Profile Photo

লবঙ্গ লতিকাOffline

  • Md.-Russel-Miah
  • Profile picture of লবঙ্গ লতিকা

    লবঙ্গ লতিকা

    2 years, 3 months ago

    সারিয়াকান্দি: এক দুঃখময় ভালোবাসা

    নারী-পুরুষের প্রেম সস্তা না হলেও চেষ্টায় মেলে। পৃথিবী জুড়েই মানবীয় প্রেমের দেখা পাওয়া যায়। মন মিলে গেলে, পছন্দের পুরুষ বা নারীকে জগতের দূরতম স্থান হতে আপন নীড়ের ঠিকানায় নিয়ে আসাও কঠিন নয়। প্রেমের টানে প্রেমিক পুরুষ কিংবা প্রেমিকা নারীর দেশান্তরী হওয়ার ঘটনা আজকাল ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা খবরের কাগজে হামেশাই মেলে। এমনকি মহাশূন্যেও দুই নভোচারী মিলতে পারে মানবীয় প্রেমে।

    সুতরাং নারী-পুরুষের প্রেম দামি হলেও দুর্লভ নয়।

    ০২.
    তবে প্রিয় কোন জায়গার প্রেমে যদি পড়েন তবে আপনি ফেঁসেছেন। এই প্রেম এমনই সংক্রামক যে ভালোবাসার প্রিয় সেই জায়গা আপনাকে খুব করে টানবে অথচ জীবনের বাস্তবতায়, সময়ের অভাবে আপনি সেই টানে সাড়া দিতে পারবেন না। এমনকি বেঁচে থাকা অবশিষ্ট জীবনে কোনদিন হয়তো সেখানে আর যাওয়াই হবে না। অথচ ঐ জায়গার ভালোলাগা প্রিয়গুলো মনে করে প্রতিনিয়ত পুড়লেও স্থানটিকে আবার ঘৃণাও করতে পারবেন না। কারণ, স্থান তো প্রেমিক কিংবা প্রেমিকার মতো প্রেমের সাথে বেইমানি করতে জানে না। প্রেমিক-প্রেমিকার প্রেম সহজ প্রাপ্য এবং তা সহজ পাচ্যও। তাইতো প্রেমিক বা প্রেমিকার মধ্যে কেউ একজন বেঈমানি করলে অপরজনের ঘৃণা আসতে পারে এবং সময়ের ফেরে প্রিয় প্রেমিক বা প্রেমিকা হতে পারে অপ্রিয় শত্রুও। কিন্তু স্থানের প্রতি প্রেম সহজে মিললেও ভোলা সহজ নয়। কারণ এই প্রেম বেঈমানি করতে না জানায় কখনো শত্রু হয় না।

    সুতরাং এই প্রেম ভোলা যায় না। এ এক যন্ত্রণা!

    ০৩.
    আমার একজন বউ বর্তমান, তাই নারী প্রেমও বিদ্যমান। তবে নারী প্রেমের সাথে সাথে আবার স্থান প্রেমও চলমান। প্রেমের নারীকে সাথে নিয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াতে পারি। কিন্তু ভালোলাগার এবং প্রেমের সেই জায়গাকে সাথে নিয়ে ঘুরতে পারি না। বরং সেই জায়গাকে ভালোবেসে তার ব্যর্থতায় পাওয়া বিরহ নিয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরি।

    প্রিয় সেই ভৌগোলিক প্রেমের গল্পই আজ বলবো।

    ০৪.
    সারিয়াকান্দি আমার ভৌগোলিক প্রেম, আরেক প্রেমিকা। প্রিয় পছন্দের সারিয়াকান্দিকে বড় ভালোবাসলেও সাথে করে, সাথী করে ঘুরতে পারি না। বিচ্ছেদের হাহাকার মনকে পোড়ায়।

    ভালো লাগা আর মনপোড়ানোর সারিয়াকান্দিকে নিয়ে এই লেখা।

    ০৫.
    সারিয়াকান্দিতে ষড়ঋতুর বাংলার রূপের বদল না চাইলেও চোখে এসে ধরা দেয়। বর্ষায় তার এক রূপ, দীর্ঘ যমুনার প্রশস্ত দুকূল তখন ছাপিয়ে যায় নতুন জলে। এমনকি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বাসার উঠোনে মা মাছকে সন্তান দলসহ ঘুরতে দেখেছি। উপজেলা পরিষদের ভেতরে খেলার মাঠ থেকে মাছ ধরে সেই মাছ সুস্বাদু রান্না শেষে পরিবেশিত হয়েছে আহার টেবিলে। আবার নিজ হাতে যমুনার তাজা ইলিশ জলের উপর তুলেছি এই সারিয়াকান্দিতে।

    শরৎ এখানে কাশফুলের কোমল মায়ায় ঢেকে দেয় পৃথিবীর বিস্তীর্ণ চরাচরের এক সংকীর্ণ অংশ। দূর-দুরান্ত থেকে প্রেমাঙ্গণ সেই কাশফুলের মায়ায় মৌমাছির মতো ছুটে আসে হৃদয়ে হৃদয় রাঙানো ভালোবাসার প্রেমিক-প্রেমিকা। এক শরৎ বিকেলে যমুনার জলে ভাসতে ভাসতে এমনকি মেঘালয়ের পাহাড়শ্রেণী প্রত্যক্ষ করার অবাক আর মুগ্ধকর দৃশ্যের সাক্ষী আমি নিজেই।

    যমুনার জল নেমে যাওয়া হেমন্ত, শীত আর বসন্তে চরের রূপ আবার পুরোই ভিন্ন। তখন ধুধু বালুময় মরুর বুক হেসে ওঠে সবুজ ধানের ক্ষেত, হলুদ সরিষার মাঠ আর লাল লঙ্কার ঝাল হয়ে।

    সারিয়াকান্দির বিশাল চরভূমির একখন্ড জুড়ে আছে ছোট্ট সুন্দর ধারাবর্ষার চর। ভরা বর্ষায় চারিদিকে জল ছাড়া যখন দৃষ্টিসীমায় আর কিছুই পড়ে না তখন দ্বীপ মতন ধারাবর্ষার কৃত্রিম বন আমাদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়, মন জুড়িয়ে দেয়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় এ যেন সুন্দরবনের এক প্রতিরূপ!

    ফুল, জল, মরু, বালি, মায়ার মানুষ- প্রকৃতির প্রায় সবটাই মেলে এখানে, কেবল বরফেরই দেখা নেই। আশা রাখছি, সারিয়াকান্দির বুকে একদিন এমন কেউ আসবেন যিনি বাস্তবে পারুক আর নাই পারুক নিখরচায় মানুষকে অন্তত আশ্বাসটুকু দিতে পারবেন যে, তিনি চেয়ার পেলে সারিয়াকান্দিতে তুলতুলে তুষারপাত হবে। সেদিন ভ্রমণ পিপাসু মানুষেরা বরফ বৃষ্টির সারিয়াকান্দিতে ভিড় করবে কাশ্মীর আর সুইজারল্যান্ডের অবকাশ যাত্রা বাতিল করে।

    কত বড় বড় মিথ্যার সুদৃশ্য মোড়কে মুড়িয়ে আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখা হয় আশ্বাসে আশ্বাসে! হাজারো মিথ্যার ভিড়ে এমন একটা ছোট্ট স্বপ্ন কেউ দেখাবে না, সে কি করে হয়!

    ০৬.
    মনে পড়ে নান্দিনার চরের সাতাশ বছর বয়সী সেই মেয়েটার কথা। বছর বছর বাচ্চা জন্ম দেয়া হাড় জিরজিরে মেয়েটার কোল জুড়ে তখন পর্যন্ত সাতটা সন্তান। জন্মদাত্রী যেমন রুগ্ন, গর্ভজাত সন্তানেরাও তেমনই লিকলিকে। তার মা, নারী আর সংসার জীবনের একটুখানি চোখ পেতে দেখলাম, ছোট্ট পাতিল মাটির চুলোয় বসিয়েছে, পাতিলের গলা অবধি অজাত কচু শাক। এতগুলো সন্তান আর স্বামী নিয়ে এইটুকু পাতিলের পুরোটা ভরে রান্না করলেও সবার আধপেটে খাওয়া হবে না। প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করা যমুনার মাছে মেয়েটির টানাটানির সংসার কালঘড়ি ধরে এগোয় ধীরলয়ে। নিশাচর স্বামী রাত জেগে মাছ ধরে অথচ নিজেদের পাতে মাছ খুব একটা জোটে না। তবুও অসীম স্রষ্টার ওপর পূর্ণ ভরসা করে তারা ভাল থাকে- আলহামদুলিল্লাহ, অথবা ভালো থাকার অভিনয়কে জীবনের অংশ করে নেয়।

    অন্যদিকে, সব মিললেও কত না মেলার অনন্ত বেদনা আমাদের, কত পাওয়ার প্রত্যাশা দিনরাত!

    অভাবি মৎস্যজীবী আর দিনমজুর চরের মানুষদের নতমুখ দুঃখি জীবনের অন্দরে ঢু দিলে নিজের জীবন, অবস্থান আর প্রাপ্তি নিয়ে কোন অভিযোগ অবশিষ্ট থাকে না, বরং স্রষ্টার প্রতি ভীষণ কৃতজ্ঞতা জন্মে।

    ০৭.
    যদি পকেটে পুরে রাখা যেত তবে মিহি সুতোয় বোনা পৃথিবীর সবটুকু মসলিন জুড়ে একটা বিরাট পকেট বানাতাম, সারিয়াকান্দিকে রাখতাম সেই বুক পকেটে। অন্য কাউকে না হোক, সারিয়াকান্দিকে আমার চেয়েও বেশি ভালোবাসা প্রিয় মেয়েটাকে মাঝে মাঝে পকেট থেকে বের করে দেখাতাম- ‘মা, এই তোর প্রিয় সারিয়াকান্দি। এই তোর ডুব-সাতারের নদী, বেতাল ভাসার জল যমুনার কূল।’

    সারিয়াকান্দি এক ভালবাসার নাম; যেখানে অনন্ত যৌবনা নদী যমুনা আছে, যেখানে চর ভরা মাটি মন মানুষ আছে, যেখানে আজও বুক ভরা ভালবাসার আপাদমস্তক বাঙালি নারী আছে।

    ০৮.
    সরিয়াকান্দিকে নিঃশর্ত ভালোবাসা সবসময়।

    5
    4 Comments
    • এত সুন্দর আর নিখুঁত বর্ণনা। মনোমুগ্ধকর।

    • সারিয়াকান্দির প্রেমে পড়ে গেলাম আমিও!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 23 May 2024 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • এত নিখুঁত, সুন্দর ভৌগোলিক বর্ননা অনেকদিন বাদে পড়লাম। মনের এক কোণে সে থাকে উজ্জ্বল

Skip to toolbar