-
আর কত প্রাণহানি অগ্নিকাণ্ডে?
-অনিল মো. মোমিননিমতলী থেকে রূপগঞ্জ। একের পর এক বড় বড় দুর্ঘটনা জাতিকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। প্রতিবার পোড়া লাশের মিছিলে পুড়ছে আমাদের মন। মিছিল দীর্ঘ হতে দীর্ঘতর হচ্ছে। পুরোনো ক্ষত না সারতে নতুন ক্ষত বিক্ষত করে আমাদের। চোখ বুজলেই ভয়ংকর যন্ত্রণা মানসপটে। ২০১৯ সালে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঘটনাস্থলে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ৭৮ জন মারা যায়। একই বছরের ২৮ মার্চ রাজধানীর বনানীতে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে ২৬ জনের মৃত্যু হয় এবং ৭০ জন আহত হয়। ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বরে রাজধানীর অদূরে টঙ্গীর টাম্পাকো ফয়েলস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনের লেলিহান শিখায় কারখানার মধ্যে পুড়ে মারা যান ৪১ জন। ২০১২ সালে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় তাজরীন ফ্যাশন কারখানায় একটি মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডে মোট ১১৭ জন পোশাকশ্রমিক নিহত হন ও ২০০ জনের অধিক আহত হন।
২০১০ খ্রিষ্টাব্দের ৩ জুন পুরান ঢাকার নবাব কাটরার নিমতলী ট্র্যাজেডিতে সরকারি হিসাবেই মৃতের সংখ্যা ১২৪। বিশ্বের ইতিহাসে তৃতীয় বৃহত্তম শিল্প দুর্ঘটনাটিও বাংলাদেশে হয়েছিল, যা ছিল সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি। তখন মৃত্যু হয়েছিল ১ হাজার ১৭৫ জন শ্রমিকের এবং ২ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হন। আমরা এই পরিসংখ্যান গুনি আর মানসিকভাবে দুমড়েমুচড়ে মরি! এখানেই শেষ নয়। মৃত্যুর মিছিলের এই দীর্ঘ যাত্রা যেন থামারই নয়। বড় বড় এসব দুর্ঘটনাসহ সারা বছরে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান আমাদের রীতিমতো আঁতকে দেয়।
ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০১৫, ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে সারা দেশে শিল্প কলকারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ১৩, ১ হাজার ১৬৫, ১ হাজার ১৯ ও ১ হাজার ১৩১টি। পরবর্তী দুই বছর ঘটে ১ হাজার ৭৫৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই ছয় বছরে শিল্পকারখানায় ৬ হাজার ৮১টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি ৩৭২ কোটি টাকার পাশাপাশি শেষ হয়ে যায় অপূরণীয় ক্ষতি মূল্যবান তরতাজা প্রাণ। এত সব দুর্ঘটনার প্রায় প্রতিটির বেলায় আমরা শুনি অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানা থেকে বের হওয়ার সিঁড়ি পর্যাপ্ত ছিল না বা বন্ধ ছিল। তারপর শোনা যায় ফায়ার সেফটি সামগ্রী যথাযথভাবে ছিল না। আরো পরে জানা যায়, ভবনটা নিরাপদ ছিল না। একসময় শোনা যায়, কারখানাটির বহু ধরনের অনুমোদনই ছিল না। বরাবরের মতো নারায়ণগঞ্জের এই ঘটনায়ও ফায়ার সার্ভিস বলছে, ভবন নির্মাণ বিধিমালা মেনে কারখানাটি নির্মিত হয়নি। কেমিক্যালও বিশৃঙ্খলভাবে ব্যবহূত হচ্ছিল। অথচ একটা কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে বহু অনুমোদন নিতে হয়। শুধু অনুমোদনেই শেষ নয়, এ দেশে সরকারের নানা দপ্তর আছে, যাদের কাজ নিয়মিত এগুলো তদারক করা। কিন্তু এসব হয় কি? প্রতিটি ঘটনা শেষে আমরা দেখি সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিছু আর্থিক সহায়তার ঘোষণা আর কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পোড়া লাশের তরতাজা গন্ধ যত দিন থাকে, তত দিন সেই কমিটি নড়াচড়া করে। অধিকাংশ কমিটির রিপোর্ট আলোর দেখাও পায় না। দু-একটি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া লেগেও সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দেখি না। দেখি শুধু আবার নতুন একটি দুর্ঘটনা। ২০১৬ সালে গাজীপুরের টঙ্গীতে টাম্পাকো কারখানায় দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটির অভিজ্ঞতা ও রিপোর্টের আলোকে শিল্প কারখানাগুলোতে অগ্নিকাণ্ডসহ অন্যান্য দুর্ঘটনা রোধে ১২ দফা সুপারিশ দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। তারপর কয়েকবার বৈঠক হলেও সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে জড়িত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় হয়নি বিধায় সেগুলো আর বাস্তবায়িত হয়নি। এছাড়া জোরালোভাবে জড়িতদের শাস্তির আওতায়ও আনা হয় না।
জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান এখন ৩৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ। তাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে এই খাতে। ভয়াবহ এসব দুর্ঘটনা রোধে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, তিতাস গ্যাস, বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও বয়লার পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং শিল্প পূর্তকাজে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের সমন্বয় সাধনের কাজে জোর দিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা পরিদর্শন করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি কারখানায় পর্যাপ্ত পরিমাণে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র স্থাপন করতে হবে, যাতে সেগুলো সবাই ব্যবহার করতে পারে।
কারখানায় ২৪ ঘণ্টার জন্য শিফটিং ভিত্তিতে প্রতি ফ্লোরের জন্য আলাদা অগ্নিনির্বাপণ ইউনিট গঠন করতে হবে। দুর্ঘটনার পর যাতে সরঞ্জামসহ সিভিল ডিফেন্স সহজে দুর্ঘটনাকবলিত কারখানায় প্রবেশ করতে পারে, সেভাবে কারখানার অবকাঠামো ডিজাইন তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে হবে। অপরিকল্পিত ও অবৈজ্ঞানিকভাবে নির্মিত প্রতিষ্ঠানের মালিকদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মালিকপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট বক্তিবর্গ এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা এসব দুর্ঘটনার দায় এড়াতে পারে না।
লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
(লেখাটি ১২ জুলাই ২০২১ এ ইত্তেফাকে প্রকাশিত)
3 Comments
Friends
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
অভিমানী মন
@ovimanimon
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor
তুলট ডেস্ক
@toulot
মো দানিয়াল আরাফাত (প্রমিস)
@md-daniel-araphat-promice
Rehana Akter
@rehana-akter



বিবেকহীন ব্যবসায়িদের লোভের অগুনে জ্বলছে স্বদেশ। অভিনন্দন সুন্দর কবিতার জন্য।