Profile Photo

সাইফুন নেসা সীমা।Offline

  • MeherMeherShima
  • কিশোরী_বয়সের_ভালোবাসা
    (না কি অপরিণত বয়সের ভুল )
    লেখাঃ মেহের_মেহের_সীমা।
    পর্বঃ ১৩
    আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে সোহেল মামা বললেন, কিরে উত্তর দিতে ভয় পাচ্ছিস?
    তুই তো বাঘিনী তোর আবার ভয় কিসের?
    আসলেই কি সব প্রশ্নের উত্তর হয় ?
    সবার কাছে যেই আমি ভীতু তার কাছে বাঘিনী।
    কারণ সেদিন তার হাতে ছুরি দেখেও আমার সিদ্ধান্ত বদলায়নি।
    সে কারণে আমাকে বাঘিনী বলছে তা আমার বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না।
    আচ্ছা তার প্রশ্নের উত্তর দিলেই কি সব কিছুর সমাধান হবে।
    না হবে না উল্টো তখন আরও ভয়ে ভয়ে থাকতে হবে।
    কিছু প্রশ্নের উত্তর না দেওয়ার মধ্যে যদি কারো মঙ্গল থাকে তো আমি মনে তা এরিয়ে যাওয়া ভালো।
    যেমন আমি তাকে কখনো বলতে পারবো না তার অপরাধ হচ্ছে তার জন্ম শহরে এবং সে আমাদের বাড়ি ওয়ালার ছেলে।
    তার এই পরিচয়ের কারণে আমি কখনো তার আকুলতা বুঝতে চেষ্টা করিনি।
    কেন চেষ্টা করবো যেখানে জানা রয়েছে এটা দিবা স্বপ্ন।
    তার ডাকে সাড়া দিয়ে মা বাবাকে হারানোর সাহস নেয় আমার মধ্যে।
    আমার পরিবারে একটা কথা বা নিয়ম প্রচলিত তা হচ্ছে মেয়ে গরীব ঘরে বৌ রূপে যাবে তাতে আপত্তি নেই।
    তবে ছেলের হতে হবে তাদের আসেপাশের চেনা পরিচিতদের মধ্যে ।
    আর ছেলের শহরে থাকলেও সমস্যা নেই তবে তার জন্মস্থান অবশ্যই হতে হবে আমাদের আসেপাশের গ্রামের মধ্যে।
    গ্রামের ছেলেরা জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে বৌকে নিয়ে শহরে আসলেও নাড়ীর টান কখনো ভুলে যাবে না।
    এটা তাদের বিশ্বাস।
    আর তাদের কাছে টাকার থেকে সম্মান বড়।

    আমার পরিবার এক জেলা থেকে অন্য জেলায় তাদের সন্তানদের বিয়ে দেয় না।
    সে হোক ছেলে বা মেয়ে।
    তাদের (সোহেলদের)পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আমার পরিবারের সম্পর্ক যতই ভালো থাক না কেন ?
    যার বড় ভাই হচ্ছে নামকরা মস্তান তা জেনে কোন বাবাই তার একমাত্র মেয়েকে কখনো সে বাড়িতে বিয়ে দিবে না।
    তাহলে আমার বাবাকে দোষ দেয় কিভাবে?
    আর আমি তো সবসময় মা বাবার বাধ্য সন্তান।
    তাহলে এই আমি কিভাবে তার ডাকে সাড়া দেয়?
    তাই তো মা বাবার কথা ভেবে তাকে বারবার প্রত্যাক্ষান করেছি এই কথা তো তাকে বলতে পারবো না।
    কারণ সে আমাকে ভালোবাসে তাই হয়তো আমার ক্ষতি করবে না।
    কিন্তু সত্য কথা বললে আমার মা বাবার ক্ষতি করবে না তার গ্যারান্টি কি?
    আমার পরিবারের ক্ষতি করতে তার মধ্যে দ্বিধা কাজ নাও করতে পারে।
    তাছাড়া সে সব সময় মনে করতেন, আমার বাবা মা তার পরিবারের কথা ফেলতে পারবে না।
    যেখানে ভিতরের খবর অন্য।
    বিশেষ করে তার বড় ভাইয়ের কথা।
    কারণ লিটন সর্দার বাহিরে সবার জন্য মস্তান হলেও আমার বাবাকে বড় ভাইয়ের মত সম্মান করেন।
    এই পর্যন্ত তিনি কখনো আমার বাবার সাথে উঁচু গলায় কথা বলেনি।
    বরং সব সময় আমার বাবার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখিয়েছেন।
    অবশ্য বাবাও তাকে ছোট ভাইয়ের মত দেখতেন।
    তবে লিটন সর্দার আমার বাবার সাথে যতই ভালো ব্যাবহার করুক না কেন তার একবার জেদ চাপলে সে আপন পর ভুলে যায় মুহূর্তের মধ্যে।
    আমি বিশ্বাস করি সোহেল মামার পরিবার থেকে বিয়ের প্রস্তাব এলে আমার বাবা একমাত্র লিটন সর্দারের কথা ভেবে তাদের প্রস্তাবে রাজি হতেন না।

    কারণ, যেখানে লিটন সর্দার ও সোহেল সর্দার একটু ঝগড়া লাগলে নিজেদের মধ্যে রক্তারক্তি কান্ড ঘটায় ।
    একবার তো লিটন সর্দারের রাগ এতোটাই ভয়াবহ ছিল যে সোহেল সর্দার তার আপন ভাই হওয়া সত্ত্বেও তাকে খুর দিয়ে হাতে জখম করেছিল সুস্থ হতে কয়েক মাস লেগেছিল।
    সেদিনের সেই দৃশ্য দেখে
    একজন বাবা কখনো জেনে শুনে তার মেয়েকে এমন পরিবারের সদস্য করতে চাইবে না।
    যেখানে তার মেয়ের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
    সোহেল সর্দার তার মেয়েকে যতই ভালোবাসুক জীবন না বাঁচলে ভালোবাসা দিয়ে কি হবে?
    সত্য সব সময় তিতা হয় যা শুনার সৎ সাহস অনেকের নেয়।
    যেমন সোহেল সর্দার কখনো নিজের পরিবারের খুঁদ দেখবে না।
    কেউ তাদের খুঁদ ধরেছে তা নিশ্চয় সহ্য করতে চাইবে না।
    আর তাকে এসব বলেও লাভ হবে না।

    কিরে বলছিস না কেন?
    মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছিস কেন!
    পুতুলটার কষ্ট হচ্ছে দে তোর মেয়েকে আমার কোলে দে,

    না,
    ও আমার কোলেই ঠিক আছে ।
    আমি তার কথা শুনে কিছু সময়ের জন্য আঁতকে উঠে উপরের কথাটা বললাম,
    মনে মনে ভয় হচ্ছে এই লোক যদি আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে জিম্মি করে তার ভালোবাসার দাবি করেন?
    তখন কি হবে?
    মানুষ হিসেবে আমি তাকে বিশ্বাস করতে পারলেও একজন মা হিসেবে বিশ্বাস করতে পারছি না।
    আসলে মা বাবারা সন্তানের সব বিষয়ে পজেসিভ থাকেন।
    আমিও তার ব্যাতিক্রম নয়।
    আমার মুখে ভয় দেখে সোহেল সর্দার তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন, আসলে তুই আমাকে কখনো চিনিতে পারলি না আর না পারলি কখনো আমার ভালোবাসা বুঝতে সারাজীবন এটাই আমার সব চেয়ে দুঃখ থাকবে।
    আচ্ছা জান তুই ভাবলি কি করে আমি তোর পুতুলের ক্ষতি করবো?
    আরে এই পুতুলটার শরীরের তো তোর রক্ত বয়ছে।
    আমি নিজে মরতে রাজি কিন্তু তোর বিন্দুমাত্র ক্ষতি দেখতে রাজি না।
    তুই আমাকে ভালোবাসতে না পারলেও আমি তো তোকে ভালোবাসি।
    তার কথা শুনে কিছুক্ষণ আগে আমি আমার উল্টা পাল্টা ভাবনার জন্য মনে মনে লজ্জিত হলাম।
    এটা সত্যি সোহেল ইচ্ছে করলে আমার বড় ধরনের ক্ষতি অনেক আগেই করতে পারতেন।
    বিয়ের পর চার মাস এই এলাকায় বাসা ভাড়া করে থাকতাম।
    সে সময়ে আমার বরের ক্ষতি করা তার জন্য কোন ব্যাপার ছিল না।
    কিন্তু তিনি তা করেননি।
    আমি কথাগুলো ভেবে তার দিকে তাকিয়ে বললাম, আসলে আমি বিশ্বাস করি আপনার মধ্যে একজন ভালো প্রেমিক, বন্ধু, স্বামী হওয়ার সব যোগ্যতার আছে।
    তবে জানেন তো ভালোবাসা জিনিসটা জোর করে হয় না।
    এই যে দেখুন চার বছর ধরে আপনি আমাকে ভালোবাসতেন তবুও কেন যেন আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা হয়নি।
    আপনাকে দেখলে সম্মান করি তবে আপনার প্রতি ভালোবাসার অনূভুতি হয় না।
    মনের উপর তো জোর চলে না।
    এখানে আমার কি দোষ?
    তাছাড়া আপনাকে দেখলে মনে হয় আমার মায়ের আপন ছোট ভাই।
    তাইতো আপনাকে মামা বলি।
    মামা আপনি জানেন আমার না বড় ইচ্ছে ছিল আপনার কোন বড় বোন থাকলে তার বরকে উকিল বাবা বানানোর।
    যাতে আমি এবং আমার বর সব সময় আপনাকে মামা বলে ডাকতে পারি।
    কিন্তু আফসোস তা আর হলো না।

    মামা কথাটা একটু জোর দিয়ে বললাম যাতে আমার সামনে থেকে যাতে তিনি সরে যায়।
    কারণ এই লোক আমাকে সব সময় বলতেন,তুই দরকার হলে আমার নাম ধরে ডাক তবুও মামা বলিস না।
    তোর মুখে মামা ডাক শুনলে আমার হৃদয় জ্বলে।
    প্রিয়সীর মুখে মুখে কেই বা মামা ডাক শুনতে চায়?
    তুই আমাকে মামা ডাকলে আমি তোর সামনে নিজের ভালোবাসার কথা মেলে ধরতে পারি না কেমন লজ্জা করে।
    তোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না।
    হঠাৎ করে অতীতে বলা তার কথাটা মনে পড়ায় তাকে মামা বলে ডাকলাম।

    ফাজিল মেয়ে,বদের হাড্ডি, পাষাণ,ডাইনি।
    ডাইনির কথা শুনে মনে হচ্ছে আমার ভাগ্নি হতে পারেনি সে দুঃখে মরে যাচ্ছে।
    আমার মুখে মামা ডাক শুনে সে রাগে গজগজ করতে করতে সামনে থেকে চলে গেছেন।
    আমি সুস্থির নিঃশ্বাস ছাড়লাম।
    আমি জানি কয়দিন আমার সামনে আসবে না।
    আসলে আমি তাকে কষ্ট দিতে মামা বলিনি।
    আমি চাই সে আমাকে ভুলে যাক।
    আমার আসায় না থেকে সামনে এগিয়ে যান।
    জীবনে একজন ভালো জীবনসঙ্গী পেয়ে আমাকে ভুলে জীবনের নতুন মানে খুঁজে বের করুক।
    তবে আদৌও তা হবে কিনা জানি না।

    বাবার বাড়িতে বাবা মায়ের কাছে প্রতিটি মেয়ে রাজকন্যা।
    আমিও তার ব্যতিক্রম নয়।
    এখানে এসে আরামে আছি , আমার মা আমার পুতুলটাকাকে নিয়ে ব্যস্ত।
    আমাকে কিছু করতে দিচ্ছে না মায়ের হুকুম খাওয়া দাওয়া করবে আর ঘুমাবে।
    আমিও মায়ের লক্ষী মেয়ে হওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত হোক তা একদিনের।
    রাতে আমার মেয়ে তার নানীর সাথে ঘুমাচ্ছে আমি বসে বসে মোবাইলে আমার বিয়ের ছবি দেখছিলাম।
    কারণ বাবা ও ভাইয়েরা এখনো বাসায় ফেরেনি মা আমাকে খেয়ে ঘুমিয়ে যেতে বলেছিল।
    অবশ্য মা জানে সে বললেও রাতে বাবা ও ভাইদের সাথে খাওয়া আমার ছোট বেলার অভ্যাস।
    সেজন্য জোর করেনি।
    এখন মাত্র নয়টা বাজে দোকান বন্ধ করে তাদের আসতে অনেক দেরী আছে।
    অন্যদিকে
    গ্রামের মানুষের কাছে এখন অনেক রাত হয়ে গেছে,
    তারেক হয়তো এখন ঘুমিয়ে গেছেন।
    কারণ ঢাকায় থাকলে যে মানুষ নয়টার মধ্যে ঘুমান গ্রামে তো আরও আগেই ঘুমানোর কথা।
    তাই ফোন করে তাকে বিরক্ত না করিনি ।
    মোবাইল নাড়াচাড়া করছি আর দুপুরে সোহেল মামার বলা কথাগুলো ভাবছি।
    ছোট থেকে বড় হয়েছি এই এলাকায়।
    বিয়ের পর এখানে থেকে অন্য এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়েছে আমার বর।
    তাতে আমার কখনো মন খারাপ হয়নি বরং সুস্থি অনুভব করছিলাম এই ভেবে সোহেল মামার থেকে দূরে থাকতে পারছি এটা ভেবে।
    কারণ আমার আসেপাশে তার ঘুরঘুর দেখে আমার বর ভাবছে তার সাথে আমার সম্পর্ক ছিল।
    তাছাড়া এখানে এলে তার আবেগপ্রবণ কথাবার্তা শুনলে কখনো কখনো নিজেকে খারাপ একজন মনে হয়।
    আসলে আমি চাই না আমার জন্য কারো জীবন থেমে থাক।
    কথাটা ভেবে চোখ বুঝলাম,
    শহর মেতেছে আজ পহেলা বৈশাখের উল্লাসে।
    চারপাশে বাজছে গানের সুর।
    জেগেছে বাঙ্গালির ঘরে ঘরে এ কি মাতন দোলা
    জেগেছে সুরেরই তালে তালে হৃদয় মাতন দোলা
    বছর ঘুরে এলো আরেক প্রভাত নিয়ে
    ফিরে এলো সুরের মঞ্জুরী
    পলাশ শিমুল গাছে লেগেছে আগুন
    এ বুঝি বৈশাখ এলেই শুনি

    মেলায় যাইরে মেলায় যাইরে
    বাসন্তী রঙ শাড়ি পড়ে ললনারা হেটে যায়
    ঐ বখাটে ছেলেদের ভিড়ে ললনাদের রেহাই নাই
    মেলায় যাই রে মেলায় যাই রে

    জেগেছে রমণীর খোপাতে বেলী ফুলের মালা
    ভিনদেশী সুগন্ধী মেখে আজ প্রেমের কথা বলা
    রমনা বটমূলে গান থেমে গেলে
    প্রখর রোদে এ যেন মিছিল চলে
    ঢাকার রাজপথে রঙের মেলায়
    এ বুঝি বৈশাখ এলেই শুনি…

    মেলায় যাইরে মেলায় যাইরে
    বাসন্তী রঙ শাড়ি পড়ে ললনারা হেটে যায়
    ঐ বখাটে ছেলেদের ভিড়ে ললনাদের রেহাই নাই
    মেলায় যাই রে মেলায় যাই রে।
    প্রতিটি দোকানে দোকানে গানটি বাজছে,
    তরুণ তরুণী হাতে হাত রেখে ঘোরাঘুরি করছে।
    এরমধ্যে সোহেল বলেন,
    এই বিলাই ফুসকা খাবি?
    আমার বন্ধুরা ফুসকার স্টল দিয়েছে ওদিকে।
    আমি রাগি চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললাম,মামা আপনি আমাকে আর কখনো বিলাই বলবেন না।
    থাপ্পর দিয়ে দাঁত ফেলে দিবো বেয়াদব , আমার কি চুল পেঁকেছে নাকি আমার বয়স বেশি?
    মামা বলছিস কেন?
    মামা কে মামা বলবো না তো কি বলবো?
    এসেছেন একজন আমাকে থাপ্পর মারবেন।
    আরে আমার ভুল হয়েছে এই বজ্জাত লোকের সাথে মেলাতে এসে।
    আমি থাকবো না এখানে কথাটা বিরবির করে বলে আমি বের হয়ে যাচ্ছিলাম এরমধ্যে সোহেল মামা আমার হাত ধরে বললেন, এক পা সামনে এগিয়ে দ্যাখ পা হাতে ধরিয়ে দিব বেয়াদব কোথাকার।
    এই মুহূর্তে তোর দায়িত্ব আমার তাই একা কোথাও যেতে পারবি না।
    তাই চুপচাপ আমার পাশে দাড়িয়ে থাক।
    তার কথা শুনে মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছিল এরমধ্যে এরমধ্যে তন্দ্রা কেটে যায়।
    চোখের সামনে একে একে ভেসে ওঠে অতীতের স্মৃতিগুলো,

    আমি তখন সেনাপল্লী স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়তাম।
    আমাদের স্কুলের সামনে ছিল বিএন স্কুল।
    সেখানে প্রতি বছর তিন দিনের পহেলা বৈশাখের মেলা বসতো।
    টিকিট কেটে যাওয়া লাগতো তবে সেখানে বহিরাগতদের যাওয়ার উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল।
    তবে যারা মেলায় স্টোল দিবে তাদের লোকজনের জন্য কিছু টিকেট দেওয়া হতো।
    আমরা যেহেতু আর্মি স্কুলে পড়ি সে সুত্রে আমাদের স্কুলে সব ছাত্র ছাত্রীদের টিকিট দেওয়া হতো বিনামূল্যে।
    তবে তিনদিন মেলা হলেও উৎসব মুখর পরিবেশ থাকতো প্রথম দিন।
    সে সময়ে মেলায় লাল সবুজ বাতি নজর কাড়ত আমাদের মন।
    মেলায় যেতে উৎসুক হয়ে থাকতাম।
    টিকেট পেয়ে খুশিতে বাক বাকুম হয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বললাম,আম্মু ও আম্মু মেলায় নিয়ে যাবে?
    আম্মু আমার কথা শুনে বললেন,দেখি।
    আম্মুর দেখি মানে যাওয়া হবে ভেবে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
    সেদিন বিকালে সোহেল মামা আমাদের বাসায় আসেন। কথায় কথায় মা তাকে বলেন, আমি মেলায় যেতে চাই। আমার মেলায় যাওয়ার কথা শুনে তিনি আমার মা’কে বললেন,ভাবী আমিও তো তৃণাকে নিয়ে মেলায় যাচ্ছি।
    আমার বন্ধুরা খাবারের স্টোল দিয়েছে স্টোল দেখতে যেতে বলেছে।
    ভাবছি তৃণাকে নিয়ে যাব।
    যদি আপনি বলেন তো আমাদের সাথে ওকে নিয়ে যেতে পারি।
    আম্মু সোহেল মামার কথা শুনে বললেন,তৃণা যেহেতু যাচ্ছে তাহলে সীমাও যাবে।
    ভাই যেহেতু ওদের সাথে তুমি যাচ্ছো তো চিন্তার কিছু দেখছি না।
    ও আপনাদের তো বলা হয়নি তৃণা হচ্ছে সোহেল মামার একমাত্র বোন।

    মা সরল মনে তাদের সাথে আমাকে পাঠান।
    সে তো আর জানতেন না মেলায় এনে তার মেয়েকে অপমান করবে কথাটা ভেবে আমার কান্না পাচ্ছিল।
    তবুও কান্না আটকে তার পিছনে পিছনে হাঁটছিলাম।
    কিন্তু হুট করে সোহেল মামা আমার আর তৃণার হাত ধরে হাঁটতে লাগলেন।
    আমি হাত ছাড়াতে চেষ্টা করলে সে বললেন,সখে তোর হাত ধরিনি।
    মেলায় মানুষের ভীড়ে হারিয়ে গেলে তোকে কে খুঁজবে?
    হারিয়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে সম্পূর্ণ মেলায় আমাদের হাত ধরে ছিলেন।
    সেদিন একটা বিষয় ভেবে অবাক হয়েছিলাম , তার বন্ধুরা আমাকে দেখে ফিসফিস করছিল এবং তাকে কুচ কুচ হোতা হে বলে খোঁচাচ্ছেন।
    সে ওদের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছিলেন।
    তার হাসির কারণ আমার ছোট মাথায় বোধগম্য হলো না।
    তবে সে সময়ে তার হাঁসির অর্থ না বুঝলেও তার কিছুক্ষণ পর আমার কাছে সব পরিস্কার হয়ে যায়।
    মেলায় ঘুরাঘরি শেষে তিনি আমাকে একটা শোপিচ কিনে দেন।
    আমি নিতে চায়নি সে জোর করে আমার হাতে ধরিয়ে দেয়।
    দোলনায় একটা ছেলে ও একটা মেয়ে বসে রয়েছে।
    ছেলেটার হাতে রয়েছে ফুল আর মেয়েটার হাতে ভালোবাসা।
    শোপিচটা যেন কারো ভালোবাসা ব্যক্ত করেছিলেন।
    আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ওখানে পুতুল, খরগোশ, মসজিদ, পাখির শোপিচ ছিল তা না দিয়ে আমাকে এটা দিয়েছে।
    এটা দেখে আমার ছোট মনে তখন খটকা লাগলো।
    কারণ আমার বয়স কম হলেও দেখতে শুনতে ৯ম,১০ম শ্রণীর ছাত্রী মনে হতো যার দরুন ৪র্থ শ্রেণীতে থাকতে প্রথম গোলাপ ফুল ও প্রেমপত্র পাই।
    ভয় পেয়ে ওগুলো ছুড়ে ফেলে দৌড়ে বাসায় এসে
    সে সময়ে আম্মু’কে সব বলে দেয়।
    চলার পথে এমন প্রেমপত্র অনেকে দিবে সেদিকে নজর দিলে নিজের ক্ষতি হবে।
    কারণ এদের মধ্যে কে ভালো কে খারাপ বোঝা কষ্টকর।
    তুমি একজন খারাপ মানুষের হাতে পড়লে তোমাকে বিদেশে বিক্রি করে দিবে।
    সেখানে তোমাকে মেরে তোমার শরীরের এক একটা কেটে বিক্রি করে দিবে।
    সেদিন আম্মু আমাকে একজন বান্ধবীর মতো খুব সুন্দর করে উপরের কথাগুলো বুঝিয়ে বলেন
    এর পর থেকে এই পর্যন্ত অনেকের প্রেমপত্র পেয়েছি।
    তবে তাদের দিকে ফিরেও তাকায়নি।
    তাই এই মুহূর্তে আমাকে দেওয়া তার উপহার এবং আমার দিকে তার তাকানো দেখে আমার মনে সন্দেহ জাগে।
    তাইতো সেদিন মেলায় থেকে আসার পর আমার প্রতি তার কর্মকান্ড ফলো করতে থাকি।
    কিছুদিন খেয়াল করে দেখলাম আমার সব ব্যাপারে তার আগ্রহ বেশি।
    তা দেখে আমি তার থেকে দূরে সরে থাকার চেষ্টা করতাম।
    কারণ আমি চায়নি সামনে কোনো অসস্থিকর অবস্থায় পড়তে।
    তাইতো সে আমাদের বাসায় এলে আমি ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকতাম তার সামনে আসতাম না।
    সব সময় চেষ্টা করতাম তার সামনে না পড়ি।
    সে যেখানে থাকতেন তার ত্রিসীমানায় আমার ছায়া পড়তে দিতাম না।
    কিন্তু ভাগ্য বলেও তো একটা কথা আছে।
    সোহেল মামা আমার আচরণে অধৈর্য হয়ে একদিন বিকালে সেদিন মা বাহিরে ছিলেন সূযোগ বুঝে আমাদের বাসায় এসে চকলেট ও গোলাপ ফুল দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে বলেন, আমি জানি তুই এখনও অনেটা ছোট।
    কিন্তু তোর বোঝার ক্ষমতা অন্য সবার থেকে ভালো।
    কারণ এই বয়সে যে মেয়ে প্রেমে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার সাহস করতে পারে।
    সে আর যায় হোক অন্য সবার মত নয়।
    কিন্তু তুই কি জানিস তোর পিছনে থাকা ছেলেদের লাইন দেখে আমার ভয় হয়?
    আমি তার কথা শুনে চমকে উঠি!
    সে আবারো বলেন,ভয় হয় তোকে হারিয়ে ফেলার।
    তোকে আমি ভালোবাসি সুন্দরী।
    আমার ভালোবাসা গ্রহণ করে
    আমাকে তোর সঙ্গী করে নিবি?
    তোর প্রিয় একজন হওয়ার সুযোগ দিবি?
    একবার শুধু সুযোগ দে তোকে আমার হৃদয়ের রাজরানী করে রাখবো।
    এতদিন যাকে মামা বলে ডেকে এসেছি তার মুখে ভালোবাসার কথা শুনে তার থেকে ছিটকে দূরে সরে,
    চলবে।

    16
    10 Comments

Saifun nesa Shima

Housewife

Skip to toolbar