স্মৃতি ও ভাবনার গদ্য
আবার দুপুর আড়াইটা
তুমি যখন আমার কথা মনে করতেছিলা, আমি তখন ভুয়া একটা রেস্টুরেন্টে বইসা সেটমেন্যু খাইতেছিলাম, দুপুরের খাবার হিসাবে।
ওদের চিকেনটা এত আজাইরা, তোমারে যদি এক কামড় খাওয়াইতে পারতাম, তাহলে বুঝতা।
কিন্তু সেইসব দিন তো আর নাই। কে কারে আর কী বাল খাওয়াবে, এখন পুরা দুনিয়া বইসা রইছে আমাদের খাবে জন্যে।
কিন্তু তুমি তবু যেহেতু মনে করতেছিলা আমার কথা, পানি খাইতে গিয়া তাই আমি হাল্কা বিষম খাইলাম।
আর আমার মনে পড়ল একদিন আজিমপুর থেকে ফেরার সময়, নিশুতি একটা গলিতে একটা কুত্তারে আমি খুব আগ্রহ নিয়া ড্রেনের পানি খাইতে দেখছিলাম।
উঁচু রাস্তা থেকে ওকে অনেকখানি নিচে ঝুঁকতে হইছিল পানিটা খাওয়ার জন্যে। একটা পা বেকায়দাভাবে উঠায়ে রাখতে হইতেছিল। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে খুব আন-কমফোর্টেবল অবস্থা হইছে ওর।
আমি ভাবলাম যে এত কায়দা কানুন কইরা ঐ ড্রেনের পানি ছাড়া আর কিছু খাওয়ার মত পাইলো না কুত্তাটা? এতই পিপাসা লাগছে ঐটার?
আগ্রহবশত আরো ডিটেল দেখব জন্যে আমি একটু ডাইনে চাপলাম৷ এবং আমার মাথাসহ ঘাড়টাকে অনেকখানি বাঁকা করলাম।
কোরান শরীফে যেরকম লেখা আছে, দেখি আকাশের অল্প আলোতে পানিটা ঐরকম বেহেশতের কোনো নহরের মত দেখতে লাগতেছে। আমারও মনে হইল যেন এর থেকে সুপেয়, এর থেকে পরিষ্কার এবং এর থেকে সুন্দর কোনো পানি, আমি বহুবছর দেখি নাই। খুব মৃদু একটা স্রোতের টানও আছে বোঝা গেল। একদৃষ্টে তাকায়ে থাকলে আস্তে আস্তে দেখা যায়।
বুঝলাম কুকুরটা কেন এত পাগল হইছে। ওর ঐ জলপানের শব্দ ততক্ষণে আরো স্পষ্ট এবং আরামপ্রদ মনে হইতে শুরু করছিল আমার কাছে। আমি চোখ ফিরায়ে ওরে অতিক্রম কইরা যাইতে যাইতে মন দিয়া শব্দটা এমনভাবে মুখস্থ করলাম যেন বহুদিন মনে থাকে।
ড্রাংক অবস্থায়, বা অতিরিক্ত কফি খাওয়ার কারণে আমি কি কখনো এই গল্পটা তোমারে বলছিলাম?
বলি নাই?
তুমি কী বলতে পারবা কেন আমার ঠিকঠাক কখনো মনে পড়ে না, যে আমি তোমাকে কোন গল্পগুলি বলছিলাম, আর কোনগুলি বলা হয় নাই?
আমারও যে মন চাইছিল ঐ পানিটা খাইতে, বলছিলাম? আমার খাওয়া উচিত ছিল। ঐ গলিতে তখন কোন লোকজনই ছিল না, থাকলেই বা কী হইত? কেউ যদি দেইখা ফেলতো, ফেললেই বা কী হইত?
আমি যদি পানিটা একটু খেয়ে দেখতে পারতাম, তাহলে এই গল্পটা শুধু তাকায়ে দেখার গল্প না হয়ে কিছু-একটা করার গল্প হইত।
তুমি যখন আমার কথা মনে করতেছিলা, তখন আমি বিল দিতে গিয়া ঐ রেস্টুরেন্টের ম্যানেজারকে উঁচু গলায় সরাসরি বললাম, যে, খাবারটা খুবই খারাপ ছিল, এত ফালতু চিলি-চিকেন আমি বহুদিন খাই নাই। শুনে লোকটা ভ্রু কুঁচকায়ে আমার মুখের দিকে তাকায়ে দেখলো আমিও ভ্রু কুঁচকায়ে তার দিকে তাকায়ে আছি।
লোকটা চোখ নামায়ে নিছিলো আর আমি বের হয়ে গেছিলাম ঐখান থেকে। বাইরে প্রচণ্ড গরম জানোই তো। পকেট থেকে বাইকের চাবি বের করতে-করতে আমি ভাবলাম আমার একটা গাড়ি থাকলে এই ভয়াবহ গরমের মধ্যে আর হেলমেটটা পরতে হইত না।
তখন আমার তোমার কথা মনে হইল। প্রত্যেকবার, যতবার আমি এই হেলমেটটা পরি, খুব কোনো ঝামেলার মধ্যে না থাকলে আমার তোমার কথা মনে পড়ে। আর মনে হয়, খুব শক্ত কইরা আমার মাথাটা কে যেন দুই হাত দিয়া ধরে ফেললো। কোনো একটা প্রাণী। আমার চিন্তাভাবনাগুলিকে নষ্ট হয়ে যাওয়ার হাত থেকে সুরক্ষা দিতে চাচ্ছে।
যদিও শেষের দিকে, তবু তখনও পর্যন্ত, তুমি আমার কথাই মনে করতেছিলা। আর আমার চেহারা হাসি-হাসি হয়ে যাচ্ছিলো হেলমেটটা পরতে পরতে। আর আমিও মনে করতেছিলাম, সবকিছু বাদ দিয়ে, শুধু তোমার হাসি-হাসি মুখটার কথা।
যেন মাত্র এক-ফিট সামনে থেকে দেখতে পাইতেছি।
বাস্তবে আমরা অনেক দূরে আইসা পড়ছি যদিও। এবং আরো অনেক দূরে আমাদের যাইতে হবে যদিও।
এবং যদিও এই হেলমেটটা পরা অবস্থায় আর কোনো অ্যাকসিডেন্ট আমি এখনো করি নাই।
August 25, 2021
রঙ্গরসিকতা
নারী কই আটকায়, পুরুষ কই আটকায় এগুলি নিয়ে লাইট-ওয়েট আলাপ চলতেছে কয়দিন ধইরা। বেশিরভাগই হাসি আসে না এইরকম রঙ্গরসিকতা।
এরমধ্যে কবি ব্রাত্য রাইসু সুন্দর কইরা বলছেন যে নারীপুরুষ দুইপক্ষই মূলত আটকায় সন্তানে। তার ভাষায়- চিরজনমের মত বান্ধা পড়ে।
এরথেকে সোজা ও সত্যি কথা আর চোখে পড়ল না। আমি একসময় মজা কইরা বলতাম, যার সাথে আমার কোনো বাচ্চা নাই সে আমার এক্স না। অর্থাৎ আমার বাচ্চার আম্মু ব্যতীত আমার কোনো এক্স নাই।
স্কুলজীবনেরটা হিসাবে ধরলে জীবনে আমি মোট তিনটা প্রেম করছি। তো বাকি দুইজন আমার এক্স নয় কি? এই হিসাবানুযায়ী?
আমি তাদের অসম্মান করতে চাওয়ার প্রশ্নই উঠে না, কিন্তু সত্য হইল, তাদের সাথে আমার কোনো বাচ্চা না থাকাতে আমি তাদের সাথে বান্ধা না। আমি তাদের স্টপেজে আটকাই নাই। বা আটকায়ে নাই।
আমি আটকাইছি আমার সন্তানের আম্মুর সাথে। কারণ আমাদের সম্পর্ক একত্রে পথচলার থেকে বড় হয়ে গেছে। বলা যায়, আমাদের উভয়ের আছে একই গন্তব্য। তা আমরা একত্রেই যাই বা আলাদা-আলাদা।
বনিবনা না হওয়াতে আমরা আলাদা হইছি বটে। কিন্তু উভয়ে মিলে সমাজের যে নতুন সদস্যটিকে আমরা জন্ম দিছি, তাকে কেন্দ্র কইরা আমাদের যে বন্ধন, তা মিটবার না।
মানুষ মানে মানুষের বাচ্চা, মানুষ মানে মানুষের বাপ-মা। মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ের মত কইরা দেখা গেলে যার বাচ্চা নাই তার একটা হাত খালি। ঐ জায়গাটা ডেড এন্ড বা ওপেন এন্ড হয়ে আছে। বাকিরা যারা একইসাথে মানুষের বাচ্চা ও বাপমা, তারা যেন একটা চেইনের মধ্যে অবস্থিত একটুকরা রিং। এইসূত্রে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের দুইটা লাইন মনে পইড়া গেলো আমার-
“ছুটে কে তুলিলে শালবন
বাহুবন্ধন চারিধারে”
কোটেশন ভুল থাকলে মাফ করবেন।
তো এই বাহুবন্ধনে আমরা যার পাশে চিরদিনের মতো দাঁড়াইছি, তো দাঁড়াইছিই। কেউ যদি বলতে চায় “আটকাইছি” তো তাই। কোনো সমস্যা নাই।
অনেকদিন আগে সলিমুল্লাহ খানের মুখ থেকে সম্ভবত অস্ট্রেলিয়ান এক কবির একটা কাব্যগ্রন্থ বা আত্মজীবনীর টাইটেল শুনছিলাম। টাইটেলটা হইল সম্ভবত- “দ্য ফাদার অব মাই সন”।
খুব সুন্দর লাগছিল নামটা আমার। আমরা তা-ই। আমাদের সন্তানদের পিতা বা মাতা। আমাদের পিতামাতার সন্তান। আর সেই একইভাবে, আমরা আমাদের সন্তানের মায়েদের সাথে চিরজনমের মতো আটকায়ে যাওয়া পিতারা।
আমরা খুশি, যে আমরা আটকাইছি।
১০/৮/২৩
মিষ্টি দেখতে মানুষের গল্প
রাত্রি দশটার দিকে। আমি রিকশা খুঁজতেছিলাম, ধানমন্ডি রাইফেলসের ঐখানে। যেদিকে যাব তার উল্টাদিকে হাঁটতেছিলাম, কারণ সামনেই নর্থ-এন্ড বা নার্ডিবিনস এর পরে নিউমার্কেটে ঢোকার যে গলিটা আছে ওর মাথায় শান্তশিষ্ট পরিবেশে একাধিক রিকশা সাধারণত স্ট্যান্ডবাই থাকে।
তো, ফুটপাতের একপাশে হেলান দিয়ে বইসা একজন ষাটোর্ধ কিন্তু মজবুত শরীরের লোক ভিক্ষা করতেছে। লুঙ্গিটা তত ময়লা না। শার্টের নিচে স্যান্ডোগেন্জি আছে। মধ্যম-সাইজের সাদা গোঁফদাড়ি, কাঁচাপাকা চুল। খুব মিষ্টি দেখতে, ভাসাভাসা চোখে একটু অসহায় ভাব।
ফিল্মমেকাররা অডিয়েন্সের করুণা উদ্রেক করতে যেধরনের চেহারা ব্যবহার করে, লোকটাকে দেখতে একদম ঐরকম। আমার মন দুর্বল ছিল, আমার মেয়ের দুইদিন হইল জ্বরজ্বর, মাত্র ফোনে কথা বইলা রাখলাম। সুতরাং আমি স্বয়ংক্রিয় ভঙ্গিতে মানিব্যাগ হাতে নিয়ে খুইলাও ফেলছি, হঠাৎ কী মনে হইতে জিজ্ঞেস করলাম- কী সমস্যা হইছে আপনার?
কী যেন খুব আস্তে গলায় বিড়বিড় করল উনি, বুঝলাম না। হঠাৎ দেখি দুইটা বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া ধরনের ছেলে পাশ দিয়ে যাচ্ছিল ২২-২৪ বছর বয়সের, ওদের একজন আমার পাশে দাঁড়াইল। আমি পাত্তা না দিয়ে আবার শুনতে চেষ্টা করলাম যে ভিক্ষাপ্রার্থী লোকটি কী স্টেটমেন্ট দিতেছে।
লোকটা বলতেছিল তার বউয়ের অসুখ। পাশ থেকে ঐ ছেলেটা তখন লোকটার উদ্দেশ্যে বলল, কিন্তু গতবার যে অন্যকথা বললেন? বইলা আমার দিকে তাকায়ে বলল, ভাই উনি কিছুদিন আগে অন্যকথা বইলা ভিক্ষা করতেছিল।
ততক্ষণে আমার হাতের দশটাকার নোটটা উনার হাতে চলে গেছে। লোকটাও তেমন প্রতিবাদ কিছু করল না ছেলেটার অভিযোগের। ওর সঙ্গী আরেকটা ছেলেও ততক্ষণে একই কথা বলা শুরু করছে। যে, উনি একেকসময় একেক কথা বলে। দেখেন উনার শরীরে কোনো সমস্যা নাই, সুস্থ জোয়ান মানুষ।
সেইটা তো আমি দেখতেই পাচ্ছিলাম। পাচ্ছিলাম জন্যেই উনাকে টাকা দিতে-দিতেও ভিক্ষা কেন করতেছে জিজ্ঞেস কইরা ফেলছি।
ভিক্ষা যে কেউ এমনি এমনিই করতে পারে। আপনার পছন্দ না হইলে ভিক্ষা দিবেন না। ভিক্ষা হইল উপার্জনের একটা মাধ্যম-মাত্র। তবু পঙ্গু বা অসুস্থ বা অতিবৃদ্ধদেরকে ভিক্ষা দেয়া আর একদম সুস্থ ও মজবুত স্বাস্থ্যের কাউকে ভিক্ষা দেয়াটা একরকম না। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আমাদের মন অনুসন্ধিৎসু হয়ে উঠে।
আমি বুঝলাম ভিক্ষার কারণ জিজ্ঞেস করা আমার ঠিক হয় নাই। মনে আছে কিছুদিন আগে আমি পাগলা কিসিম দেখতে এক যুবককে ভিক্ষা দিছিলাম কারণ সে নিজের পেটের দিকে হাত ইশারা কইরা খুব সহজ একটা ভঙ্গি করতেছিল। কোনো কথাটথা বলে নাই, কিছু না, শুধু নিজের পেটের দিকে দেখায়ে দেওয়ার সরলতাটা আমার যথার্থ মনে হইছিল।
কিন্তু আজকের এই লোকটা কেমন যেন থতমত করতেছিল। পরিস্থিতিটা করুণা-জনক, কিন্তু তার অবস্থান-হীনতা আমার পছন্দ হইল না। আমি দুয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করলাম। এর মধ্যে লোকটা এই ছেলেদুইটাকে কিছু একটা জবাব দিক, কিছু একটা কইরা দেখাক, এমনটা আমি মনে মনে চাইতেছিলাম। কিন্তু তা হইল না।
বাকি থাকল আমি নিজে থেকে ছেলে দুইটাকে এখন যদি বইলা দেই, যে, যার ইচ্ছা সে ভিক্ষা করবে, এমনি এমনিই করবে। প্রতারণা আর ভিক্ষা এক না।
আমি খেয়াল করলাম লোকটা বউয়ের অসুখটসুখ এগুলি মূলত ঐভাবে বলতে চায় নাই। ছেলেদুইটাকে যখন আমি জিজ্ঞেস করছিলাম যে ইতঃপূর্বে লোকটি কী কারণ দেখাইছে মনে আছে কিনা তখন তারাও কোনো সদুত্তর দিতে পারে নাই। অর্থাৎ তাদের মনে নাই। অর্থাৎ এমনও হইতে পারে যে তাদেরকেও লোকটা তার ভিক্ষা করার কারণ ঐভাবে বলতে চায় নাই। একটা নির্দিষ্ট ফ্যাক্টরি-মেড প্রফেশনাল ট্যাগলাইন হয়ত সে ইচ্ছা কইরাই বানায় নাই।
আমার জিনিসটা খারাপ লাগল না। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। লোকটা নির্বিকার, ছেলেগুলি অপেক্ষার মতো ভঙ্গি কইরা আছে। আমি লোকটাকে বললাম, দেখি, টাকাটা ফেরত দেন।
নির্বিকারভাবে উনি টাকাটা ফেরত দিল। ছেলেদুইটা কাঙ্গালের মতো আমার পিছে পিছে হাঁটতে শুরু করল। পাশাপাশি হাঁটতে চাইতেছিল কিন্তু ফুটপাত সরু হওয়াতে তা সম্ভব হইল না। অল দে আর স্টার্ভিং ফর ইজ আ থ্যাংক য়ু, আমি মনে মনে ভাবলাম। ততক্ষণে আমি মোড়ের মাথায় আইসা পড়ছি। ওরাও। আমি ওদের এক্সপ্রেশন খেয়াল করলাম। কিছুটা ভিখারি এবং কিছুটা গুণ্ডার মতো ওরা আমার কাছ থেকে ধন্যবাদ পাইতে চাচ্ছে।
আমি সত্যিই অন্যমনস্ক ছিলাম। তাই দ্বিতীয় ভুলটাও করলাম। ওদের দিকে তাকায়ে বললাম, থ্যাংক য়ু। ওরা খুব খুশি-খুশি বিগলিত একটা হাসি দিল। আমি বদলে হাসলাম না।
২.
মোড়ে রিকশা ছিল না। আরেকটু সামনে যাব সিদ্ধান্ত নিয়ে হাঁটিতেছি, দেখি মোড় পার হয়ে ফুটপাতের অন্ধকার একটা কোনায় একটা গাছের পাশে; গলার মধ্যে পান-সিগারেটের ডালা ঝুলানো ছোট্ট একটা ছেলে বইসা আছে। ৮-১০ বছর বয়স। খুব মিষ্টি দেখতে। কালো চামড়া, ভ্রু গুলি মধুর, চোখ দুইটা উজ্জ্বল।
বুঝলাম ইচ্ছা কইরাই এই ফাঁকা ও অন্ধকার জায়গাটায় বসছে ছেলেটা। কারণ হাত মুঠি কইরা, যেন দেখা না যায়, এইভাবে সিগারেট টানতেছে।
স্বয়ংক্রিয়ভাবে, দ্রুতবেগে ওকে পার হয়ে যাইতে যাইতে আমি সামান্য হুমকি-মিশ্রিত সুরে জোরগলায় বললাম, অই তুই সিগারেট খাইতাছস কিল্লিগা?
আমার চেহারায় বোধহয় কোনো হুমকি ছিল না। কারণ ছেলেটা আমার কথা শুইনা আমার দিকে তাকায়ে এত মধুর ভাবে হাসল যে তা বইলা বুঝানো যাবে না। বহুকাল পর্যন্ত ওর এই অপূর্ব সুন্দর হাসি আমার নিশ্চিতভাবে মনে থাকবে।
৩.
একটু সামনেই রিকশা পাইলাম। সজ্জন রিকশাওয়ালা। ভাড়া সঠিক চাইল, মুখভঙ্গি কোমল। তবে সারা রাস্তা কী কী বকবক করল। তেমন কিছুই বুঝলাম না বা বোঝার ইচ্ছা হইতেছিল না। লোকটা যে আপনমনেই বকরবকর করতেছিল তা না। নিজের কোনো সমস্যা বা দুঃখের কথাও বলতেছিল না। যতটুকু শুনতে পারলাম, উনি ধানমন্ডির ট্র্যাফিকজ্যাম, আইল্যান্ডের মধ্যেকার কাটা জায়গাগুলি বন্ধ করা ঠিক হইছে কিনা, আদৌ এতে সার্বিক পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হইতেছে কিনা, এগুলি বলতেছিল।
আমি হুঁ হুঁ করতেছিলাম। মনোযোগ দিতে না পারায় কেমন আনকমফর্টেবল লাগতেছিল। তাছাড়া বাতাস উল্টাদিকে। লোকটার কথা বলার ভঙ্গিতেও এমন কিছু একটা আছে যে হুট কইরা বুঝতে একটু সমস্যা হয়। সুতরাং আশা ছাইড়া দিলাম। আবাহনী মাঠে নামায়ে দিয়ে যখন দশটাকা বেশি চাইল, তখন আমি উত্তরে তাকে হাইসা হাইসা কী যেন একটা বললাম, তবে বেশি দিলাম না। সে-ও হতাশ হইল বইলা মনে হইল না।
এই হইল মিষ্টি দেখতে মানুষদের গল্প। পাঠক, আপনাদেরকেও বরং এখন একটা ধন্যবাদ দিই।
ধন্যবাদ।
মুরাদ নীলের সুইসাইড
জানতে পারলাম মুরাদ সুইসাইড করেছেন। উনার সম্পূর্ণ নামটা জানা হয় নাই। ফেসবুকে মুরাদ নীল নামে আছে। ইংরেজি বর্ণে।
উনার সাথে সাক্ষাত হয় ২১ সালের শেষে, রংপুরে গেছিলাম, তখন। চিন্তাশীল ছিলেন। রসিক ছিলেন। সেন্স অব হিউমার অর্থে না। শিল্পরস গ্রহণ সক্ষমতার কথা বললাম।
দরদী ছিলেন যা মনে হইছে। নরম। কথা বলতে পছন্দ করতেন। অনেক বিষয় নিয়ে কথা হইছিল। আরাম ছিল উনার সাথে কথা বইলা। ইনফর্মড, ওপেন, লজিকাল। ব্যক্তিগত কথাও একটু বলছিলেন। তখন জানতে পারছিলাম যে ইতঃপূর্বে একবার উনার সাইকোসিসের মত হইছিল, রিসেন্ট টাইমসেই।
উনি একটু মানসিক সমস্যা ফেইস করতেছিলেন। ফিজিওলজিকাল সমস্যার মতই। সিরিয়াসলি মেডিকেল হেল্প কন্টিনিউ করতে থাকলে উপশম হওয়ার কথা। করতেছিলেন কি শেষদিকে? আমি জানিনা।
বাকি থাকল ফিলসফিকাল ব্যাপারটা। দেখলাম ফার্নান্দো পেসোয়া উনার নিয়মিত পাঠ্য ছিল, স্ব-ভাষ্যমতে। আমি কখনো পেসোয়ার কবিতা গুছায়ে পড়ি নাই, এইখানে ঐখানে দেখছি। চিনি-ছাড়া মর্ডানিস্ট মনে হইছে। নাহ, ভুল হইল। অনেকে লবণ দিয়ে চা খায়। ঐরকম অনেকটা। জীবনকে অন্য একটি কাল্পনিক জীবনের সাথে তুলনা কইরা কমেন্ট্রি করতে থাকা মনে হইছে। ট্র্যাজিক দিকগুলির একরকম তালিকা-করণ। মুরাদের যে মানসিক অবস্থা ছিল, পেসোয়ার কবিতা সেইখানে ঘি ঢালছে হয়ত।
আরেকজনের গুণমুগ্ধ দেখলাম উনি। আঁকি কিরোসমাকি। অনেকে কিয়ারোসমাকি বলে। আমার নিজেরও পছন্দের চলচ্চিত্র পরিচালক। এইবার জুরি অ্যাওয়ার্ড পাইছেন, ইতঃপূর্বেও পাইছিলেন বোধহয়, কান উৎসবে। আঁকি ট্র্যাজিকমেডি ধরনের ছবি বানান। চরিত্রেরা সেইখানে অন্য সব কাল্পনিকতা থেকে রিফিউজ নিয়ে, দেখা যায়, অন্তত বাঁচার ইচ্ছার কাছে আশ্রয় নেয়। নিজেকে রক্ষা করে। তাই বাঁচতে থাকে।
কিন্তু মুরাদ নিজেকে রক্ষা করতে পারলেন না দেখা যাচ্ছে। ট্র্যাজেডির দিকটার ওজনই উনার ক্ষেত্রে বেশি হয়ে গেছিল হয়ত।
আরেকটা জিনিস। চিন্তাশীলদের ক্ষেত্রে অনেকসময় দেখা যায় স্বয়ং চেতনা জিনিসটাই তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চইলা যাইতে চায়। অতিমৃত্যুসচেতনতা এবং সময় সম্বন্ধে দার্শনিক ধাঁধা তৈরি হয়। যার ফলাফল হিসাবে একধরনের ভীতি দেখা যাইতে পারে। মুরাদের এমন হইছিল উনি জানাইছিলেন। তো এই ভীতিটা বোধহয় জ্বর আসার মতই। কারণ ভীতিটা মূলত মানসিক রেজিসটেন্সেরই ফল। মন যেহেতু ফাইটরত অবস্থায় থাকে।
যাক সেগুলি মন-বিশেষজ্ঞরাই ভাল বলতে পারবেন। তবে আমি এই প্রসঙ্গ উত্থাপনের কারণ হইল ঐমতবস্থায় কোনো মানুষের সবথেকে বেশি প্রয়োজন অপরের ভালবাসা। এবং অপরকে তার সমস্যার কথা বলতে পারা৷ কিছুদিন আগে মুরাদ একটা ছোট পোস্ট দিছিলেন যেখানে বলা ছিল কেউ তার সামনে বাঁচার কথা বললেই নাকি উনার তাকে মায়ের মত জড়ায়ে ধইরা কান্দতে ইচ্ছা করতেছিল। কী করুণ কথা। উনার রিভিউমূলক পোস্টগুলির গ্রাহক আমি ছিলাম না৷ কিন্তু এই পোস্টটাতে আমি কেয়ার রিঅ্যাক্ট দিছিলাম। তবে অতটা সিরিয়াসলি নিই নাই, ভাবছি হয়ত দুঃখমূলক কাব্যগুণের ব্যাপার থাকতে পারে ঐখানে। এখন উনার আত্মহত্যার খবরটা পাওয়ার পর থেকে খুবই মনখারাপ লাগতেছে।
রংপুরে, টাউনহল-কেন্দ্রিক আড্ডায়, মুরাদের সাথে কথা বইলা আমার যথেষ্ট ভাল লাগছিল৷ ঐদিকে বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা করেন এমনদের সংখ্যা আগে থেকেই কম। নাই যে তা না। তবু উনি বোধহয় খানিকটা লোনলি ফিল করতেন। আমি জানিনা এই লোনলিনেসকে উনি রোমান্টিসাইজ করতেন নাকি দূরীকরণের বাস্তব চেষ্টা করতেন। রংপুরে এখন থাকেন বা আছেন এমন দুয়েকজনকে ফোন দিলে হয়ত বিস্তারিত জানা যাবে।
![]()