-
সুখ অপূর্ণতায়
-শেখ মুহাম্মদ মারুফপায়ের সামনে গুটিকয়েক তারার ফুল তারার মতন ছড়িয়ে আছে। আজ এত বছর পর এমন উদাস দিনে ফুলগুলো আমায় থমকে দিল। পাশে সেই দীঘি, যেই দীঘির জলে পা ভিজাতাম তুমি আর আমি। বড্ড বেশি মনে পড়ছে। পায়ে ঠান্ডা শিহরণ দিয়ে সেই দীঘি যেন আবার আমায় ডাকছে। আজ আমি ব্যস্ত হব না। ব্যস্ত হবার কারণ হারিয়ে ফেলেছি। আমি আবার পা ভিজিয়ে বসে থাকবো তোমাকে ছাড়াই।
সেদিনও ছিল শরতের আকাশ। আকাশে পেঁজা পেঁজা মেঘ ভাসছিল। ফুল ঝরানো বাতাস আর মেঘেদের ছায়ায় এ দীঘি ধূসর কাব্য আবৃত্তি করছিল। আমরা সেই কাব্যের ছন্দই উপভোগ করছিলাম। আমি তোমাকে আকাশ দেখা শিখাচ্ছিলাম। আকাশে ভেসে বেড়ানো পটচিত্রে লেখা গল্পগুলো পড়ে শোনাচ্ছিলাম। তুমি বারবার কনিষ্ঠাঙ্গুলি দ্বারা আমার কনিষ্ঠাঙ্গুল স্পর্শ করে জানান দিচ্ছিলে তোমার উপস্থিতির কথা। বুঝাতে চাইছিলে সবচেয়ে রঙিন গল্প বসে ছিলে তুমি আমার পাশে। কলম আর ব্যাগ ধরে অবশ হওয়া সেই হাত এখনও অনুভব করছে সেই শিহরণ।
তখন তোমার আমার মুখে কত হাসি ছিল। আমাদের ছোট্ট সংসার ছিল। গলির মাথায় ছোট্ট একটা বাসা ছিল। বাসার দেয়াল তোমার হাতের ছোঁয়ায় রঙিন ছিল। সবগুলো স্বপ্ন ছিল অনেক বড়, আকাশ ছোঁয়ার মত। কখনও কিছু চাইতে না আমার কাছে। বিকেল বেলায় হাঁটতে বেরোতাম আঙুলে আঙুলে শিকল বেঁধে। যতসব আজগুবি দার্শনিক ভঙ্গিমায় গল্প করতাম তোমার সাথে। সেগুলো শুনে তুমি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়তে। আমি বোকার মত চোখে ভালবাসা নিয়ে তাকিয়ে থাকতাম তোমার দিকে। তারার ফুল গুঁজে দিতাম তোমার খোপায়। তোমার চেহারা যেন আবির মাখা হয়ে বলে দিত সবকিছু পেয়ে গেছ এই জীবনে।
আমি স্বপ্নবাজ ছিলাম। সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ইচ্ছা ছিল প্রগাঢ়। নিজের চেষ্টা আর সাধনার ফলস্বরূপ বড় এক চাকরি জুটে গেল। সেদিন আমি ছোট খাটো কোন উপহার দিতে চাইনি। ফোন করে তোমাকে বলেছিলাম বড় কিছু চাইতে। তুমি কিছু চাইতে পারতে না আমার কাছে। তাই নিজেই পকেটের সবকিছু দিয়ে তোমায় গলার হার উপহার দিলাম। তোমার চোখে সেদিন বাঁধন হারা খুশি দেখেছিলাম। আমিও ভেবেছিলাম তোমাকে আরও বেশি ভালবাসা আর সুখ দেয়ার সামর্থ্য আমার হয়েছে।
তোমার চোখে এর আগে এত বিষণ্ণতা দেখিনি, সেদিন দেখেছিলাম। কোন এক বান্ধবী তোমার গলার হার নিয়ে ঠাট্টা করেছিল। তার স্বামীর দেয়া দামী দামী গয়না তোমাকে গর্ব করে দেখিয়েছিল। তাই হিংসার আগুনের ফুলকি তোমার শীতল হৃদয়কেও উত্তপ্ত করেছিল সেদিন। তোমার চোখের বিষণ্ণতা আমাকে দারূণ নেশায় উন্মত্ত করে দিয়েছিল। তুমি আবদার করতে শিখে গিয়েছিলে। আমিও তোমার আবদার রাখতে অর্থের পিছনে মাতালের মত ছুটলাম। কিন্তু হায়! সকল আবদার পূরণ করা সত্ত্বেও তোমাকে প্রায়ই বিষণ্ণ দেখতাম। তুমিও তখন আমাকে নিয়ে অনেক গর্ব করতে। কিন্তু আমার সামনে দাঁড়িয়ে আগের মতো হাসতে না।
তোমার বড় একটা বাড়ির শখ ছিল। ছোটখাটো রাজপ্রাসাদ বানিয়ে তাও পূরণ করলাম। কিন্তু সেই বাড়ির বিশাল আয়তনে আমাদের কথার ধ্বনিগুলো এ পার থেকে ওপারে পৌঁছায় না। বিকেল বেলায় আমার আঙুলে আর তোমার আঙুল ছোঁয় না। তুমি থাকো ভার্চুয়াল জগতে আর আমি থাকি টাকার শিকারে। দীঘির জলে পা ভিজানো আমাদের জন্য এখন অসভ্যতার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। আজগুবি কথাবার্তা বলা আমার জন্য নিষিদ্ধ। প্র্যাক্টিক্যাল কথার বাইরে যেকোন কথা বললে তা আমাকে পাগল সাব্যস্ত করবে।
ইদানিং তোমাকে খুব হাসতে দেখছি। তবে আমার সামনে নয়, চুপিচুপি। আমি সামনে পড়লেই কেন যেন তোমার হাসি থেমে যায়! এক অপরাধবোধের লজ্জায় ছেয়ে যায় তোমার মুখ। হাসির প্রয়োজন তবে কি লুকিয়ে লুকিয়ে মেটাচ্ছো? ভার্চুয়াল জগতের কেউ তোমাকে হাসি-খুশি রাখছে, তা বুঝতে আমার বাকি নেই।
হঠাৎ পায়ের পাতা বেশি শীতল হয়ে আসছে। দীঘির ওপারে তাকিয়ে দেখি বসে আছে আমার স্ত্রী নিতু। তার সূক্ষ্ম নড়াচড়া আমাকে জানান দিচ্ছে, সে কাঁদছে। তার চোখের পানি ওপার থেকে এপারে এসে আমাকে তার অবস্থার কথা জানান দিচ্ছে। যা তার কন্ঠ এতদিন আমায় জানায় নি। একটু আগে তাকে আমি হাসতে দেখে ফেলেছি। সে হাসি দেখে ফেলা তার এই কান্নার হেতু। কারণ সে হাসছিল অন্য এক পুরুষের সঙ্গে। সেই অপরাধবোধ তাকে এই দীঘির ধারে নিয়ে এসেছে, তবে আমার কাছে নয়, আমার বিপরীতে।
সব অপরাধ কি দীঘির ওপারেই? এপারে কি সব বিশুদ্ধ? তার এখানে এসে কান্নার কারণ তো এটাই, সব কিছুর ঊর্ধ্বে সে আমাকে চায়। আমার শরীর, আমার মনকে। কিন্তু আমি আমার মনকে হয়ত এ দীঘির জলে হারিয়ে ফেলেছি। যে মন তাকে হাসিখুশি রাখত, সেটাই তার প্রকৃত সুখের কারণ ছিল। আমি তার চাহিদা পূরণে নিজের শরীরকে দিন-রাত নিয়োজিত রেখেছি। কিন্তু আমার মন থেকে তাকে ভুলিয়ে ফেলেছি। আমি যেন কাল্পনিক এক গাছ বেয়ে উঠছি। যে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আমার স্ত্রী উপর থেকে ফেলা ফল কুড়াচ্ছে। কিন্তু আমি উঠতে উঠতে এত উপরে চলে গেছি যে এখান থেকে নিচে আমার স্ত্রীকে দেখা যাচ্ছে না। সে পাহাড়সম ফলগুলোর বোঝা নিতে পারছে না। অথচ সে শুধু ভালবাসায় বাহ্যিকতা চায় নি, ভালবাসায় আন্তরিকতাও চেয়েছে। তাই হয়ত অন্তরের তীব্র ক্ষুধা তাকে নিষিদ্ধ ভক্ষণে বাধ্য করেছে।
আমি এবার উঠলাম। তারার ফুলগুলো হাতে কুঁড়িয়ে নিয়ে দীঘির ওপারে গেলাম। ফুলগুলো তার খোপায় গুঁজে দিতেই তার শরীর কেঁপে উঠল। আমি শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে বসলাম। তার কানে কানে বললাম-
“নিতু, তোমাকে আকাশ দেখা শিখিয়েছিলাম। হয়ত ভুলে গেছ। আজ তোমাকে দীঘির জলের গল্প বলব। তার আগে বল তোমার এখন নিজেকে কি মনে হচ্ছে? ”
“(কান্নার ঢোক গিলে) পাপী। অনেক বড় পাপী।”
“হুম, ওপারে এই দীঘির জল আমার কাছে কি অভিযোগ করেছে জানো? ”
“কি?”
“বলল তোমার পাপী চোখের জল খেয়ে দীঘির অনেক মাছ ডায়রিয়া আর কলেরায় আক্রান্ত হচ্ছে। আর দীঘির নিচে হাসপাতালও নেই। ”
নিতু খিলখিল করে হেসে উঠল। আবার একই সঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়ল-
“তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমাকে ছেড়ে যেও না।”
“তুমি আর আমার কাছে কিছু চাইবে না নিতু। ক্ষমাও না। তুমি শুধু আমাকে আঁকড়ে ধরে রাখবে। আমাকে শাসন করবে। প্রতি বিকেলে আমার আঙুলে তোমার আঙুল বেঁধে ঘুরতে বেরোবে। আমাকে জোর করবে। আমাকে ঐ কাগজ রুপী তামাক পাতার নেশায় হারিয়ে যেতে দিও না।”
“হুম, তোমাকে শক্ত করে ধরে রাখবো।”
আমরা বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ সেখানে বসে থেকে আকাশ দেখলাম। নীরবতা ভেঙে দিল পিছন দিয়ে হেঁটে যাওয়া দুই বয়স্কের কথোপকথন-
“আমাদের চাওয়া পাওয়া আল্লায় আর পূরণ করে না। যত সুখ ঐ বড়লোকদের ঘরে ঢাইল্লা দেয়। ”
“জানো নিতু, স্রষ্টা কেন সবার সব চাওয়া পূরণ করে না? ”
“কেন?”
“কারণ, স্রষ্টা সবাইকে সব থেকে বেশি ভালবাসেন। সকল চাওয়া পূরণ হয়ে গেলে স্রষ্টা ও তার সৃষ্টির মাঝে দূরত্ব বেড়ে যাবে। সে আর স্রষ্টাকে আগের মত আকুল হয়ে ডাকবে না। যেমন কিনা আমাদের সব চাওয়া পূরণে আমাদের দূরত্ব বেড়ে গিয়েছিল। আসলে সুখ পূর্ণতায় নয়, সুখ অপূর্ণতায়। “
1 Comment
Friends
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
নাজমুল হক জুয়েল
@nazmulhoqjewel
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
Rabi Jahangir
@rabi-jahangir
Al-Mamun
@al-mamun
MD-Tanvir-Hossen-Atikul
@md-tanvir-hossen-atikul
EmanulHoquepronounced
@emanulhoquepronounced


অসাধারণ গল্প! শেষের কথোপকথনটুকু খুব ভালো লাগলো! নিতুর গল্প আরো পাব আশা রাখি! শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা রইল গল্পকার!