Profile Photo

নাহিদ হাসান নয়নOffline

  • Nahid-Hasan-Noyon
  • জীবনের পেছনের জানালা
    ✍️নাহিদ হাসান

    হলের বারান্দা থেকে যারা আকাশ দেখে, তারা শুধু নীল দেখে না—
    দেখে শূন্যতা।
    দেখে সেই প্রান্তর, যেখানে বাবার ফাটা হাতের তালুতে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত জমে আছে,
    আর মা—যার মুখে বয়সের চেয়ে অনেক বেশি ক্লান্তি।

    তোমরা হয়তো জানো না, কিছু ছেলে সারারাত মশার কামড় খেয়ে জেগে থাকে—
    কারণ মশারি ছিঁড়ে গেছে অনেক আগেই, আর নতুনটা কেনার টাকাটা ওদের ছোট বোনের টিউশন ফি-তে চলে গেছে।
    ওরা বলে না কিছু, শুধু সকালে উঠে অন্যদের মুখ দেখে হাসে।

    একদিন দেখি এক বন্ধু লাইব্রেরির পুরোনো প্রশ্নের খাতা উল্টে পাল্টে ঘামছে।
    বলল—”বই কিনতে পারি নাই ভাই, ওই প্রশ্নগুলোতেই পড়া দিতে হবে।”
    তার কাঁধে ব্যাগ, আর ব্যাগের ভেতর শুধু একটা কলাপাতা মোড়ানো ভাত—
    সঙ্গে লবণ।
    কারণ ওইদিনের বাজারে ডাল কিনতে গেলে ওর বাবাকে ধার চেয়ে বলতে হতো—
    “ছেলে আমার ইউনিভার্সিটিতে পড়ে।”

    তুমি কী জানো, একটা ছেলে তার বাবার জন্য প্রতিদিন ওষুধ কিনতে গিয়ে নিজের চোখের চশমা বদলাতে পারে না?
    একটা মেয়ে, যার বাবার হাত নেই—গরুর গাড়ি উল্টে গিয়েছিল একবার—
    সে রাতে ফ্যান ছাড়া ঘুমায় যাতে বিদ্যুৎ বিল কম আসে।
    তোমরা যারা জীবনকে চারপাশে সাজানো দেখে এসেছো, তারা হয়তো জানো না,
    একটা মেয়ের প্রথম চাকরির বেতন দিয়ে তার মা একটা চুল কাটার মেশিন কিনেছে।
    কারণ বাবা ক্যানসারে আক্রান্ত, চুল পড়ে যাচ্ছে।
    বাড়িতে আয় নেই।
    ভাঙা ভাঙা শরীরটা নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন দোকানের পাশে, কেউ যদি বলে—”কিছু কাজ আছে কি?”

    আর জানো কি?
    একজন ছেলে রাতে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিল,
    হাতের নিচে ছিল তার ছোট বোনের স্কুল ড্রেস—সেলাই করা।
    সে নিজেই সেলাই করেছে, কারণ দোকানে দিলে ২০ টাকা বেশি নিত।
    তার পকেটে মাত্র ৫০ টাকা ছিল—সেটা দিয়ে সে তার মাকে একটা ওষুধ কিনে দিয়েছে,
    আর স্কুল ড্রেস নিজে সেলাই করেছে।
    ওর বন্ধুরা বলে—”তুই তো একটু কৃপণ রে!”
    সে হেসে বলে—”আরে ভাই, হিসাব করতে হয় তো!”

    হলের দেয়ালে একবার একটা ছেলেকে কাঁদতে দেখেছিলাম।
    চোখ লাল, গাল শুকনো, কণ্ঠ স্তব্ধ।
    জানালার বাইরে তাকিয়ে সে শুধু বলেছিল—
    “ভাই, আমি আর পারতেসি না। প্রতিদিন শুধু দৌড়াই। সকালে পড়া, দুপুরে দুইটা টিউশন, সন্ধ্যায় খাবারের দোকানে কাজ।
    ঘরে মা-বোনের মুখ মনে পড়ে… কিন্তু কিছুই করতে পারি না।”

    আমি কিছু বলিনি।
    কারণ, কী বলব?
    যেখানে অশ্রু কথা বলে, সেখানে শব্দ অপ্রয়োজনীয়।

    তুমি জানো কি?
    একটা ছেলে, যার বাবা তাকে এক বছর ধরে ফোন করে না—
    কিন্তু ছেলেটা প্রতি মাসে বিকাশে টাকা পাঠায়, কারণ মা এখনো অপেক্ষায় থাকে।
    মায়ের চোখে এখনো “বাবা আসবে” বিশ্বাস,
    ছেলেটা সে বিশ্বাস ভাঙতে চায় না।

    একজন মেয়ে ক্লাস শেষে কাজ করে একটি ডে-কেয়ারে, শিশুদের সামলায়।
    কারণ তার ছোট ভাই জন্ম থেকেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত।
    সেই ভাইয়ের জন্য হুইলচেয়ারের টাকা জমাতে গিয়ে তার নিজের চশমার কাচ ভাঙা হয়ে গেছে—
    তবুও পড়াশোনায় সে পিছিয়ে পড়ে না।

    এইসব মুখ চেনা নয়।
    এরা জীবনের পেছনের জানালায় দাঁড়িয়ে,
    নিরবে সবার সুখের জন্য নিজের ঘুম, খাবার, আনন্দ বিসর্জন দেয়।

    তারা ঈদের আগে কেনা জামায় নিজের জন্য কিছু রাখে না,
    তাদের মা-কে ফোন দিলে বলে—“তোর গলার হাসিটাই আমার ঈদ।”
    আর তারা—হল ঘরের সেই ছেলেটা, মেয়েটা—ফোন রেখে বলে,
    “আমি ভালো আছি মা। খুব ভালো আছি।”

    2
    1 Comment
    • মনটা আর্দ্র হয়ে গেলো। এসব লরাকু ছেলে মেয়েরা ভালো থাকুক। তাদের কস্টের যথাযথ প্রতিদান পাক।

Skip to toolbar