বাঁকা সূচ ও অন্যান্য
‘বাঁকা সূচ ও অন্যান্য’
(১৯৯৯)
একদিন এখানে জল পড়েছিল টুপ টুপ পাতার উপর
আমার নৃত্য ভঙ্গিতে আবেদন করেছিলাম, তুমি কি আসবে?
ষ্পষ্ট করে আমার বুকের মধ্যটা দেখিয়েছিলাম, পাঁজরগুলো যেখানে
ধুকপুক ধুকপুক মিশেছিল শির ফলকে
জল পড়েছিল, তুমি কি জানো আমার গাড়ি আছে,ঘুড্ডি আছে, নদীরা
শুকিয়ে গেছে তবু টুপটুপ উচ্ছন্নতা আছে?
সৃষ্টি আছে, ধ্বংস আছে, ঘোরের ভিতরে কেন্দ্রীভূত অন্ধকার
সেখানে তোমার টুপটুপ করে চামড়া কুঁচকে যাবে আমি জানি
তুমি একদিন তার কাছে চলে যাবে
.
শব্দ গেছে খুলে
শব্দ গেছে খুলে
ছিঁড়ে গেছে বকুল তলা
তোমার ওড়নার ভিতরে সুতির ভিতরে
মাংসের ভিতরে গরম আবহাওয়া
আমার বিশ্বসংসার ফুটপাথ
বারান্দা আর মাঠের মধ্যে মর্মন্তূদ গাছে
উষ্ণ হাওয়া বহে
উষ্ণ ঝড়
ভেঙ্গে পড়ে মূর্তি
প্লাস্টার
তোমার মাংসের মধ্যে
মৃত্যুর আলগা পানি বহে
মৃত্যুর আলগা রস…
চোখের ভিতরে
আমার চোখের ভিতরে তোমার চোখ দেখি
আয়নায়
পাপড়িগুলো খুব তন্ময়
তাই নয় কি?
নাকি নয়?
এত শত মানুষের মধ্যে আমি কি বড় জোর হরিণের মত
তাকাতে পেরেছি তোমার দিকে?
নাকি নয়?
আমি তো একটা বিস্তীর্ণ কার্পেট
বাঁকা সূচ,
বূনন করে উপর দিয়ে চলে যাও।
ফরটিসেভেন টয়েনবি সার্কুলার রোড
গোত্তা খাওয়া ষাঁড়ের মতন ফরটিসেভেন টয়েনবি সার্কুলার রোড
পায়ের সামনে রোদ গুড়া গুড়া হয়ে যায় পায়ের পিছনে
ফেলে আসা ছয় দিনের বোধ – সেদিন
আজানের সময় ঘোমটাটা না দিলেও পারতে, জানি
বিক্রমপুর হাউজ ভেঙ্গে গুড়িয়ে যাবে তুমি
দ্বিধাহীন চোখে না তাকালেও পারতে –
হাতের কলমে প্লাস্টিক
আজ না হোক অন্তত দেড়-শ বছরে
মিশে যাবে
মিলে যাবে ক্ষরিত দুপুর
গোত্তা খাওয়া ষাঁড়ের মত
ফরটিসেভেন টয়েনবি সার্কুলার রোড।
কনসার্টে তুমি
কনসার্টে স্টেজ সেজেছিল হাঃ হাঃ হাঃ
তোমার রূপে কত আনন্দ কত হাঃ হাঃ
কতজন কত লম্ফন কত হাঃ
আনন্দ আনন্দ ফূর্তি
কত ফূর্তি
সেই কবে থেকে মেলা করে আসে
ধনী অথবা পথ-মানুষেরা
সেখানে পাখিরাও একটু বিশেষ ভঙ্গিতে ওড়ে
পায়রা সেখানে লোমের ভিতরে তোমার চোখ
হাঃ হাঃ হাঃ
তোমার চোখ কাকে খোঁজে কাকে
হ্যাঁ?
সেখানে কাওকে খোঁজে কিনা?
যাওয়া আর না যাওয়া
বাঁকা সূচের কাছে যাওয়া অথবা না যাওয়া
কত আর জ্বলজ্বল করবে মূল্যবান
আঙটির দিকে তাকাই আর না তাকাই
আলো তার গা থেকে বিচ্ছুরিত হবেই
শেষ হবে কথা
জ্ঞান
নৃত্যভঙ্গিতে শিক্ষা-
দীক্ষা
শুরু হবে। আর
মৃত্যুর পরের অবস্থা যেহেতু অজানা
বাঁকা সূচ তাই জ্বলজ্বল করতেই থাকবে।
বাঁকা সূচের থিটা মস্তিষ্ক
ফ্লোরে পাতা তোষকটাকে স্বাভাবিক মনে হয়েছিল
শুয়ে শুয়ে অনেক আমি অনেক করে
বাঁকা সূচের থিটা মস্তিষ্কের কথা
ভেবেছি
আমার ভিতরে যেমন টানা পোড়েন
আসা যাওয়া
ধোপার হাতে কাপড়ের মত
এইদিক একবার
ঐদিক
তার ভাবনা রাশি
চমৎকার স্থির চিত্র
অন্ধকার ঘর
আমার নীচে দু ইঞ্চি
তোষকটার মত
কোন কথা বলে না
কোন
না
ঈদের দিনের প্রথম কাব্য
পকেটের ভিতরে দগদগে ঘায়ের মত খুচরা পয়সা
নামাজ শেষ করে ভিক্ষুকদের দেওয়া হয়নি, নামাজ পড়েছি তাই
মনটা একটু পবিত্র পবিত্র আর সেজন্যই হয়তো
পয়সা গুলো দগদগে ঘা
নামাজ পড়েছি নিবেদিত ভাবে নিবেদিত কারণ
কিছুদিন হলো প্রেম বিষয়ক বিপর্যস্ত – বড্ড ভেঙ্গে গেছি আমি
মানে আমার কর্টেক্স ব্রেন – যেখানে কিছু মানবিক
শিক্ষা-দীক্ষা হার মেনে গেছে বিশ লক্ষ বছরের হরমোনের কাছে
তারপরও এই কাঁধ নু‘য়ে গেছে – জড়ভরত আমি
কোকিলের ডাক বাতাসে মিষ্টি গন্ধ শুঁকে শুঁকে
ভিক্ষুক এড়িয়ে সব কিছুর কারণ বের করে
সবকিছুর
পকেটে খুচরা পয়সা –
তার আওয়াজ শুনি
দগদগে ঘায়ের মত জ্বলজ্বল করতে থাকে
গোলাপগঞ্জে আগুন
গোলাপগঞ্জে আগুন লেগেছে আগুন পুড়ছে
আকাশে বাতাস ছাড়খার হয়ে গেছে ধোঁয়ায় ধোঁয়ায়
গলে গেছে রাস্তাঘাট আর ক্রমবর্ধমান শহর
ইলেকট্রিকের পোস্ট
নতুনতর শিকড় গজাচ্ছে এই বুকে
ফুসফুসে হাড্ডিতে ঢুকে গেছে জিহবা আমি
মাটির উপরে খাঁট ছেড়ে পালঙ্ক ছেড়ে বেমালুম ঠান্ডা ফ্লোরে আতঙ্কগ্রস্থ
দুই চোখে দেখি শুধু
আগুন লেগেছে গোলাপগঞ্জে বাঁকা সূচ
যেখানে উদ্ধত ভঙ্গিমায় অবস্থান করছে
ছয় সাতদিন হলো।
সমান্তরাল
মাথার ভিতরে জমে থাকা হিরোইনের রস হয়ে
বাঁকা সূচের ভাবনা আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শিথিল করে দেয়।
আতঙ্ক দ্রষ্ট হয়ে পাইপ তুলে নেই
চোখ দিয়ে নীল বিদ্যুত আক্রমণ করে কোষ
করে চলতি কথার ঝনাৎঝন ঝন
ঝন করে
রাস্তাঘাট দেবে যায়
রিকশা আর মানুষের সাথে মানুষের
সম্পর্ক
দাওয়াত
প্রয়োজনোৎভূত সংলাপ
বাদে আর কিছু নাই
তাই কিচ্ছু নাই তাই
হাতে পায়ে কাঁপাকাঁপি থামে
চোখের সামনে বাহুর মাংসপেশী
গিট বেঁধে শুকিয়ে টান টান হয়ে আসে
পাইপে আরেক টান হবে কিনা
সেই সংশয় নিয়ে তাকিয়ে থাকি সামনে
বাঁকা সূচের আবছা প্রচ্ছায়ায়।
বাঁকাসূচ বাদে
বাঁকাসূচ বাদে
আমি আরও আধুনিক
আরও আধুনিক
আমি রোবট।
ও নাকি আসে নাই
ও তো আসেনাই, গাড়ির উইন্ডশিল্ডে ওর চেহারা
দেখেছিলাম সন্ধ্যার গুড়গুড় করা বাতাস
বয়েছিল, বসেছিল আমার পাশটাতে যখন।
কাচের ভিতর থেকে ওর অবয়ব আমাকে শক্তি
দিয়েছিল এক্সালেটর চাপবার মত সন্ধ্যায়।
কি যেন একটা শনশনে গন্ধের পরত পড়েছিল-
ছোটকালে আমার মুখের চামড়ায় আমি সেটা
চেটেপুটে নিয়ে আস্বাদন করে করে
চিনেছিলাম ওকে দেখেছিলাম – আজকে
গাড়ির সামনে একটুও না ঝুঁকে তাকিয়েছিল,
আচ্ছা, নাহয় অন্তত আমিই দেখেছিলাম ওকে
হাত বাড়ালে ছুঁতেও পারতাম নিশ্চিত
অন্তত পদার্থবিদ্যার সূত্রানুযায়ী
প্রমাণিত করা যেত ওখানে সে আছে
অথচ ও নাকি আসে নাই
-এরকম ভাবে কথা বলে গেল সারাক্ষণ।
[রাদ আহমদ, ১৯৯৯]
![]()
Shomik Adhikary Nandon
“বাঁকা সূচ ও অন্যান্য” চমৎকার এক অভিজ্ঞতা। এই শীতের রাতে বেশ জমাট বাঁধা আনন্দ পেলাম।