-
কবিতার অনুবাদ নিয়ে দুটি কথা
প্লেটো বলেছেন,”বিশ্বের সবকিছুই ধারণার ছায়া কিংবা কোনো মূল ধারণার অনুকরণ”।ব্যাপক দৃষ্টিতে দেখলে প্রায় সবকিছুতেই— প্রকৃতিতে,জীবনে,শিল্পে সবকিছুতেই অনুকরণ বা অনুবাদের একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।একটা জীবকোষ ভেঙ্গে যখন দুটো হয় বা সন্তান যখন বাবা মা বা পূর্বপুরুষের কারও আদল পায় তখন সেটা অনুকৃতি ছাড়া তো অন্য কিছু নয়।এমনিভাবে এক শিল্পকর্মের জন্ম হয় অন্য শিল্পকর্মের অনুকরণে বা অনুপ্রেরণায়।কবিরা বহুকার ধরে অনুকৃতির মাধ্যমে লিখতে শেখেন।প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যত না কবিকে উদ্দীপ্ত করে তার চেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে একটি কবিতা বা শিল্পকর্ম।এলিয়ট বলেছেন,”এক যুগের এক সংস্কৃতির কবির কাছ থেকে কৌশল রপ্ত করেন নিজকালের উপযোগী করে প্রনোদনা,আঙ্গিক চরন এবং ধারণা ধার করেন”।প্রায় সব মহান কবি যেমন:বাল্মীকি,হোমার,ভার্জিল,দান্তে,শেক্সপিয়ার,রবীন্দ্রনাথ কেউই এই বক্তব্যের বাইরে নন।
যেকোনো অনুকরণ শিল্পের মতো অনুবাদ শিল্পও মূলত রুপান্তর ঘটায়,স্থান বিন্যাস করে।মূলকে স্থানচ্যুত করে ভিন্নতর প্রতীক ও ইঙ্গিতের আওতায় পুনরুদ্ভব করানোই অনুবাদের কাজ।অনুবাদ শিল্পের রুপান্তরের বিষয়টি এবং মূলের সঙ্গে অনুবাদের সম্পর্ককে দুটি বাদ্যযন্ত্রের যুগলবন্দীর উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যেতে পারে।পিয়ানোয় বাজানো সুর যখন বেহালায় জবাবি দেয় তখন তারা অবিকল একই সুর সৃষ্টি করে না। যা করে তা একই স্বরের কাছাকাছি,প্রায় সমার্থ শব্দ ও সুর সৃষ্টি করে।যদিও শুনে মনে হয় শব্দযন্ত্র দুটি একই স্বর ও সুরের অনুকরণ করে চলেছে।ভাষাও সে রকম একটি যন্ত্র।এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় এই জন্যই হুবহু অনুবাদ সম্ভব নয়।পিয়ানোতে যেমন বেহালার স্বর নেই তেমনি এক ভাষায় নেই অন্য ভাষার স্বর।এ সত্য মেনে নিয়েই অনুবাদককে অনুবাদ করতে হয়।কবিতার জন্ম ভাষার গূঢ়তম সত্তা থেকে।তাই এক ভাষার কবিতা যখন অন্য ভাষায় অনুবাদ করা হয় তখন অর্থটুকু স্থানান্তরিত হলেও যা সত্তাসার তা মূল কবিতার মধ্যে অবিচলিতভাবে জ্বলতে থাকে। কবিতার অনেক সংজ্ঞা আছে।তার মধ্যে একটা হল,যা অনুবাদ করা যায় না তাই কবিতা।রবার্ট ফ্রস্ট ঠিকই বলেছেন, “কবিতা সবচেয়ে গোঁড়া জাতীয়তাবাদী শিল্প, কারণ স্ব ভাষায় সীমান্ত অতিক্রমে তার বড়ই অনিচ্ছা “। বাস্তবিক কবিতার অনুবাদ হয় কিনা এ বিষয়ে তো অনেকের বদ্ধমূল সন্দেহ। কবিতার অনুবাদকে তাই কেউ কেউ বলেন “a perpetual attempt to square the circle “।কবিতার অনুবাদ প্রসঙ্গে” অন্যদেশের কবিতা ” গ্রন্হের ভূমিকায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, “এই বইতে যারা বিশুদ্ধ কবিতার রস খুঁজতে যাবেন তাদের নিরাশ হবার সম্ভাবনাই বেশি। এই বইতে কবিতা নেই, আছে অনুবাদ কবিতা। অনুবাদ কবিতা একটা আলাদা জাত,ভুল প্রত্যাশা নিয়ে এর সম্মুখীন হওয়া বিপদজনক।….. আমার ব্যক্তিগত দৃঢ় বিশ্বাস, অনুবাদ কবিতার পক্ষে বিশুদ্ধ কবিতা হওয়া সম্ভব নয়,কখনো হয়নি”। এজন্য অনুবাদকে বলে এমব্রয়ডারির উল্টো পিঠ।ইতালীয় প্রবাদে অনুবাদককে বলা হয়েছে “Traduttore,traditor” অর্থাৎ”Translator, traitor”বাংলায় যার অর্থ অনুবাদক বিশ্বাসঘাতক।আলেকজান্ডার পোপ যিনি নিজেও অনুবাদক হিসেবে বিখ্যাত তিনিই অনুবাদককে বলেছেন “saddest pack of rogues in the world”।
এত ঠাট্টা বিদ্রুপ সহ্য করেও কিন্তু অনুবাদকেরা স্বকার্য থেকে বিরত হননি। কেননা অনুবাদের সেতুবন্ধন ছাড়া সাহিত্যের বিশাল জগতে পদার্পন করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হতো না।অনুবাদ না থাকলে বিশ্বের বিচিত্র ভাষায় বদ্ধ মনীষাকল্পনার শ্রেষ্ঠ ফসল গুলো সর্বসাধারণের আস্বাদের অতীত থেকে যেত।তাই ” all translation is a cratch for human incompetence ” বলে যতই ঠাট্টা করা হোক না কেন এই ক্র্যাচ না থাকলে ভাষার ব্যাপারে পঙ্গুদের পক্ষে ভাষা সীমার গিরিলঙ্ঘন কোনদিন সম্ভব হতো না।অনুবাদকে থিওরি হিসেবে দাঁড় করানোর পর তাত্ত্বিকরা নানা দৃষ্টিকোন থেকে একে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে আসছেন। তাই অনুবাদের প্রকারভেদ, কিভাবে বা কোন মূলনীতি অনুসরণ করে অনুবাদ করা হবে সে বিষয়ে কোন স্হির মত প্রতিষ্ঠিত হয়নি।ইংরেজ কবি জন ড্রাইডেন তার Preface of Ovid’s Epistles এ অনুবাদকে ৩ শ্রেণীতে ভাগ করেছেনঃ
১.মেটাফ্রেজ বা আক্ষরিক অনুবাদ
২.প্যারাফ্রেজ বা বিশ্বস্ত স্বাধীন অনুবাদ
৩.ইমিটেশন
মেটাফ্রেজ হলো”word for word and line by line” অনুবাদ। যাকে আক্ষরিক অনুবাদ বলা যায়।প্যারাফ্রেজ এ আনুগত্য অক্ষরের প্রতি নয় অর্থের প্রতি এবং সেই অর্থ may be amplified,but not altered।একে “sence for sence” অনুবাদও বলা যায়। আর ইমিটেশন হলো এক ধরনের অনুকৃতি। রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন প্রতিরুপ।এ অনুবাদে শাব্দিক ও ভাবগত সাযুজ্য উভয়কে বিসর্জন দেওয়া হয়।এটা স্বাধীন অনুবাদ না অনুসরণ তা নিয়ে মতভেদ আছে।
Eugene Onegin এর অনুবাদের ভূমিকায় ভ্লাদিমির নাবোকভ ও(রাশিয়ান-আমেরিকান লেখক) ৩ ধরনের অনুবাদের কথা বলেছেনঃ
১.Paraphrastic বা ভাবানুবাদ
২.Lexical বা আভিধানিক
৩.Literal বা আক্ষরিক
Paraphrastic অনুবাদে মূলের কিছু হারায় আর কিছু নতুন যোগ হয়।
Lexical অনুবাদে মূলের প্রাথমিক অর্থ ও বিন্যাস দেওয়া হয়।
Literal অনুবাদে অনুবাদের ভাষার প্রকৃতি ও বাক্যগঠন প্রনালী বজায় রেখে মূলের প্রতি,মূলের সঠিক প্রাসঙ্গিক অর্থের প্রতি বেশি নজর দেওয়া হয়।তবে এই দুই বিরুদ্ধ মেরু এড়িয়ে বরং সুবর্ণমধ্যমকে গ্রহন করাই ভালো এবং অধিকাংশ সার্থক কবিতা অনুবাদক কার্যত তাই করেছেন। এরকম মধ্যপন্হী বুদ্ধদেব বসু অনুবাদ সম্পর্কে বলেছেন “অনুবাদের উচ্চতম লক্ষ্য হতে পারে ১.মূলের ভাব,বক্তব্য ও সংবাদের পরিবেশন ২.চিত্রকল্প,ভাষার ভঙ্গি, ছন্দ, মিল ও স্তবকের বিন্যাস অর্থাৎ সমগ্র রূপকল্পের অনুসরণ ৩.মূল কবির দেশ ও কালের স্বাদ সঞ্চার ৪.অনুবাদের ভাষায় একটি সুন্দর -অন্তত সুখপাঠ্য -নতুন কবিতার রচনা।”
ইউজিন নিডা(আমেরিকান ভাষাবিদ) কবিতা অনুবাদে করণীয় তিনটি বিষয়ের কথা বলেছেনঃ
১.অনুবাদককে মূল শব্দাবলীকে বিষয়বস্তু ও রচনাশৈলীর আলোকে অনুধাবন করতে হবে।
২.অনুবাদককে উৎস ও লক্ষ্য ভাষার কাঠামোগত বৈষম্য বুঝতে হবে।
৩.অনুবাদককে উৎস ভাষার রচনাশৈলীর ভাষিক কাঠামো লক্ষ্য বা অনুদিত ভাষায় পুননির্মাণ করতে হবে।
উপরোক্ত সকল বিচারেই স্পষ্ট হয় কবিতা অনুবাদ কোন সহজ কর্ম নয়।কবিতা অনুবাদকের জন্য অপেক্ষায় থাকে গোপন কাঁটা,চোরাবালি, ফাঁদ,পরাজয়। তবুও প্রিয় বিদেশি কবির কবিতা নিজের ভাষায় সঞ্চারিত করার লোভ অদম্য।তাছাড়া বিদেশি কবি প্রতিভা ও ভাষার সামর্থ্যের সঙ্গে দ্বৈতসমরে লিপ্ত হয়ে নিজের ও নিজের ভাষার ক্ষমতার দৌড় যাচাই করার লোভও সংবরণ করা কঠিন। তাই, যতদিন বিদেশি ভাষার কবিতা কবির সামনে চ্যালেঞ্জের মত আছে তত দিন অনুবাদ চলছে এবং চলবে।তথ্যসূত্রঃ
অনুবাদ, বাংলা একাডেমি পত্রিকা
আধুনিক কবিতার দিগবলয়-অশ্রুকুমার সিকদার
ইন্টারনেট এর বিভিন্ন ওয়েব সাইট2 Comments
Friends
jannatul ferdoushi moni
@jannatmoni321gmail-com
Md Saifullah Sarkar Atik
@md-saifullah-sarkar-atik
Prodip Roy
@prodip
মোঃ আব্দুল মোমিন
@mdabdulmomin
মন কলম
@md-faridul-islam
Md. Pavel Forajy
@pavelforajy
Afruza Khatun
@afruza78
Afroza khatun
@roza
TAPAN MALAKAR
@tapan

ভালো লাগলো কবিতা সম্পর্কে সুন্দর তত্ত্বকথা জেনে। যথার্থই লিখেছেন লেখক, সাহিত্যের সমৃদ্ধির জন্য অনুবাদের গুরুত্ব অপরিসীম। শুভেচ্ছা নেবেন।