Profile Photo

Pritam BiswasOffline

  • Pritam-Biswas
  • Profile picture of Pritam Biswas

    Pritam Biswas

    1 year, 7 months ago

    অমিমাংসিত
    প্রীতম বিশ্বাস

    ছোট্ট শহর রূপগঞ্জ । চারপাশে সবুজ মাঠ, আর মাঝখানে একটি শান্ত নদী বয়ে গেছে। সেই নদীর নাম স্বপ্নের নদী। শহরের মানুষ বিশ্বাস করে, এই নদীর পানি যাদের ছোঁয়ে যায়, তাদের জীবনে এক ধরনের মায়াবী ঘটনা ঘটে। বিশেষত, রাতে নদীর ধারে গেলে মানুষ নিজের সবচেয়ে গভীর ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষাকে দেখতে পায়। তবে কেউই সেই ঘটনা নিয়ে বেশি কথা বলে না—কেউ বিশ্বাস করে, কেউ অবিশ্বাস।

    এই শহরেই থাকে প্রীতম। তিনি একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষক, যার জীবন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ। মানুষজন বলে, প্রীতম অদ্ভুত; তিনি দিনরাত শুধু গল্প লেখেন, কিন্তু কখনো কোনো গল্প শেষ করেন না। তবে তার জীবনে একটি অপূর্ণ অধ্যায় আছে, যা তিনি কখনো কাউকে বলেন না—তার প্রিয় রাজশ্রী। রাজশ্রীর সঙ্গে তার প্রেম ছিল তীব্র, কিন্তু তা হঠাৎ করেই শেষ হয়ে যায়, কারণ রাজশ্রী অন্য শহরে চলে যায়।

    প্রীতম কখনো রাজশ্রীকে ভুলতে পারেননি। বছরের পর বছর ধরে তার গল্পের নায়িকা ছিল রাজশ্রী, কিন্তু তিনি কোনো গল্প শেষ করতে পারেননি। রাজশ্রী চলে যাওয়ার পর তার সমস্ত জীবন যেন থেমে গেছে, শুধুমাত্র তার স্মৃতি আর স্বপ্নের মাঝে বেঁচে আছেন।

    এক সন্ধ্যায় প্রীতম নদীর ধারে হাঁটছিলেন। নদীর জল তখন রুপালি হয়ে উঠেছে, আর রাতের ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে এসে লাগছে। হঠাৎ তার মনে হলো, যেন নদী থেকে কুয়াশার মতো কিছু উঠছে। তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন, নদীর জলের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তার মনে হলো, কোথাও থেকে একটি পরিচিত গলা ভেসে আসছে।

    তিনি ধীরে ধীরে নদীর পাড়ে গিয়ে বসে পড়লেন। তার চোখের সামনে নদীর জল কাঁপছে, আর সেই জলের মধ্য দিয়ে একটি চেনা অবয়ব ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে লাগল। প্রীতম প্রথমে বিশ্বাস করতে পারলেন না, কিন্তু তারপরও দৃশ্যটা অদ্ভুতভাবে স্পষ্ট হলো—রাজশ্রী, সেই রাজশ্রী, যার কথা তিনি এতদিন ধরে ভুলতে পারেননি, নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে তাকে ডাকছে।

    রাজশ্রীর মুখে সেই একই মিষ্টি হাসি, যা প্রীতমকে প্রতিদিন মুগ্ধ করত। প্রীতম নদীর পাড় থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে এগিয়ে যেতে চাইলেন, কিন্তু পা যেন সামনে বাড়ে না। রাজশ্রী হাত বাড়িয়ে বলল, “তুমি আসবে না, প্রীতম?”

    প্রীতম থেমে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এটি স্বপ্নের নদীর এক মায়াবী খেলা। তিনি জানতেন, এই নদীর জলের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা মানুষের মনের গভীর ইচ্ছাকে সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু এই রাজশ্রী সত্যিকারের নয়। তবুও, তার হৃদয় মানতে চাইছিল না।

    তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “তুমি কি সত্যিই এখানে আছো, রাজশ্রী?”

    রাজশ্রী মৃদু হেসে বলল, “আমি তোমার মধ্যেই আছি, প্রীতম। তুমি আমায় কখনো ছেড়ে যাওনি, কিন্তু আমি চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। তুমি সেই গল্পটা কখনো শেষ করোনি, তাই আমি ফিরে এসেছি।”

    প্রীতম বুঝতে পারলেন, রাজশ্রী আসলে তার অতীতের স্মৃতি, তার অসমাপ্ত ভালোবাসা। কিন্তু এই মায়াবী দৃশ্য তাকে দ্বিধায় ফেলে দেয়। তিনি নদীর পাড়ে বসে পড়ে রাজশ্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি কখনো গল্প শেষ করতে পারিনি, কারণ আমার জীবনের গল্পের তুমি ছিলে সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়। তুমি ছাড়া সবকিছুই অসম্পূর্ণ।”

    রাজশ্রী হালকা হাসল, নদীর ওপার থেকে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি যদি গল্প শেষ না করো, তবে আমি কখনো মুক্তি পাব না। আমাকে মুক্ত করো, প্রীতম। আমাদের ভালোবাসার গল্পটাকে শেষ করো।”

    প্রীতমের চোখে জল চলে এলো। তিনি জানতেন, রাজশ্রী সত্যিকারের নয়, কিন্তু তার ভালোবাসা সত্যি ছিল। সেই মুহূর্তে তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, যে অসমাপ্ত গল্পটি তিনি এতদিন ধরে লিখে আসছেন, সেটি তিনি শেষ করবেন। গল্পের শেষে তিনি রাজশ্রীকে মুক্ত করবেন, আর তার নিজের জীবনেও মুক্তি আসবে।

    পরের দিন সকালে, প্রীতম তার গল্পের খাতাটি খুললেন। বহুদিন পর তিনি কলম হাতে তুলে নিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, রাজশ্রীর ভালোবাসার গল্পকে শেষ করতে হবে। কলমের কালিতে ধীরে ধীরে গল্পের পাতা ভরে উঠতে লাগল, আর তিনি লিখলেন সেই অধ্যায়, যেখানে রাজশ্রী মুক্ত হলো, প্রীতমও মুক্ত হলো।

    স্বপ্নের নদীর জলের দিকে তাকিয়ে প্রীতম হাসলেন। তিনি জানতেন, রাজশ্রীর ছায়া আর ফিরে আসবে না। তাদের গল্প শেষ হয়েছে, কিন্তু তার হৃদয়ে সেই ভালোবাসার স্মৃতি চিরদিন বেঁচে থাকবে।

Skip to toolbar