Profile Photo

হাসান তারিকOffline

  • Bohemian
  • Profile picture of হাসান তারিক

    হাসান তারিক

    • 1 month, 1 week ago

    তোমার নামে নাম…
    …………………………
    ১.
    খুব কাক ডাকা ভোরে স্টেশনে এসে বসে আছি।সকাল সাড়ে সাতটায় ট্রেন। অফিসের জরুরি কাজে ঢাকার বাইরে যেতে হবে, তাই তাড়াহুড়ো করে এই সাত সকালে আসা।
    এসে দেখি, ট্রেন এক ঘন্টা ডিলে হবে।
    ইস! অস্ফুটে বিরক্ত হয়ে উচ্চারণ করি।
    ২.
    স্টেশন প্লাটফর্মে বসে থাকি, নিরুপায় হয়ে।অনাবশ্যক অনাহূতের মত তাকিয়ে মানুষ দেখি, নানান মানুষ। বাচ্চা, বৃদ্ধ, তরুন,মধ্যবয়সী, টোকাই, ভিক্ষুক,প্রেমিক যুগল।
    কত মানুষের কত তাড়া!
    আমার অবশ্য কোন তাড়া নেই। আমি মানুষ দেখতে থাকি।হঠাৎ চমকে উঠি, অপরিচিত অসংখ্য মানুষের ভীড়ে একটা খুব পরিচিত,একান্ত আপন একজনের চোখ দেখে!
    হ্যালুসিনেশন নাকি!
    চমকে উঠার হতবিহ্বলতা কাটাতে চোখ রগড়াই।
    না, সত্যি!
    অনেক দিনের, না, অনেকগুলো বছরের খুব পরিচিত চোখের মানুষটা বোরখার আড়ালে মুখ ঢেকে রাখলেই কি অচেনা হয়ে যায়?
    ৩.
    মোহাবিষ্টের মত পা চালিয়ে এগিয়ে যাই।
    সামনে এগিয়ে দাড়াঁই, যেমন করে আগে দাঁড়িয়েছি বহু বহু বার।
    চোখ ছোট করে কিঞ্চিৎ জিজ্ঞাসু চোখে সে আমার দিকে তাকায়, আগের মতোই।
    চোখাচোখি হয়।
    চক্ষুদিঘীতে বিস্ময়ের ঢেউ দেখতে পাই।
    নেকাবের পর্দা ভেদ করে অস্ফুট কন্ঠে শুনতে পাই, আপনি…!!!
    ৪.
    স্টেশনের প্লাটফর্মে বসে আছি। সে এবং আমি।
    মুখোমুখি নয় পাশাপাশি।
    পলপল করে সময় কেটে যায়।
    কি এক গোপন আবেগে কারো মুখে কোন কথা নেই।
    নীরবতা ভাঙি।
    সম্মুখে উদ্ভ্রান্তের দৃষ্টি ভাসিয়ে আলতো কন্ঠে বলি, কেমন আছো…?
    পাশ থেকে উত্তর আসেনা, আসে প্রশ্ন।
    আপনি ভাল আছেন…?
    আমি আলতো হাসির চেষ্টা করে উত্তর দেই, আগে বোধহয় ‘তুমি’ ছিল…।
    তারপর কারো মুখে আর কোন কথা নেই।
    ৫.
    আর্তচিৎকার করতে করতে কোন এক ট্রেন স্টেশন ছেড়ে যায়।
    পাশ থেকে আমি প্রশ্ন করি, তুমি সুখী..?
    বাতাসে দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে সে উত্তর দেয়, সু..খ…।
    আমি পাশ ফিরে তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করি, এখনো ভালোবাসো আমাকে…?
    সে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে উত্তর দেয়, নাহ…।
    তারপর, প্রসংগ পালটে তার জিজ্ঞাসা, বিয়ে করেছো?
    -করতে হয়েছে।
    কেমন সে?
    -মানুষের মতো।
    ভালোবাসো তো?
    -আমার তো হৃদয় নেই।
    কেন?
    -অনেক বছর আগেই হারিয়ে গেছে।
    সে ভালোবাসে?
    -বুঝিনা,বুঝতে পারিনা।
    জলদ কন্ঠে সে পরামর্শ দেয়, আমার মতো আর কাউকে কষ্ট দিও না।

    আমার স্মৃতি আমাকে হুট করে এগারো বছর আগের সময়ে নিয়ে যায়।
    যেদিন আমি বুকের ভেতর কান্না পাথর চেপে মিথ্যে বলেছিলাম, ভালোবাসার সুখ পাখিটাকে মুক্ত করে দিয়েছিলাম।
    আমার মতো বেকার ছেলের ভালোবাসার মানুষের প্রতি দায়িত্ব হিসেবে নিজের হৃদয়কে বলী দেয়া ছাড়া আর কি-ইবা করতে পারতো!
    ৬.
    ট্রেন এনাউন্সমেন্ট এর শব্দে সম্বিত ফিরে আসে।
    সে উঠে দাঁড়ায়।ব্যাগের হাতলে হাত।
    বুঝি, যেতে হবে তার।
    আসি তাহলে…।
    আমি নিশ্চুপ, নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকি।
    সে পা বাড়ায়।
    একটু ঘুরে তার জিজ্ঞাসা, তোমার বউ এর নামটা তো জানা হলোনা…
    আমি মুচকি হেসে প্রতুত্তর করি,তোমার নাম..
    সে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়।
    আমি অবলীলায় বলে যাই, তোমার নামেই নাম…।
    …সত্যি তোমাকে না পেলেও তোমার নামের মানুষটা নিয়েই আছি।
    এটুকু বলে আমি চুপ হয়ে যাই।
    সেও বিস্ময় চোখে তাকিয়ে থাকে।
    ৭.
    মেয়েরা অনেক কিছু বুঝতে পারে, ঝিনুকের মতো বুকের ভেতর বালি জমিয়ে মুক্তো তৈরি করতে জানে, জানে পুরো হৃদয়ের একটা সংরক্ষিত অংশে না পাওয়া মানুষটার জন্য এতটুকু মায়ার মতোন ভালোবাসা জমিয়ে রাখতে।
    এটাও বুঝতে পারে ভালোবাসার মানুষ হারালেও সে আসলে তারই থাকে,অথবা তার সে…

    আমার উপর অনেক অভিমান রাখা সে কৃতজ্ঞতা চোখে আশীর্বাদ করে,সুখে থেকো…।

    4
    5 Comments
    • হাসান তারিক, স্টেশনের প্রেক্ষাপটে লেখা আপনার এই গল্পটা পড়ার সময় একদম চোখের সামনে সব দৃশ্যগুলো ভেসে উঠছিল। পুরোনো প্রেম আর স্মৃতির এমন টানাপোড়েন সত্যি খুব আবেগী একটা অনুভূতির জন্ম দেয়। আচ্ছা, বাস্তব জীবনেও কি এমনভাবে কাউকে নিজের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলা সম্ভব যা দীর্ঘ এগারো বছর পরও একই রকম থাকে?

    • ভালোবাসা হারিয়েও এত সুন্দর করে বিদায় জানানো যায়! অসাধারণ লেখা।

    • এতটাই আবেগঘন যে ভাষা হারাইয়া ফেললাম😣

Friends

Skip to toolbar