-
ধূলি ধূসরিত পথ
ইমাম হাফিজ সাহেব নামাজে সালাম ফিরিয়ে মোনাজাত ধরলেন। আয়তুল কুরসি পড়ে শরীর মসিহ করেন। নিচের তলায় ভাড়া থাকেন। দো তলার বন্যাকে নিজের মেয়ের মতন দেখেন। বন্যার ছোট্ট একটা ছেলে আছে, ক্লাশ সিক্স এ পড়ে। এখন বর্ষাকাল, থেকে থেকে বৃষ্টি হয়। বন্যা খুব লক্ষী মেয়ে একটা। স্কুলে চাকরি করে, আসার সময় বাজার নিয়ে ফেরে,পল্লবের লেখাপড়া সব দেখতে হয়।অসুস্থ বাবার সেবা ও করতে হয়।
সেইদিন ফেরার সময় হাফিজ ইমামকে সালাম দেয় পল্লব। “ বহত খুব,বহত খুব। মা ই এতো ভালো, কি সুন্দর ছেলে আল্লাহ দিয়েছেন। মা বন্যা, দেখিস আল্লাহ যা নেন তার চেয়ে দামি উপহার দেন। আল্লাহ ভরসা, কিচ্ছু হবে না। খালি লক্ষ্য করিস,পল্লব যেন ঐ চিপা ঘিন্জি গলি দিয়ে না যায়।” হাফিজ সাহেব কথা বলতে বলতে বৃষ্টি নেমে এলো।এইএলাকায় বের হওয়ার জন্য দুই রাস্তা, একটা পিছের মাঠ আরেকটা চিপা গলি,কেমন যেন অন্ধকার। একবার এক প্রেগনেনট মহিলা তিন মাসের বাচ্চা নিয়ে ঐ গলি দিয়ে যাওয়ার সময় মরে যায়। তার রক্তের দাগ দেওয়ালে এখনো আছে। কিন্তু,কেস ঝুলছে। কে মেরেছে, সঠিক তথ্য পাওয়া যায় নি। সবার মতে,এই গলি থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পাওয়া যায়,কেউ যাতায়াত করলে মনে হয় কেউ পেছন থেকে ডাকছে। পল্লবকে বারবার না করেছে মা। তবুও কৌতূহলী হয়ে সে দু একবার চিপা গলি দিয়ে এসেছে, রক্তের দাগ দেখেছে,কিন্তু কই সেই চিতকার বা কোনো আত্মা ও তো পিছু নেয় নি ওর।
ঝড় এলোপাতাড়ি হচ্ছে,বৃষ্টি হচ্ছে। পল্লব খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। রাত প্রায় 10টা। “ মা বন্যা, দেখত, বাবার কাশি হয়েছে। “ মায়ের কথা শুনে বন্যা ওষুধ আনতে গিয়ে দেখে নেই। বুদ্ধি করে আদা,লবঙ্গ,তেজপাতা দিয়ে লেবু চা করে দিল। বুড়ো খায় আর অল্প অল্প কাশে।বাহিরে ঝড়, বন্যার মনেও ঝড়। চা করতে গেলেই সেই খারাপ লোক,যাকে সে মন দিয়ে ভালোবেসেছিল সেও চা খেত। সে বই পড়তে বসলে বন্যা দুধ চা করে দিত। তার ঘন চুলে হাত বুলিয়ে দিত,যাতে ঘুমিয়ে পড়ে। তার মা,বোন সবাইকে নিজেরপরিবারের মতো করে আগলে রেখেছে। বিনিময়ে জুটেছে একটা পেপার, তারপর সব শেষ। আগে পল্লবকে দেখতে আসত,এখন সময় নেই। সাদা চামড়া ওয়ালা সেই মেয়েটি কি বন্যার বিকল্প? না কি তার ধন-দৌলত তাকে এনে দিল বন্যা আর ফিরনাস এর মধ্যে? এসব প্রশ্নের জবাব সে খুঁজেছে অনেক কিন্তু,আগে। এখন অত ভাবা যায় না,সময় হয় না তার। কিন্তু, পল্লব, ওর সামনে তো হাসতে হয় হাসি আসুক আর না আসুক। হাফিজ সাহেব সবসময়ই বলেন,আল্লাহ ভালো কিছু দেবেন। আসলেই কি? এইসব ভাবার সময় নেই।
বাবার চায়ের কাপ ধুয়ে রেখে দেয়, পল্লবকে মশারি টাঙিয়ে দেয়। ঘুমিয়ে পরে ক্লান্ত বন্যা।
“জানো, ভাবী, সেই চিপা গলির মহিলা যে মরে গেছিল, সেই মামলার আসামি কে,তদন্ত করতে পুলিশ এসেছিল, গতকাল। কি শুনেছে,কে জানে? যতই বলি, ঐ গলি ভূতের,পুলিশ বিশ্বাস করে না। এলাকার দুষ্টু দুষ্টু কতগুলো ছেলের নাম লিখে নিয়েছে।……. ।” হাফিজ সাবের বৌ আর বন্যার মা আলাপ করে।” ওখানে ভূত নেই। হেঁটে হেঁটে গেলেও কিচছু হয় না।” পল্লবের কথা শুনে সবাই একবার ওর দিকে তাকিয়ে থাকে।
“ চলো,স্কুলে চলো,দেরি হয়ে যাচ্ছে। “ বন্যা পল্লবকে নিয়ে স্কুলে গেল। বৃষ্টির দিন,ছাতা নিয়ে গেল। সামনে একটা গাড়ি এসে থামল, কালো শার্ট, মুখে অল্প কিছু দাড়ি,সুন্দর দেখতে। বোধ হয় মালিকের ছেলে,তিন তলায় থাকে মালিক। আজ ওর আসার কথা ছিল। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পড়া শেষ করে ফিরেছে। বন্যাকে হ্যালো বলল। হাফিজ সাবকে সালাম দিল। বন্যা শুধু চেয়ে আছে। ছেলেকে নিয়ে স্কুলে গেল। বৃষ্টির দিন,তাতে কি? সামনে পরীক্ষা।
পল্লব বিকেল বেলা বল খেলতে যায়। আজ ও তাই গেল। উচ্ছ্বাস, মালিকের ছেলে ছোটদের সঙ্গে খেলছে। পল্লব, কচি আর মোট আট-দশজন হবে। পল্লব খেলা শেষ করে মাঠেই হাত পা ধুয়ে যাচ্ছিল বাড়ি, একটু দেরি হয়েছে ফিরতে। “ এই হারামি, পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ভূত বলে কিচ্ছু মানছে না। এখন কি হবে? শোন, মোমিন, আমার ভয় করছে। আমার ব্যবসায় লাল বাতি জ্বলবে, তোর ও। আমি সহ্য করতে পারব না। কিছু কর। ওর মা আর বড় ভাই এসব করছে।……….।” হাফিজ সাবের গলা! সে এসব কথা বলছে! যাকে সবাই দেবতা ভাবে। পল্লব শুধু কথা শোনে ক্লান্ত দেহে দো তলা ওঠে। মা হর্লিক্স বানিয়ে ফেলেছে,সাথে বিস্কুট। পল্লব খাচ্ছে আর মা কে বলছে,” মা, চিপা ঐ গলিতে যে ভূত আছে তা সত্যি। কিন্তু,যে যে ঐ গর্ভবতী মহিলাকে সন্তান পেটেই মেরেছে ভূত ভূত শুধু তারাই করে। অন্য কেউ ভূত দেখেও না, গল্প ও বলে না। কথাটা মাথা নয়,মন দিয়ে বুঝ। ভূত হলো সব মৌলবাদী মুনাফেক, কোনো ভালো মানুষ না।”
বন্যা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। পল্লবকে কোনো ঝামেলাতে জড়াতে না করল। পল্লব মা কে ও তেমন কিছু বলল না। থ বনে যায় সে, এলাকার লোকজন যাকে ফেরেশতা বলে,তার ভেতর এই।
প্রতিদিনের মত আজ ও ঘুমিয়ে পড়ে সে। এক বৃহস্পতিবার, স্কুলে হাফ ক্লাশ হয়। পল্লব মনের সাথে বুঝে, বুঝে,শেষে থানায় যায়। নিজের কানে যা শুনেছে সব বলে। ওখানে বল্টু,পিন্টু, মামুন এরা অযথা বন্দী। পুলিশ সব গোপন রাখবে বলে ওকে আশ্বাস দেয়।
দিন যাচ্ছে ভালোই, রোদ উঠে বৃষ্টির পানি শুকিয়ে যায়। সবাই একটু বাহিরে বের হতে পারে।
কোনো এক বিকেলে সেই চিপা গলির দেওয়ালে রক্তের দাগ হাতিয়ে দেখে পল্লব।পেছন থেকে কে যেন চাকু দিয়ে ডান পায়ের হাঁটুতে আঘাত করে। জোরে জোরে চিল্লায়, মুখ ঢাকা সে। উচ্ছ্বাস, হামিদ দোকানি,ব্যাপারি সব দৌড়ে আসে। বেশি লাগে নি,তবে ঘাতক খুব চেষ্টায় ছিল। তারপর চোখে অন্ধকার দেখে সে। জ্ঞান ফিরে দেখে মা,উচ্ছ্বাস,মালিক,বন্ধুরা আর সেই ভণ্ড হাফিজ।
ইনজেকশন,স্যালাইন আরো কত কি। “ তেমন কিচ্ছু হয় নি,ঠিক হবে সব।” বন্যা একটু একটু চোখ মুছে। “ হ্যাঁ,আসলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, সবকিছুরই বিচার শুরু হবে। দেখো।” এবার পল্লবের মুখের দিকে হাফিজ সাব তাকিয়ে থাকে। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত থেকে চলে যায় সবাই।
আবার সেই বৈশাখী ঝড়, বৃষ্টি। কচির মা এসেছে, এখনো যায় নি। উচ্ছ্বাস পল্লবের সঙ্গে কথা বলছে। এখন কে বাইরে যাবে ওষুধের জন্য। অথচ, বড় ডাক্তার ওষুধ লিখেছে। পল্লব আর বাবা দুইজনেরই ওষুধ আনতে হবে। উচ্ছ্বাস গেল আনতে। ওকে ছাতা দিয়ে দেয় বন্যা। রাত প্রায় সাড়ে আটটায় কচির মা চলে গেল। হাফিজ সাবের বৌ বারবার এলো পল্লবকে দেখতে। সেই রাত যেন আর কাটে না ওদের। উচ্ছ্বাস এলো ওষুধ নিয়ে। পল্লব নিজে ও জানে সে কি করেছে।( 2 মাস পরে)
কোনো এক বিকেলে পল্লব,উচ্ছ্বাস আর সবাই খেলছে। হটাত এ কি, পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে হাফিজ সাব,মোমেন আরো 4 জনকে। আর বল্টুসহ কয়েকজন মুক্তি পায়। “ বলেছিলাম না, সব কিছুরই বিচার হবে। যাও, তোমার জায়গায়। মুখোশ তো খুলে পরে গেছে।” পল্লব খুব তেজি হয়ে কথা বলে। বল্টু,পল্টু জুতো মারতে গেলে পুলিশ ওদের বাধা দেয়।
“এই হাফিজ সাব আর মোমেন নারী ব্যবসায়ী। মোমেন বৌ দিয়ে ব্যবসা করতে চেয়েছিল। কিন্তু,রাজি হয় নি সে। তাই, চিপা গলিতে তাকে মরতে হয়। বন্যার প্রতি ও লোভ ছিল হাফেজ বেটার,ওকেও বিক্রির কথা বলেছিল। কিন্তু এখন, সব শেষ।” ওসি সালাউদ্দিন বলেন এসব কথা।
তারপর দিন যেতে থাকে, যেতে থাকে সময়।
এখন কেউ চিপা গলিকে ভুতুরে বলে না। কোনো এক বিকেলে পল্লব খেলা শেষ করে হাত পা ধুয়ে বাড়ি ফেরার সময় মনে হলো পেছন থেকে কোনো মহিলা বলছে,” পল্লব, ধন্যবাদ তোমায়।” আওয়াজ শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখে সেই রক্তমাখা দেওয়াল। ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। হয়ত ওদের ধরে নিয়ে গেছে বলেই সে খুশী হয়েছে। পল্লব মোটেও ভিতু নয়। এটা কার আওয়াজ হতে পারে? পেছনে তাকিয়ে দেখে একজন মহিলা। “ওসি সাহেব আমার দুলাভাই। উনি তোমার সাহসের প্রশংসা করেছেন। আমি সত্যিই অবাক হয়ে গেছি তোমার সাহস দেখে। খুব ভালো লাগছে।” পল্লব ওনাকে ধন্যবাদ দিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। তাহলে আওয়াজ ওনারই ছিল, মানুষের মন, কখন যে কি ভাবে।
দেখতে দেখতে দিন চলে যাচ্ছে। পল্লব বড় হয়। সপ্তম শ্রেণীতে উঠে। নিজের বাবাকে সে দেখতে চায়। তা কি পারবে? এমন বিচ্ছেদ কেন হলো, সে তো জানে ও না। বন্যা কিছুই বলে না ওকে। শুধু ফিরনাস এর প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে।
Friends
Syeda Faria Jahan
@syedafariajahan
Tayba Hoque
@taybahoque
অবরুদ্ধ অনিক
@880b7c6afc3f8d0e5430cb009e1418df
Fazlul Karim
@fazlulkarim
আলমগীর খোরশেদ
@alamgirkhurshed
তাছনীম বিন আহসান
@tbahsan
তানজিদা তানি
@tanjidatani
আয্যাহ্ নূর
@azyahnoor
Delowar Hossain
@delowarhossain
