-
লামডিং থেকে ফিরে আসা ভালোবাসা
✍️ রতন চন্দ্র রায়বাংলাদেশের একটি শহরে থাকত রতন। সাধারণ জীবন, সাধারণ স্বপ্ন। প্রতিদিনের ব্যস্ততার বাইরে তার নিজের জন্য খুব বেশি কিছু ছিল না। কিন্তু একদিন ফেসবুকের একটি বন্ধুত্বের অনুরোধ তার জীবনের গল্পটাই বদলে দিল।
নাম—পূজা।
প্রোফাইল দেখে রতন জানতে পারল, মেয়েটি ভারতের আসাম প্রদেশের লামডিং শহরে থাকে।
প্রথমে পরিচয়, তারপর বন্ধুত্ব।
বন্ধুত্ব থেকে নিয়মিত কথা।
আর সেই কথার ভেতর দিয়েই কখন যে দুজনের মধ্যে ভালোবাসা জন্ম নিয়েছিল, তারা নিজেরাও বুঝতে পারেনি।
১. প্রথম পরিচয়
—“আপনি বাংলাদেশে থাকেন?”
পূজার প্রথম দিকের একটি মেসেজ ছিল।
রতন লিখেছিল—
—“হ্যাঁ। বাংলাদেশে। আপনি?”
—“আমি আসামে।”
—“আসামের কোথায়?”
—“লামডিং।”
রতন তখন লামডিং সম্পর্কে খুব বেশি জানত না। কিন্তু সেদিন থেকে শহরটির নাম তার কাছে অদ্ভুতভাবে পরিচিত হয়ে গেল।
এরপর প্রতিদিন কথা হতে লাগল।
কখনো সকালবেলা—
“ঘুম থেকে উঠেছেন?”
কখনো দুপুরে—
“খাওয়া হয়েছে?”
কখনো গভীর রাতে—
“আজ এত চুপচাপ কেন?”
এই ছোট ছোট কথাগুলোই ধীরে ধীরে তাদের জীবনের বড় অংশ হয়ে উঠল।
২. চার বছরের পথ
চার বছর খুব কম সময় নয়।
এই চার বছরে তাদের মধ্যে কত অভিমান হয়েছে, কত হাসি, কত স্বপ্ন—তার কোনো হিসাব ছিল না।
দুজনেই জানত, তারা দুই দেশের মানুষ।
তবু হৃদয়ের কাছে দেশ, সীমান্ত, দূরত্ব—এসব যেন কোনো অর্থ বহন করত না।
রতন মাঝে মাঝে বলত—
—“একদিন তোমার শহরে যাব।”
পূজা হেসে উত্তর দিত—
—“সত্যি আসবে?”
—“হ্যাঁ।”
—“কথা দাও?”
—“কথা দিলাম।”
কথাটা হয়তো তখন শুধু একটি প্রতিশ্রুতি ছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতিই রতনের কাছে হয়ে উঠল একটি স্বপ্ন।
৩. লামডিং যাত্রা
অবশেষে সেই দিন এল।
রতন বাংলাদেশ থেকে আসামের পথে রওনা হলো।
যতই লামডিংয়ের দিকে এগোচ্ছিল, ততই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উত্তেজনা তৈরি হচ্ছিল।
চার বছর ধরে যার সঙ্গে কথা বলেছে, তাকে এবার সামনাসামনি দেখবে।
মোবাইলের পর্দার মানুষটি এবার বাস্তবের মানুষ হবে।
লামডিং পৌঁছে রতনের মনে হলো, শহরটি যেন তার কাছে আগে থেকেই পরিচিত।
কারণ এই শহরের প্রতিটি গল্প সে এতদিন পূজার মুখে শুনেছে।
তারপর দেখা হলো।
কথা হলো।
দুজনের চোখে ছিল দীর্ঘদিনের অপেক্ষা।
সাক্ষাৎটা হয়তো খুব দীর্ঘ ছিল না।
কিন্তু রতনের কাছে সেটুকুই ছিল এক জীবনের স্মৃতি।
ফিরে আসার সময় তার মনে হয়েছিল—
“এই দেখা কি আবার কখনো হবে?”
পূজা হয়তো তখনও ভাবেনি, এই বিদায়ই একদিন তাদের শেষ দেখা হয়ে থাকবে।
৪. বাংলাদেশে ফিরে
রতন বাংলাদেশে ফিরে এল।
দুজনের যোগাযোগ তখনও ছিল।
কিন্তু আগের মতো সহজ ছিল না সবকিছু।
কখনো রতন ব্যস্ত থাকত।
কখনো পূজা।
কখনো একটি কথার উত্তর দেরিতে আসত।
কখনো একটি সাধারণ বাক্যও ভুলভাবে বোঝা হতো।
ছোট ছোট অভিমান জমতে জমতে একসময় বড় দেয়াল তৈরি হলো।
রতন ভাবত—
“পূজা কি বদলে গেছে?”
পূজাও হয়তো ভাবত—
“রতন কি আর আগের মতো আমাকে গুরুত্ব দেয়?”
কেউই হয়তো সত্যিটা জানতে চাওয়ার আগে নিজের নিজের ধারণাকে সত্যি ধরে নিয়েছিল।
আর সেখানেই শুরু হলো দূরত্ব।
৫. শেষ কয়েকটি দিন
এক রাতে পূজা মেসেজ করল—
—“রতন, তুমি কি এখনো আগের মতো আছ?”
রতন কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর লিখল—
—“আমি তো বদলাইনি। তুমি এমন ভাবছ কেন?”
পূজা উত্তর দিল—
—“তোমার কথাবার্তা বদলে গেছে।”
—“তুমি আমাকে ভুল বুঝছ।”
—“হয়তো।”
—“হয়তো নয়, তুমি সত্যিই ভুল বুঝছ।”
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর পূজা লিখল—
—“সবকিছু কি এত সহজ?”
রতন বলল—
—“না, সহজ নয়। কিন্তু কথা বললে সব বোঝানো যায়।”
পূজা দীর্ঘ সময় পর লিখল—
—“সব কথা কি আর বলা যায়?”
রতন থেমে গেল।
এই একটি বাক্য যেন তার বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা তৈরি করল।
সে লিখল—
—“তাহলে তুমি আমাকে কী বলতে চাও?”
অনেকক্ষণ পর পূজার উত্তর এল—
—“আমি জানি না।”
রতন লিখল—
—“চার বছর পরেও তুমি জানো না?”
পূজা কোনো উত্তর দিল না।
৬. শেষ কথোপকথন
কয়েকদিন পর এক রাতে আবার তাদের কথা হলো।
সেদিন দুজনেই বুঝতে পারছিল, সম্পর্কটা আগের জায়গায় নেই।
রতন লিখল—
—“পূজা, আমাদের মধ্যে কী হয়েছে?”
পূজা বলল—
—“জানি না।”
—“আমরা কি আর আগের মতো হতে পারব না?”
—“হয়তো পারব না।”
রতনের হাত থেমে গেল।
কিছুক্ষণ পর সে লিখল—
—“তুমি কি সত্যিই এটা চাও?”
পূজা উত্তর দিল—
—“আমি চাই না আমাদের মধ্যে এত কষ্ট থাকুক।”
—“কষ্ট তো ছিল, কিন্তু ভালোবাসাও ছিল।”
—“ছিল।”
—“শুধু ‘ছিল’?”
পূজা অনেকক্ষণ কোনো উত্তর দিল না।
তারপর লিখল—
—“রতন, কিছু সম্পর্ক খুব সুন্দর হয়। কিন্তু সব সুন্দর সম্পর্কের শেষ বিয়ে দিয়ে হয় না।”
রতন দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর লিখল—
—“তাহলে আমাদের চার বছর?”
পূজা উত্তর দিল—
—“মিথ্যে ছিল না।”
—“তাহলে শেষ কেন?”
—“হয়তো আমরা একে অপরকে ভালোবেসেছি, কিন্তু একে অপরকে ঠিকভাবে বুঝতে পারিনি।”
রতনের চোখের সামনে তখন লামডিংয়ের সেই দিনটি ভেসে উঠল।
সে লিখল—
—“তোমার সঙ্গে দেখা করতে আমি এত দূর গিয়েছিলাম।”
পূজা বলল—
—“আমি জানি।”
—“তোমার শহরে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল, এত দূরত্ব পেরিয়ে যখন তোমার কাছে আসতে পেরেছি, তখন আর কিছুই অসম্ভব নয়।”
পূজা লিখল—
—“আমারও সেদিন অনেক কিছু মনে হয়েছিল।”
—“আজ তাহলে কী হলো?”
—“সময় বদলে গেছে।”
রতন লিখল—
—“সময় বদলেছে, নাকি আমরা?”
পূজা বলল—
—“দুজনেই হয়তো।”
কিছুক্ষণ কেউ কিছু লিখল না।
তারপর রতন শেষবারের মতো প্রশ্ন করল—
—“তুমি কি আমাকে আর ভালোবাসো না?”
অনেকক্ষণ পর উত্তর এল—
—“এই প্রশ্নের উত্তর দিলে হয়তো তোমার কষ্ট আরও বাড়বে।”
রতন লিখল—
—“তবুও জানতে চাই।”
পূজা লিখল—
—“ভালোবাসা কখনো কখনো থেকে যায়, কিন্তু সম্পর্কটা আর থাকে না।”
রতনের চোখে পানি চলে এসেছিল।
সে লিখল—
—“তাহলে আমাকে কী করতে হবে?”
পূজা বলল—
—“আমাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করো।”
রতন লিখল—
—“চার বছরকে কি এত সহজে ভুলে যাওয়া যায়?”
পূজা বলল—
—“না। ভুলে যেতে হবে না। শুধু মেনে নিতে হবে।”
রতন শেষবার লিখল—
—“তুমি সুখী হও।”
পূজা উত্তর দিল—
—“তুমিও।”
তারপর কিছুক্ষণ পর আর কোনো মেসেজ এল না।
রতন ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
অনলাইনের সবুজ চিহ্নটি একসময় অদৃশ্য হয়ে গেল।
সেদিনই শেষ হয়ে গেল তাদের নিয়মিত কথোপকথন।
৭. শেষ মেসেজের পর
সেই রাতের পর রতন বহুবার ফোন হাতে নিয়েছে।
ফেসবুক খুলেছে।
পুরোনো মেসেজ পড়েছে।
কখনো লিখতে চেয়েছে—
“কেমন আছ?”
কিন্তু পাঠায়নি।
কারণ সে বুঝেছিল, কিছু দরজা একবার বন্ধ হয়ে গেলে বারবার কড়া নাড়লে দরজা খোলে না—শুধু ভেতরের স্মৃতিগুলো আরও অস্থির হয়ে ওঠে।
একদিন রতন পুরোনো ছবিগুলো দেখতে বসেছিল।
লামডিংয়ের ছবি।
সেই শহরের রাস্তা।
সেই দিনের কিছু স্মৃতি।
তার মনে হলো, মানুষ কখনো কখনো একটি শহরকে ভালোবাসে শুধু শহরটির জন্য নয়—সেখানে রেখে আসা একজন মানুষের জন্য।
রতনের কাছে লামডিংও তেমন হয়ে গেল।
৮. অসমাপ্ত ভালোবাসা
তাদের বিয়ে হয়নি।
একসঙ্গে সংসারও হয়নি।
তবু চার বছরের ভালোবাসাকে অস্বীকার করার মতো মানুষ রতন ছিল না।
সে জানত, পূজা তার জীবনের একটি অধ্যায়।
সেই অধ্যায় শেষ হয়েছে।
কিন্তু বই থেকে কোনো অধ্যায় মুছে ফেললেই তো তার অস্তিত্ব মুছে যায় না।
কিছু স্মৃতি মানুষ সঙ্গে করে নিয়ে চলে।
কিছু নাম উচ্চারণ না করেও মনে রাখা যায়।
আর কিছু মানুষ জীবনে ফিরে না এলেও জীবনের গল্পে চিরকাল থেকে যায়।
পূজা তেমনই একজন।
৯. বহুদিন পর
অনেকদিন পর এক সন্ধ্যায় রতন বারান্দায় বসেছিল।
আকাশে মেঘ ছিল।
দূরে কোথাও বৃষ্টির গন্ধ।
হঠাৎ তার মনে পড়ল লামডিংয়ের কথা।
মনে পড়ল সেই মেয়েটির কথা, যে একসময় তাকে প্রতিদিন জিজ্ঞেস করত—
“খেয়েছ?”
রতন মৃদু হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর সেই হাসি আবার বিষণ্ণতায় বদলে গেল।
সে মনে মনে বলল—
“পূজা, তুমি হয়তো আজ অনেক দূরে। হয়তো তোমার জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু আমার জীবনের চারটি বছর তুমি হয়ে আছো একটি স্মৃতি।”
তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বলল—
“আমাদের গল্পের শেষটা আমি বদলাতে পারব না। শুধু এতটুকু চাই—তুমি ভালো থেকো।”
১০. শেষ কথা
ভালোবাসার সব গল্পের শেষ এক হয় না।
কেউ ভালোবেসে বিয়ে করে।
কেউ ভালোবেসে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
আবার কেউ ভালোবেসে সারাজীবন সেই মানুষটির স্মৃতি বয়ে বেড়ায়।
রতন ও পূজার গল্পও তেমনই।
বাংলাদেশের রতন আর ভারতের লামডিংয়ের পূজা—দুই দেশের দুই মানুষ।
চার বছরের ভালোবাসা।
একটি বাস্তব সাক্ষাৎ।
একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন।
আর কিছু ভুল বোঝাবুঝি, যা ধীরে ধীরে তাদের আলাদা করে দিল।
তাদের মধ্যে বিবাহবন্ধন হয়নি।
কিন্তু তাদের ভালোবাসার স্মৃতির সঙ্গে কোনো কাগজের চুক্তির প্রয়োজনও ছিল না।
আজ হয়তো রতন বাংলাদেশের কোনো শহরে বসে পুরোনো স্মৃতি মনে করে।
আর লামডিংয়ের কোনো এক সন্ধ্যায় পূজাও হয়তো কখনো সেই পুরোনো দিনগুলোর কথা ভাবে।
তারা হয়তো আর একে অপরকে কিছু বলে না।
কিন্তু দুজনেই জানে—
একসময় তারা সত্যিই একে অপরকে ভালোবেসেছিল।
আর সেই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় স্মৃতি হয়ে আছে একটি শহরের নাম—
লামডিং।
যেখানে রতন একদিন দূরদেশ পেরিয়ে গিয়েছিল ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে দেখা করতে।
আর সেখান থেকেই ফিরে এসেছিল এমন একটি স্মৃতি নিয়ে, যা হয়তো কোনোদিন পুরোপুরি মুছে যাবে না।
কিছু ভালোবাসা সংসার পায় না,
কিছু ভালোবাসা শুধু স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকে।
আর কিছু গল্প শেষ হয় না—
শুধু শেষ অধ্যায়ের পর আর কোনো পৃষ্ঠা লেখা হয় না।3 Comments-
আপনার লেখনীতে জীবনের চরম বাস্তবতা এবং গভীর আবেগের এমন দারুণ এক সংমিশ্রণ ঘটেছে যে, বিশেষ করে “ভালোবাসা কখনো কখনো থেকে যায়, কিন্তু সম্পর্কটা আর থাকে না”—এই লাইনটি পড়ে আমি সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি। আপনার এই রচনাটিতে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং মানিয়ে নেওয়ার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা সত্যিই হৃদয়স্পর্শী; আপনি আপনার লেখনি অব্যাহত রাখুন, কারণ আপনার ভাবনার গভীরে অনেক পাঠকই নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাবে।

রতন চন্দ্র রায়
ইম্পোজিটর
রতন চন্দ্র রায়
পেশা - সরকারি চাকরি
শখ- লেখা / কবিতা/ গল্প/ উপন্যাস
কর্মস্থল- বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেস), তেজগাঁও, ঢাকা- ১২০৮
ঠিকানা- ৪১০ নবীনবাগ উত্তর গোড়ান,
- খিলগাঁও, ঢাকা ১২১৯
Friends
মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান
@mdziaurrahman
নুর
@thelight
Shahriar Hossain
@shahriarhossain
বিপাশা মন্ডল
@bipashamondal
গাজিবর রহমান
@gaziborrohman
মোঃ মোক্তারুজ্জামান মোক্তার
@mokteruzzamanpbtgmail-com
asif khandaker
@asifkhandaker
দিতি আহমেদ
@ahmedditee87gmail-com
ফারহান সাদিক (সংগ্রাম)
@fs-hasan-mohammad

রতন চন্দ্র রায়, আপনার এই লেখাটি পড়ে একদম অন্যরকম একটা অনুভূতির ভেতর দিয়ে গেলাম। চার বছরের একটা সম্পর্কের স্মৃতি এভাবে গুছিয়ে তুলে ধরবেন ভাবিনি, খুব মায়া লাগল পড়ে। আচ্ছা, সেই লামডিং ভ্রমণের পর বাস্তবতার টানাপোড়েন শুরু হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ কি আসলে দূরত্বের ভয় ছিল?