-
পিংকি
.
” হাউ সুইট ! অবশেষে পিংক বাসে উঠতে পারলাম ! ” উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ল স্বর্ণার কণ্ঠ থেকে। স্বর্ণার পরণে আজ গোলাপি টপ আর জিন্স; বাসে ওঠা উপলক্ষে। তার পাশে বড়ো বোন রূপা। তার পরণে অবশ্য গোলাপি রঙের পোশাক নেই। সে পরেছে বেগুনি রঙের থ্রিপিস। মাথায় কালো হিজাব বাঁধা। পায়ে বাদামী মোজা।
সে বিরক্তি প্রকাশ করল। এমনিতেই সে আজকে আসতে চায়নি। মাথা ব্যথা করছিল খুব। শুধুমাত্র এ বাসে চড়ার জন্য সে রূপাকে জোর করে রাজি উঠিয়েছে। অবশ্য সে বড়ো চাচ্চুর বাসায় যাওয়ার নাম দিয়ে এ কাজ করেছে। তাই রূপা বিরক্তি এড়াতে পারছে না। তার ওপর স্বর্ণার এ ন্যাকামি। বিরক্তিভরে সে বলল, ” ওফ, তোর এ ইংরেজি রাখ তো ! ”
সে বদমেজাজি হিসেবে পরিচিত তাদের বাসায়। স্বর্ণার অবশ্য ঠান্ডা মাথা। বোন রাগ ঝাড়লেও সে গায়ে মাখে না। এ স্বভাব পেল না বলে রূপার মনোকষ্ট কম নয়। কিন্তু সামলাতে পারে না সে প্রয়োজনের সময়।
তবে স্বর্ণার ঠান্ডা স্বভাবের কারণে অন্য দিক দিয়ে কিছুটা বিরক্ত রূপা। সে বলে-কয়েও বোনকে শালীন পোশাক পরাতে পারে না খুব একটা। কোনো কিছুকে পাত্তা না দেয়া স্বর্ণা তার এ কথাতেও গা করে না তেমন।রূপার কথার বিপরীতে হেসে স্বর্ণা বলল, ” কেন, তুই কোনোদিন ইংরেজি বলিস না যেন ? ”
রূপা এর উত্তর দিল না, অহেতুক তর্ক করে লাভ নেই।
স্বর্ণা বোনকে রাগাতে এবার বলল, ” বাসটা কী পুকি রে, আপু ! ”
তার উদ্দেশ্য সফল করে দিয়ে রূপা এবার আগের চেয়েও বেশি রেগে গেল, ” একদম এ শব্দটা ব্যবহার করবি না ! বিশ্রী একটা শব্দ ! ”
স্বর্ণা মিটিমিটি হেসে বলল, ” অবশ্যই বলব ! আরও বেশি করে ইংরেজি বলব। ”
রূপা রাগের পারদ বাড়াতে গিয়েও থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ” ঠিক আছে, ইংরেজি বলার এত ইচ্ছে যেহেতু তোর, বলতো – আমি সকালে ভাত খেতে গিয়েও খাইনি – এটার ইংরেজি কী ? ”
স্বর্ণা চুপ করে গেল। কয়েক মুহূর্ত পর বলে উঠল, ” মিথ্যা বলব কেন ? আমি তো সকালে ভাত খেয়েছি ! ”
রূপা হেসে ফেলল ; অথচ তার বোন প্রতি আলোচনায় কমপক্ষে পাঁচ-ছ’টা মিথ্যা বলে !
_________জ্যোতির স্বামী উদারমনা। তাদের দুই সন্তান। চারজনের সুখের সংসার ছিল। কিন্তু বিলাসী জীবনযাপন করতে গিয়ে ইদানিংকালে কিছুটা ঋণে পড়ে গেছেন তারা। এদিকে আবির-আরিবার বাবার বাবার প্রমোশনও আটকে গেছে অফিসে। তাই কিছু একটা কাজ খুঁজছিলেন জ্যোতি। এরই মধ্যে আশীর্বাদ হয়ে এলো গোলাপি বাসে ড্রাইভিং করবার লোভনীয় সুযোগ।
কিন্তু আবিরের বাবাকে বলতেই সে এক কথায় ভেটো দিয়ে দিল এতে৷ তার মতে জ্যোতির জন্য বাসায় প্রাইভেট ব্যাচে টিউশনি কিংবা স্কুলে শিক্ষকতা করাটাই সর্বোত্তম হবে। জ্যোতি তখন তাকে নানা কায়দায় কথা বলে রাজি করিয়েছেন। তবে ব্যঙ্গ করাটাই কাজে লেগেছে সবশেষে। জ্যোতির ব্যঙ্গাত্বক কথা হজম করতে না পেতে মত দিয়েছে সে।
এর পর পরই শাশুড়িকে গ্রাম থেকে আনিয়েছেন জ্যোতি। উদ্দেশ্য ছেলে-মেয়েকে দেখে রাখা। এতসবের পর চাকরিতে যোগ দিয়েছেন তিনি। কিন্তু শান্তি তিনি পুরোপুরি পাননি ; হুটহাট নাতির দুষ্টুমি আর নাতনির কান্নার অজুহাত দেখিয়ে জ্যোতিকে কল করে বিরক্ত করছেন শাশুড়ি মা।নানা কথা ভাবতে ভাবতে বাস চালাতে লাগলেন জ্যোতি। সামনে ইউটার্ন। সেটা পেরিয়ে কিছুদূর পর ফ্লাইওভার। বাঁক পেরোনোর আগে হঠাৎ কল দিলেন তার শাশুড়ি আবারও। বাসায় ছেলে-মেয়ে ভাত খাওয়ানোর সময় যেন কোনো রকম ঝামেলা না করে, তাই ট্যাবটা দিয়ে এসেছেন। শাশুড়ি কখনো সেটা দিয়ে কল করেন, কখনো বা তার নিজের বাটন মোবাইলে দিয়ে। এখন করেছেন ভিডিও কল ; নির্ঘাত আবির শিখিয়ে দিয়েছে তাকে। কখনো কখনো অবশ্য আবির-আরিবারও কল করে ; তবে সেটা কদাচিৎ, শাশুড়ির তুলনায়। জ্যোতি কল ধরলেন না। তবে তাতে থেমে যাওয়ার মানুষ নন শাশুড়ি ; ফের কল দিলেন তিনি। জ্যোতি বিরক্ত হয়ে কল রিসিভ করলেন। সাথে সাথে ভেসে এলো মেয়ের কান্নার সুর, ” মাম্মা, ব্যাতা পেয়েসি। পা কেতে গেসে, মাম্মা ! মাম-মা… – ”
জ্যোতি আঁতকে উঠলেন, ” কোথায় ব্যথা পেয়েছ, সোনা ? কিভাবে, আম্মু ? মলম দিয়েছো ? দেখি- মাম্মা, কাটা জায়গাটা দেখাও মাম্মাকে – ”
হঠাৎ বিকট শব্দে পিলে চমকে লেন তার। সামনে যে ইউটার্ন ছিল, সেটা কখন যেন ভুলে গিয়েছেন তিনি। বাসটা সেখানে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেছে। দেবে গেছে অনেকখানি !…
আর আশেপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে সম্মিলিত নারীকণ্ঠের চিৎকার। কেউবা জোরে জোরে পড়ছে, ” লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ “, ” লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ জোয়ালিমিন “…__________
বিধ্বস্থ অবস্থায় বাস থেকে নামতে নামতে স্বর্ণা বলতে লাগল, ” এই বাসে আর উঠব না জীবনে ! কী সাংঘাতিক ! ”
টীকা :
দু’আ দু’টির সঠিক রূপ :আরবী: لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
উচ্চারণ: লা- হাওলা ওয়া লা- কুওওয়াতা ইল্লা- বিল্লা-হ্।
অর্থ: আল্লাহর সাহায্য ছাড়া পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার এবং নেক কাজ করার কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।
দ্বিতীয় দু’আ (দু’আ ইউনুস):
আরবী: لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণ: লা- ইলা-হা ইল্লা- আংতা সুবহা-নাকা ইন্নি- কুংতু মিনায্- যো-লিমীন।
3 Comments-
লেখাটা পড়ে জাস্ট শিউরে উঠলাম, বিশেষ করে “এই বাসে আর উঠব না জীবনে ! কী সাংঘাতিক !” লাইনটা একদম বাস্তব পরিস্থিতির গভীরতা বুঝিয়ে দিয়েছে। গল্পে দুই বোনের খুনসুটি আর জ্যোতির সংসারের টানাপোড়েনটা খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন আপনি। দায়িত্ব আর আবেগের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখা যে কতটা চ্যালেঞ্জিং, তা এই লেখাটি পড়লে দারুণভাবে উপলব্ধি করা যায়।
Friends
Md Shakhawat Hossen
@mdshakhawathossen
FAM Farhad
@fmfarhad71gmail-com
মোবারক হোসেন
@mobarakhossain
area info
@areainfo
উত্তম কুমার
@uttamkumarpaul75
গোলাম ফারুক অভি
@enterprisesikder45gmail-com
02101988
@sahedahmed
মো: আমিরবিন আনোয়ার
@writeramir
শেখ মিজানুর রহমান
@sheikhmizanurrahman66gmail-com

আবিদাতুর রাহমান, আপনার লেখনীর ‘স্বর্ণা মিটিমিটি হেসে বলল, “অবশ্যই বলব ! আরও বেশি করে ইংরেজি বলব।”‘ এই অংশটিতে দুই বোনের মিষ্টি সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। আপনার বর্ণনার এই বাস্তবধর্মী ছোঁয়া এবং আবেগের সংমিশ্রণটি খুব চমৎকার হয়েছে, তাই নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে আপনার এই লেখনিশৈলীকে আরও সমৃদ্ধ করে এগিয়ে যান।