-
হারিয়ে যাওয়া ধোপার ঘাট
✍️ রতন চন্দ্র রায়১৯৮০ কিংবা ১৯৯০-এর দশকের কথা।
তখন জীবন আজকের মতো এত দ্রুত ছিল না। মানুষের ঘরে ঘরে ছিল মাটির গন্ধ, উঠোনে ছিল কুয়োর পানি, আর পুকুরঘাটে সকাল হলেই জমত মানুষের আনাগোনা। সেই ঘাটের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কিছু মানুষের জীবন, কিছু মানুষের ঘাম, কিছু মানুষের স্বপ্ন—তাঁরা ছিলেন ধোপা।
সকালের আলো ফুটতেই কাঁধে কাপড়ের বোঝা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন হরিপদ ধোপা। কারও শাড়ি, কারও ধুতি, কারও পাঞ্জাবি, আবার কারও বিছানার চাদর—সবকিছু নিয়ে তিনি চলে যেতেন গ্রামের পুরোনো পুকুরঘাটে।
কাপড় পানিতে ভিজিয়ে পাথরের ওপর আছড়ে পড়ত তাঁর হাত।
ছপ্… ছপ্… ছপ্…
সেই শব্দ যেন ছিল গ্রামের সকালের এক চেনা সুর।
দূর থেকে স্ত্রী সরলা মাঝে মাঝে বলতেন,
—“আর কত পরিশ্রম করবে? শরীর তো আর আগের মতো নেই।”
হরিপদ মৃদু হেসে বলতেন,
—“পরিশ্রম না করলে সংসার চলবে কী করে?”সারাদিন মানুষের কাপড় পরিষ্কার করতেন তিনি। রোদে শুকাতেন, ভাঁজ করতেন, কখনো ইস্ত্রি করে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিতেন। সন্ধ্যায় যখন ফিরতেন, শরীরে থাকত সারাদিনের ক্লান্তি, হাতে পানির দাগ আর জামাকাপড়ে লেগে থাকত সাবানের গন্ধ।
তবুও মুখে থাকত এক ধরনের তৃপ্তি।কারণ তিনি জানতেন—তিনি শুধু কাপড় পরিষ্কার করেন না, মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে একটু সহজ করে দেন।
বছরের পর বছর এভাবেই কেটে গেল।
তারপর একদিন সময় বদলাতে শুরু করল।গ্রামে এল আধুনিকতা। শহরে গড়ে উঠল লন্ড্রি। ঘরে ঘরে ঢুকে পড়ল ওয়াশিং মেশিন। মানুষের জীবন হয়ে উঠল দ্রুততর।
ধীরে ধীরে পুকুরঘাটের ভিড় কমে গেল।
এক সকালে হরিপদ কাপড়ের বোঝা নিয়ে ঘাটে এসে দাঁড়িয়ে দেখলেন—চারপাশে কেউ নেই।
যে ঘাটে একসময় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাপড় ধোয়ার শব্দ শোনা যেত, সেখানে এখন শুধু বাতাসের শব্দ।
হরিপদ ধীরে ধীরে ঘাটের সিঁড়িতে বসে পড়লেন।
চোখের সামনে ভেসে উঠল পুরোনো দিনগুলো।
কত মানুষের কাপড় তিনি ধুয়েছেন!
কত বিয়ের শাড়ি, কত পূজার নতুন পোশাক, কত পরিবারের সাদা ধুতি, কত শিশুর জামা—সব তাঁর হাতের স্পর্শ পেয়েছে।
হঠাৎ তাঁর মনে হলো, তিনি শুধু কাপড়ই ধুয়ে দেননি—এই ঘাটে বসে তিনি যেন একটি সময়কেও ধুয়ে, মুছে, ধরে রেখেছিলেন।
কিন্তু সময় কারও জন্য থেমে থাকে না।
হরিপদের ছেলে অমল বাবার পেশায় আসেনি। সে শহরে গিয়ে অন্য কাজ নিয়েছিল।একদিন অমল বাবার পাশে বসে বলল,
—“বাবা, তোমার সেই ঘাটে এখন আর কেউ আসে?”
হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর মৃদু হেসে বললেন,
—“না রে। ঘাটটা আছে… কিন্তু কাজটা আর নেই।”
কথাটা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে এল।অমল বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল—বাবা আসলে শুধু ঘাটের কথা বলছেন না।
তিনি বলছেন তাঁর হারিয়ে যাওয়া যৌবনের কথা, হারিয়ে যাওয়া পেশার কথা, হারিয়ে যাওয়া এক পৃথিবীর কথা।
অমল বাবার হাতের দিকে তাকাল।
খসখসে, শক্ত হয়ে যাওয়া সেই হাত—কত বছরের শ্রমের সাক্ষী!
সে ধীরে বাবার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল।হরিপদ বললেন,
—“মানুষ বদলাবে, কাজ বদলাবে, সমাজ বদলাবে—এটাই স্বাভাবিক। এখন কাপড় পরিষ্কারের কাজ বিভিন্ন আধুনিক সেবা ও নানা মানুষের হাতে চলে গেছে। আমাদের পুরোনো পেশার সেই পরিচয়ও আর আগের মতো নেই।”
একটু থেমে তিনি বললেন,
—“কিন্তু রে অমল, একটা কথা মনে রাখিস—কোনো সৎ কাজ কখনো ছোট নয়। যারা ঘামের বিনিময়ে মানুষের জীবনকে একটু সহজ করে, তাদের সম্মান করতে হয়।”
অমল কোনো উত্তর দিল না।
শুধু বাবার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে রইল।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
পুকুরের পানিতে ডুবে যাচ্ছে সূর্যের শেষ আলো।হরিপদ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর একবার পেছন ফিরে তাকালেন সেই পুরোনো ঘাটের দিকে।
ঘাটটি নীরব।
কোনো কাপড়ের বোঝা নেই।
কোনো সাবানের ফেনা নেই।
কোনো মানুষের কোলাহল নেই।শুধু বাতাসের ভেতর কোথাও যেন ভেসে আসছে সেই বহু বছরের পুরোনো শব্দ—
ছপ্… ছপ্… ছপ্…
হরিপদ চোখ মুছে ফিসফিস করে বললেন,
—“সবকিছু হারিয়ে যায় না রে… কিছু জিনিস মানুষের স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকে।”
অমল বাবার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
দুজনের ছায়া তখন সন্ধ্যার আলোয় পুকুরের পানিতে পাশাপাশি পড়েছে।পুরোনো ঘাটটি নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল—যেন সে-ও জানে, তার বুকের ওপর দিয়ে একটি যুগ চলে গেছে।
একটি পেশা বদলে গেছে।
একটি জীবন বদলে গেছে।
একটি প্রজন্ম হারিয়ে গেছে।কিন্তু সেই পাথরের ওপর পড়া হাতের শব্দ, সেই সাবানের গন্ধ, সেই ঘামের গল্প—কীভাবে যেন সময়ের বুক চিরে আজও ফিরে আসে।
ধোপার ঘাট হয়তো হারিয়ে গেছে,
কিন্তু সেই ঘাটে ঝরে পড়া শ্রমিকের ঘাম হারিয়ে যায়নি।
কারণ ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশার গল্পে লেখা হয় না—
ইতিহাস লেখা হয় হরিপদের মতো সাধারণ মানুষের শ্রম, ঘাম আর নীরব আত্মত্যাগেও।
সময় বদলে যায়, পেশা বদলে যায়, মানুষ বদলে যায়—
কিন্তু শ্রমের মর্যাদা কখনো পুরোনো হয় না।5 Comments-
রতন চন্দ্র রায়, আপনার লেখাটির “সেই ঘাটে বসে তিনি যেন একটি সময়কেও ধুয়ে, মুছে, ধরে রেখেছিলেন”—এই অংশটি আমার হৃদয়ে গভীর ছোঁয়া দিয়ে গেছে। গ্রামবাংলার ফেলে আসা সেই চিরায়ত দৃশ্য ও শ্রমজীবী মানুষের অনুভূতির এমন আবেগঘন চিত্রায়ন সত্যিই দারুণ এক মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। আপনি নিয়মিত আমাদের এই সুন্দর প্ল্যাটফর্মে অন্য সবার লেখা পড়ে উৎসাহমূলক মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন, যাতে আমাদের এই লেখার আড্ডা আরও প্রাণবন্ত ও চমৎকার হয়ে ওঠে।

রতন চন্দ্র রায়
ইম্পোজিটর
রতন চন্দ্র রায়
পেশা - সরকারি চাকরি
শখ- লেখা / কবিতা/ গল্প/ উপন্যাস
কর্মস্থল- বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেস), তেজগাঁও, ঢাকা- ১২০৮
ঠিকানা- ৪১০ নবীনবাগ উত্তর গোড়ান,
- খিলগাঁও, ঢাকা ১২১৯
Friends
মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান
@mdziaurrahman
নুর
@thelight
Shahriar Hossain
@shahriarhossain
বিপাশা মন্ডল
@bipashamondal
গাজিবর রহমান
@gaziborrohman
মোঃ মোক্তারুজ্জামান মোক্তার
@mokteruzzamanpbtgmail-com
asif khandaker
@asifkhandaker
দিতি আহমেদ
@ahmedditee87gmail-com
ফারহান সাদিক (সংগ্রাম)
@fs-hasan-mohammad



হারিয়ে যাওয়া ধোপার ঘাটের ছপছপ শব্দে এক প্রজন্মের শ্রম, আত্মমর্যাদা ও নীরব ইতিহাস আজও স্মৃতির জলে ধ্বনিত হয়…🖤