Profile Photo

Aditya BhowmikOffline

  • adityabhowmik
  • Profile picture of Aditya Bhowmik

    Aditya Bhowmik

    • 1 month ago

    আমি একটু অন্যরকম ছিলাম
    আমি ছোটবেলা থেকেই একটু অন্যরকম।
    সবাই যেমন সহজে মানুষের সঙ্গে মিশতে পারত, কথা বলতে পারত, আমি তেমন ছিলাম না। স্কুলেও খুব একটা যেতাম না। মানুষের ভিড়ের মাঝেও কেন জানি নিজেকে আলাদা মনে হতো। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি, তারপর হঠাৎ করেই পড়াশোনার প্রতি মনটা কেমন যেন হারিয়ে গেল। কেন হারিয়ে গেল, আজও তার উত্তর আমার নিজের কাছেই নেই।
    আমার মা হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর সন্তান অন্যদের মতো নয়। তাই আমাকে নিয়ে ভারত পর্যন্ত গিয়েছিলেন, ডাক্তার দেখিয়েছিলেন। অনেক আশা ছিল হয়তো আমি বদলে যাব, হয়তো আমার ভেতরের অস্থিরতাগুলো একটু শান্ত হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তেমন কিছুই হলো না।
    আজও আমার ভেতরে অনেক রাগ। অল্পতেই রেগে যাই, অনেক সময় নিজের রাগকেই নিজের কাছে অপরিচিত মনে হয়। রাগের মুহূর্তে এমন কিছু কথা বলে ফেলি, এমন কিছু আচরণ করি, যা পরে মনে হলে নিজের কাছেই খারাপ লাগে। তখন মনে হয় আমি কি সত্যিই এমন হতে চেয়েছিলাম?
    কখনো কখনো মনে হয়, ছোটবেলা থেকে যদি আমাকে আরেকটু বুঝে দেখা হতো, আমার মনের কথাগুলো যদি কেউ একটু মন দিয়ে শুনত, আমার প্রতি যদি আরেকটু যত্ন, ধৈর্য আর খেয়াল রাখা হতো তাহলে হয়তো আজকের আমি অন্যরকম হতে পারতাম। হয়তো এত রাগ জমে থাকত না বুকের ভেতর। হয়তো মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে না গিয়ে মানুষকেই আপন করে নিতে শিখতাম আরও সুন্দরভাবে।
    আমার জন্ম কুমিল্লায়। অথচ আমার সেই জন্মভূমিতেই ছোটবেলা থেকে থাকা হয়ে ওঠেনি। কী অদ্ভুত না যে মাটিতে আমার জন্ম, সেই মাটির সঙ্গে শৈশবের স্মৃতিগুলোই সবচেয়ে কম। তবুও কুমিল্লার প্রতি আমার অদ্ভুত এক টান। মনে হয়, এই শহরের বাতাসের মধ্যেও যেন আমার নিজের কোনো গল্প লুকিয়ে আছে।
    আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমার মধ্যে আছে আমি কোথাও কিছুদিন থাকলেই সেই জায়গাটার প্রতি মায়া জন্মে যায়। মানুষগুলোর প্রতি মায়া জন্মে যায়। তারপর যখন সেই জায়গা ছেড়ে চলে আসার সময় হয়, বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। মনে হয়, আমি যেন শুধু একটা জায়গা ছেড়ে যাচ্ছি না সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি অনেকগুলো মুখ, অনেকগুলো মুহূর্ত, অনেকগুলো না বলা কথা।
    আমি জানি, পৃথিবীতে কেউ কারও চিরদিনের নয়।
    তবুও কেন জানি সবাইকে আপন ভাবি।
    জানি না, আমার জন্য কার কতটুকু মায়া আছে। জানি না, আমি কারও মনে সত্যিই কতটা জায়গা করে নিতে পেরেছি। কখনো কখনো নিজের কাছেই প্রশ্ন করি যাদের আমি এতটা আপন ভাবি, তারাও কি আমাকে ততটা আপন ভাবে? নাকি আমার এই মায়াগুলো শুধু আমার একার?
    হয়তো সবাইকে আপন ভাবা ঠিক নয়। হয়তো সবার প্রতি এতটা মায়া রাখাও ঠিক নয়। কারণ মায়া যত বেশি হয়, বিচ্ছেদের কষ্টও তত বেশি হয়।
    আর “স্মৃতি” শব্দটা শুনলেই কেন জানি আমার বুকটা ভার হয়ে আসে। মনে হয়, চোখের কোণে জমে থাকা জলটা বুঝি আর ধরে রাখতে পারব না। কারণ স্মৃতি মানেই তো ফিরে যাওয়া যায় না এমন কিছু মুহূর্ত। স্মৃতি মানেই একসময় যা ছিল, আজ তা নেই। মানুষ আছে, কিন্তু সেই সময়টা নেই। জায়গা আছে, কিন্তু সেই দিনগুলো নেই। তাই স্মৃতি আমার কাছে কখনো কখনো আনন্দের চেয়ে বেশি কষ্টের।
    পড়াশোনা এখন আর করি না। কিন্তু শব্দের সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। আমি কবিতা লিখি। জানি না, কোনোদিন বড় কবি হতে পারব কি না। জানি না, আমার লেখা কোনোদিন মানুষের হৃদয়ে সত্যিকারের জায়গা করে নেবে কি না। জানি না, কেউ কোনোদিন আমার কবিতা পড়ে বলবে কি না “এই কথাগুলো তো আমার মনের কথাই।”
    তবুও লিখি।
    কারণ হয়তো আমার কাছে কবিতা শুধু কবিতা নয় আমার না বলা কথাগুলোর আশ্রয়। যে কথাগুলো মানুষকে বলতে পারি না, সেগুলোই কখনো কাগজের কাছে বলে ফেলি। আমার কষ্ট, আমার মায়া, আমার অভিমান, আমার হারিয়ে যাওয়া শৈশব সবকিছু যেন শব্দ হয়ে আমার কাছে ফিরে আসে।
    জীবনের শেষ পরিণতি কী, আমি জানি না।
    অনেকেই বলে, মানুষ হয়তো জন্মের আগে কোনো ঋণ রেখে আসে, কোনো অজানা হিসাব নিয়ে পৃথিবীতে আসে; কারও ঋণ শোধ করতে হয়, কোনো কর্মের ফল ভোগ করতে হয়। জানি না এসব সত্য কি না। জানি না, আগের কোনো জন্মে আমি কী করেছিলাম। কারও কাছে কোনো ঋণ রেখে এসেছিলাম কি না, কিংবা কারও কাছ থেকে কিছু পাওনা ছিল কি না কিছুই জানি না।
    শুধু এটুকু জানি এই জীবনে আমি অনেক কিছু পাইনি, আবার অনেক মানুষকে পেয়েও হারিয়েছি। অনেক জায়গায় গিয়েছি, মায়া রেখে এসেছি। অনেক মানুষকে আপন ভেবেছি, জানি না তারা আমাকে কতটা আপন ভেবেছে।
    তবুও আমি কাউকে দোষ দিতে চাই না।
    হয়তো আমার জীবনটা একটু অন্যরকম হওয়ার কথা ছিল।
    হয়তো আমার শৈশবটা অন্যদের মতো হওয়ার কথা ছিল না।
    হয়তো আমার পথটা একটু বেশি একা হওয়ার কথা ছিল।
    কিন্তু আমি চাই, আমার এই একাকিত্ব একদিন কবিতায় পরিণত হোক। আমার চোখের জল একদিন কারও হৃদয়ে অনুভূতি হয়ে পৌঁছাক। আমার জীবনের অপূর্ণতাগুলো একদিন আমার লেখার পূর্ণতা হয়ে উঠুক।
    আমি জানি না ভবিষ্যতে আমি কোথায় গিয়ে দাঁড়াব।
    জানি না, মানুষ আমাকে মনে রাখবে কি না।
    জানি না, কোনোদিন বড় কবি হতে পারব কি না।
    তবুও শেষ পর্যন্ত একটা স্বপ্ন বুকে রেখে যেতে চাই
    যদি জীবনে অনেক কিছু না-ও পাই, অন্তত আমার লেখা কয়েকটি কবিতা যেন কোনো এক অচেনা মানুষের হৃদয়ে গিয়ে বলে
    “তুমি একা নও।
    কেউ একজন তোমার মতোই কেঁদেছিল,
    কেউ একজন তোমার মতোই সবাইকে আপন ভেবেছিল,
    আর কেউ একজন স্মৃতির কথা শুনলেই
    চোখের জল লুকাতে পারত না।”
    হয়তো সেখানেই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।
    আদিত্য ভৌমিক
    ১৯ আগস্ট ২০২৬

    4
    3 Comments
    • স্মৃতি মানেই কষ্ট—এটা খুব সত্যি! কিন্ত আমরা তো স্মৃতিতেই বাঁচি। কবিতায় আশ্রয় খোজার বিষয়টি দারুন লাগলো।

    • Aditya Bhowmik, আপনার জীবনের এই সততা আর না বলা কথাগুলোর গভীর আবেগ আমাকে ভীষণভাবে স্পর্শ করেছে। প্রতিটি শব্দে আপনার হৃদয়ের যে নিবিড় টান ও মায়া অনুভব করা যায়, তা অটুট রেখে নিয়মিত লিখে যাওয়ার জন্য আপনাকে অনেক উৎসাহ জানাই।

    • Aditya Bhowmik, আপনার লেখাটা পড়ে মনের ভেতরটা এক অদ্ভুত মায়ার অনুভূতিতে ভরে গেল। মানুষের একা হয়ে যাওয়ার কষ্টগুলো আপনি এত সুন্দর করে শব্দে সাজিয়েছেন যে সত্যিই অনেক কিছু মনে করিয়ে দিল।

Skip to toolbar