Profile Photo

রাইহান খালিদারOffline

  • @Rayhan-30
  • Profile picture of রাইহান খালিদার

    • ভূমধ্যসাগরের নীল মণি সিসিলি আমিরাতের দাস্তান:
    • ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে তাকালে দেখা মেলে, ৮২৭ ঈসব্দের এক সোনালী মহেন্দ্রনগরের। উত্তর আফ্রিকার তিউনিসিয়া থেকে আমির জিয়াদাতুল্লাহর নির্দেশে দশ হাজার জানবাজ সিপাহি নিয়ে জাহাজে চড়েছিলেন সত্তর বছর বয়সী প্রাজ্ঞ আলেম সেনাপতি শাইখ আসাদ ইবনে আল-ফুরাত। লক্ষ্য ভূমধ্যসাগরের বুক চিরে জেগে থাকা অপরূপ দ্বীপ সিসিলি। যদিও এদ্বীপ জয়ের পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই ছিল তবে চূড়ান্ত অভিযান শুরু হয় মূলত তখনই, যাহোক
    এর শুরুটা অবশ্য তেমন সহজ ছিল না। মাজারাদেলভালো-তে পা রাখার পর একের পর এক বাধা ডিঙাতে হয়েছে প্রতিনিয়ত। অতঃপর ৮৩১সে যখন পালেরমো বিজিত হলো, তখন মুসলিমরা সেখানে তাদের শক্ত ভিত খুঁজে পায়। তবে পুরো সিসিলিকে বশ করতে সময় লেগেছিল প্রায় দীর্ঘ ৭৫ বৎসর। অবশেষে ৯০২ ঈসব্দে তাওরমিনা শহরের পতনের মধ্য দিয়ে দ্বীপের আকাশ-বাতাসে মুসলিমদের বিজয় কেতান ওড়ে।
    বিজয়ের পর এ সময়টাতে ক্ষমতা তিউনিসিয়ার আঘলাবিদের অধীনে থাকলেও, সিসিলির আসল ভাগ্য ফেরে কালবি রাজবংশের হাত ধরে। ৯৪৮ ঈসব্দে আমির হাসান আল-কালবি যখন শাসনভার নিলেন, সিসিলি তখন এক স্বতন্ত্র স্বর্গে পরিণত হলো। রাজধানী পালেরমো হয়ে উঠল পৃথিবীর এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহানগরি। মানুষ তখন পালেরমোকে তুলনা করত দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বাগদাদ কিংবা কর্ডোভার সাথে। চারিদিকে শত শত মসজিদের মিনার আর মাদ্রাসার কলকাকলিতে মুখর থাকত দ্বীপের বাতাস। সে-ই সাথে মুসলিম শাসকরা সিসিলির রুক্ষ জমিতে এনেছিলেন ‘কানাত’ বা জাদুকরী ভূমধ্যস্থ সেচ ব্যবস্থা। মরুর অভিজ্ঞতা দিয়ে তারা সিসিলির মাটিকে উর্বর করে তুললেন। ফলশ্রুতিতে দ্বীপের চারপাশ ভরে উঠল মিষ্টি কমলা আর লেবুর সুগন্ধে, আখ আর তুলার শ্বেত শুভ্রতায়, আর পেস্তা ও রেশম চাষের নতুন ছোঁয়ায়। এদ্বীপ হয়ে উঠল ভূমধ্যসাগরের প্রধান বাণিজ্যিক হৃৎপিণ্ড।
    আরো মজার বিষয় হলো সেখানে মসজিদ আর গির্জা পাশাপাশিই ছিল। খ্রিস্টান ও ইহুদিরা ‘জিম্মি’ হিসেবে পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা পেত। তাইতো পরবর্তীতে এই উদারতায় মুগ্ধ হয়ে অনেক গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষী মানুষ স্বেচ্ছাতেই ইসলাম গ্ৰহণ করেন। সিসিলির রাজদরবার ধন্য হয়েছিলো ইবনে হাওকাল আর ইদ্রিসির মতো বিশ্বখ্যাত ভূগোলবিদদের পদচারণায়। যারপরনায় স্থাপত্যের গায়ে ফুটে উঠল আরব্য জ্যামিতিক নকশা আর মোটিফ যা আজও মানুষের নয়ন জুড়ায়।
    কিন্তু ইতিহাসের নিষ্ঠুর নিয়ম হলো, উত্থানের পর পতন আসেই। ১০৪৪ ঈসব্দের দিকে কালবিদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সিসিলি ছোট ছোট ক্ষুদ্র আমিরাতে ভেঙে পড়েছিল। যা একতার অভাবে শিকড় প্রচন্ড রকমের দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। আর এই সুযোগটাই নিল উত্তর ইউরোপের নরম্যানরা। রজার-১ এর নেতৃত্বে শুরু হলো আক্রমণ আর দখল। অতঃপর একে একে পতন হলো পালেরমোর। সবশেষে ১০৯১ ঈসব্দে নটো শহর পতনের মধ্যদিয়ে সিসিলির আকাশ থেকে প্রায় আড়াইশ বছরের মুসলিম শাসনের সূর্য আনুষ্ঠানিকভাবে পাটে বসল।
    তবে অবাক করা তথ্য হলো মুসলিম শাসন শেষ হলেও সিসিলির মাটি তাঁদের সংস্কৃতি মুছতে পারিনি। তাইতো বিজয়ী নরম্যান রাজা দ্বিতীয় রজার এতটাই মুগ্ধতা ছিলো যে, তিনি তার দরবারে আরবি ভাষা ও মুসলিম পণ্ডিতদের উচ্চপদে বসিয়ে রেখেছিলেন। তবু একে হারিয়ে গেছে সবকিছু….

    ✍️ Rayhan Khalidar

Skip to toolbar