Profile Photo

Sol NovaOffline

  • tasnuvatamanna
  • Profile picture of Sol Nova

    Sol Nova

    • 18 hours, 20 minutes ago

    Another World

    Chapter 4 — You
    —

    সেদিন রাতে শ্রেয়াকে ফোন করে সবকিছু বিস্তারিত বলছিল ইনায়া।

    — তারপর কী হলো জানিস…

    কথা বলতে বলতেই ইনায়ার ফোনে একটা মেসেজ এল।

    **Arham:** Ina..

    ইনায়া স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
    — আচ্ছা রাখ। পরে কথা বলতেছি।

    শ্রেয়া সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল।
    — হুম, বুঝছি। ২৪ মেসেজ দিছে।

    ইনায়ার মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল। সে আর কিছু না বলে আরহামকে কল দিল। ওপাশ থেকে কল ধরেই আরহামের কণ্ঠ শোনা গেল,
    — কল আশা করিনি। মিস করতেছো?

    ইনায়া অবশ্য হাসল না। সে সরাসরি নিজের চিন্তার কথাই বলতে শুরু করল। ক্যারিয়ার, সময়, দূরত্ব—সবকিছু নিয়েই তার দুশ্চিন্তা। আরহাম ধৈর্য ধরে শুনল। তারপর বলল,
    — ঢাকার বাইরে অত থাকা হয় না। ম্যাচ থাকলেই ট্রাভেল করি জাস্ট। এটা নিয়ে কোনো প্রবলেম হবে না।

    ইনায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল,
    — আর ইনস্টায় এত ফিমেল ফলোয়ার? তাও আমি একা কীভাবে ছেড়ে দিবো?

    আরহাম হেসে বলল,
    — Dear wife…

    — No.

    — ওকে। আরে ওইসব কোনো ব্যাপার না। ফলোয়ার দিয়ে কি যায় আসে। আর খেলতে যাইয়া কোনো মেয়ের দিকে তাকাবো না।

    ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
    — কী গ্যারান্টি?

    আরহামের কণ্ঠ এবার একটু কঠোর হয়ে গেল।
    — আরে একি প্রশ্ন বারবার। এতো সন্দেহ করো তুমি!

    — আচ্ছা রাখি।

    — আরে দাঁড়াও। এতো সন্দেহ ভালো না। ট্রাস্ট করা শিখো।

    ইনায়াও ভাবল, সে মনে হয় একটু বেশি ভয় পাচ্ছে। তাই সে টপিক চেঞ্জ করল।
    — ন্যাশনাল টিমে কবে সিলেক্ট হইছেন?

    তারপর তাদের কথা চলতেই থাকল। একটা বিষয় থেকে আরেকটা বিষয়ে চলে যাচ্ছিল তাদের কথোপকথন। কখন যে রাত আরও গভীর হয়ে গেল, কেউ খেয়ালই করল না।

    এভাবেই কেটে গেল দুই সপ্তাহ।

    —

    ঈদের নামাজ শেষে বাড়ি ফিরেছে আরহাম। চারদিকে ঈদের আনন্দ, বাড়িতে আত্মীয়দের আনাগোনা। সবাই যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, তখন সে চুপচাপ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে। ইনায়াকে একটা মেসেজ দিতে ইচ্ছে করছে তার। কিন্তু কী লিখবে, সেটাই বুঝতে পারছে না।

    অনেক ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত লিখল—

    **Arham:** Ina…

    কয়েক মুহূর্ত পর আবার লিখল—
    **Arham:** আচ্ছা, তোমার কোনটা পছন্দ? জান, বেবি, সোনা, কলিজা—কোনটা?

    মেসেজটা পাঠিয়ে আরহাম নিজেই হেসে ফেলল। কথাটা একটু বেশিই হয়ে গেল কি না, কে জানে!

    অন্যদিকে ইনায়া তখন নিজের কাজে ব্যস্ত। ফোনে নোটিফিকেশন দেখে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। মেসেজটা পড়ে তার ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি ফুটে উঠল। তারপর লেখলো-

    **Inaya:** তোমাকে।

    মেসেজটা পাঠিয়েই সে ফোনটা নামিয়ে রাখল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আবার ফোনের দিকে তাকাল। নিজের উত্তরটা মনে পড়তেই মুখে হাসি চলে এল।

    এদিকে আরহাম মেসেজটা পড়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্য একদম চুপ। তারপর—
    — আআআ!

    তার চিৎকারে তনিমা দৌড়ে এল।
    — কী? তোকে ভূত ধরছে?

    মাও ছুটে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
    — কী হয়েছে বাবা?

    আরহাম তাড়াতাড়ি ফোনটা তুলে নিয়ে বলল,
    — কিছু না।

    তনিমা সন্দেহের চোখে তাকিয়ে ফোনটা নেওয়ার চেষ্টা করল।
    — নে, মেসেজ দেখ তো আমি মেবি ভুল দেখতেছি।

    মেসেজটা দেখে তনিমা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। তারপর বলল,
    — হুম… কনফেস করছে। তুই একটু বেশিই মরে যাচ্ছিস না ওর জন্য?

    — সর, আমার ফোন দে।

    আরহাম ফোনটা নিয়ে ধীরে ধীরে,
    — ইনা… ইনা…
    বলতে বলতে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

    তনিমা পেছন থেকে মাকে দেখে হেসে বলল,
    — মা, তোমার ছেলের এক্সাইটমেন্ট দেখছো? নাতি-নাতনির নাম ঠিক করো।

    আরহামের মা কিছু বললেন না। শুধু শান্ত গলায় বললেন,
    — সেমাই খা। আর তোর ভাইরে দে।

    তনিমা আর কিছু বলল না। কিছুক্ষণ পর সে আরহামের ঘরে ঢুকল। আরহাম তখনও ফোন হাতে নিয়ে বসে আছে।
    — জা-আ-আন…

    তনিমা একটা বাটি এগিয়ে দিয়ে বলল,
    — নে, সেমাই খা। এত মিষ্টি কথা বলিস না। ভাবির ডায়াবেটিস হয়ে যাবে।

    আরহাম হেসে ফেলল।

    —

    ঈদের পর দিনগুলো আবারও নিজেদের চেনা ছন্দে ফিরতে শুরু করল। ইনায়া ফিরে গেল হাসপাতালের ব্যস্ত জীবনে। সকাল থেকে রোগী দেখা, সিনিয়রদের নির্দেশনা মেনে কাজ শেখা, আর দিনের শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফেরা—সব মিলিয়ে নিজের জন্য সময় বের করাটাই কঠিন হয়ে পড়ল।

    অন্যদিকে আরহামও ফিরে গেল ফুটবল নিয়ে ব্যস্ততায়। অনুশীলন, টিমের মিটিং, ফিটনেস ট্রেনিং—দিনের বেশিরভাগ সময়ই কেটে যেত মাঠে।

    তবু ব্যস্ততার মাঝেও তাদের যোগাযোগটা থেমে থাকল না। কখনো সকালে ঘুম থেকে উঠে ইনায়ার ফোনে আরহামের মেসেজ ভেসে উঠত—
    *”Good morning, Ina. Duty তে যাওয়ার আগে breakfast করে নিও।”*

    সেদিন হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে ফোনটা হাতে নিল ইনায়া। আরহামের মেসেজ এসেছে—
    **Arham:** Ready হচ্ছি…

    ইনায়া সঙ্গে সঙ্গেই কল দিল।
    — শোনো, এয়ারপোর্টে পৌঁছেই কল দিও।

    — জি, এয়ারপোর্টে পৌঁছে কল দিব। তারপর সিটে বসে আবার কল দিব। পৌঁছালে জানাব, হোটেলে পৌঁছে ভিডিও কল দিব। এর মধ্যে নিজের খেয়াল রাখব আর জাস্ট তোমার কথাই ভাবব।

    কথাগুলো শুনে ইনায়ার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
    — Perfect.

    এভাবেই দিন কাটতে লাগল। আরহামও অনুশীলনের ফাঁকে ফাঁকে তার খোঁজ নিত। ইনায়া ঠিকমতো খেয়েছে কি না, সারাদিন কেমন কাটল, খুব ক্লান্ত লাগছে কি না—এমন ছোট ছোট প্রশ্নে ভরে থাকত তাদের কথোপকথন। মাঝেমধ্যে দুজনের কথা বলতে বলতে সময়ের হিসাব হারিয়ে যেত। আবার কখনো একজন ব্যস্ত থাকলে অন্যজন অপেক্ষা করত, কোনো অভিযোগ ছাড়াই।

    আরহাম কখনো তাকে নিজের কাজ থেকে দূরে থাকতে বলেনি। বরং ইনায়ার ব্যস্ততা বুঝেছে, তার স্বপ্নের কথা শুনেছে, আর প্রতিবারই তাকে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছে। এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই ইনায়ার মনে আরহামের জন্য আলাদা একটা জায়গা তৈরি করছিল।

    দুই সপ্তাহ কেটে গেল এভাবেই। তাদের জীবন আগের মতোই ব্যস্ত ছিল। প্রতিদিন দেখা হতো না, প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কথা বলাও সম্ভব হতো না। তবু দুজনের মধ্যে একটা অদৃশ্য অভ্যাস তৈরি হয়ে গিয়েছিল—দিনের শেষে একে অপরের খোঁজ নেওয়ার অভ্যাস।

    ইনায়া অবশ্য এখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি ভাবতে চাইত না। তবু কোথাও যেন একটা পরিবর্তন এসেছিল। আরহামের মেসেজের অপেক্ষা করতে, তার সঙ্গে নিজের দিনের ছোটখাটো ঘটনাগুলো ভাগ করে নিতে, এমনকি ব্যস্ততার মাঝেও তার কথা মনে পড়তে—এসবের মধ্যে ইনায়া এখন আর আগের মতো অস্বস্তি খুঁজে পেত না।

    হয়তো সে এখনো ভালোবাসার নাম দিতে প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু আরহামের সঙ্গে কাটানো ভবিষ্যতের কিছু মুহূর্ত কল্পনা করতে তার আর আগের মতো ভয় লাগত না।

    আর ঠিক এই সময়েই, তাদের সম্পর্কের গল্পে অপেক্ষা করছিল নতুন একটা অধ্যায়।

    —

    সেদিন একটু বেশিই গরম ছিল। বিকেলে ডিউটি শেষ করে বাড়ি ফেরার সময় হঠাৎ আবার বৃষ্টি নামল। ইনায়া একটা দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে পড়ল। ক্লান্ত চোখে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল সে। মনে হলো, আজ ছাতাটা সঙ্গে আনলেই ভালো হতো।

    বৃষ্টির ফোঁটা সামনে ঝাপসা পর্দার মতো পড়ছে। ইনায়া একা দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ নেই পাশে। শুধু বৃষ্টির শব্দ আর দোকানের ভেতরে বাজতে থাকা পুরোনো একটা গান। হঠাৎ তার মনে হলো, এই বৃষ্টিটা যেন চেনা। এই ছাউনিটাও যেন চেনা। কয়েক মাস আগে, হাসপাতালের সামনে, সেদিনও এমন বৃষ্টি ছিল। সেদিনও সে একা দাঁড়িয়েছিল। আর সেদিনই প্রথমবার সে দেখেছিল একটা হলুদ ছাতা।

    ইনায়া নিজের অজান্তেই একবার চারপাশে তাকাল। শূন্য রাস্তা। ভেজা ফুটপাত। দূরে একটা বাস থামল, তারপর আবার চলে গেল। কেউ নেই। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হয়তো এবারও ছাতাটা আসবে না। হয়তো এবারও তাকে ভিজেই বাড়ি যেতে হবে।

    ঠিক তখনই সেই ঝাপসা বৃষ্টির ওপাশে একটা হলুদ ছাতা চোখে পড়ল। ধীরে ধীরে ছাতাটা তার দিকে এগিয়ে আসছে। ইনায়া তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। তারপর ছাতাটা আরও কাছে এলো। আর ছাতার নিচে সেই চেনা মুখ—আরহাম।

    অজান্তেই তার মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল। এত সুন্দর করে হাসতে দেখছে আরহাম তাকে এই প্রথম। কাছে এসে দুজনের চোখে চোখ পড়ল। এক মুহূর্তের দ্বিধা ছাড়াই তারা একে অপরের হাত ধরল।

    আরহাম মৃদু গলায় বলল,
    — Jaan, tired?

    ইনায়া মাথা নাড়ল।
    — Nahh… আচ্ছা, সেদিন কি তুমি ছিলে? হুইলচেয়ারে মেবি তোমার ফ্রেন্ড ছিল… যেদিন আমাদের ফার্স্ট কথা হয়েছিল আরকি।

    আরহাম হেসে বলল,
    — হ্যাঁ।

    ইনায়া তার ছাতার দিকে তাকিয়ে বলল,
    — ছাতা নিজের মাথায়ই ধরছিলে।

    আরহাম হেসে উঠল।
    — আরে, মজা করে। তাছাড়াও এটা ছাতা আমার ফেভারিট। অনেক দিন থেকে ইউজ করি। আর আমার জিনিস আমি জাস্ট তোমার সাথেই শেয়ার করি…

    ইনায়া কিছু বলল না। শুধু তার হাতটা একটু শক্ত করে ধরল।

    গাড়িতে বসে যাওয়ার সময় বৃষ্টিভেজা রাস্তার পাশে একটা জোড়া কবুতর চোখে পড়ল। দুটো পাশাপাশি হাঁটছিল। আরহাম সেদিকে তাকিয়ে বলল,
    — আমরাও অলওয়েজ একসাথে থাকব।

    ইনায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
    — একদিন না একদিন তো যেতেই হবে।

    আরহাম তার দিকে তাকাল।
    — একসাথেই যাব।

    ইনায়া আর কিছু বলল না। শুধু নিঃশব্দে আরহামের হাতটা ধরে রাখল।

    —

    কয়েকদিন পর। ইনায়া আর আরহাম দুজনে মিলে ঢাকার বাইরে একটা স্টেডিয়ামে এসেছে। দুপুরের খাবার খাওয়া হয়নি। পথে যেতে যেতে আরহাম হঠাৎ বলল,
    — কিছু খেতে যাই।

    ইনায়া তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
    — হুম, চলো।

    দুজন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে পাশের ক্যাফে থেকে খাবার নিয়ে স্টেডিয়ামের ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামছে। বিশাল স্টেডিয়ামজুড়ে জ্বলে উঠেছে বড় বড় ফ্লাডলাইট। সাদা আলোয় সবুজ মাঠটা যেন আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। গ্যালারির কিছু অংশ ফাঁকা, কোথাও কোথাও কয়েকজন কর্মী নিজেদের কাজে ব্যস্ত। দূরে অনুশীলন শেষ করা কয়েকজন খেলোয়াড়ের কথাবার্তা ভেসে আসছে।

    মাঠের পাশের বসার জায়গাটায় এসে থামল আরহাম।
    — এখানে বসি?

    ইনায়া চারদিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। দুজন পাশাপাশি বসল। আর ইনায়া? সে বসে আছে ঠিকই, কিন্তু তার মনটা যেন অন্য কোথাও আটকে আছে। কিছুক্ষণ আগেও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। অথচ এখন মাথার ভেতর একটার পর একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। যতই সেগুলোকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, ততই যেন প্রশ্নগুলো নতুন করে ফিরে আসছে।

    আরহাম ফোন থেকে মুখ তুলে ইনায়ার দিকে তাকাল। মেয়েটার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, সে কোনো একটা বিষয় নিয়ে বেশ গভীর চিন্তায় ডুবে আছে।
    — কী নিয়ে এত টেনশন?

    ইনায়া চোখ তুলে তাকাল।
    — টেনশন না। ওভারথিংকিং, বুঝতেছি না।

    — বলো শুনি।

    — বাদ দাও। মেবি আমি বেশি ভাবতেছি।

    আরহাম ফোনটা পাশে রেখে একটু এগিয়ে বসল।
    — তো আমি বেশি এক্সপ্লেইন করব।

    ইনায়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
    — এটাই প্রবলেম।

    — মানে?

    — আমার যত প্রবলেম, তুমি ডাইরেক্ট সলভ দাও কীভাবে?

    আরহাম কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে মুচকি হাসল।
    — প্রবলেম সলভ করা কি অপরাধ নাকি?

    — আরে, সেটা না! মানে, তালা-চাবির মতো ফিট হচ্ছি কীভাবে আমরা? কোনো না কোনো প্রবলেম তো থাকেই। দুজন মানুষের সবকিছু একরকম হওয়া কি সম্ভব?

    এবার আরহাম একটু গম্ভীর হলো। ইনায়ার কথাটা সে হালকাভাবে উড়িয়ে দিতে চাইল না।
    — প্রবলেম নাই, এটাই প্রবলেম?

    — নাহ্! তুমি বুঝতেছ না। আমি যা বলি, তুমি সেটাই শোনো। আমার সব কথা তো তোমার পছন্দ হওয়া সম্ভব না। সবকিছুতে তুমি আমার সঙ্গে একমত হবে, এমনও তো না।

    আরহাম নিজের খাবারের দিকে তাকিয়ে আবার কথা শুরু করল।
    — শুরুর দিকে এসব ফলোয়ার ভালো লাগত। তখন ভালোই লাগত যে অনেক মানুষ আমাকে ফলো করে, আমার খেলা দেখে, আমার ব্যাপারে জানতে চায়। কিন্তু এখন অতটা যায় আসে না। সারাদিন এত কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় যে ফলোয়ার মেইনটেইন করার মতো সময়ও নেই। আর তোমার যেহেতু ব্যাপারটা পছন্দ না, তাই বললাম যায় আসে না।

    ইনায়া চুপচাপ শুনল। উত্তরটা যুক্তিসংগত। কিন্তু তার মাথায় যে আরও প্রশ্ন জমে আছে!
    — আর গার্লফ্রেন্ড ছিল না কেন?

    আরহাম মুখ তুলে তাকাতেই ইনায়া দ্রুত যোগ করল,
    — এখন আবার বলো না, এটারও সময় পাওনি!

    আরহাম হেসে ফেলল।
    — না, এবার অন্য উত্তর আছে।

    সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল,
    — ছোটবেলায় বাবা মারা গেছেন। আমাদের সংসারটা আম্মুই সামলেছেন। একা হাতে একটা পরিবার চালানো সহজ না, ইনায়া। আমাদের লাইফ খুব একটা স্টেবল ছিল না। আম্মুকে অনেক কিছু করতে হয়েছে, অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে। ছোট থেকেই এসব দেখেছি।

    ইনায়া চুপ করে গেল। আরহাম আবার বলল,
    — তখন থেকেই ভাবতাম, বড় হয়ে আগে নিজের পায়ে দাঁড়াব। নিজের একটা স্টেবল লাইফ তৈরি করব। তারপর অন্য কিছু নিয়ে ভাবব। একটা বয়সে এসে মনে হতো, মেয়েদের সঙ্গে ঘোরা, রিলেশনশিপ—এসব ভালোই লাগে। কিন্তু আমি নিজের কাছে যেটা চেয়েছিলাম, সেটা আগে অর্জন করতে চেয়েছি। এখন মনে হয়, আমি আগের চেয়ে অনেক বেশি ম্যাচিউর। সম্পর্কের দায়িত্ব নেওয়ার মতো মানসিক অবস্থায়ও আছি। তাই এসব নিয়ে এখন আর আগের মতো ভাবি না।

    কথাগুলো বলার সময় আরহামের কণ্ঠে কোনো অভিযোগ ছিল না। নিজের জীবনের একটা সাধারণ সত্যের মতো করেই সে কথাগুলো বলল।

    ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। এতদিন আরহামকে সে দেখেছে হাসিখুশি, দুষ্টুমি করা, সহজে সবকিছু সামলে নেওয়া একটা মানুষ হিসেবে। তার পেছনে কতটা পরিশ্রম আর দায়িত্ববোধ ছিল, সেটা এভাবে কখনো ভাবেনি।

    আরহাম হঠাৎ ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
    — আর তোমার বয়ফ্রেন্ড ছিল কি না, আমিও তো জিজ্ঞেস করতে পারি!

    ইনায়া একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
    — আঙ্কেলকে তো দেখেছিলাম, মেবি আমি।

    আরহাম অবাক হয়ে তাকাল।
    — হ্যাঁ? তোমার মনে আছে?

    ইনায়া কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
    — যেদিন আমরা চলে আসি, সেদিনের কথা একটু মনে আছে। আঙ্কেল বলেছিলেন, আমি বাসা থেকে চলে গেলে বাসায় কে চিল্লাবে? আম্মু শুনিয়েছিলেন আমাকে। আমি গোসলের সময় নাকি অনেক চিল্লাতাম।

    কথাটা বলেই ইনায়া নিজেই একটু হেসে ফেলল। আরহামও হেসে উঠল। ছোটবেলার সেই এলোমেলো স্মৃতির সঙ্গে নিজের বাবার কথাটা মিলে যাওয়ায় তার মুখে এক অদ্ভুত কোমলতা ফুটে উঠল।

    ইনায়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। আরহামকে হাসতে দেখে তার নিজেরও ভালো লাগছিল। কিছু কিছু হাসি আছে, যেগুলো দেখলে অজান্তেই মন ভালো হয়ে যায়। আরহামের এই হাসিটা ঠিক তেমন।

    কিছুক্ষণ পর আরহাম আবার প্রশ্ন করল,
    — তো, তোমার বয়ফ্রেন্ড ছিল না কেন?

    ইনায়া এবার খাবারের দিকে মন দিল।
    — আমার বয়ফ্রেন্ড ছিল না, কারণ ছেলেদের ওপর আমার তেমন ইন্টারেস্ট কখনোই ছিল না। ইন্টার পর্যন্ত তো এসব নিয়ে চিন্তাও করিনি। আর পরে… দেখছিলা তো তোমার সঙ্গে কেমন ছিলাম। বাকিদের সঙ্গে তার চেয়েও খারাপ বিহেভ করতাম।

    আরহাম মজা করে বলল,
    — একটু ছেলেবিদ্বেষী মনোভাব?

    ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
    — বিয়েবিদ্বেষী।

    আরহাম হেসে মাথা নাড়ল।
    — আমাদের বিয়ে হওয়ার পর তোমার এই মনোভাব গায়েব হয়ে যাবে।

    ইনায়া তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
    — মেবি।

    — মেবি কেন? নিশ্চিত না?

    — এত তাড়াতাড়ি নিশ্চিত হওয়া যায় নাকি?

    আরহাম হেসে ফেলল। তারপর একটু আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
    — আচ্ছা, বিয়ের বিষয়টা তোমার এত খারাপ লাগে কেন?

    ইনায়া এবার আর হাসল না। সে কিছুক্ষণ খাবারের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে বলল,
    — কাপলদের মধ্যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকে না। ছোট ছোট বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়, একজন আরেকজনকে বোঝার চেষ্টা করে না। দিন শেষে দুজনেরই মানসিক শান্তি নষ্ট হয়। শুধু নিজেদের না, বাচ্চাদের ওপরও তার প্রভাব পড়ে। একটা বাচ্চা এমন একটা পরিবেশে বড় হয়, যেখানে প্রতিদিন ঝগড়া, মনোমালিন্য। এসবের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তাকে। আমি চাই না, কেউ এমন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাক।

    কথাগুলো বলার সময় ইনায়ার কণ্ঠ শান্ত ছিল, কিন্তু তার কথার মধ্যে একটা গভীর বিশ্বাস ছিল। সে বিয়ের বিরোধিতা করতে চাইছে না; বরং এমন একটা সম্পর্ক চায়, যেখানে দুজন মানুষ অন্তত একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করবে।

    আরহাম মন দিয়ে তার কথা শুনল। তারপর সহজ গলায় জিজ্ঞেস করল,
    — আমি তোমাকে বুঝি?

    ইনায়া এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।
    — হুম। এখন পর্যন্ত।

    — তাহলে?

    ইনায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
    — কিন্তু আমাদের প্রফেশন এত ভিন্ন। তুমি ন্যাশনাল টিমের প্লেয়ার, তোমাকে কত জায়গায় যেতে হয়, কত ব্যস্ত থাকতে হয়। আর আমি হাসপাতাল, পড়াশোনা, নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত থাকব। কে জানে, ভবিষ্যতে কী হয়?

    আরহাম এবার একটু হেলান দিয়ে বসল।
    — সিরিয়াসলি? তুমি হাসপাতালে স্ট্রাগল করবে, আর আমি মাঠে। দুজনই নিজেদের জায়গায় পরিশ্রম করব। আমি নিজেও অনেক কষ্ট করে আজকের জায়গায় এসেছি। তাই যারা স্ট্রাগল করে, নিজের চেষ্টায় সামনে এগিয়ে যায়, তাদের আমি রেসপেক্ট করি। তোমার প্রফেশন আলাদা বলে তোমার পরিশ্রমটা আমার কাছে ছোট হয়ে যাবে কেন?

    ইনায়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
    — নাইস।

    তারপর আরহাম বলল,
    — আর কোনো মানুষই পারফেক্ট না। বাট তুমি যেই বিষয়গুলো নিয়ে ভয় পাচ্ছো সেগুলো খুবই বেসিক। আর কোনো ডাউট?

    ইনায়া একটু ভেবে বলল,
    — প্লেয়ারদের পেছনে অনেক মেয়ে পড়ে থাকে।

    আরহাম ভ্রু তুলে তাকাল।
    — আমার পেছনে থাকে না।

    — বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তো হয়! তোমার ক্ষেত্রে কেন হবে না?

    আরহাম নিজের প্লেট থেকে এক টুকরো খাবার তুলে নিয়ে বলল,
    — অধিকাংশ ডাক্তার হেলথ কনশাস হয়। কিন্তু তুমি ফ্রাইস খাচ্ছ।

    ইনায়া এক মুহূর্ত থমকে গেল। তারপর নিজের প্লেটের ফ্রাইসের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
    — গুড ওয়ান!

    — সবকিছু সবার ক্ষেত্রে মেলে না, ইনায়া। তাই না?

    ইনায়া মাথা নাড়ল। কথাটা তার ভালো লেগেছে।

    আরহাম আবার বলল,
    — তোমার পেছনেও অনেক ছেলে ঘুরতে পারে। তুমি কি তাদের দিকে তাকাবে?

    ইনায়া হাসতে হাসতে উত্তর দিল,
    — ঘুরবে না। আমি অত সুন্দরও না!

    কথাটা শুনেই আরহাম এমন জোরে বলে উঠল যে আশপাশের দু-একজন মানুষও তাদের দিকে তাকাল।
    — সিরিয়াসলি?

    ইনায়া চমকে গিয়ে চারদিকে তাকাল।
    — আস্তে! সবাই তাকাচ্ছে।

    কিন্তু আরহাম যেন সেসব খেয়ালই করল না।
    — কে বলেছে তোমাকে? তুমি জানো, প্রতি ম্যাচে স্টেডিয়ামে কত মেয়ে আসে? কত মেয়ে সামনে বসে থাকে? কিন্তু আমার চোখ কখনো কারও দিকে যায় না। সেদিন তোমাকে হাসপাতালে দেখেই আমার ক্রাশ খেয়েছিল। নইলে কাউকে এভাবে ডাইরেক্ট অ্যাপ্রোচ করতাম না।

    ইনায়ার হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। সে চোখ নামিয়ে ফেলল।
    — ইটস ওকে। বলতে হবে না কিছু। আই নো হোয়াট আই অ্যাম।

    আরহাম এবার আর হাসল না। সে ইনায়ার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
    — নো। ইউ ডোন্ট।

    ইনায়া মুখ তুলে তাকাল। আরহাম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। যেন কথাটা কীভাবে বলবে, সেটাই ভাবছে।
    — তুমি অনেক সুন্দর, ইনা। কথাটা আমি আগে বলিনি। কারণ ভেবেছিলাম, তুমি হয়তো ভাববে আমি শুধু তোমার চেহারা দেখে তোমাকে ভালোবাসছি। আমি চাইনি তুমি কখনো এমনটা ভাবো।

    একটু থেমে সে নিজেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।
    — ওহ নো! এটা আমি এখন বলতে চাইনি।

    ইনায়া অবাক হয়ে তাকাল।
    — কোনটা?

    আরহাম সঙ্গে সঙ্গে নিজের প্লেটের দিকে তাকাল।
    — আরহাম, খাওয়া শেষ করো। আমি আসছি।

    — কোথায় যাচ্ছ?

    — ওয়ান মিনিট। ওয়েট করো।

    কথাটা বলে সে উঠে দাঁড়াল। মাঠের পাশের করিডর ধরে দ্রুত এগিয়ে গেল। ইনায়া কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা নেড়ে হেসে নিজের খাবারের দিকে মন দিল। এই ছেলেটা যে কখন কী করবে, কিছুই বোঝা যায় না!

    কয়েক মিনিট কেটে গেল। ইনায়া একবার ঘড়ির দিকে তাকাল, তারপর মাঠের দিকে। আরহামকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ঠিক তখনই দূর থেকে কয়েকজন মানুষের হাসির শব্দ ভেসে এল।

    ইনায়া মাথা তুলে তাকাতেই দেখল, আরহাম ফিরে আসছে। তার হাতে লাল শাপলার একটি তোড়া। আর তার পেছনে? আরহামের কয়েকজন সতীর্থ। তাদের একজনের হাতে একটা কেক, আরেকজনের হাতে ছোট্ট একটা ব্যাগ। সবাইকে দেখে মনে হচ্ছে, তারা কোনো একটা বিশেষ ঘটনার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

    ইনায়া প্রথমে ফুলগুলোর দিকে তাকাল, তারপর আরহামের দিকে। বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে গেল। লাল শাপলা—তার প্রিয় ফুল।

    আরহাম ধীরে ধীরে তার কাছে এসে দাঁড়াল। মুখে সেই পরিচিত হাসি, কিন্তু চোখেমুখে আজ অন্য রকম একটা আন্তরিকতা। তারপর সবার সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ইনায়া একদম স্থির হয়ে গেল। মাঠের উজ্জ্বল আলোয় আরহামকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সতীর্থদের মুখেও চাপা উত্তেজনা। কেউ মুচকি হাসছে, কেউ আবার বন্ধুর দিকে তাকিয়ে ইশারায় কিছু বলছে।

    কিন্তু আরহামের চোখ শুধু ইনায়ার দিকে। সে লাল শাপলার তোড়াটা দুহাতে ধরে ইনায়ার দিকে বাড়িয়ে দিল।
    — I love you, Inaya. অনেক ভালোবাসি তোমাকে। Will you marry me?

    ইনায়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এই মানুষটা কিছুক্ষণ আগেও তার সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল। তার ভয়, সংশয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা—সবকিছু মন দিয়ে শুনছিল। আর এখন সেই মানুষটাই তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে, হাতে তার প্রিয় ফুল।

    কথা বলার জন্য ইনায়া ঠোঁট খুলল, কিন্তু প্রথম মুহূর্তে কোনো শব্দ বেরোল না। সে ফুলের তোড়ার দিকে তাকাল। তারপর আরহামের দিকে। মাথার ভেতরে ছোটবেলার লাল চেয়ার, ছাদের বৃষ্টি, হলুদ ছাতা, স্টেডিয়ামের আলো—সব একসাথে ভেসে উঠল।

    তারপর সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে ফুলের তোড়াটা নিল। মুখে ফুটে উঠল একটা মিষ্টি হাসি।
    — Yes. I will.

    আরহামের মুখটা মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যেন এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর আটকে থাকা নিঃশ্বাসটা এবার ছেড়ে দিতে পারল। পরক্ষণেই চারপাশে হাততালি আর উল্লাসের শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।
    — অবশেষে!
    — ভাই, এতদিনে সাহস হইছে!
    — আরে, কেকটা নিয়ে আয়!

    বন্ধুদের একজন কেকটা নিয়ে এগিয়ে এল। আরহাম উঠে দাঁড়াতেই তার বন্ধুরা তাকে ঘিরে ধরল। কেউ তার কাঁধে হাত রাখল, কেউ পিঠ চাপড়ে দিল। আরহাম হাসতে হাসতে তাদের সামলানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার কান দুটো লাল হয়ে উঠেছে।

    ইনায়া ফুলের তোড়াটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশের এত মানুষের উপস্থিতিতে সে কিছুটা লজ্জা পাচ্ছে, আবার পুরো ঘটনাটা এখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।

    আরহাম পকেট থেকে একটি ব্রেসলেট বের করল।
    — হাতটা দাও।

    ইনায়া অবাক হয়ে নিজের হাত এগিয়ে দিল। আরহাম যত্ন করে তার হাতে ব্রেসলেটটা পরিয়ে দিল। ইনায়া ব্রেসলেটটার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ গলায় বলল,
    — সরি, জান। আমি কোনো গিফট নিয়ে আসিনি।

    আরহাম হেসে তার দিকে তাকাল।
    — ইটস ওকে।

    তারপর একটু ঝুঁকে নিচু গলায় বলল,
    — বিয়ের রাতে দিয়ে দিও।

    ইনায়া এবার আর চোখ তুলে তাকাতে পারল না। লজ্জায় তার গাল দুটো লাল হয়ে উঠল।

    পেছন থেকে একজন বলে উঠল,
    — ভাই, ভাবির সামনে এত লজ্জা পাস কেন?

    আরেকজন সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
    — মাঠে তো দেখি অনেক সাহস! এখানে এসে সব শেষ!

    আরহাম তাদের দিকে তাকিয়ে বিরক্তির ভান করল।
    — তোদের কাজ নাই?

    — আছে তো! তোর engagement celebrate করা!

    কথাটা শুনে সবাই আবার হেসে উঠল। আরহাম মাথা নেড়ে হাসল। তারপর কেক কাটার জন্য সবাইকে কাছে ডাকল। কেকের ওপর ছোট করে লেখা— *Congratulations, Arham & Inaya.*

    কেক কাটার সময়ও বন্ধুরা তাকে ছাড়ল না। কেউ বলল, প্রথম টুকরো ভাবিকে খাওয়াতে হবে, কেউ আবার দাবি করল, এত বড় সারপ্রাইজ দেওয়ার পর কেক খাওয়ানোর দায়িত্বও আরহামের। সবশেষে কেকের বাক্সটা খুলে সবাইকে টুকরো দেওয়া হলো।

    কেক খাওয়ার সময় আরহাম ইনায়াকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।
    — ও হচ্ছে ইনায়া। আমার…

    কথাটা শেষ করার আগেই একজন বলে উঠল,
    — আমরা জানি, ভাই! ভাবি!

    আরেকজন হেসে বলল,
    — এতদিন যার জন্য ফোন হাতে নিয়ে বসে থাকতি, অবশেষে তাকেই পেয়ে গেছিস!

    — আরে, চুপ কর তোরা!

    আরহামের মুখে লজ্জা মেশানো হাসি ফুটে উঠল। ইনায়া অবাক হয়ে একবার আরহামের দিকে, আরেকবার তার বন্ধুদের দিকে তাকাল। ওরা যে আরহামকে এভাবে খেপাবে, তা সে ভাবেনি। কিন্তু আরহামকে একটু লজ্জা পেতে দেখে ইনায়ার বেশ ভালোই লাগছিল। যে ছেলেটা সবসময় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলে, মুহূর্তেই যেকোনো পরিস্থিতি সামলে নেয়, আজ নিজের বন্ধুদের সামনে তাকেই কেমন অপ্রস্তুত দেখাচ্ছে।

    ইনায়া মুখ নামিয়ে হাসি লুকানোর চেষ্টা করল। আরহাম সেটা ঠিকই খেয়াল করল।
    — হাসতেছ কেন?

    ইনায়া মাথা নাড়ল।
    — না তো!

    — মিথ্যা কথা। তুমিও ওদের সঙ্গে যোগ দিছো?

    — আমি কী করলাম?

    আরহাম চোখ ছোট করে তাকাল। ইনায়া এবার আর হাসি আটকাতে পারল না।

    চারপাশে তখনও হাসি, গল্প আর কেক কাটার আনন্দ চলছে। মাথার ওপর উজ্জ্বল ফ্লাডলাইট, সামনে বিশাল সবুজ মাঠ, আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো—যারা আরহামের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

    ইনায়া ফুলের তোড়াটার দিকে তাকাল। লাল শাপলাগুলো আলোয় আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। কবজিতে নতুন ব্রেসলেটটা ঝলমল করছে।

    কিছু কিছু মুহূর্ত হয়তো অনেকদিন ধরে কল্পনা করে রাখতে হয় না। সেগুলো হঠাৎ করেই জীবনে এসে যায়।

    আর সেই মুহূর্তে, নিজের প্রিয় ফুল হাতে আর কবজিতে নতুন ব্রেসলেট নিয়ে, ইনায়ার মনে হলো—হয়তো এই মানুষটার সঙ্গে নিজের আগামী দিনগুলো কল্পনা করে দেখতে তার আর আপত্তি নেই।

    2
    5 Comments
    • বৃষ্টিভেজা প্রেম পেল বিশ্বাসের লাল শাপলা…..🤍🖤

    • Sol Nova, লেখাটা পড়ে মনটা একদম ভালো হয়ে গেল, বিশেষ করে “ছাতা নিজের মাথায়ই ধরছিলে”—এই অংশটা দারুণ ছিল। সম্পর্কের ছোট ছোট খুনসুটি আর বিশ্বাসের টানাপোড়েন আপনি খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই গ্রুপের অন্য লেখকদের লেখাতেও নিয়মিত লাইক ও সুন্দর সব কমেন্ট করুন, এতে আমাদের কমিউনিটি আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

    • দুজনের খুনসুটি, অভিমান আর আন্তরিক কথোপকথন গল্পটাকে প্রাণবন্ত করেছে। বন্ধুদের উপস্থিতিতে প্রপোজ করার দৃশ্যটাও বেশ উপভোগ্য।

    • Sol Nova, আপনার এই লেখাটিতে ইনায়া ও আরহামের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো এবং তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন অত্যন্ত সাবলীলভাবে ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে, “সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। অথচ এখন মাথার ভেতর একটার পর একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে”—এই লাইনটির মাধ্যমে চরিত্র দুটির মানসিক দোটানা আপনি দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আপনার লেখনশৈলীতে যে মাধুর্য ও সারল্য রয়েছে, তা বজায় রেখে সামনের দিনগুলোতে আরও নতুন কিছু সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারেন। এমন চমৎকার আবেগময় সব গল্প লিখে আমাদের মুগ্ধ করতে থাকুন, শুভকামনা রইল আপনার জন্য।

Skip to toolbar