Profile Photo

মো. জাকির হোসেনOffline

  • zakir
  • Profile picture of মো. জাকির হোসেন

    মো. জাকির হোসেন

    3 months, 2 weeks ago

    ​যে স্পর্শে জেগে ওঠে বাবার স্মৃতি : চাঁদপুর রোটারী ক্লাবের এক রাত ও কিছু অশ্রুবিন্দু!

    অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

    ​চাঁদপুর রোটারী ক্লাবের নিয়মিত সাপ্তাহিক সাধারণ সভাটি যে কেবলই প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতার বৃত্ত ভেঙ্গে এক পরম আত্মিক ও জীবনমুখী আখ্যানের জন্ম দেবে, তা হয়তো উপস্থিত রথী-মহরথীদের কেউ ভাবেননি। রোটারিয়ান বন্ধু, আমাদের সকলের প্রিয় আবুল কাশেম গাজী সাহেবের সুযোগ্য উত্তরসূরি গাজী মহসিনের শুভ জন্মদিনকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হয়েছিল এক ঘরোয়া অথচ জমকালো উৎসবের। অবলীলায় সেই উৎসবের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছিলো ‘বৌমার হাতের জাদুমাখা রান্না’। কিন্তু রসনাবিলাসের সেই সুস্বাদু আয়োজনের আড়ালে যে একান্নবর্তী বাঙালি সংস্কৃতির সুগভীর দর্শন, অনুশাসন ও মানবিকতার এক মহাকাব্যিক গল্প লুকিয়ে ছিলো, তা উন্মোচিত হলো এক অভূতপূর্ব মুহূর্তে।
    ​অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে যখন গাজী মহসিনের সহধর্মিণী তথা আমাদের স্নেহের বৌমা তাঁর জীবনের অনুভূতি ও শ্বশুরবাড়ির দিনলিপি প্রকাশ করতে মাইক্রোফোন হাতে নিলেন, তখন পুরো মিলনায়তনে এক সম্মোহনী নীরবতা নেমে আসে। যান্ত্রিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক এই আধুনিক যুগে তাঁর প্রতিটি শব্দ যেন হারিয়ে যাওয়া পারিবারিক সৌহার্দ্যের এক সুধাময় প্রতিধ্বনি হিসেবে বেজে উঠেছিলো।

    ​এক ছাদের নিচে দুই বাপের বাড়ি : এক সৌভাগ্যবতীর জবানবন্দি

    ​স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বৌমা যখন বলছিলেন, তখন তাঁর চোখ-মুখ থেকে এক অদ্ভুত কৃতজ্ঞতাবোধ ঝরে পড়ছিল। তিনি বলছিলেন—
    ​”এটি ছিলো সম্পূর্ণ আমাদের একটি ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক বিয়ে। আমার বড়োভাই পাত্র নির্বাচন করেছিলেন এবং আমাদের পরিবারে বড়োভাইয়ের কথার ওপর কথা বলার বা তাঁর সিদ্ধান্তকে অমান্য করার ধৃষ্টতা কারো নেই, আমারও ছিলো না। তাই কোনো দ্বিধা ছাড়াই আমি একবাক্যে রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু বিয়ের পর এই বাড়িতে পা রেখে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা এক অলৌকিক প্রাপ্তি। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি আমাকে কোনোদিন চিরাচরিত ‘বৌমা’ বা পর-মানুষ হিসেবে দেখেননি। তাঁরা আমাকে পরম মমতায় ও শাসনে ঠিক নিজেদের গর্ভজাত মেয়ের মতোই লালন-পালন করেছেন। ফলে, তথাকথিত ‘শ্বশুরবাড়ি’ বলতে যে একটা পর-পর ভাব, জড়তা বা দূরত্বের দেয়াল থাকে, তা আমি কোনোদিন স্পর্শই করতে পারিনি। এই বাড়িটি আমার কাছে বরাবরই আমার বাপের বাড়ির আরেকটি সম্প্রসারিত রূপ ছিল।”

    ​স্বামীর দায়িত্বশীলতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অর্ঘ্য অর্পণ করে তিনি আরও যোগ করেন—
    ​”মহসিন বাইরে হয়তো কিছুটা চঞ্চল, আড্ডাপ্রিয় কিংবা সদালাপী; কিন্তু ঘরের চৌকাঠে পা রাখতেই সে এক ভিন্ন মানুষ—ভীষণ গম্ভীর, পরিণত ও দায়িত্ববান এক পুরুষ। পরিবারের কাউকেই সে কোনোদিন কোনো কিছুর অভাব বুঝতে দেয় না। সেটা বস্তুগত অভাব নয়, বরং আত্মিক অভাব। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, কিংবা স্নেহ—যার যেখানে যতোটুকু প্রাপ্য, মহসিন তা উজাড় করে পূরণ করে। আমি আমার বাপের বাড়িতেও পারিবারিক বন্ধন ও শৃঙ্খলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতাম, স্বামীর ঘরে এসেও সেই একই পারিবারিক মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ন রেখেছি।”

    ​বৌমার কণ্ঠ তখন ক্রমশ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসছিলো, বিশেষ করে যখন তিনি তাঁর প্রয়াত শ্বশুরের স্মৃতিচারণ করছিলেন :
    ​”পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার দরবারে আমি প্রতিদিন আমার শ্বশুরের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। তিনি আমাকে এতোটাই নিজের মেয়ের আসনে বসিয়েছিলেন যে, বিয়ের পর নিজ হাতে আমার শোবার ঘরটি (রুম ডেকোরেশন) সাজিয়ে দিয়েছিলেন। একজন বাবা যেমন তাঁর নিজের মেয়ের আহ্লাদ পূরণের জন্যে করেন, ঠিক তেমন দরদ দিয়ে তিনি তা করেছিলেন। আমি পৃথিবীর অন্যতম পরম সৌভাগ্যবতী মেয়ে, যে বিয়ের পর আরেকটি বাবার কোলে এসে আশ্রয় পেয়েছিলাম।”

    ​সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে এক নীরব চপেটাঘাত

    ​বৌমার মুখের এই অকৃত্রিম পারিবারিক বন্ধন, প্রাচীন অনুশাসন, কঠোর ডিসিপ্লিন আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জীবন্ত উপাখ্যান শুনে সভাকক্ষে উপস্থিত আমাদের মতো প্রবীণদের হৃদয়ও আলোড়িত হয়ে ওঠে। আমরা যদি বর্তমান ঘুণে ধরা সমাজের দিকে তাকাই, তবে কী দেখতে পাই? চারদিকে শুধু পারিবারিক কলহ, যৌতুকের বলি, পরকীয়া, আত্মহনন আর আপনজনদের হাতে আপনজন খুনের বীভৎস খতিয়ান। খবরের কাগজের পাতা ওল্টালেই যে নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র আমাদের শিউরে তোলে, তার একমাত্র এবং প্রধান কারণ হলো—পরিবারের ভেতরের সেই আত্মিক ‘বন্ডেজ’ বা সুদৃঢ় বন্ধনটি আজ কর্পোরেট সভ্যতার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে হারিয়ে গেছে।
    ​বৌমার এই আদর্শিক, যুক্তিনিষ্ঠ এবং চরম আবেগঘন বক্তব্য শোনার পর, নিজের অজান্তেই আমার ভেতরের পিতৃসত্তা জাগ্রত হয়ে উঠেছিলো। মনের ভেতর এক প্রবল আবেগ ও বাৎসল্য-রস ভর করেছিলো। তাই মিটিং শেষ হওয়া মাত্রই, কোনো আনুষ্ঠানিকতার তোয়াক্কা না করে আমি তাঁর সামনে এগিয়ে যাই। নিজের অজান্তেই আমার ডান হাতটি পরম স্নেহে তাঁর মাথায় চলে যায়, আমি তাঁকে মন থেকে আশীর্বাদ করি।
    ​মধ্যরাতের সেই টেলিফোন ও কাশেম গাজীর প্রতিচ্ছবি
    ​কিন্তু এই গল্পের সবচেয়ে হাড়কাঁপানো এবং হৃদয়স্পর্শী অংশটি অপেক্ষা করছিলো গভীর রাতের জন্যে। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত একটা। চারদিক নিস্তব্ধ। হঠাৎ আমার মুঠোফোনটি বেজে উঠলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠল মহসিনের নাম। ফোনটি ধরতেই ওপাশ থেকে আবেগজড়িত, কিছুটা রুদ্ধ কণ্ঠে মহসিন বললো—
    ​”আঙ্কেল, আপনি যে আজ সভা শেষে বাসায় আসার আগে বৌমার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন, সে বাসায় ফেরার পর থেকে চোখের জল ধরে রাখতে পারছে না। আপনার ওই পিতৃসুলভ স্নেহের স্পর্শে সে তাঁর প্রয়াত বাবার স্মৃতির কথা মনে করে ব্যাকুল হয়ে কেঁদে চলেছে। ও বারবার বলছে, আজ মনে হলো আমার বাবা বুঝি ওপর থেকে নেমে এসে আমার মাথায় হাত রাখলেন।”

    ​মহসিনের কথাটি শুনে অবশ হয়ে আসা বুকটা এক অজানা স্বর্গীয় শান্তিতে ভরে গেলো। চোখের কোণে এক ফোঁটা জল হয়তো আমারও জমা হয়েছিল। আমাদের প্রয়াত বন্ধু কাশেম গাজী ভাই ছিলেন একজন অত্যন্ত সজ্জন, অমায়িক, পরোপকারী এবং প্রকৃত অর্থেই একজন খাঁটি মানুষ। তিনি ছিলেন আমার হৃদয়ের ভীষণ কাছের একজন বন্ধু। তাঁকে অকালে হারিয়ে আমাদের চাঁদপুর রোটারী ক্লাব যেমন একজন প্রকৃত অভিভাবক ও গুণী মানুষকে হারিয়েছে, তেমনি আমরা ব্যক্তিগতভাবে হারিয়েছি এক পরম সুহৃদকে।
    ​আজ তাঁর প্রয়াণের পর, তাঁরই ঘরে আসা পুত্রবধূর প্রতিটি উচ্চারণে, কাশেম গাজী ভাইয়ের রেখে যাওয়া সেই উচ্চমানের বংশীয় আদর্শ, আভিজাত্য আর পারিবারিক শিক্ষার যে দ্যুতি ছড়ালো, তা সত্যি অনন্য। রক্তের সম্পর্কের বাইরেও যে কেবল শ্রদ্ধাবোধ, মানবিকতা আর স্নেহের এক অদৃশ্য সুতোয় মানুষকে এভাবে আজীবনের জন্যে বেঁধে ফেলা যায়, চাঁদপুর রোটারী ক্লাবের এই বিশেষ রাতটি আমাদের সামাজিক ইতিহাসে তার এক জীবন্ত দলিল হয়ে থাকবে।

    বন্ধু কাশেম গাজী, তুমি ওপারে ভালো থেকো; তোমার রেখে যাওয়া আদর্শ আজও তোমার ঘরে আলো ছড়াচ্ছে।

    2 Shares
Skip to toolbar