গেরিলা ‘৭১
তখনো সবকিছু জমে ওঠেনি,
পাতা ঝরার মার্চ মাসে
গড়াতে গড়াতে নানিবাড়ি।
শুধু আমরাই নই,
মাতুল বংশের রশুনের রোয়া
বৃত্তের সফল সম্মেলন ঘটে গেলো।
ভেঙে পড়লো গণ্ডগ্রাম সমসপুরে ।
সে খুব বেশি দিনের কথা নয়
নানা-নানি পরলোকগত হলেও
খানবাড়ির মসজিদে চুনকাম ছিল
জালালি কবুতরের ডানা ঝাপটানিতেও
মুসল্লিদের ধ্যানে বিঘ্ন ঘটেনি ।
উকিল মামার পোড়ো ঘর থেকে
ভয়ার্ত কোন সাপ ফণা তোলেনি।
শিউলিদের ভিটেয় তখন দাতব্য চিকিৎসা,
ডাক্তার খালু হাট থেকে ভেঙে এনেছেন
নিজের ঘরে, শেষ বয়সে।
আমরা সেই আশ্চর্য সময়ের
উৎকণ্ঠিত আমকালে, স্বাধীনতা অপরাধে
শহর ছেড়ে গ্রামবাসী হলাম।
শেখ মুজিব তখন দুর্দান্ত নেতা,
তাঁর গর্জনে খান খান ভেঙে পড়ছে
পাকিস্তান।
তিনি এখন ইয়াহিয়ার হাতে বন্দি।
তাঁকে কি হত্যা করা হবে,
নাকি তিনি আপোষ করবেন!
এরকম রাজনীতিচর্চায় খানবাড়িতে
রাত জেগে তর্কাতর্কি।
নির্মম পূর্ণিমার চাঁদ গলে পড়ছে
বেলগাছে, সুতো কাটা ঘুড়ির পাশে
অবহেলায় ।
আমার দারুণ ডানপিটে মেজোভাই
মুখে ফেনা ছোটায় –
চারু মজুমদার ছাড়া গত্যন্তর নাই
দেশে এখন গৃহযুদ্ধ,
অস্ত্র চাই, যুদ্ধে যাবো ।
পরিশ্রান্ত রেডিওর নৰ খোঁজে
মেজর জিয়া
মুক্তিযুদ্ধ কি সত্যিই শুরু হয়ে গেছে,
সে এক প্রবল উৎকণ্ঠা
ভূগোলের বই থেকে ছিঁড়ে আনা
পূর্ব পাকিস্তান, অস্পষ্ট ভারতকে
খোঁজা হচ্ছে সীমান্তের ওপারে ।
মেজোভাইকে মনে হচ্ছিলো চে গুয়েভারা,
সমসপুরের আদিগন্ত ফসলের মাঠ
আমার কাছে তখন ল্যাটিন আমেরিকা,
জুলিয়ান ফুচিকের গলার ফাঁসি
মামাবাড়ির আমগাছে ঝুলতে দেখেছি।
তন্ময়তার সেই বিহবল দিন-রাতে
ভূতের ভয়ের বদলে শুনেছি বুটের শব্দ
পৃথিবীর তাবৎ মুক্তিযুদ্ধের বারুদের গন্ধ
শুঁকেছি একা একা।
ভারত আমাদের সাহায্য দেবেই
-এরকম সিদ্ধান্তে অটল মেজোভাই
সহপাঠী মামাতো ভাইকে নিয়ে
গোপন বৈঠকে ব্যস্ত,
সূর্য সেন, বাঘা যতীনের চেয়েও
বড় কিছু হতে হবে।
অন্তরালে তৈরি হলো
সীমান্তপাড়ির রুট-ম্যাপ।
আমার জমানো টাকা
চিড়ের পুটলি ৷ এই প্রথমবার
মেজোভাই প্রতারণা করলেন,
ওরা পালিয়ে গেলো আমাকে ফেলে,
পেছনে পড়ে রইলো শিরীখালা,
পারভিন-ইয়াসমিন।
খানবাড়ি হারালো তার টগ্বগে যৌবন ।
তারপর বিধিবদ্ধ ইতিহাস শুরু ।
মেজোভাইয়ের সফল সিদ্ধান্ত,
একে একে দৃশ্যমান হলো,
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বিবিসি,
আকাশবাণী থেকে ভেসে আসা তরঙ্গে
মেজোভায়ের স্বপ্ন ঝরতো।
আমঝুপির প্রবাসী সরকার
শরণার্থীর লং মার্চের পদধ্বনিতে
কেঁপে উঠতো বুকের মধ্যে জেগে থাকা
বাংলাদেশ!
জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো হিংস্র থাবা,
চারদিকে রাজাকার-রাজাকার ভীতি ।
নতুন প্রজাতির এই জন্তুর ভয়ে
ভুতুড়ে হয়ে উঠল আশপাশ,
খানবাড়িতে চাঁদতারা পতাকা উঠলো
ঘটা করে।
উঠতি মেয়েরা পাটক্ষেতে
লুকিয়ে রইলো সারা বেলা ।
দূরে স্টেশনের দিগন্তে
মাছপাড়ায় আগুনের ধোঁয়া
নুরু চেয়ারম্যানের সেই রঙিন কাঠের বাংলো
পুড়ে গেছে স্বাধীনতা দোষে।
এ যাত্রায় বেঁচে গেছে সমসপুর,
বেঁচে গেছে খানবাড়ি, আর্মি এলো না।
হতাশার কালো মেঘ
ভয়াবহ বন্যাকেও ছাপিয়ে গেলো,
মুক্তিযুদ্ধ বুঝি শুধু আকাশবাণীতেই –
দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ধরে রাখেন
মায়ের পেটের ব্যথা আরো বেড়ে যায়,
মুখভর্তি শ্মশানের ছায়া
মেজো ছেলেকে হারানোর শোকে
পাথর হয়েছেন,
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্থহীন
আকাশের চিল অমঙ্গলের ইঙ্গিত।
ঠিক এরকম এক দিবাগত বৃষ্টিহীন রাতে
জল ভাঙার শব্দ,
ক্রমান্বয়ে সেই শব্দ দরজার শিকল পেরিয়ে
খিল খুলে দিলো ।
বড়মামি চিৎকার করে জানতে যাচ্ছিলেন,
তাঁর ছেলে কোথায়,
কিন্তু এক অদ্ভুত ত্বরিত গতিতে
তার মুখ চেপে ধরা হলো ।
খোদার কসম কেটে
মেজোভাই বললেন-
ফরিদ বেঁচে আছে
আর্টিলারি ট্রেনিং নিচ্ছে, ইন্ডিয়ায়,
এখনো অপারেশনে আসেনি,
দেশ স্বাধীন হলে
আর্মির বড়ো অফিসার হবে।
বড়মামি নির্বাক, নিশ্চুপ।
বাড়ির সমুদয় মাথা
মেজোভাইয়ের মাথার কাছে
ঘনিষ্ঠ হয়ে
ফিস ফিস শব্দে আরো গম্ভীর করে
শেষ রাত।
অবাক করে মা দাঁড়িয়ে রইলেন
কিছুই বললেন না,
তাঁর মুখভর্তি গর্বের হাসি,
গোর্কির মায়ের চেয়েও
বলিষ্ঠ মনে হচ্ছিল তাঁকে,
একবারও মেজোভাইকে
বুকে জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে
সময় নষ্ট করলেন না।
এক সময় সব ভিড় ভেঙে মেজোভাই
আমার মুখোমুখি হলেন,
বিজ্ঞের ভাষায় বোঝাতে চাইলেন
সঙ্গে নিলে কী কী ঘটতে পারতো।
ট্রেনিং ক্যাম্পের দুঃসহ কষ্টের কথা বললেন
করিমপুরের কথা, দেরাদুনের, চাকুলিয়ার কথা,
আর মাঝে মধ্যেই কাপড় সরিয়ে হাত-পায়ের
পচা ঘা দেখিয়ে ভয় দেখালেন
আত্মতৃপ্তির হাসিমাখা মুখে ।
এখন তার গেরিলা ট্রেনিং আছে,
সময়ের সাহসী সন্তান
দায়বদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা তিনি,
সবাইকে দেশ ছাড়লে চলবে না
দেশেই ট্রেনিং হবে
নতুন প্রস্তাবনা হাতে
স্বপ্নের স্বর্ণখচিত বাংলাদেশের ছবি,
প্রতিটি বাঙালিকে হতে হবে
এক একটি গ্রেনেড।
যুদ্ধ এবং রক্তের হামাগুড়ি পেরিয়ে
আমরা সেই মানচিত্র পেয়েছিলাম ।
মেজোভাই তার সমস্ত অস্ত্র এবং গোলাবারুদ
প্রকাশ্য দিবালোকে রাষ্ট্রের কাছে
জমা দিয়েছিলেন ।
তাঁর বীরগাঁথা ও জনপ্রিয়তার লেপে
বেশ কিছুদিন আমরা শীত কাটিয়েছি।
মুক্তিযুদ্ধের ফসল রেবা আপা
রেবাভাবী হলেন।
তারপর হিং টিং ছট!
সেই গণ্ডগ্রাম সমসপুরে
আর ফেরা হয়নি মধুমাসেও।
এখন ওখানে শুধু অভাব আর মানুষ।
চিঠি আসে, আমরা পালিয়ে বাঁচি।
নগরীর অলিতে-গলিতে লুকিয়ে থাকি
সহসা দেখা হলে-
জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ স্মৃতি
ভেঙে যাবার ভয়ে।
লাইসেন্স, পারমিট আর তালিকাবহির্ভূত
একাত্তরের দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহার
এখন মধ্যপ্রাচ্যে, জীবনযুদ্ধে
আরব সাগরের তৈলাক্ত জলে
ঝরে পড়া যৌবনের ইতিহাসে
স্মৃতিমালা খোঁজে।
[রচনাকাল ১৯৮৭, নিউ ডি ও এইচ এসে, ঢাকা]
![]()
1 Comment
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.
Drako Shajib
অনবদ্য কবিতা!
পড়তে গিয়ে চোখের সামনে প্রতিটি শব্দ যেন ছবি হয়ে ভেসে উঠল! চিরকাল মনে গেঁথে থাকবে এই অনন্য লাইন দু’টি,
“প্রতিটি বাঙালিকে হতে হবে
এক একটি গ্রেনেড।”