-
★মহুয়ানামা★
মহুয়া একটি মধ্যম থেকে বৃহৎ আকারের একটি বৃক্ষ। পাতা ডিম্বাকার। বৃন্ত ছোট। ফুলগুলো রসাল এবং স্বাদ অম্লমধুর। ফুলের নির্যাসে মাদকতা আছে। এর ধূসর রঙের ছাল প্রায় আধা ইঞ্চি পুরু। বসন্তের শেষে বা মার্চ মাসে মহুয়া গাছে সুপারির মতো আকারের ফল হয়। গ্রীষ্মের শেষে বা জুন মাসে মহুয়ার ফল পরিপক্ব হয়, পাকা মহুয়া ফল খেতে মিষ্টি। স্থানভেদে একে মহুয়া, মহুলা, মধুকা, মোহা, মোভা, মহুভা , মাদকম ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। মহুয়া মধ্যভারতের আদি বাসিন্দা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুরা, বিহারেও মহুয়ার দেখা মেলে। বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বত্র দেখতে পাওয়া যায়। শুষ্ক ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের গাছ হলেও আর্দ্র কোমল আবহাওয়াতেও বেশ ভালো জন্মায়। শীতে সব পাতা ঝরে যায়। মহুয়া অনেক বড় আকারের গাছ। ৩০ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। ১০ বছর বয়স থেকেই ফুল দিতে শুরু করে মহুয়া গাছ। ঢাকা শহরের রমনা পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহুয়া গাছ আছে। রমনা পার্কের লেকের পূর্ব পার্শ্বে অনেকগুলো মহুয়া গাছ আছে তাই সেখানকে মহুয়া চত্বর বলে নামকরণ করা হয়েছে।
সংস্কৃত শব্দ ‘মহু’ থেকে মহুয়া নামের উৎপত্তি, মহু শব্দের অর্থ মিষ্টি এবং নেশা ধরানো। মহুয়া নামের উৎস মূলত এসেছে মিষ্টি ও সুগন্ধযুক্ত মহুয়া ফুল থেকে। এছাড়াও সংস্কৃতে ‘মধু’, ‘মধুচ’, ‘মোহ’ এবং ‘মহুলা’ শব্দগুলো থেকে এই নামের উৎপত্তি হতে পার, যার অর্থও মধুর মতো মিষ্টি বা নেশা ধরানো। এই ফুলের নির্যাস থেকে প্রাচীনকাল থেকেই সুস্বাদু নেশা জাতীয় পানীয় তৈরি হয়ে আসছে।
মহুয়া একটি অত্যন্ত বহুমুখী ঔষধি ও ঐতিহ্যবাহী গাছ। এর ফুল, ফল, বীজ এবং ছাল বিভিন্ন পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন, খাদ্য ও চিকিৎসায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
নিম্নে মহুয়ার প্রধান ব্যবহারগুলো আলোচনা করা হলো:
১। খাদ্য ও পুষ্টি:
মহুয়া ফুলে প্রচুর পরিমাণে শর্করা, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন থাকে। আদিবাসী ও গ্রামীণ জনপদে এর ফুল কাঁচা, সিদ্ধ বা ভেজে খাওয়া হয়। চালের সাথে রান্না করে এবং গুড়ের সাথে মিশিয়ে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি বা মালপোয়া তৈরি করা যায়। এর ফলও সবজি হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয়।
২। পানীয় তৈরি:
মহুয়া ফুল থেকে গাঁজন প্রক্রিয়ায় অ্যালকোহলযুক্ত দেশীয় পানীয় তৈরি করা হয়, যা আদিবাসী সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আখের পরেই এটিকে সিরকা বা ভিনেগার তৈরির অন্যতম উৎস হিসেবে ধরা হয়।
৩। ভেষজ ও ঔষধি ব্যবহার:
প্রথাগত আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় মহুয়ার ব্যাপক কদর রয়েছে। এর ফুল ও বাকলের নির্যাস সর্দি-কাশি, হাঁপানি, বাত-ব্যথা, মাথাব্যথা এবং অর্শ বা পাইলস নিরাময়ে দারুণ কাজ করে। এছাড়া পুরানো ক্ষত ও কীট দংশনে এটি বিষ ও ব্যথা নাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৪। বীজের তেল ও সাবান: মহুয়ার বীজে ২০% থেকে ৫০% ফ্যাটি অয়েল বা চর্বি থাকে। এই তেল সাবান, মোমবাতি, চকোলেট ও চুল ঠিক করার কাজে ব্যবহার করা হয়। পূজায় প্রদীপ জ্বালাতেও এই তেলের ব্যবহার দেখা যায়। এবং
৫। কৃষি ও অন্যান্য ব্যবহার:
তেল নিষ্কাশনের পর অবশিষ্ট ‘মহুয়া খৈল’ চমৎকার প্রাকৃতিক সার হিসেবে জমিতে প্রয়োগ করা হয়। এই খৈলের পোড়ানো ধোঁয়া মশা ও পোকামাকড় তাড়াতে সাহায্য করে। মাছ শিকারেও এর খৈল ব্যবহৃত হয়।
মহুয়া একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও ঔষধি গুণসম্পন্ন গাছ। এর ফুল, ফল, পাতা এবং বীজ মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, হজমশক্তি উন্নত করতে, ত্বকের যত্ন নিতে এবং বাত-ব্যথা কমাতে এই গাছ স্বাস্থ্যের ভাণ্ডার। মহুয়ার প্রধান ঔষধি ও স্বাস্থ্য উপকারিতাগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১। হজমশক্তি ও কোষ্ঠকাঠিন্য:
মহুয়ার ফুলে মৃদু জোলাপ বা ল্যাক্সেটিভ গুণ রয়েছে, যা হজমশক্তি বাড়াতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।
২। বাত ও গাঁটের ব্যথা: মহুয়ার বীজ থেকে তৈরি তেল ত্বকে মালিশ করলে আর্থ্রাইটিস ও শরীরের যেকোনো ব্যথা ও ফোলাভাব কমে বিধায় এই গাছ স্বাস্থ্যের ভাণ্ডার। এর ফুল থেকে ফল শত রোগের যম।
৩। ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্য:
ত্বকের শুষ্ক ভাব, একজিমা এবং ফাটা গোড়ালি সারাতে মহুয়া তেল দারুণ কাজ করে। এর তেল মাথায় দিলে চুলের গোড়া শক্ত হয় এবং খুশকি কমে।
৪। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা:
ভিটামিন ‘সি’ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর মহুয়া ফুল শরীরের ইমিউনিটি বাড়ায় তাই এই গাছ স্বাস্থ্যের সুস্থতার পাওযার হাউজ।
৫। ক্লান্তি ও ঘুমহীনতা:
রাতে ঘুমানোর আগে এক গ্লাস দুধে কয়েকটি শুকনো মহুয়া ফুল ফুটিয়ে খেলে ক্লান্তি দূর হয় এবং গভীর ঘুম আসে। এবং
৬। অন্যান্য উপকারিতা:
কাশি, চর্মরোগ ও প্রজনন স্বাস্থ্য রক্ষায় মহুয়া ফুল ও ছাল আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
মহুয়ার বেশ কিছু ঔষধি গুণ থাকলেও এর অপরিমিত বা অতিরিক্ত সেবন শরীরের জন্য ক্ষতিকর। মহুয়ার অপকারিতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১। নেশা ও মানসিক প্রভাব:
মহুয়া ফুল ও এর থেকে তৈরি মদ অতিরিক্ত সেবনের ফলে মাথা ঘোরা, ঝিমুনি এবং প্রচণ্ড নেশার সৃষ্টি হতে পারে।
২। লিভারের ক্ষতি:
অপরিশোধিত বা অতিরিক্ত মাত্রায় মহুয়ার মদ পান করলে তা লিভারের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
৩। ডায়াবেটিস রোগীদের ঝুঁকি:
সীমিত আকারে মহুয়া ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সাহায্য করলেও, এর অতিরিক্ত গ্রহণ রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।
৪। হজমে সমস্যা:
কাঁচা বা অপরিপক্ব মহুয়া ফুল খেলে অনেকেরই বদহজম, পেট ফাঁপা বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দেখা দেয়।
৬। শারীরিক দুর্বলতা:
অতিরিক্ত মাত্রায় মহুয়া বা এর নির্যাস সেবন করলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এবং
৭। ত্বকের অ্যালার্জি:
মহুয়ার নির্যাস বা তেল সরাসরি ত্বকে লাগানোর আগে পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত, কারণ সংবেদনশীল ত্বকে এটি চুলকানি বা লালচে ভাব সৃষ্টি করতে পারে।
মহুয়া গাছের ফুল, ফল, পাতা এবং ছাল মানুষের জন্য খুবই উপকারি। হাজার বছর ধরে বাঙালির রন্ধন শিল্পে, ভেষজ চিকিৎসায় এবং মাদকদ্রব্য তৈরিতে মহুয়ার ব্যবহার হয়ে আসছে। বসন্তের শেষে বা মার্চ মাসে যখন মহুয়া ফুল ফোঁটে তখন মহুয়া গাছে ঝাঁকে ঝাঁকে বাঁদুর মহুয়া ফুল খেয়ে নেশায় বুঁদ হয়ে গাছের ডালে ঝুলে থাকে। আবার গ্রীষ্মের শেষে বা জুন মাসে যখন মহুয়া ফল পাকে তখন কাঠবিড়ালি, ইদুঁর এবং কাকের দল সারাদিন ধরে মহুয়া গাছে মহুয়া ফলের মিষ্টি রস আস্বাদন করে মাতাল হয়ে গাছের ডালে ঘুমিয়ে পড়ে। মহুয়া গাছের ফুল মিষ্টি বিধায় এই ফুল শুকিয়ে কিসমিসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আবার মহুয়ার পাকা ফল দ্বারা মদ ছাড়াও বিভিন্ন প্রকার মিষ্টান্ন দ্রব্যাদি তৈরি করা যায়। মহুয়া আমাদের অনেক উপকারী বন্ধু বৃক্ষ। তাই বিদেশি বিভিন্ন অপকারি গাছ না লাগিয়ে আমাদের মহুয়া বৃক্ষ লাগানো উচিৎ। আমাদের দেশের প্রতিটি বাড়িতে যদি একটি মহুয়া গাছ থাকে তাহলে নিজেদের প্রয়োজন ছাড়াও বন্যপ্রাণী ও পাখিদের পেটের ক্ষুধা মিটবে বলে আশা করি।লেখক: মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান আকন্দ।
বি:দ্র: আমার নিজের সংগ্রহ করা পাকা মহুয়া ফল থেকে সংগৃহীত মহুয়া বীজ আমার কাছে আছে। কারো প্রয়োজন হলে আমার কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারেন। প্রতিটি বীজই পরিপক্ক, তাই শতভাগ অঙ্কুরিত হবার সম্ভাবনা আছে। তবে শর্ত একটাই, আমার কাছ থেকে বীজ নিয়ে আপনার বাড়িতে যত্ন করে লাগাতে হবে। ধন্যবাদ।2 Comments
Friends
Ismat Jahan
@ismatjahan
Osman Gani
@osmangani
Jannatul Ferdus Samira
@jannatulferdussamira
ম পানা উল্যাহ্
@panaullah63gmail-com
মোঃ নুরুল আফসার ইকবাল
@afsariqbal811gmail-com
Anju Manara Begum
@anjumanarabegum
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor

Md. Mostafizur Rahman, মহুয়া গাছ নিয়ে আপনার এই তথ্যবহুল ও সুলিখিত লেখাটি পড়ে সত্যিই মুগ্ধ হলাম, বিশেষ করে ‘বসন্তের শেষে বা মার্চ মাসে যখন মহুয়া ফুল ফোঁটে তখন মহুয়া গাছে ঝাঁকে ঝাঁকে বাঁদুর মহুয়া ফুল খেয়ে নেশায় বুঁদ হয়ে গাছের ডালে ঝুলে থাকে’—এই চিত্রকল্পটি আমার মনে এক অপরূপ দৃশ্যের অবতারণা করেছে এবং আপনার এই পরিবেশ সচেতনতা ও বৃক্ষরোপণের আহ্বান অত্যন্ত প্রশংসনীয়, তাই আপনি সামনে আরও এমন তথ্যবহুল লেখা নিয়ে আমাদের মাঝে নিয়মিত হাজির হবেন বলে আশা রাখি।