Profile Photo

মেহেদী হাসান আইয়ুশOffline

  • kobimahadihasanaayush
  • ভুলে যাবো
    – কবি মেহেদী হাসান আইয়ুশ

    এরপর অনেকদিন আমাদের কথা হবে না।

    একদিন,
    দু’জন দু’দিকে মুখ ফিরিয়ে
    নিজ নিজ জীবনের ভিড়ে হারিয়ে যাবো আমরা।
    তারপর ধীরে ধীরে ভুলে যাবো,
    কেমন ছিল তোমার কণ্ঠস্বর,
    কথার মাঝখানে হঠাৎ থেমে যাওয়ার অভ্যাসটা,
    হাসতে হাসতে শ্বাসকষ্ট হয়ে আসা সেই হাসির শব্দ,
    আবৃত্তি করতে গিয়ে কোন উচ্চারণে বারবার ভুল করতে তুমি।

    ভুলে যাবো,
    কোন কথাগুলো তুমি বেশি বলতে,
    কোন কথাগুলো বলতে গিয়েও চুপ করে যেতে।
    কোন কথায় তোমার ভীষণ রাগ হতো,
    আর কোন কথাটা শুনে
    আমি শিশুর মতো খুশি হয়ে উঠতাম।

    ভুলে যাবো আমাদের ঘরের আলাপ,
    পরের বাড়ির গল্প,
    সারাদিনের ছোট ছোট ব্যস্ততা,
    অকারণ অভিমান,
    অকারণ হাসি,
    নিঃশব্দে জমে থাকা কষ্ট।

    ভুলে যাবো ট্রেন চলে যাওয়ার শব্দের ভেতর
    তোমার সঙ্গে শেষ কথোপকথন,
    ফোনটা কেটে দেওয়ার আগে
    খুব স্বাভাবিক গলায় বলে ওঠা—
    **“ভালো থেকো।”**

    অথচ সেই দুটো শব্দের আড়ালে
    কত কান্না লুকিয়ে ছিল,
    কত কথা বলা হয়নি,
    কত কথা বলতে গিয়েও
    তুমি থেমে গিয়েছিলে,
    কত কথা বলতে গিয়েও
    আমি বলতে পারিনি।

    একদিন
    সেসবও ভুলে যাবো।

    দেখা না হতে হতে
    একদিন ভুলে যাবো
    তুমি দেখতে কেমন ছিলে।

    ভুলে যাবো
    তোমার গায়ের রঙ,
    চুলগুলো কেমন করে কপালের ওপর এসে পড়ত,
    গালে সত্যিই কোনো তিল ছিল কি না,
    কোথায় ছিল জন্মচিহ্ন,
    কেমন ছিল তোমার আঙুল,
    নখের আকৃতি,
    চোখের সেই অদ্ভুত মায়া,
    ঠোঁটের কোণে জমে থাকা
    অল্প একটু হাসি।

    তোমার হাসিটা ভুলতে ভুলতে
    ভুলে যাবো
    আমাদের একসঙ্গে হেসে ওঠার দিনগুলো।

    বেখেয়ালে হেসে ওঠা,
    অকারণে কেঁদে ফেলা,
    চোখের জল মুছতে মুছতে
    একদিন হয়তো
    মুছে ফেলবো আমাদের স্মৃতিগুলোও।

    তুমি ভুলে যাবে
    কোন শার্টটায় আমাকে সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগত,
    আমার মুখে দাঁড়ি ছিল কি না,
    চুলগুলো ছোট ছিল নাকি একটু বড়।

    আর আমি?

    আমি ভুলে যাবো
    তোমার প্রিয় পোশাকের রঙ,
    তোমার অফিসে যাওয়ার আগে
    কপালে টিপ পরতে কিনা,
    চুল বাঁধতে তোমার কেমন লাগত,
    কোন রঙে তোমাকে সবচেয়ে বেশি সুন্দর দেখাত।

    এমনকি একদিন
    এতটাই দূরে চলে যাবো আমরা,
    যে আয়নায় নিজেদের মুখের দিকে তাকিয়েও
    মনে হবে
    এই মানুষটাকে কোথায় যেন দেখেছি!

    তারপর একদিন
    না দেখতে না দেখতে
    ভুলে যাবো

    আমাদের কখনো দেখা হয়েছিল কি না।

    আমাদের আর কিছুই মনে পড়বে না।

    শহরের ব্যস্ত রাজপথের মতো
    আমাদের বুকও একদিন
    পাথর হয়ে যাবে।

    যে হৃদয় একসময়
    একটা শব্দে কেঁপে উঠত,
    একটা নীরবতায় ভেঙে পড়ত,
    একটা “ভালো থেকো”-তে
    সারারাত কাঁদত,

    সেই হৃদয়ই একদিন
    কিছুতেই আর কাঁদবে না।

    ক্ষুধা,
    অনিদ্রা,
    শোক,
    অভিমান,
    অপেক্ষা
    কিছুই আর আমাদের ক্লান্ত করবে না।

    আমরা ধীরে ধীরে
    যান্ত্রিক মানুষ হয়ে যাবো।
    ঘুম থেকে উঠবো,
    কাজে যাবো,
    ফিরে আসবো,
    খাবো,
    ঘুমাবো।

    তারপর আবার
    একই জীবন।

    শুধু কোথাও,
    খুব গভীরে,
    আমাদের পুরোনো আমিটা
    নিঃশব্দে পড়ে থাকবে।

    আমরা ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে
    নিজেদের একাকীত্বকে মেনে নেবো,
    আবার কোনো কোনো রাতে
    ঈশ্বরকেই দোষ দেবো।

    দোষ দেবো ভাগ্যকে,
    সময়কে,
    দূরত্বকে,
    অথবা নিজেদের।

    ভাগ্যকে তিরস্কার করতে করতে
    নিজেদের ভেতরের অদ্ভুত কৌতূহলগুলো
    খুঁজে বেড়াবো।

    কেন এসেছিলে?
    কেন এত কাছে এসেছিলে?
    কেন এতটা আপন হয়েছিলে?
    যদি শেষ পর্যন্ত
    চলে যেতেই হয়?

    যেহেতু তুমি
    পড়ে ফেলেছো তোমার সমূহ ভবিষ্যৎ,
    যেহেতু তুমি
    ছুড়ে ফেলেছো আমাদের বিবর্ণ অতীত,
    আর আমিও জেনে গেছি—

    ভাগ্য নয়,
    কেবল ইচ্ছাশক্তিই ধ্রুব।

    তবু কী আশ্চর্য,
    আমাদের সমস্ত ইচ্ছাশক্তি
    একদিন এসে হেরে যাবে
    দূরত্বের কাছে।

    আমরা কাছে এসেছিলাম
    শুধু দূরে সরে যাওয়ার জন্য।

    আমরা ভালোবেসেছিলাম
    শুধু ভালোবাসা যে
    চিরকাল থাকে না,
    সেটা জানার জন্য।

    আমরা কেউ কারো হতে পারিনি।

    অথবা,
    হয়তো কোনোদিন
    আমরা কেউ কারো ছিলামই না।

    তবুও কেন জানি
    তোমাকে হারানোর পরও
    মনে হবে,
    আমার ভেতরের সবচেয়ে সুন্দর একটা অংশ
    তোমার কাছেই রেখে এসেছি।

    তারপরও জীবন চলবে।

    অনেক বছর পর
    হয়তো কোনো এক বৃষ্টির রাতে
    হঠাৎ কোনো গান বাজবে,
    কোনো পরিচিত গন্ধ ভেসে আসবে,
    কোনো অচেনা মানুষের হাসিতে
    তোমার হাসির মতো কিছু একটা শুনবো।

    এক মুহূর্তের জন্য
    বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠবে।

    মনে হবে,
    কোথায় যেন একটা মানুষ ছিল।

    খুব আপন।

    খুব কাছের।

    যার সঙ্গে
    অসংখ্য রাত কথা বলেছি,
    যার নীরবতাও বুঝেছি,
    যার অভিমান ভাঙাতে
    নিজের অহংকারটুকুও সরিয়ে রেখেছি।

    কিন্তু মনে করতে পারবো না
    তার নাম।

    মনে করতে পারবো না
    তার মুখ।

    মনে করতে পারবো না
    সে আমাকে কী নামে ডাকতো।

    শুধু বুকের ভেতর
    অকারণ একটা শূন্যতা জন্ম নেবে।

    আর আমি বুঝতেও পারবো না,
    সেই শূন্যতার নাম
    তুমি।

    কারণ

    একদিন সবকিছু ভুলে যেতে যেতে
    আমি ভুলে যাবো
    তোমাকে।

    তুমি ভুলে যাবে
    আমাকে।

    আমরা ভুলে যাবো
    আমাদের কথা,
    আমাদের হাসি,
    আমাদের কান্না,
    আমাদের অপেক্ষা,
    আমাদের অভিমান,
    আমাদের অসমাপ্ত কথাগুলো।

    সবশেষে,

    ভুলে যাবো
    আমি আমাকে।

    আর

    তুমি তোমাকে।

    তবুও কোথাও,
    সময় আর স্মৃতির ধ্বংসস্তূপের নিচে,
    দু’জন অচেনা মানুষের মতো
    চিরকাল পড়ে থাকবে—

    আমাদের একদিন
    খুব ভালোবাসা হয়েছিল।

    3
    2 Comments
    • ভালো থেকো—এই দুটি শব্দের আড়ালে কত কান্না লুকিয়ে থাকে!

    • মেহেদী হাসান আইয়ুশ, আপনার প্রতিটি শব্দের বুনন এবং স্মৃতির এত নিখুঁত চিত্রায়ন পাঠক হিসেবে আমার হৃদয়ে এক গভীর স্পর্শ রেখে গেছে। আমাদের এই আঙিনাকে আরও প্রাণবন্ত রাখতে আপনি নিয়মিত অন্যদের লেখায় আপনার ভালো লাগা প্রকাশ করুন এবং সবার সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকুন।

Skip to toolbar