Profile Photo

পি.কে. সরকারOffline

  • PKSarker
  • Profile picture of পি.কে. সরকার

    পি.কে. সরকার

    18 hours, 49 minutes ago

    আলোর মহত্ত্ব: পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও আদর্শের প্রকৃত মর্যাদা
    ___ পি কে সরকার

    মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে মত, পথ ও আদর্শের বৈচিত্র্য কখনো সংঘাতের কারণ হয়েছে, আবার কখনো হয়েছে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও মানবিক বিকাশের অন্যতম চালিকাশক্তি। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ তার অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, পরিবেশ ও উপলব্ধির আলোকে নিজস্ব চিন্তা ও বিশ্বাস গড়ে তোলে। এই বৈচিত্র্যই মানবসমাজকে প্রাণবন্ত ও গতিশীল করে। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যের মত, পথ বা আদর্শকে হেয় করে নিজের অবস্থানকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে, তখন তা কেবল অন্যকে আঘাতই করে না; বরং নিজের আদর্শের মর্যাদাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

    প্রকৃতপক্ষে, অন্যকে ছোট করা কখনোই নিজের মহত্ত্বের প্রমাণ নয়। যে বৃক্ষ ফলবান, সে যেমন নত হয়ে থাকে; তেমনি যে আদর্শ সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী, সে কখনো কটূক্তি, বিদ্বেষ কিংবা অবজ্ঞার আশ্রয় নেয় না। কারণ সত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার স্বয়ংসম্পূর্ণতা। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য মিথ্যার প্রয়োজন হয় না, যেমন আলোকে উজ্জ্বল হওয়ার জন্য অন্ধকারকে গালি দিতে হয় না। আলো তার স্বভাবগত গুণেই চারপাশকে আলোকিত করে।

    অন্যের বিশ্বাস বা চিন্তাকে হেয় করার প্রবণতা প্রায়শই আত্মবিশ্বাসের অভাব, সংকীর্ণতা কিংবা অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। যে ব্যক্তি নিজের অবস্থানের দৃঢ়তায় নিশ্চিত, সে ভিন্নমতকে ভয় পায় না। বরং সে জানে, মতের ভিন্নতা চিন্তার পরিসরকে প্রসারিত করে এবং সত্যের অনুসন্ধানকে আরও গভীর করে। বিপরীতে, যে ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারে না, সে অনেক সময় নিজের অবস্থানের দুর্বলতাকেই আড়াল করার চেষ্টা করে। তাই অবজ্ঞা প্রায়শই শক্তির নয়, বরং অন্তর্নিহিত দুর্বলতার ভাষা।

    সভ্যতার ইতিহাসে যাঁরা প্রকৃত অর্থে মহান ছিলেন, তাঁরা কখনো ঘৃণার ভাষা ব্যবহার করে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেননি। তাঁরা যুক্তি, প্রজ্ঞা, সহনশীলতা ও মানবিকতার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। কারণ তারা উপলব্ধি করেছিলেন যে, মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা রুদ্ধ করে নয়, বরং তাকে সম্মান দিয়েই স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করা সম্ভব। মতের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা একটি পরিণত ও উন্নত সমাজের লক্ষণ।

    একটি সুস্থ সমাজে মতভেদ থাকবে, বিতর্ক থাকবে, সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু সমালোচনা ও অবমাননা এক বিষয় নয়। গঠনমূলক সমালোচনা সত্য অনুসন্ধানের সহায়ক, অথচ অবমাননা কেবল বিভেদ সৃষ্টি করে। যখন কোনো আলোচনা যুক্তির পরিবর্তে বিদ্বেষে পরিণত হয়, তখন সেখানে জ্ঞানের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। শব্দ তখন আর সত্যের বাহক থাকে না; বরং হয়ে ওঠে বিভাজনের অস্ত্র। ফলে ব্যক্তি, সমাজ ও সভ্যতা—সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

    অন্যের মতকে সম্মান করার অর্থ এই নয় যে, নিজের বিশ্বাসকে বিসর্জন দেওয়া। বরং এর অর্থ হলো এই স্বীকৃতি দেওয়া যে মানুষের চিন্তার জগৎ বহুমাত্রিক এবং প্রত্যেকেরই নিজের মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। এই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় সহিষ্ণুতা। সহিষ্ণুতা দুর্বলতার লক্ষণ নয়; এটি গভীর আত্মবিশ্বাস ও প্রজ্ঞার পরিচয়। কারণ যে নিজের অবস্থানে দৃঢ়, সে অন্যের অবস্থানের অস্তিত্ব মেনে নিতে ভয় পায় না।

    মানবতার প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মধ্যেই। পৃথিবীর নানা ভাষা, সংস্কৃতি, দর্শন ও বিশ্বাস মিলেই মানবসভ্যতার বিশাল মোজাইক গড়ে উঠেছে। যদি সবাই একইভাবে চিন্তা করত, তবে জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা ও অগ্রগতি অনেকাংশেই থমকে যেত। তাই ভিন্নতাকে শত্রু নয়, বরং সম্ভাবনার উৎস হিসেবে দেখতে শেখাই সভ্যতার অন্যতম বড় শিক্ষা।

    প্রকৃত আদর্শ কখনো প্রতিপক্ষ সৃষ্টি করে না; বরং মানুষকে উন্নততর মানবিকতার দিকে আহ্বান জানায়। যে আদর্শ মানুষকে অন্যকে ঘৃণা করতে শেখায়, সে আদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আর যে আদর্শ মানুষকে উদার হতে, শুনতে, বুঝতে এবং সম্মান করতে শেখায়, সেখানেই মহত্ত্বের প্রকৃত প্রকাশ ঘটে। কারণ মানুষের হৃদয় জয় করা যায় ভালোবাসা ও প্রজ্ঞা দিয়ে, অবজ্ঞা ও বিদ্বেষ দিয়ে নয়।

    অতএব, অন্যের মত, পথ বা আদর্শকে হেয় করা কোনো বিজয়ের পথ নয়; এটি এক ধরনের আত্মপরাজয়। কারণ এতে অন্যের মর্যাদা যতটা না ক্ষুণ্ন হয়, তার চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিজের চরিত্র, চিন্তা ও আদর্শের সৌন্দর্য। সত্যিকার মহত্ত্ব প্রকাশ পায় সংযমে, শালীনতায় এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে। যে আদর্শ সত্যিই মহান, সে নিজের দীপ্তিতেই উদ্ভাসিত হয়; অন্যের আলো নিভিয়ে নয়।

    শেষ পর্যন্ত মানবসভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে এই উপলব্ধির উপর যে, মতের ভিন্নতা বিভেদের কারণ নয়, বরং পারস্পরিক শিক্ষার সুযোগ। আর যখন মানুষ ভিন্নতাকে সম্মান করতে শেখে, তখনই জন্ম নেয় সৌহার্দ্য; প্রতিষ্ঠিত হয় সভ্যতা; বিজয়ী হয় মানবতা। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো সেই আলো, যা নিজে জ্বলে এবং অন্যকেও জ্বালিয়ে তোলে।

    3
    2 Comments
    • শ্রদ্ধাবোধেই আদর্শের প্রকৃত মহত্ত্ব…..🤍

    • লেখাটি শুধু মতের প্রতি শ্রদ্ধার কথা বলে না, বরং প্রকৃত মহত্ত্বের সংজ্ঞাও স্পষ্ট করে।
      খুব সুন্দর হয়েছে

পি কে সরকার

 

“পি.কে. সরকার — শব্দের ভেতর মানবতা ও সমাজের গভীরতম সত্য খুঁজে চলা এক সমকালীন বাংলা লেখক।”

Skip to toolbar