত আছে, সবাই একটা স্বপ্ন দেখছে তাদের বিয়ে নিয়ে। সেই সাথে মুনিয়া এটাও জানে যে আরিফ তাকে কত ভালোবাসে। শুধু মাত্র তার বাল্যকালের কিছু ইচ্ছা পূরণ না হ‌ওয়ার জন্য এত ভালো একজন মানুষের সে মন ভাঙতে পারে না। সবার পছন্দ তো আর এক হবে না। তাও সে আশাবাদী ছিল আরিফকে সে যতটুকু চিনে, আরিফ নিজে নৃত্যে অংশগ্রহণ না করলেও মুনিয়াকে বাধা দিবে না। তার বাদ বাকি সব কিছুই আরিফ মেনে নিয়েছে, এখন যদি আরিফ তো দূরে থাক মুনিয়া নিজেও যদি নাচার সুযোগ না পায় তাহলে নাই বা পেলো। তাতে তার কোন আফসোস থাকবে না। সবার সামনে না হোক, বাসর ঘরে খুব‌ই একান্ত সময়ে না হয় ইচ্ছেটা পূরণ করবে সে। তারপরেও আরিফকে তো বলতেই হয়, সে কি বলে অন্তত সেটা জানার জন্য হলেও মুনিয়া একবার বলে দেখতেই পারে।

    সময় সুযোগ করে মুনিয়া একদিন তার চাপা কথাটা আরিফকে সাহস করে বলেই দিলো।

    “আরিফ, তুমি যা বলবে তাই হবে। আমি কোন চাপ দিচ্ছি না তোমাকে। তোমাকে যে নাচতেই হবে এমন কোন কথা নেই। আবার আমাকেও যে তোমার অনুমতি দিতেই হবে এমন‌ও কোন কথা নেই। আমি শুধু এমনেই বললাম, হলে ভালো না হলে আর‌ও ভালো। কারণ মন মত না হ‌ওয়া মানে সেটাতে আল্লাহ তা’য়ালার ইচ্ছা থাকে এবং তিনি যেটা করেন ভালোর জন্য‌ই করেন।”

    মুনিয়া এক নিঃশ্বাসে সব কথা যেন বলে দিল আর অপেক্ষা করতে থাকলো আরিফের জবাবের। আরিফ রাজি হয়ে গেলো সাথে সাথেই।

    “মুনিয়া, প্রথম কথা হলো তুমি এখন‌ও আমার স্ত্রী হ‌ও নি তাও তুমি আমার কাছে অনুমতি চেয়েছো সেটাই আমার খুব ভালো লাগছে। তুমি যে আমাকে তোমার জীবনের একটা অংশ হিসেবে এখন থেকেই গ্রহণ করেছো, তোমার মনের ইচ্ছা তুমি মন খুলে আমাকে বলতে পেরেছো আবার সেটাতে আমার মতামতের যে একটা মূল্য আছে সেটা ভেবেই আমার সত্যি খুব ভালো লাগছে। আর পাগলি, আমি কেন মানা করতে যাবো? নিজের স্ত্রীর সাথে একবার কেন, হাজারবার নৃত্য করতে আমি রাজি আছি। তাও আবার শুধু নৃত্য না, তোমার মুখের এই মায়াবি হাসি দেখতে আমার যা করতে হয় আমি তাই করে যাবো সারা জীবন। শুধু আশা করি আমার ভুল ত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখা হবে কারণ আমি তো আর তোমার মত পারদর্শী না এই ব্যপারে। তবে তুমি শিখিয়ে দিলে আমি পারদর্শী হয়েও যেতে পারি।”

    আরিফের কথা শুনে মুনিয়ার খুশির বাধ র‌ইলো না। এত্ত খুশি মুনিয়া বোধহয় জীবনেও হয় নি। তার জীবনের সকল প্রাপ্তি যেন এই প্রাপ্তির সামনে তুচ্ছ হয়ে গেলো। সত্যিই তার স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে।

    এক সপ্তাহ পরে তার বিয়ের আয়োজন শুরু হয়ে গেলো। বিয়ের সকল পোশাক, সাজ, সরঞ্জাম আরিফের বাড়ি থেকে আসলো। তার পছন্দের লাল-গোলাপি মিশ্রণের কাতান শাড়ি, সাথে মিল রেখে লাল চুরি, গহনা, নূপুর সহ আর‌ও অনেক কিছু। সারা বাড়ি জুরে উৎসবের আমেজ। এসবের মাঝেই আরিফ আর মুনিয়া তাদের নৃত্য চর্চা করতে থাকলো। বাড়ির আর কেউ এই ব্যপারে জানতো না। মুনিয়ার পছন্দের কয়েকটি গান বেছে নেওয়া হলো তাদের নৃত্যের জন্য। সবগুলো গানকে একটি গানে পরিবর্তন করা হলো, প্রায় ১৫ মিনিটের মত। চর্চা চলতে থাকলো, কিন্তু এর‌ই মাঝে মুনিয়া আরেকটি কাজ করলো।

    মুনিয়া আরিফের জন্য একটা ভিন্ন নৃত্য পরিকল্পনা করলো, সারপ্রাইজ বলা যায়। সেটা থাকবে তার একক নৃত্য, হলুদের দিন নাচবে সে। সেইটা নিয়ে সে অনেক উত্তেজিত। আরিফ দেখে কি বলে, তার প্রতিক্রিয়া কি হবে, সে খুশি হবে কিনা, কতটুকু আশ্চর্য হবে সব ভেবেই মুনিয়ার যেন ঘুম হয় না। আরিফ অপছন্দ বা রাগ করবে না সেটা সে ভালো করেই জানে। শুধু জানতে চায় তার প্রতিক্রিয়া যাই হবে সেটা কেমন হবে। এতটা উত্তেজিত মুনিয়া আগে কখনো ছিল না।

    দেখতে দেখতে আরো এক সপ্তাহ পার হয়ে গেল এবং চলে আসলো মুনিয়ার বিয়ে। অনেক বড় করেই আয়োজন করা হয়েছিল তবে অনুষ্ঠান ছিল দুই দিনের। প্রথম দিন সন্ধ্যা থেকে থাকবে সঙ্গীত আর হলুদের অনুষ্ঠান। দ্বিতীয় দিন রাতে হবে বিয়ে। সবকিছু ঠিকঠাক ছিল, পরিকল্পনা মত‌ই সব যাচ্ছিল।

    ‘আরিফ-মুনিয়ার হলুদ সন্ধ্যা’
    বিকালের পর থেকেই মেহমানদের আসা শুরু হয়ে গেলো। মুনিয়ার যেখানে তৈরি হ‌ওয়া নিয়ে ব্যস্ত হ‌ওয়ার কথা ছিল সেখানে সে ব্যস্ত ছিল তার নাচ নিয়ে। আরেকবার আরেকবার বলে সে এই নিয়ে দশবারের‌ও বেশি চর্চা অরে ফেলেছে। কিন্তু এইবার সত্যি সত্যি তাকে তৈরি হয়ে যেতে হবে না হলে হলুদ আর আজকে হচ্ছে না।

    হলুদ বেনারসী শাড়ি পড়লো একদম ঐতিহ্যবাহী বাংলা স্টাইলে। সেই সাথে কাঁচা হলুদ রঙের চুড়ি, কানে আর গলায় লাল রঙের ফুলের গহনা, আর হাতে-পায়ে আলতা। এই যুগে আলতা কে পড়ে? আরিফের পছন্দ আর মুনিয়ার যে অপছন্দ তাও না তাই আরিফের পছন্দটাই করলো সে।

    অবশেষে পৌঁছালো হলুদ মণ্ডলে। শহরের ঠিক মাঝেই তাদের একটা বাড়ি আছে, সিকদার ম্যানশন, সেখানেই সব আয়োজন করা হয়েছে। বাড়ির ভেতরে হলুদ মণ্ডল, বর-কনে দুজনেরটা মুখোমুখি অপর পাশে। সামনে বড় খোলা জায়গা মেহমানদের বসা, হাটা, চলা ফেরার জন্য। বাড়ির বাইরে উঠোনে করা হয়েছে খাবারের আয়োজন। হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হলো মুনিয়া পৌছাঁনোর সাথে সাথেই। আরিফের মা মুনিয়াকে এবং মুনিয়ার মা আরিফকে প্রথম হলুদ লাগিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করলো।

    আনন্দের আমেজে অনুষ্ঠান চলতে থাকলো, সবাই বেশ মজা করেছে কিন্তু মূল আকর্ষণ যেটা সেটাই এখন‌ও হলো না। কি আবার? আরিফের জন্য মুনিয়ার নৃত্য!

    মুনিয়ার বাল্যকালের বান্ধবীকে সে জানিয়েছিল শেষ মুহূর্তে, কিছু সহযোগিতা দরকার ছিল তাই। বান্ধবীকে ইশারা করে বুঝিয়ে দিল এখন‌ই সময়। মুনিয়ার বান্ধবী বুদ্ধি করে বাড়ির মেইন সারকিট বন্ধ করে দিল। হলের মধ্যে হৈচৈ পরে গেলো ততক্ষণাৎ লাইটের ব্যবস্থা করতে, এরকম একটা দিনে কোন ভেজাল হতে দিতে চান না মুনিয়ার বাবা। তিনি‌ই সবচেয়ে বেশি রাগান্বিত হয়ে গিয়েছিলেন এই কাণ্ডের পরে কিন্তু পরোক্ষণেই সব ঠিক হয়ে গেলো।

    মুনিয়ার সবচেয়ে পছন্দের গানের মধ্যে একটি বেজে উঠলো। ইমরান মাহমুদুলের কণ্ঠে ‘বলবো তোকে আজ’ গানটি ছিল এক সময়ের ভীষণ জনপ্রিয়। গানটির প্রথম সুর শুনেই বুঝে আরিফের হার্টবিট একটু বেড়ে গিয়েছিল, কেননা সে এই গানটির কথা হাজার বার মুনিয়ার মুখে শুনেছিল।

    লাইট চলে যাওয়া? হঠাৎ মুনিয়ার পছন্দের গানটি বেজে ওঠা? ঘটনা কি? ভাবতে থাকলো আরিফ। আবার‌ও সবাইকে চমকে দিয়ে লাইট জ্বলে উঠলো কিন্তু এবারের লাইটটা ছিল শুধু মুনিয়াকে কেন্দ্র করে। মুনিয়াকে দেখতে অসম্ভব সুন্দর লাগছিল, চোখ যেন ফেরাতেই পারছিল না আরিফ। কয়েক ঘণ্টা আগে যখন দেখেছিল তখন‌ও এরকম লাগে নি এখন যেমন লাগছে। মুনিয়া কি…?

    আরিফকে চমকে দিয়ে মুনিয়া তার মধুর কণ্ঠে বলে উঠলো,

    “আরিফ, শুধু তোমার জন্য।”

    সাথে সাথেই মুনিয়া তার নৃত্য শুরু করলো। গানের প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি ছন্দে, তালে তালে মুনিয়া তার অসাধারণ নাচ নাচতে থাকলো।

    বলবো তোকে আজ
    বলবো কিছু কথা
    চলবো অচেনা পথ
    ভেঙ্গে সব নীরবতা…

    গানটির প্রতিটি লাইন আরিফের মনে গেথে গেলো, বেশ রোমান্টিক ছিল গানটা। গানের লাইনগুলো যেন মুনিয়া নিজেই আরিফকে বলছিল। মুনিয়া যেমন অনুভূতির সাথে নেচে যাচ্ছিল, আরিফ‌ও অনুভব করছিল মুনিয়ার প্রতিটি তাল।

    সেই গানটি শেষ হ‌ওয়ার পরে ইমরানের আরো বেশ কয়েকটি গানে মুনিয়া তার নাচ দেখালো। মুনিয়া কখনো ভাবে নি সে বাস্তবে তার স্বপ্ন আসলেই পূরণ করতে পারবে। বিয়ে নিয়েই সে স্বপ্ন দেখেছে, পূরণ করলে সেই একটি স্বপ্ন‌ই সে পূরণ করতে চেয়েছে। এরকম ভাগ্যবতী পৃথিবীতে খুব কম মানুষ‌ই থাকে তবে তাদের মধ্যে একজন যে মুনিয়া সেটার জন্য সে আল্লাহর কাছে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে।

    এরকম ভাবতে ভাবতেই আরিফ বিহীন আরেকটি রাত পার হয়ে গেলো। পরেরদিন সকালে সবাই ব্যস্ত হয়ে পরলো নানান কাজে। মুনিয়ার ঘুম ভাঙলো বেশ দেরী করে, অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিল আগের দিন তাই সকালে সময় মত উঠতে পারলো না। তবে কেউ তাকে কেন ডেকে দিল না এই নিয়ে একটু অভিমান করেছিল আমাদের কনে। কিন্তু কনের তো আজকে তৈরি হয়ে বিয়ের পিড়িতে বসা ছাড়া আর কোন কাজ নেই, সেই সাথে ঠিক মত ঘুম না হলে চোখের নিচে কালো দাগ পরে যাবে আর দেখতে খারাপ দেখাবে তাই কেউ তার ঘুমের বাঁধা হয় নি। তার ঘুম ভাঙলো আরিফের ফোন পেয়ে। আরিফ বুঝতে পারছিল না কিভাবে কি হবে, সে খুব চিন্তিত ছিল সবকিছু নিয়ে। তার মতে এটা তার জন্য প্রথম বার আর সে জানে না কিভাবে কি করতে হবে। ঘুম দেরীতে ভাঙ্গার জন্য তার মেজাজ খারাপ হয়ে থাকলেও আরিফের কথায় সে এক ফোটাও রাগ করে নি। খুব‌ই স্বাভাবিক চিন্তার মাথায় সে এরকম আবোল তাবোল কথা বলেছে, এসবের হিসাব বিয়ের পরে নেওয়া যাবে। সেই সাথে আরিফ আরো চিন্তিত ছিল তাদের নৃত্য পরিবেশনা নিয়ে। এটা সত্যি সত্যি তার জীবনের প্রথম একটা অভিজ্ঞতা, ঠিক ঠাক যদি না হয় সেটাই তার ভয়।

    নানান কথা বলে মুনিয়া ঠিক তাকে বুঝিয়ে দিলো আর চিন্তা মুক্ত করে দিলো। তাদের নৃত্য কোন প্রতিযোগিতার জন্য না, তাদের নৃত্য শুধুই একে অন্যের জন্য। এক কথায় বলা যায় তাদের বিয়ে হ‌ওয়ার খুশিতে তারা নাচছে, সেটা শুধু তাদের‌ই পরিবারের সদস্যরা দেখবে। এখানে ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। তাদেরকে নম্বর দেওয়ার মত নৃত্যের কোন গুরু সেখানে উপস্থিত থাকবে না সুতরাং একটা সতেজ মস্তিষ্ক নিয়ে যাওয়ার অনুপ্ররণাই দিলো মুনিয়া।

    আরিফ শুধু মুগ্ধ হয়ে মুনিয়ার কথা শুনছিল, সম্ভব হলে তার চোখের দিকে তাকিয়ে সেই গভীরতায় হারিয়ে যেতো। কিন্তু প্রথা অনুযায়ি হলুদের পরে বিয়ে না হ‌ওয়া পর্যন্ত বর কনে একে অন্যকে দেখতে পারবে না সুতরাং বিয়ের মুহূর্ত পর্যন্ত আরিফ তাকে দেখতে পাবে না। কিন্তু কথা তো বলা যাবে তাই সকল টেনশন মুনিয়ার সাথে কথা বলে দূর করে নিলো।

    আরিফের সাথে কথা শেষ করে মুনিয়া গোসল সেড়ে নাশতা করে নিলো পেট ভরে। এরপরে কখন খাওয়ার সুযোগ পাবে আল্লাহ মালুম। গরুর কালো ভুনার সাথে আটার রুটি, যত সম্ভব খেয়ে নিলো। খাওয়া শেষ করে হাতে মেহেদী দিতে বসে পরলো সে। নৃত্য নিয়ে তার আর তেমন কোন চিন্তা নেই, সব শেষ করে বিয়ের সাজে একবার শুধু চর্চা করে নিবে যাওয়ার আগে। এর বেশি তার মতে আর দরকার নেই।

    পছন্দ মত মেহেদী লাগালো, সেখানে ছোট্ট করে আরিফের নাম। পায়েও মেহেদী মুনিয়ার, দেখে একদম মেহেদী রাঙ্গা ব‌উ লাগছিলো দেখতে। শুধু বিয়ের সাজ সাজা বাকি। পায়ের মেহেদী শুকিয়ে আসলেই পার্লারে চলে গেলো তৈরি হ‌ওয়ার জন্য। সেই কাতান শাড়ি, হাতে চুড়ি, পায়ে নূপুর আর হাত-পা মেহেদী রাঙ্গা…দেখতে তাকে অপরূপ লাগছিল। আরিফের পছন্দকে বেশ বাহ্বা দিলো। মুনিয়াকে এর আগে কখনো এত সুন্দর লেগেছে বলে সে মনে করতে পারছে না।

    পার্লারে সাজতে সাজতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। বিয়ের এখনো বেশ সময় বাকি আছে। ৭টা থেকে মেহমানদের আসা শুরু হয়ে যাবে, এখন বাজে ৬.৩০। মুনিয়া র‌ওনা হবে কিছুক্ষণ পরেই। বর আসার আগেই তাকে পৌছাঁতে হবে আর কিছু জিনিস দেখে নিতে হবে। সামনের জায়গা, ডিজে কে গান বুঝিয়ে দেওয়া, যাওয়ার সাথে সাথেই যেন বিয়ে হয়ে যায় সহ আরো অনেক কিছু।

    প্রায় ৭.৩০ এর দিকে মুনিয়া গিয়ে পৌঁছালো বিয়ের হলে। বিয়ে তাদের অনেক বড় একটা কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজন করা হয়েছে। আগে গেলেও মুনিয়া বেশ চমকে গিয়েছিলো সেখানে যাওয়ার পরে। নিজের চোখকে একদম‌ই বিশ্বাস করতে পারছিলো না।

    মুনিয়ার স্কুল জীবন থেকে শুরু করে কলেজ জীবন, ভার্সিটির সকল বন্ধু-বান্ধবরা সেখানে ছিল। সেই সাথে তার সর্বকালের পছন্দের শিক্ষক, ইলিয়াস স্যার সহ আরো কয়েকজন শিক্ষক‌ও উপস্থিত ছিলেন। কনের আসনে গিয়ে বসা তো দূরের কথা, সবার সাথে সাক্ষাৎ করতে করতেই সময় পেরিয়ে যাচ্ছিলো। সবার সাথে কথা বলে জানা গেলো যে এইসব আরিফ করেছে, সবার সাথে যোগাযোগ আরিফ নিজে করেছে এবং বিশেষ ভাবে আমন্ত্রণ করেছে তাদের বিয়েতে আসার জন্য। আরিফ নিশ্চিত করেছে তারা সবাই যেন অবশ্য‌ই আসে।

    বর-কনের স্টেজ পুরোটা গোলাপ ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছিলো। ছবি তোলার জন্য আলাদা একটা জায়গা ঠিক করা হয়েছিলো অন্য সবার জন্য, পেছনের ব‌্যাকগ্রাউন্ড ছিলো সেন্চুরি পাতার রঙ্গে। স্টেজের সামনে রেড কার্পেট দিয়ে যাওয়ার রাস্তা করা হয়েছে এবং দুপাশে ছিলো মেহমানদের বসার ব্যবস্থা। কমিউনিটি সেন্টারটা ছিল দুই তলা আর উপরের তলায় খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বিয়ের আগে বর কনেকে আলাদা বসানোর জন্য মঞ্চ করা হয়েছে প্রধান স্টেজ থেকে একটু দূরে। মাঝে একটি পর্দা দিয়ে আলাদা করা আর পর্দার দুই পাশে দুই জন বসবে। কাজী তার কাজ অনুযায়ি প্রথমে বর তারপর কনের মতামত নিবে আর তাদের বিয়ে সম্পন্ন করবে।

    যতটুকু আয়োজন করা হয়েছে সব ছিল মুনিয়ার পছন্দের। সারা জীবন তার বাবা মায়ের সাথে সে যেভাবে সব শেয়ার করেছিল ঠিক সেভাবেই তার বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। এর মাঝে নতুন করে শুধু আরিফকে তার পুরনো দিনের স্মৃতি বলার সময় বলেছিল কিছু মূল্যবান মানুষের কথা যারা থাকলে তার বিয়েটা পরিপূর্ণ মনে হবে তার কাছে আর আরিফ সেটাও পূরণ করে দিলো‌। জীবনে আর কিছু বোধহয় মুনিয়ার চাওয়ার নেই।

    মুনিয়াকে তার জায়গা মত আসনে গিয়ে বসে পরলো আর অপেক্ষা করতে থাকলো আরিফের জন্য। আরিফ কখন আসবে, কখন তাদের বিয়ে সম্পন্ন হবে আর কখন সে তাকে সব কিছুর জন্য ধন্যবাদ জানাবে। তারপর তাদের নৃত্য হবে, অনেক মজা হবে, খাওয়া দাওয়া তারপর অবশেষে বিদায় নিয়ে চলে যাবে শ্বশুড় বাড়ি। শুরু হবে তার নতুন জীবন, আরিফের সাথে।

    এসব ভাবতে ভাবতে বাইরে হঠাৎ হৈচৈর শব্দ শোনা গেলো। প্রথমে একটু ভয় পেয়ে গেলো মুনিয়া, বিয়েতে কোন রকম ঝামেলা সে চায় না। যদিও কোন ঝামেলা হ‌ওয়ার কথা না তাহলে কিসের এত আওয়াজ?

    মুনিয়ার বান্ধবীদের কাছ থেকে জানতে পারলো সবাই জামাইকে ধরেছে। মুনিয়ার আর বুঝতে বাকি র‌ইলো না যে সবাই মিলে আরিফের গেট ধরেছে। মুনিয়ার ভাই বোন কেউ ছিল না তাই বন্ধু-বান্ধবরা সহ তার কিছু চাচাতো-মামাতো-খালাতো-ফুফাতো ভাই বোনরা আরিফকে আটকেছে গেটে। আজকে পকেট খালি না করিয়ে আরিফকে তারা ছাড়বে না। সবকিছুই মুনিয়া উপভোগ করতে লাগলো। অবশেষে তার অপেক্ষার পালা শেষ হলো। গেটে সবাইকে খুশি করে আরিফ তার কাছে চলে এসেছে।

    পর্দার অপর দিকে আরিফ এসে বসলো, তাকে দেখা যাচ্ছে না কিন্তু মুনিয়া আরিফের উপস্থিতি ঠিক অনুভব করতে পারছিলো। এতক্ষণে অনেক সময় পার হয়ে গেলো, আর দেরী না করে কাজীকে দ্রুত খবর দেওয়া হলো। কাজী হাসেব এসে তাদের বিয়ে পড়ালো, প্রথমে আরিফ তারপর মুনিয়া তিন বার কবুল বললো। সবার একটাই প্রশ্ন মুনিয়া খুব তাড়াতাড়িই নিজেকে বরের কাছে ধরা দিয়ে দিলো‌। কোন রকম দেরী করলো না, কান্না করলো না, কাজী বলার সাথে সাথেই মুনিয়া কবুল বলে দিলো। এটা কেমন কথা?

    মুনিয়ার কথা ছিল যে তার বিয়েটা কোন দুঃখের বিষয় না যে সে এমন দিন কেঁদে ভাসিয়ে দিবে। আর কবুল যেহেতু বলতেই হবে সেহেতু নানান ভাব-ভনিতা দেখিয়ে দেরী করার কোন মানে হয় না।

    বিয়ে ঠিকঠাক ভাবে সম্পন্ন হ‌ওয়ার পরে বর কনেকে নিয়ে স্টেজে বসানো হলো‌। এই প্রথমবার মুনিয়া আরিফকে মন ভরে দেখে নিলো। কি সুন্দর লাগছিলো তাকে দেখতে! একদম তার স্বপ্নের রাজকুমারের মত! লাল শেরোয়ানি, মাথায় পাগরি, সেই লাগছিলো তাকে দেখতে। সাধারণত ছেলেরা এত গাড়, চোখে পরার মত রঙ পরিধান করে না কিন্তু মুনিয়ার ইচ্ছের কথা ভেবে আরিফ পড়েছে। এমন না জোর করে পড়েছে, কিন্তু এই শেরোয়ানি পছন্দ করার পেছনে বেশিরভাগ মত ছিলো মুনিয়ার।

    – দিদি, আর কত তাকিয়ে থাকবি? এবার আমাদের দিকেও একটু তাকিয়ে দেখ!

    বলে তার মামাতো বোন হেসে দিলো। এভাবে এক দৃষ্টিতে আরিফের দিকে তাকিয়ে থাকা সবার চোখে পরে গেলো।

    – কি দেখছিলে অমন করে?

    আরিফ জিজ্ঞাসা করলো।

    – তোমাকে দেখছিলাম।
    – সারা জীবন‌ই তো দেখবে এখন থেকে।

    মুনিয়া একটা কিছু বলতে যাচ্ছিলো যখন খেয়াল করলো যে আরিফের ঠোট কেমন লাল হয়ে আছে, চোখগুলো রক্তলাল, ঘামছে অনবরত আর কান থেকে যেন ধোয়া বের হচ্ছে। চিন্তিত হয়ে আরিফকে জিজ্ঞাসা করলো কি হয়েছে তার আর আরিফ যা বললো…

    – কি আর হবে! তেমন কিছু না, সচরাচর যা হয় আর কি। সরবত নিয়ে এসেছিলো আমার জন্য গেটে, আমিও বলদের মত খেয়েছি আর খেয়ে এই অবস্থা। মরিচের সরবত ছিলো সেটা, ঝালটা এখন‌ও কাটে নি মুখ থেকে।
    – কি?? ওরা তোমাকে মরিচের সরবত পান করতে দিয়েছে? দাড়াও আমি ওদের খবর নিচ্ছি। নিশাত…
    – শুধু শুধু তুমি আবার নিশাতকে ডাকছো কেন? ওরা তো মজা করবেই আর আজকে একটা দিন‌ই তো। এমন দিন কি বারবার আসে। প্রথমত ভুল আমার ছিল, গেটে কিছু খেতে দিলে সেটা না খাওয়াটাই উত্তম একজন বরের জন্য নাহলে ভুগতে হবে এভাবে আমি জানতাম তাও খেয়েছি। সে কোন ব্যপার না, তুমি কাউকে কিছু বলো না।

    বলেই হেসে দিলো আরিফ।

    – কিছু বলবো না মানে কি? তোমার সাথে এরকম করবে কেন? দেখো তো কি অবস্থা হয়েছে তোমার! ফাজলামোর একটা সীমা থাকে!
    – মুনিয়া, চিন্তা করো না। এটা চলে যাবে। আর যাবে নাই বা কেন, এমন মিষ্টি ব‌উ আমার, পৃথিবীর সব ঝাল হার মেনে যাবে।

    কথায় তার দুষ্টুমির ছোঁয়া। মুনিয়া লজ্জা পেয়ে গেলো। বিয়ে তো হলো, পরিকল্পনা অনুযায়ি যেটা বাকি আছে সেটা করা বাকি এখন শুধু। আরিফকে সে মনে করিয়ে দিলো আর আরিফ কি একটা ঠিক করবে বলে উঠে চলে গেলো। বেশ অনেকটা সময় পার হয়ে গেলো আরিফের কোন খবর নেই। মেহমানরা এখন উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছিল, বর গেলো কোথায়!

    হঠাৎ করেই সেন্টারের সব লাইট বন্ধ হয়ে গেলো। আর দূর থেকে গানের সুর শোনা যাচ্ছিলো। হলের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলো, চারপাশ হয়ে গেলো নিস্তব্ধ। এই গানে তো কিছু হ‌ওয়ার কথা ছিলো না। তাহলে কি?

    রাতের যত তারা আছে
    দিনের গভীরে
    বুকের মাঝে মন যেখানে
    রাখবো তোকে সেখানে…
    তুই কি আমার হবি রে?

    এই গান? এই গান তো মুনিয়ার সবচেয়ে পছন্দের, সেই এক‌ই গায়কের। হঠাৎ করেই লাইট সব চলে এলো আর সামনে আসলো আরিফ। এ কি করছে আরিফ? আরিফ সহ আরিফের কিছু বন্ধুরা সবাই মিলে এই গানটায় নেচে যাচ্ছিলো, মুনিয়া কল্পনা করছে না তো? যেই ছেলে জীবনে কখনো নাচে নি, তার কথায় একটা নাচের জন্য রাজি হয়েছে সেই ছেলে কিভাবে সবার সাথে এখন এত ভালো করে নাচছে? মুনিয়ার নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।

    সামনের যে জায়গাটায় তাদের নাচার কথা ছিল, আরিফ সহ বাকিরা সবাই সেখানেই নাচছে। মুনিয়া মুগ্ধ নয়নে আরিফকে দেখতে দেখতে তার আসন ছেড়ে নিচে নেমে এসে দাড়ালো। একদম ছবির মত করে আরিফ তাকে ঘিরে, কয়েকবার তার গালে স্পর্শ করে দিয়ে গেলো। গানের যেই অংশটি থেকে গায়িকার গলা ভেসে আসলো ঠিক তখন‌ই সেই নৃত্যে মুনিয়াও যোগ দিলো। মুনিয়া এই গানটায় নাচ অনেক আগে থেকেই পারতো তাই তার কোন অসুবিধা হয় নি আরিফকে সঙ্গ দিতে। দুজন মিলে পরে বাকিটা গান একসাথে নেচে গেলো। গান শেষ হ‌ওয়ার সাথে সাথেই আরিফ মুনিয়ার কানে কানে বললো,

    – কেমন দিলাম?
    – আরিফ? কিভাবে?
    – সোনা, তুমিই শুধু সারপ্রাইজ দিতে জানো, আমি জানি না?
    – আচ্ছা! তো আমাদেরটা কি হবে?
    – হবে না আবার! আলবাদ হবে!

    এই বলেই তাদের সেই প্লেলিস্ট চালু হলো যেটাতে তারা নৃত্য করার পরিকল্পনা করেছিলো। “আমার গরুর গাড়িতে” সহ পুরনো দিনের আর নতুন কিছু গানের মিশ্রণ ছিলো।

    মুনিয়ার সকল স্বপ্ন পূরণ হলো, আর আল্লাহর কাছে সে জন্য সে সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকবে। আরিফের মত এত ভালো একজন স্বামী, আরিফের বাবা মায়ের মত এত স্নেহময়ী শ্বশুড়-শ্বাশুড়ী শুধু একজন ভাগ্যবতীর কপালেই সম্ভব। এরকম একটা পরিবার পাশে থাকলে যত ঝড়‌ই আসুক না কেন নিশ্চিন্তে সারা জীবন পার করে দেওয়া যাবে।

    [ সমাপ্ত ]

    ———————————-

    প্রিয় বন্ধুরা,
    আপনারা যারা আমার লেখা পড়েন, আপনাদের অনেক ধন্যবাদ। বেশ কয়েকদিন লিখতে পারি নি নানান ব্যস্ততার কারণে, আশা করছি এবার নিয়মিত থাকবো ইনশাল্লাহ। সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।

    4
    3 Comments
    • প্রথম লাইনটাই মন কেড়ে নিল । “মুনিয়ার ছোটবেলা থেকেই বিয়ে করার শখ।” – একই সাথে কৌতূহল জাগায়, আবার হিউমার সমৃদ্ধ। ভালো লাগল বেশ। শুভেচ্ছা নিবেন।

    • খুব সুন্দর রোম্যান্টিক গল্প। মুনিয়া-আরিফের মত সবার গল্পের সুন্দর সমাপ্তি হোক এই শুভ কামনা রইল।

Skip to toolbar