Profile Photo

A.N.M.SolaymanOffline

  • 000A999@888
  • Profile picture of A.N.M.Solayman

    A.N.M.Solayman

    4 years, 9 months ago

    তনয়া
    আবু নাঈম
    পার্ট:-৩
    দুহাতে তুলে নিলাম তনয়ার ছোট্ট দেহটা, জড়িয়ে নিলাম বুকের সাথে। যেন একটা বড়সড় রক্তপিন্ড। আমাকে জড়িয়ে ধরেনি মেয়েটা, দুছোখ বোঁজা, যন্ত্রণায় মুখটা কেমন যেন নীল হয়ে আছে।
    যত্ন করে শোয়ালাম টেবিলে, আলমিরা খুলে নিয়ে এলাম ফাস্ট এইড বক্স, দ্রুত হাতে রক্ত পরিষ্কার করে নিলাম। পেটের ডান পাশে বড় একটা ক্ষত তৈরী হয়ে আছে, কপালের ডানপাশটাও অনেকটুকু কেটে গেছে। গজকাপড় পেঁচিয়ে ভালো করে বাঁধলাম, সেন্সে নেই মেয়েটা এখনো। এবার ওকে নিয়ে ছুটলাম ক্লিনিকের দিকে…
    ড.কামাল সাহেবের মুখোমুখি বসে আছি আমি, কথা বলছেন ড.কামাল, আপনি রিল্যাক্স হোন মিঃরোহান। কিছুই হবেনা আপনার মেয়ের, ভিতরে যে কাঁচের টুকরো ছিলো তা বের করা হয়েছে। তাছাড়া এটা বড় কোন সমস্যা নয়, ভয় পেয়ে জ্ঞান হারিয়েছে।
    আর হ্যাঁ বেশী ব্লিডিং হওয়ায় এক ব্যাগ রক্ত দেয়া জরুরী, আপনি দেখবেন নাকি আমি দেখবো?
    কি গ্রুপ ওর রক্তের? প্রশ্নটা আমার যেন প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই বেরিয়ে এলো। ও প্লাস, যেন স্বগতোক্তি করলেন ড.কামাল। বললাম রক্ত আমি দিতে পারবো, আপনি নেয়ার ব্যবস্থা করুন। ড. কামাল একজন নার্স ডেকে আমাকে পাঠালেন তার সাথে।
    রাতে জ্ঞান ফিরতেই ওর চোখ আমাকেই খুজে পেলো, হাত বাড়িয়ে বাবাকে আরো কাছে চাইলো। ঝুঁকে পড়ে বললাম, মা ভয় পেওনা একদম, আমি তোমার কাছেই তো আছি। কোন দিকে কান নেই তনয়ার, ভীত হরিণীর মতো আঁকড়ে ধরে আছে আমায়। কাঁপছে পুরো শরীর, বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে।
    দু’সপ্তাহ পর ক্লিনিক ছেড়ে বাসায় এলাম, যদিও দুদিন পরই ড.কামাল সাহেব রিলিজের কথা বলেছেন, তবে আমি কোন রিস্ক নিতে চাই নি। এখনো পুরোপুরি সুস্থ নয় মেয়েটা, কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে, আমাকে কাছ ছাড়া করতেই চায় না। যাই করবো সব ওকে কোলে রেখেই করতে হবে। এখন আমার দু’হাত নয় বরং একহাতে সব কাজ সারতে হয়। বাম হাতে সব সময় তনয়া বুকের সাথে জড়ানো থাকে। ওকে ছাড়া কোথাও যাওয়া আমার জন্য চিন্তার ও বাইরে। বাজার থেকে রান্না, গোসল থেকে ঘুম সবকিছুতে তনয়া আমার ছায়ার মতো। তমার সাথেও যেন মিশতে ভয় পায়, মেয়েটা মাঝে মাঝে আসে, এটা ওটা দিয়ে ভাব জমাতে চায়। আমিও একটু একটু বলি, আন্টির কাছে যাও তোমাকে অমলেট দিবে। আমি আন্টির থেকে নয় বাবার থেকেই খাবো উত্তর থাকে তনয়ার।
    ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হতে লাগলো, তনয়ার ভয় অনেকটা কমেছে, তমার সাথেও কদিন ধরেই মিশতে শুরু করেছে।
    বাবা-মেয়ের খুনশুটি আর হুল্লোড়ে কেটে যাচ্ছিলো আমাদের সময় গুলো, একতলা দো’তলা করতে করতে তনয়ার বয়স চার বছরে পরিণত হলো।
    তমা একদিন হঠাৎ সকাল বেলা এলো, সাথে ওর বাচ্চা ও। ভাইজান আজ আমরাও আপনাদের সাথে নাস্তা করবো, হেসে বললো তমা।
    আমি কিছুটা অবাক হয়ে বললাম, আমাদের নাস্তা করতে দেরী হবে, এখনো কিছু তৈরী করিনি। তুমি চাইলে বিস্কিট খেতে পার তবে শুকনো। রহস্য করে হাসলো তমা, তারপর বললো চলুন, নিচে চলুন। আমি অবাক হইনি খুব একটা এই মেয়েটা পারেনা এমন খুব বেশীকিছু নেই। বললাম তুমি যাও আমি তনয়াকে ডেকে আসছি। তমা বললো তার দরকার নেই ভাইজান, তনয়া সকাল থেকেই তো আমার কাছে আছে। আমি হাসলাম একটু করে, বললাম চলো।
    নাস্তার টেবিলে কথাটা শুরু করলো তমা, ভাইজান, আজ আমি আপনাকে ডেকেছি একটা কথা বলবো বলে, থামলো তমা, চোখ রাখলো আমার চোখে। বললাম কি কথা বলো? কৌতুহলি হয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম।
    বলছি তনয়ার বয়স তো চার বছর হয়ে গেলো,ওকে এখন স্কুলে দেয়া দরকার আপনি কি বলেন? হুমম তাইতো! আমি তো এখনো ভাবিই নি এদিকটা। ঠিক আছে দুএক দিনের মধ্যেই আমি ভর্তির বিষয়টা দেখবো। আপনিও পারলে দু’একটা স্কুলে কথা বলে দেখতে পারেন।
    কয়েক দিনের মাঝেই তনয়ার স্কুল জীবন শুরু হলো, সাথে আমার ও। বাবাকে ছাড়া সে ক্লাসে বসবেই না, অগত্যা কি আর করা, আমারও সেই ছোট ছোট বেন্চে বসে ক্লাস শুরু করতে হলো।
    ক্লাসে যাওয়া আমার খুব বেশীদিন লাগেনি। একদিন তনয়া নিজেই বললো বাবা তুমি যাও, আমি বন্ধুদের সাথে বসতে পারবো। সেদিন থেকে ক্লাসে দিয়ে আসা ছাড়া আমার আর কাজ ছিলোনা, তমাই দুপুরে ওকে নিয়ে ফিরতো।
    দুপুরে খেয়ে ঘুমানো, বিকেলে খেলতে যাওয়া আর রাতে হোমওয়ার্ক রেড়ী করার মতো নতুন রুটিন সেট করতে হলো আমাকে।
    কিছুদিনের মাথায় ভাবলাম তনয়া স্কুলে চলে যাওয়ার পর আমি তো শুয়ে বসেই সময় পার করি, তারছেয়ে নতুন করে কিছু শুরু করলেতো মন্দ হয়না।
    সেদিন তনয়াকে স্কুলে দিয়ে বের হলাম একটা চাকরীর খোঁজে। পুরোদিন ঘুরে ঘুরে অনেকে প্রতিষ্ঠানে সিভি জমা দিয়ে এলাম।কদিন পর থেকেই ফোন, মেইল আসা শুরু করলো, আবার নতুন করে ইন্টারভিউ দেয়া শুরু করলাম। মৌলিক প্রশ্নটা আমার জন্য কমন ছিল, আপনার চাকরিজীবনে চার বছরের গ্যাপ কেন??
    উত্তর কারো কাছে যৌক্তিক নয়, আবার কারো কাছে যৌক্তিক হলেও আমার এখনো সমস্যার সমাধান হয়নি। এসব কারণ দেখিয়ে রিজেক্ট করতে থাকলো।
    অবশেষে একটা ফার্মে এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হলাম। জীবনের একটা নতুন অধ্যায়ের সুচনা হলো। শুরু করলাম নতুন ভাবে সংগ্রাম। এই অফিসটা আমাকে অনেক দায়িত্বের সাথে সাথে অনেক স্বপ্নও দেখতে শিখালো।
    তনয়া বড় হচ্ছে একটু একটু করে, ক্লাস পাড়ি দিচ্ছে সাফল্যের সাথে। ক্লাস থ্রীতে পড়ে মেয়েটা এখন আর হোমওয়ার্ক রেড়ী করে দেয়ার জন্য আমাকে জ্বালায় না। আমার অনিয়মের যন্ত্রণায় অতিষ্ট হয়ে অনেক বছর আগে মা বলেছিলেন, আমি আর পারছিনা, বিশটা বছর ধরে জ্বালাচ্ছিস আমায়। আর কত জ্বলবো??
    মাকে মজা করে বলেছিলাম, তুমি না পারলে অন্যকারো কাছে দায়িত্ব ভাগ করে দাও। আমি নিয়মে আসতে পারবোনা, যত অনিয়মই আমার জীবনে নিয়ম। সেই কথাটা এতবছর পর মনে পড়লো,কারন তনয়া যেন দিন দিন সেই দায়িত্বটাই নিজের ঘাঁড়ে তুলে নিচ্ছে।
    বাবা বাবা, উঠো বাবা, বাবা উঠোনা.. তনয়ার এরকম ননস্টপ ডাকে আমার ঘুম ভাঙ্গলো। ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখে ঘুম নেমেছিল আর রাত পেরিয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। বললাম কি হলো মা, এত ডাকছিস কেন???
    বাবা তুমি অফিসে যাবেনা? আমার স্কুলের দেরী হয়ে যাচ্ছে তো! আজ ম্যাম বকা দিলে আমি কিন্তু বলে দিবো বাবার জন্যই দেরী হয়েছে।
    থাক বুঝেছি আমি,তুমি নাস্তা কর গিয়ে আমি দু’মিনিটেই রেড়ী হয়ে আসছি…..
    সমাপ্ত

    6
    4 Comments
Skip to toolbar