-
শেষ চিঠি
বৃদ্ধ মানুষটি প্রতিদিন বিকেলে একই জায়গায় এসে বসতেন।
পুরোনো কাঠের বেঞ্চটা ছিল নদীর ধারে। সামনে শান্ত নদী, ওপারে সবুজ গাছপালা, আর মাথার ওপর নরম আকাশ।
তার হাতে থাকত একটি পুরোনো খাম।
কেউ জানত না, খামের ভেতরে কী আছে।
চায়ের দোকানের ছেলেটা একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করল,
— “চাচা, প্রতিদিন এই চিঠিটা নিয়ে এখানে বসেন কেন?”
বৃদ্ধ মানুষটি মৃদু হেসে বললেন,
— “অপেক্ষা করি।”
— “কার জন্য?”
কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে থেকে তিনি বললেন,
— “আমার মেয়ের জন্য।”
মেয়েটি বহু বছর আগে শহরে চলে গিয়েছিল। যাওয়ার সময় বলেছিল,
“বাবা, আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসব।”
কিন্তু সেই “তাড়াতাড়ি” আর আসেনি।
বছর কেটে গেছে।
মেয়েটি হয়তো নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছে। হয়তো বাবার কথা ভুলে গেছে। কিন্তু বাবা ভুলতে পারেননি।
একদিন অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি আবার নদীর ধারে এলেন।
চায়ের দোকানের ছেলেটা বলল,
— “চাচা, আজ এত কষ্ট করে এসেছেন কেন?”
বৃদ্ধ মানুষটি খামটা হাতে নিয়ে বললেন,
— “আজ শেষ চিঠিটা লিখেছি।”
ছেলেটা অবাক হয়ে বলল,
— “চিঠি কি পাঠাবেন?”
তিনি মাথা নাড়লেন।
— “না। আজ আর পাঠাব না।”
— “তাহলে?”
বৃদ্ধ মানুষটি চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরে বললেন,
— “কিছু কথা মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য লেখা হয় না। নিজের বুকটা একটু হালকা করার জন্য লেখা হয়।”
সেদিন সূর্যটা খুব ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল।
বৃদ্ধ মানুষটি চিঠিটা বেঞ্চের ওপর রেখে চোখ বন্ধ করলেন।
চিঠির শেষ লাইনে লেখা ছিল—
“তুই ফিরিসনি, তবুও আমি তোকে দোষ দিইনি। কারণ বাবা হওয়া মানে কখনো কখনো অপেক্ষা করা নয়, অপেক্ষা করেও ভালোবাসতে থাকা।”
পরদিন সকালে বেঞ্চটা খালি ছিল।
শুধু সেখানে পড়ে ছিল একটি পুরোনো খাম।
আর খামের ওপর লেখা—
“যদি কখনো ফিরে আসিস, আমাকে না পেলেও এই নদীর কাছে একবার আসিস।”
কয়েক মাস পর এক বিকেলে নদীর ধারে একটি মেয়ে এসে দাঁড়াল।
তার হাতে ছিল সেই চিঠি।
সে অনেকক্ষণ বেঞ্চটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বসে কাঁদতে কাঁদতে বলল—
“বাবা, আমি ফিরেছি… কিন্তু তুমি আর অপেক্ষা করলে না।”
নদী তখনও বয়ে চলছিল।
শুধু একজন মানুষ ছিল না, যে প্রতিদিন শেষ বিকেলের আগে সেখানে এসে বসত।
কিছু অপেক্ষার শেষ হয় না—শুধু অপেক্ষা করা মানুষটি একদিন চলে যায়।
3 Comments-
আব্দুল্লাহ আল হুসাইন, নদীর পাড়ে বৃদ্ধ মানুষটির অপেক্ষার এই গভীর অনুভূতিগুলো পাঠক হিসেবে আমার হৃদয়ে এক অদ্ভুত নীরবতা তৈরি করেছে। আপনি চমৎকারভাবে শব্দের মাধ্যমে বাবা-মেয়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন ফুটিয়ে তুলেছেন, যা পড়ার সময় চোখের কোণে জল চলে আসে। গ্রুপের অন্যান্য সদস্যদের লেখায় ভালোবাসা ও মন্তব্য জানিয়ে আমাদের এই সুন্দর প্ল্যাটফর্মটিকে আপনি আরও প্রাণবন্ত করে তুললে খুব ভালো লাগবে।
Friends
Tamjid hassan Al Rakib
@tamjidhassanalrakib
এস এম পলাশ
@smpalash
নওশিন জাহান রিতিকা
@monjuarakhatun261430gmail-com
Monir Uddin Shemul
@moniruddinshemul
MD. Shofiqul Islam
@md-shofiqulislam1
ফারাবি আহমেদ নাদিম
@farabi-83
Shaila Siddique Sumi
@shailasiddiquesumi
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor


খুব সুন্দর গল্পটা, মন ছুঁয়ে গেল!