Profile Photo

প্রদীপ্ত দে চৌধুরীOffline

  • Pradiptadey12006024
  • *জোড়া শালিক

    বৃদ্ধ হাজেরা বেগম বাড়ির উঠোনে বসে রোদ পোহাচ্ছিলেন। কুচকে যাওয়া চামড়া আর হাড় শিকশিকে হাতগুলোতে একটু করে তেল মালিশ করছিলেন।
    ঘরের ভেতর কোন কিছু পড়বার শব্দ শোনা গেল। হাজেরা বেগম না দেখেই বললেন, ” ময়না আইছোছ? উঠান ডা ঝাড়ু দিয়ে যাইছ, বুঝছছ? পাতা পুতা পইড়া ভইরা গেছে!”
    ভেতর থেকে শব্দ এল, “ঠিকাছে খালাম্মা!”

    হাজেরা বেগম একটু শ্রাগ টানলেন, সরিষার তেলের বাটি থেকে এক চিলেত তেল হাতে ঘষে নিয়ে ফের মালিশ শুরু করলেন। “খালাম্মা” শব্দটা তিনি গত চারবছর ধরে শুনে যাচ্ছেন। অনেক দিন হয়, সামনের খালা শব্দটা তার মন খারাপ করে দেয়। হাজেরা বেগম নিজের মনে হাসেন, দিনদিন জোয়ান হয়ে যাচ্ছেন আরকি তিনি, এই বুড়ো বয়সে নতুন মায়েদের মতো “আম্মা” ডাক শুনবার ইচ্ছে হয়েছে তাঁর!
    বাড়িতে আম্মা ডাকবার মতো মানুষও তার অবশ্য নেই, একটা কাজের মেয়ে আর দুসম্পর্কের এক নাতি তার দেখাশোনা করে। তার তিন ছেলেরাই ঠিক করে দিয়ে গেছে তাদের। মাঝে মাঝে তারা আসে, আম্মা আম্মা রব তোলে, হাজেরা বেগমের বুকটা ভরে যায়। তিনি রীতিমতো দিশেহারা হয়ে যান কয়েকটা দিনের জন্য, চুল এলোমেলো করে এদিক ওদিক দৌড়াতে শুরু করেন। ময়নাকে সারা দিন বকাবকি করেন। “অনেক শুকাই গেছিস বাবা”, “ঠিকঠাক খাচ্ছিস না, সব জ্বালা তো আমার”, ” রাত জাইগা জাইগা চোখে কালি ফেলে দিচ্ছিস” এসব কথা হাজেরা বেগম বলতে বলতেই দিনগুলো পার করে দেন।

    হাজেরা বেগমের তেল মালিশ শেষ হয়েছে। তিনি বারান্দায় বসে উঠোনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। দুটো শালিক জুটি বেধে উঠোনের এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাজেরা বেগম জানেন, দুই শালিক দেখতে পাওয়া ভালো কোন কিছু ঘটবার আগাম লক্ষণ।
    বিদ্রুপের হাসি হেসে উঠে পড়লেন বুড়িমা, সরিষার তেলের বাটি নিতে নিতে বিড়বিড় করলেন, ” আমার আর ভালো জিনিস! ” তারপরই গলা হেঁকে বললেন, “কিরে ময়না সাড়া শব্দ পাওন যায়না!”
    ভেতর থেকে ময়নার কিছু একটা আওয়াজ শুনতে পেলেন হাজেরা বেগম।
    হাতের বাটিটা নিয়ে উচু বারান্দায় পা-টা রাখতেই আচমকা একটা ঘটনা ঘটে গেল- হাজেরা বেগম পা মচকে পড়ে গেলেন!

    চিৎকার শুনে ভেতর থেকে দৌড়ে এল ময়না। তেলের বাটি উলটানো, মুখ থুবড়ে বুড়ি মা পড়ে আছেন। ময়না উদভ্রান্ত হয়ে চারদিকে ছুটোছুটি লাগিয়ে দিল। তারপর ও-বাড়ির শালুকের মাকে ডেকে হাজেরা বেগমকে ধরাধরি করে শোয়ার ঘরে নিয়ে গেল। হাজেরা বেগম কোকাচ্ছিলেন শব্দ করে। ময়না স্বভাবশুদ্ধ কিছু কথা শুনিয়ে বুড়িমার পায়ে তেল মালিশ করতে লেগে গেল।

    অবাক করা কান্ডটা ঘটল দুপুরের সময়। হঠাৎ করে তার তিন ছেলে দলবল নিয়ে বাড়িতে হাজির হয়ে গেলেন। কেউই একদমই জানতেন না হাজেরা বেগমের কাহিল অবস্থা, বাড়িতে এসে মোটামুটি তুলকালাম কান্ড বাধিয়ে দিলেন ছেলেরা। একজন গেলেন ডাক্তার আনতে, একজন গেলেন ঔষধ জোগাড় করতে, আর আরেকজন বসে না থেকে ফলমূল কিছু পান কিনা দেখতে বাজারে ছুটলেন। বড় দুই ছেলে বিবাহিত, দুই বউ আম্মা আম্মা করে মাতিয়ে রাখলেন।

    আর দশটা বারের মতো হাজেরা বেগম বাচ্চাদের মতো হয়ে গেলেন। বিছানায় শুয়ে শুয়েই “রাজিবটা শুকাই গেছে রে”, “মিঠু, দুধের মাঠা খায়, রাখছি বাটি কইরা” ; আর এর মাঝেও ময়নাকে তিন চারবার বকাঝকা তিনি করে ফেললেন। তার পায়ের গোড়ালির চিনচিন ব্যাথা কোথায় গেল টেরই পেলেন না। সবকিছু ছাপিয়ে হাজেরা বেগম বলতে লাগলেন তার আজকে সকালে দুই শালিক দেখবার কাহিনীটা। কীভাবে দেখলেন, কখন দেখলে কি হয়, আপাদমস্তক বর্ণনা করে গেলেন তিনি। এক শালিকে অমঙ্গল আর দুই শালিকে মঙ্গল, বিষয়গুলো নতুন বউদের বুঝিয়ে দিলেন।প্রমান হিসেবে আজকে এই দুঃসময়ে হাজেরা বেগমের খবর না জানতে পেরেও তাদের এই আসা- ওগুলো ওই দুই শালিকের কাজ ছাড়া আর কি হয়!
    ময়নাকে এর মধ্যে আবার ডাক দিলেন হাজেরা বেগম, “ময়না, শুন! উঠানে যে দুইডা শালিক বয়, কাইল থাইকা খাওন দিমু ওগুলারে বুঝলি?” ময়না বাসন মাজছিল, কোথাকার শালিক, কেন খাবার দিবেন কিছুই বুঝল না; প্রশ্নও করল না- ধমক তো খাবেই প্রশ্নটা করলে। হাজেরা বেগম তারপর শুধালেন, “আচ্ছা, যা, হাত চালা জলদি, আমার চান্দের টুকরাগুলারে খাওয়ামু মন ভইরা!”

    সন্ধ্যা অব্দি পুরো বাড়ি জুড়ে কোলাহল লেগে থাকল। ডাক্তার এলেন, ঔষধ লাগিয়ে দিলেন। ছেলেরা খাবার খেল, একটু ঘুরাঘুরি করলো। হাজেরা বেগমও কেউ শুনুক না শুনুক, এতদিনের জমা রাখা কথাগুলো বলে গেলেন। রাতের খাবারের পর ধীরে ধীরে থেমে আসল কোলাহল।

    বিছানায় শুয়ে শুয়ে হাজেরা বেগম নানারকম চিন্তা করছিলেন, তখনই তার তিন ছেলে ঘরে ঢোকে। পায়ের খবর নেবার পরই তিন ভাই তাদের যাত্রাপথের গল্প করে মায়ের সাথে। হাজেরা বেগম তাদের গল্প শুনে যান, মাঝে মাঝে তাদের কথা ছাপিয়ে নিজের গল্প বলেন।
    একটা সময় গল্পের ঝুলিতে বিরতি পড়ে, বড় ছেলে একটু ইতস্তত করে বলেন, “আম্মা!”
    হাজেরা বেগমের গা কাটা দিয়ে উঠল, এই একটা শব্দের জন্য তিনি কত আহাজারি করতেন, আজকে একটা দিনে কতবার শুনছেন এই শব্দটা। অন্যমনস্ক হয়ে যান বুড়িমা।
    তার মধ্যেই বড় ছেলে বলেন, “আম্মা, আজকে আমরা আসলে আমাদের জমিটা ভাগ করতে এসেছিলাম!”
    হাজেরা বেগমের মনে আম্মা শব্দের রেশ সহজে কাটে না, শুনতে না পারায় তিনি বলেন, ” কি বললে বাবা, ”

    বড় ছেলে বাকিদের দিকে তাকিয়ে ফের বলেন, “আম্মা, আসলে দেখেন, আমাদের জমিগুলো ভাগ করে ফেলা উচিত, বিক্রি করে কিছু টাকাও আসে। এভাবে ফেলে রেখে কি করা আর শুধু শুধু-”

    বড় ছেলে আরো কিছু কথা বলে, কিন্তু হাজেরা বেগম ফের অন্যমনস্ক হয়ে যান। সারাদিনের জমিয়ে রাখা আনন্দবাষ্পটা হুহু করে উড়ে যায়। পায়ের চিনচিনে ব্যাথাটা হঠাৎ করেই পুরো শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তার; যেন এতসময় ব্যাথাগুলো কোন একটা কিছু দিয়ে আটকে ছিল, বাধা খুলতেই সবদিকে ছড়িয়ে পড়ল! হাজেরা বেগম দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে ব্যথা সামলাতে থাকেন। শরীরটা এক মুহুর্তের জন্য অসার অনুভব করেন বুড়িমা। “ভাগ, জমি, বিক্রি” শব্দগুলো শুনে ভেতরকার কিশোরী হাজেরা যেন ধপ করে অসহায় বুড়ো হয়ে পড়ে!

    বড় ছেলে জিজ্ঞেস করে, আম্মা, আপনি শুনছেন তো?

    হাজেরা বেগম ‘হু’ করে একটা শব্দ করেন। ছেলেরা কথা চালিয়ে যায়।

    চিন্তা দুশ্চিন্তা আর হাহাকারে ডুবে যান হাজেরা বেগম। ছোট্টবেলায় বউ হয়ে আসা থেকে দিন জীবন এই মাটিতে কাটানো- সব একে একে চোখের সামনে ভাসতে থাকে হাজেরা বেগমের।

    কুয়াশা পড়া রাতের কুপি বাতির মৃদু শীতল আলোয় আজকের দিনের সেই দুটো শালিকজোড় আর তাদের মঙ্গল কথা এতসব কিছুর মাঝেও মনে পড়ে কি না বুড়িমায়ের – ঠিক বুঝতে পারা যায় না!

    1 Share
    7
    8 Comments
    • সময়ের সাথে কত কিছুই না পরিবর্তন হয় কিন্তু এসকল গল্প ঠিক একি রকম রয়ে যায়। খুব সুন্দর করে উপস্থাপন করেছেন।

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 06 July 2021 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তুলতে সহায়তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 23 October 2021 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 04 March 2022 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 16 July 2022 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 16 April 2023 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 26 October 2024 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 20 October 2025 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

Friends

Skip to toolbar