-
(ছোট গল্প)
গল্পের নাম: আষাঢ়ের তুষারভাদ্রের শুরু প্রাক্তন নৈরাজ্য দিয়ে। “আচ্ছা শোনো, আমি তোমার সাথে পরে কথা বলবো”, বলে উঠলো গোল হয়ে থাকা বাবরি চুল আর চশমা পরা ছেলেটা। খন্দকারের তাতে যায় আসে না। চার দেয়ালের গণ্ডির ওপার ছুয়েই আবার চলে আসে ভেতরে। তাই বাস থেকে নেমে বিনা বার্তায় সোজা ঘরে উঠে যান। বলা হয়ে থাকে, মানুষ যা বোঝে না তা তারা সাধারণত ভয় পেয়ে থাকে। ভেতরের ফসল বাহিরে যাবার নয়, বাহিরের ফসল নয় আসার। সূচনার সমাপ্তি দিয়ে তার সমাপ্তির সূচনা। খন্দকার এককালে সাহেব বলে সম্বোধিত হতো। এখন সে খুনি। অন্তঃপুরের নৈরাজ্য এতটাই আপন যে তা বাহির জগতে নিস্তব্ধতা। সূচনা-সমাপ্তির মধ্যকার নৈরাজ্যের একটা বিনিময় আছে। আর সেইজন্যই বুঝি খন্দকার প্রত্যেক বিকেলে গাছ কাটার আয়োজন করে। তার ওপর দিয়ে নিষেধাজ্ঞা অনেক আগেই উঠে গেছে। নৈরাজ্য, নিষেধাজ্ঞা, নিরবতা। সমাপ্তি।
আশ্বিন আসে নিষেধাজ্ঞার কারণের অবকাশ হয়ে। তবে অন্তঃপুরের ইতিবাচকতা-নেতিবাচকতা চলমান। কান পেতে থাকলে চিৎকার শোনা যায়, “আমাকে দয়া করে মেরে ফেলো”। তিন দেয়ালের মানুষের কাছে চার দেয়াল আগন্তুক, যার কারণে খন্দকার তার সাহেব খেতাব হারায়। ঋতুর প্রতিকূলতা তার স্বর্গ রূপি নরক। তাই এসময় তার দেখা মেলে কম।
কার্তিক এক হলদে রাঙা রবি-রোদ্দুর। খন্দকার যেনো মনের ভুলেও এ বর্ণে দৃষ্টি না দেয়। তবে খাটনি শুরুর জন্য ঋতুটি শ্রেয়। দাবানলের আভা বয়ে আনতে আনতে খন্দকারের পিছে নরম কণ্ঠে কে যেনো জিজ্ঞেস করে ওঠে, “ভেবেছো জলের আশায় আগুন বয়ে আনলেই নিষ্পাপ হয়ে যাবে?” খন্দকার কেপে উঠে পিছে তাকায়। আরশি। মুখে মৃদু হাসি, চোখে রাগ। বরাবরই খন্দকারের কাছে এককালের ঐশ্বর্যিক দর্শন। হয়তো সেকারণেই সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়। আপনমনে সমাপ্তির সরলরেখা ধাবন করে চলে। “যতই করো। আমরা কখনো তোমাকে নিচ্ছি না। তোমার কুকর্মের কালো অসারই পাবে তুমি”। খন্দকার তার গোফ-দাড়ির ওপর দিয়ে গামছা চালিয়ে যায়। তালহা বলে ওঠে, “আমার সেই কাঠের ঘর”? খন্দকার তার কাটা গাছগুলো আস্তেধীরে রেখে দিলো।
অগ্রহায়ণের নিরবতা বড়ই নিঠুর। খয়ে পড়া আগুনের ফুলকি বাদে দিন-রাত অপরাধবোধে কাটে। আরশির তিক্ত আঘাত তালহার কাঠের ঘরের আকাঙ্খাকেও উপেক্ষা করে যায়। ধুসর যেনো বিন্দু বর্ণের শেষ চিহ্নও মুছে দিতে চায়। খন্দকার তবুও আধারকে সেই ধুসর ছেড়ে বহন করে কোনোমতে চালিয়ে যায়। আরশিতে নিজের অবয়ব শূন্য। শূন্য তার নাম গৃহে। ধুসরবাহি আরশি প্রতিনিয়তই তাকে লালসার দ্বোর দেখিয়ে যায়। আর ধুসরে ছায়ার চাহিদা, তালহা। খন্দকার চালিয়ে যায় তার গাছ কাটা।
বৃত্ত-বন্দী ধূসরকে স্রোত বানিয়ে নীড় থেকে কুড়িয়ে আনে পৌষ আর মাঘ। অসারের শেষ চিহ্নটুকুও ডুবিয়ে নিয়ে যায় তা। কাঠের কারুকার্যের প্রায় সমাপ্তি। নিলয়ের বিরতি পর্যায়ে নির্ধারিত সেই অসার প্রায়েই উঁকি দেয়। মনে করিয়ে দেয় সেই ঝাপসা আকাশ। খন্দকার কখনো কখনো ঝাপসা আকাশের স্মৃতিতে কালো সেই অসারের সৌন্দর্যকে খুঁজে পায়। আর সেই কালোর টোপকে আঁকড়ে ধরেই নিদ্রা থেকে ঝিঁঝিঁপোকার গানের আসরে চলে যায় খন্দকার। আলো কখন অন্ধকার হয়ে যায় তার আর হদিস থাকে না।
ফাল্গুন আর চৈত্র নিঠুর না হয়েও এক কণ্টকাঘাত। চারিদিকের নিস্তব্ধতা বসন্তের রঙকেও খেয়ে ফেলে। কান পেতে থাকলে শোনা যাবে এতদিনে খন্দকার এলাকার বাচ্চাদের কাছে ভূতের নোলকের হাতিয়ার হয়ে গেছে। কারো চক্ষুনজরে পড়লেই নরক-ভয়ে চোখ সরিয়ে নেয়। চারিদিকের কালোর মাঝেও ধুসর অন্তত দৃষ্টিপাত উপযোগী দেখে কালোর সড়কে ঐ ধুসরের দেখা পেতে আপনমনে আর বাকি দিনের মতো নিজের কাজ করে যায় খন্দকার। জগতের খেলা বহু দেখেছে সে।
বৈশাখ আর জৈষ্ঠ্য। নিরবতা, নিষেধাজ্ঞা আর নৈরাজ্য। এবারে নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য উবে গেলো। কিন্তু আগের সেই নিরবতাটা আর নেই। কী যেনো গান গাইছে। খন্দকারের চোখে কালোর দ্বিতীয় অবয়ব। বুঝে নিয়েছে সে, এক আকাঙ্খার সমাপ্তি আরেক আকাঙ্খার মুখোশ। চোখ বন্ধ করে গান শুনে যায় আরশির। কালো অসারের অগ্রসরকের কাছে তা স্বর্গীয়।
আষাঢ়-শ্রাবণ।। তোমাকে হয়তো কখনো বলা হয়নি যে তুমি এক সৌন্দর্যের রূপক। তাই হয়তো অভিমান করেই রাতে চুপটি করে থাকতে। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি তোমার কুহেলিকার উষ্ণতা ছাড়া আর কিছুই চাইনি। আমি একাকিত্বতেই ছিলাম, কিন্তু একাকিত্বতে থাকতে চাইনি। তোমার চোখ যখনি পলক ফেলতো, সময় যেনো থেমে যেতো। আর আমি তোমার চেতনার আড়ালে মন ভরে দেখে নিতাম। কয়েদখানার কনিষ্ঠ জগতে আমি বড় হয়েছি। তাই দুই ঠোঁটের ভেতর থেকে কণ্ঠ হয়তো এ হাওয়াও তেমন শোনেনি। না, আমি তোমার কাছে করুনা চেতে আসিনি, শুধু তালহার পত্র-প্রদীপ চাইছি। ক্ষমা চাওয়ার যোগ্য আমি নই। তবুও যদি পারো, কালোর উপর ধুসরের আচ্ছাদন দিয়ে আমার দেখার সুযোগ করে দিও। আমি কোনো আশা রাখি না। শুধু দম নেয়ার কাজ থেকে উপসংহার চাই।।
বছর ঘুরে আষাঢ় আসে। মেরু তার দিক বদল করে। আকাশ যখন ঘন মেঘে কালোর আশ্রয় নেয় তখন কোনো একদিন খন্দকার মুক্তি পেয়ে যায়। বিশাল এক গাছের নিচে চোখ নুয়ে যায়। কালো হয়ে আসে সবকিছুই। একটা সময় খন্দকার তালহার খোঁজ পায়। আষাঢ়ের কালো থেকে কী যেনো ছায়া পড়ছে। খন্দকারের শরীর শীতল হয়ে যায়। আর তালহার ছায়া যেনো তুষারপাত চালিয়ে যাচ্ছে। চোখ খুলতেই আরশির দেখা মেলে। তার মাঝে যেনো নিজেরই চেনা সেই অসারের দেখা। খন্দকার উঠে দাঁড়ায় আর তুষারপাতের মধ্য দিয়েই আরশিকে কবুল করে নিয়ে নিজ অজান্তে হেটে যায়। কে জানে, হয়তো আকাশের কালো মেঘ নিশ্রিত বৃষ্টি হয়তো তার শুদ্ধ জল দিয়ে কালোকে ধুয়ে নিয়ে গিয়েছে, নয়তো তুষার তা অসারের অগোচরেই চাপা দিয়ে দিয়েছে। যার পুনরাবৃত্তি অনিশ্চয়তার উপমা।
3 Comments
Friends
Ashrafuj Jaman
@ashrafujjaman
আয়মন সিদ্দিকা উর্মি
@asurmi85
Haoya Khan
@haoyakhan
Jiban Hasan
@jibanhasan
junaed all habib
@junaedallhabib
Sahriar Rahman
@sahriarrahman
merajul islam
@merajulislam
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor


অন্ধকার, ধূসর আর কালোর রাজত্ব পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত এক অনিশ্চিত শুদ্ধির গল্প যেন ফুটে উঠেছে।