Profile Photo

AlockOffline

  • alock
  • Profile picture of Alock

    Alock

    3 weeks, 4 days ago

    “শৈলীর প্রেমের আত্মকাহিনী”

    ✍️ পর্ব আট: ( খলনায়কের আগমন ও নিটোল প্রেমের শপথ )

    হ্যাঁ, সেই ‘শপথের’ কথা কেন তুলতে হলো, এবার তবে সেটাই বলা যাক। রবিন আর শৈলীর এই নিটোল, নিষ্পাপ প্রেমের মাঝে হঠাৎ করেই এক খলচরিত্রের কালো ছায়া এসে পড়ল। লোকটার নাম ‘হাঞ্জা’। সে ছিল শৈলীর প্রাইভেট টিউটর। তথাকথিত ‘শিক্ষক’ হওয়ার সুবাদে শৈলীদের পুরো পরিবারকে সে নিজের আঙুল দিয়ে নাচাত; বাড়ির সবাই তাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করত। কোনো এক গোপন সূত্রে এই হাঞ্জা তাদের প্রেমের কথা জেনে যায়। আর জানা মাত্রই সে শৈলী এবং তার পুরো পরিবারকে ডেকে রীতিমতো চোটপাট ও হম্বিতম্বি শুরু করে। এলাকার মানুষ তাকে ভদ্র ও শিক্ষিত ছেলে হিসেবেই জানত, তাই তার মুখের কথাই সবার কাছে ‘বেদবাক্য’ হয়ে উঠল।
    রবিন এর আগে হাঞ্জাকে ব্যক্তিগতভাবে কখনো চিনত না। একদিন স্কুলের পাশের বাজারে রবিনকে একা পেয়ে হাঞ্জা ডেকে বলল, “তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিল।”
    রবিন অত্যন্ত বিনীতভাবে জবাব দিল, “হুম, বলেন ভাই।” (বয়সে হাঞ্জা রবিনের চেয়ে প্রায় চার-পাঁচ বছরের বড় ছিল)।
    কথার শুরুতেই হাঞ্জা এক অদ্ভুত আর তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “তোমার নিজের প্রতি তোমার কতটুকু বিশ্বাস আছে?”
    রবিন বেশ অবাক হয়ে বলল, “মানে? কেন? কী বলতে চাচ্ছেন আপনি ভাই?”
    তখন হাঞ্জা সরাসরি আসল কথায় এসে বলল, “তুমি কি একটা মেয়েকে তোমার নিজের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করতে পারো?”
    কোন মেয়ে বা কার কথা হচ্ছে—তা রবিন মুখে আনার সুযোগ পাওয়ার আগেই হাঞ্জা তর্জনী উঁচিয়ে হুমকি দেওয়ার সুরে বলে উঠল, “এটা কোনোভাবেই হতে পারে না। আমরা জানি তুমি খুব ভালো ছেলে, ভালোভাবেই চলার চেষ্টা করো। নয়তো সামনে কিন্তু অনেক বড় ঝামেলা হবে। নিজের দিকে খেয়াল রাখিও।” এইটুকু বলেই সে হনহন করে প্রস্থান করল।
    সেদিনই হাঞ্জা শৈলীর ভাইদের ডেকে ঘটনাটিতে নুন-মরিচ মাখিয়ে এক কাল্পনিক গল্প ফাঁদে। শৈলীর এক ভাইকে সে পুরোপুরি নিজের কব্জায় নিয়ে নেয়। আর এর ফলেই রবিন ও শৈলীর সহজ-সরল প্রেমটা এক কঠিন বেড়াজালে আটকে যায়। হাঞ্জা যেন চক্রান্তের জাল বুনে তাদের পবিত্র সম্পর্কটাকে গলা টিপে হত্যা করতে চাইল। রবিনের শান্ত জীবনে এটাই ছিল প্রথম কোনো প্রকাশ্য হুমকি।
    রবিন তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ি ফিরে তার বাড়ির পাশের বন্ধুটির সাথে পুরো বিষয়টি শেয়ার করল। বন্ধুটির শরীরে তখন গরম রক্ত। সে তক্ষুনি ফুঁসে উঠে বলল, “চল, দেখে আসি কার এত বড় সাহস!” সে রাতেই সে রবিনকে সাথে নিয়ে ওই হাঞ্জাদের বাড়িতে গিয়ে চড়াও হলো। তবে হাঞ্জা তখন বাড়িতে ছিল না। তার বাবার আন্তরিক আপ্যায়ন শেষে রবিন ও তার বন্ধু ফিরে এল ঠিকই, কিন্তু সেই রাত থেকেই সম্পর্কের সমীকরণ বদলে গেল। হাঞ্জা তার দলবল নিয়ে সব জায়গায় রবিনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অবস্থান নিতে শুরু করল; সোজা কথায়, সে রবিনকে চোখে চোখে ‘গার্ড’ দেওয়া শুরু করল।
    পরদিন রবিন কলেজে গেল। সেখানেও দূর থেকে হাঞ্জা আর তার অনুসারীরা তার ওপর শকুনের মতো নজর রাখছিল। অনেক চিন্তাভাবনা করে রবিন নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে কলেজের কয়েকজন প্রভাবশালী বন্ধুকে বিষয়টি খুলে বলল। বন্ধুরা ওর কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বলল, “তুই একদম চিন্তা করিস না, বাকিটা আমরা দেখছি।”

    এদিকে দিন যত যাচ্ছিল, ওদিকে শৈলীও রবিনের ওপর মারাত্মক চটে ছিল। তার মনে ক্ষোভ জমেছিল—আমাদের গোপন প্রেমের বিষয়টি কীভাবে হাঞ্জা জানল? আর রবিন কেন হাঞ্জার সামনে স্বীকার করতে গেল যে সে শৈলীকে ভালোবাসে? (অথচ রবিন কিন্তু কিচ্ছু স্বীকার করেনি, চতুর হাঞ্জা তাকে কোনো কথা বলার সুযোগই দেয়নি!)
    সরাসরি কথা বলার উপায় ছিল না, তাই চিঠির কাগজে জমে থাকা ক্ষোভ উগরে দিয়ে দুজনের মধ্যে প্রচণ্ড রাগারাগি আর ভুল বোঝাবুঝি শুরু হলো। মনে হচ্ছিল, যেন সব বুঝি এখানেই শেষ হয়ে যাবে। দুজনের এই তীব্র অভিমান আর জেদের কারণে একপর্যায়ে সম্পর্কটা পুরোপুরি থমকে যাওয়ার উপক্রম হলো।

    এই দীর্ঘ নীরবতা, অসহ্য দূরত্ব আর ভুলের প্রাচীর ভেঙে দিতে শৈলী নিজেই এগিয়ে এল। রবিনের আজও স্পষ্ট মনে আছে—চৈত্রের এক প্রচণ্ড রোদ আর দাবদাহের দুপুরে, স্কুলের টিফিনের ঘণ্টায় বান্ধবী নীরার মাধ্যমে একটি চিঠি এসে পৌঁছাল রবিনের হাতে। দুজনের মধ্যে তৈরি হওয়া ভুলের দূরত্ব কমাতে কাঁপা কাঁপা হাতের চেনা লেখায় শৈলী লিখেছিল:

    “প্রিয় রবিন,

    জানু আমার।
    জানি তুমি খুব কষ্ট পেয়েছ, আর হয়তো আমার প্রতি ভীষণ রাগ করে আছ। লক্ষ্মী সোনা, রাগ করে না। তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম, আর আসলে আমিও এদিক থেকে একা একা সব সহ্য করতে পারছিলাম না, খুব ভয় পেয়েছিলাম। যদি পারো প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি তোমাকেই ভালোবাসি রবিন, এই পৃথিবীতে আমি অন্য কাউকেই ভালোবাসতে পারি না, এমনকি ভাবতেও পারি না। তুমিই আমার শুরু, আর তোমাতেই যেন আমার সব শেষ হয়।
    যদি শপথ চাও, এসো আমরা দুজন মিলে ওপরের একজনকে সাক্ষী রেখে শপথ করি।
    ‘শপথ যদি চাহ…’

    ইতি,
    তোমার প্রিয়তমা,
    তোমার জান,
    শৈলী”

    শৈলীর চিঠি কখনো খুব বেশি দীর্ঘ হতো না, এই নিয়ে রবিন মাঝে মাঝে খুব অভিমান করত। আসলে বড় করে লেখার মতো রোমান্টিক উপাদান বা জাগতিক অভিজ্ঞতা তখনও তাদের জীবনে জমেনি। কোনো কামুক অনুভূতি বা শারীরিক স্পর্শের ছোঁয়া তখনও তাদের পবিত্র গায়ে লাগেনি। চিঠির ওই অল্প কটি লাইনেই মিশে ছিল এক মহাসমুদ্রের সমান নিখাদ ভালোবাসা।
    ________________________________________

    গল্পের ( পর্বঃ নয় ) আসছে…

Skip to toolbar