সুবর্ণরেখা
সূক্ষ্ম ফাঁকের নেট আর কাঁচের জানালার মাঝখানে, দেড় ইঞ্চি ফারাকের মধ্যখানে একটা টিকটিকির লাশ। মরে শুকায়ে চ্যাপ্টা হয়ে ঝুলে আছে, মাকড়শার বানানো বৃত্তাকার বিস্তারে। বাইরে সোডিয়াম লাইটের ঘন আলো। বৃষ্টি টানা পড়ে যাচ
হেই, দ্যাখসো, একটা টিকটিকি মইরা পইড়া আছে। শুধু মরে নাই। মইরা শুকায়া ঝুইলা আছে চ্যাপ্টা হইয়া।
আমারে তো বৃষ্টি, বৃষ্টির সাথে আটকায়া থাকতে বাধ্য করতেসে। আমার নি:সঙ্গ লাগতেসে চরম।তুমি তো বাধ্য হওয়ার মতো না। বাইরায়া পড়।
আমার ছাতা নাই। আমার রেইন কোট নাই।
ওসবের তো দরকার নাই। ভিজলে ভিজবা। কই যাইতে চাও?
আমার যাওনের কোন জায়গা নাই। আর ভিজতে ইচ্ছা করতেসে না।
নিজস্ব সংলাপের বাইরে এসে আমি টিকটিকি আর বৃষ্টি বাদ দিয়া আকাশের মেঘ দেখতে থাকি। মেঘের মধ্যে প্রুফকের সঙ্গীত বাজতে থাকে। সেখানে জীবনানন্দ দাশ এসে একটা টানা লম্বা টেবিলে শুয়ে পড়েন আর ব্যক্তিগত আলাপের মতো বলতে থাকেন, কফির চামচে আমি মেপেছি জীবন!
চামচটা বাঁকা হয়ে গেল; ধুর বাল! নিউট্রালাইট এমন কী জিনিস যে তোমারে বাঁইকা যাইতে হবে! হ্যাঁ, তুমি বলতে পারো, তোমারে আমি ক্যান ছুরির বদলে ব্যবহার করি! বাটার টাইপ খাবার দাবার তোলার জন্য কোম্পানিগুলা বাটার বান্ধব ছুরি বানাইসে, ওইটা না ব্যবহার কৈরা ক্যান তুমি! ক্যান তোমারেই আমি ব্যবহার করি-এইটা ভালো প্রশ্ন। আমার যে চামচ ভাল্লাগে। আমি তো ছোট বেলা থেকে, এক চামচ, দুই চামচ, ছয় চামচ, নয় চামচ এরকম মাপ দিয়া, মাপ শুইনা বড় হইছি। আই লাভ চামচ। ছোট বেলায়, হাতের তালুতে পাউডার মিল্কের সাথে চিনি মিক্স করে, চুরি করে যে খাইতাম-অ্যঅ মাই গড-যতবার ভাবি, আমার মনে পড়ে ব্যাঙের গলার কাছের নরম, পাতলা জায়গাটা যেরকম করে কাঁপে আমার হাত সেইরকম কাঁপত। কিন্তু চামচ ঠিক ঠিকই প্রোপরশন বুঝত: এক চামচ পাউডার মিল্কের সাথে আধা চামচ চিনি অথবা এর চে কম হইলে চিনিও সেরকম কমে যাইত। আমি আর দীপ্ত যৌথ মিশন চালাইতাম। কখনো আমি পাহারায়, দীপ্ত মিক্সিংয়ে অথবা উল্টা দায়িত্বও বণ্টন হইত। তুমি জানো না, আমার দাদিটা ব্যাপক বদ ছিল। উনারেই ভয় পাইতাম। আর কাউরে না। আসলে আর কেউ ছিল না।
বৃষ্টি আরও ঘন হচ্ছে।
গত দুই দিন থেকে টেবিলের ওপর আমার একটা চিঠি পড়ে আছে খামের ভেতর। এখন তো আর খামে ভরে চিঠি আসে না। আমার আসছে। এই চিঠির প্রেরক যিনি, তিনি ইমেইলে তার সব যোগাযোগ করেন শুধু আমাকেই খামে ভরে চিঠি পোস্ট করেন। ডাক পিয়ন সেই চিঠি বয়ে নিয়ে আসে সেগুন বাগিচার ঠিকানায়, এইটা এক সময় তার ঠিকানাও ছিল। গত ১০ বছরে আসা এই ৮ নম্বর চিঠিটা আমার পড়তে ইচ্ছা করতেসিল না। আমার বরং চিঠিটার দিকে তাকায়া তাকায়া নানান সম্পর্ক ভিজ্যুয়ালাইজ করতে ভাল্লাগসে গত দুই দিন। গতকাল সন্ধ্যায় আমি বারান্দায় বসে যখন টেবিলে পড়ে থাকা চিঠির দিকে নিয়মিত দৃষ্টিতে তাকালাম, আমার ভেতরে দৃশ্যমানতা তৈরি হতে থাকল: মেঘের সঙ্গে শব্দ তরঙ্গ, সূর্যের আলোর সঙ্গে গাছের পাতা, হাসপাতালের সাথে রোগহীন মানুষের সম্পর্ক…এরকম সরল রৈখিক, বক্র রৈখিক নানা কিছু। জার্মানির কোলন শহর থেকে চিঠিটা আসছে। সায়রা সুলতানা নিপা ওরফে আমার মা লিখেছেন,ডিএএড-ড্যাড স্কলারশিপের জন্য এ্যাপলাই করো। গুগল সার্চ দিলেই রিকয়্যারমেন্টস জানতে পারবা। তোমাদের বাপি কখনোই তোমাদের ব্যাপারে সিরিয়াস না, যেমনটা আমার ব্যাপারেও সে ছিল না। কিন্তু তুমি আর দীপ্ত যে কোন একজন দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নাও, ইমিডিয়েটলি।
ঘনতর হতে থাকা বৃষ্টির শব্দ, সাটার নামানো বন্ধ দোকানের ভেতর একের পর এক লিক্যুইড কেমিক্যালের ড্রাম সরানোর শব্দের মতো মনে হতে থাকলো। হোয়াট দ্য ফাঁক! সেকি, চিটচিটে পুরা চিঠির মধ্যে মি অর দীপ্ত; আমার সাড়ে ৩ বছরের ছোট ভাই দীপ্ত অথবা আমি, আমাদের যে কোন একজনকে দেশ ছাড়তে হবে। অ্য শিট!
আম্মুর চিঠি এই রকম। ৩ সাড়ে ৩ লাইনের চিঠি। আমার খোঁজ খবর এক লাইন। বাপিকে বকাঝকা করা এক লাইন আর উপদেশ দেয়া শেষ লাইন, এই। আমার চিঠিতে দীপ্তকে টানে না বা দীপ্তর চিঠিতে আমাকে নিয়ে কিছু লেখে না। একদম পরিষ্কার আলাদা চিঠি লেখে।
দীপ্তর বয়স যখন ৯ আর আমি সাড়ে ১২, তখন আমাদের দুই জনকে এই বাসায় দাদীর কাছে রেখে আমাদের মা এবং বাবা দুজনই এই বাসাটা ছেড়ে চলে গেলেন। আমাদের এটা বোঝায়, সেটা বোঝায়-আমরা তো তেমন কিছু বুঝি না, কিন্তু একটা গোলমাল বুঝি। এরকম বছর খানেকের মাথায় জানতে পারলাম বাবা চলে গ্যাছে তার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার উপাসি গ্রামে আর মা চলে গ্যাছে জার্মানি নামক এক দেশে। আমাদের অভিভাবক আমাদের দাদি। দাদি আমাদের স্কুল নিয়া যায়, নিয়া আসে। টিফিন বানায়া দেয়,মোজা খুলে দেয়। নিজের হাতে খাওয়ায় আর এটা করতে না করে, সেটা করতে না করে। সিঁড়ির বর্ডার রেলিং ঝুলে পিছলা খেয়ে নিচে নামা-আসা ছিল আমার আর দীপ্তর আরেক প্রিয় খেলা, সেই খেলা খেলতে যতবার রেলিংয়ে চড়ি, সেটা ভর দুপুর অথবা ইলেক্ট্রিসিটি বিহীন সন্ধ্যা, দাদীর চোখ ঠিকই বের করে নেয় আমাদের আর শাসনের ভঙ্গিতে কী কী সব শব্দ উচ্চারণ করতো। আমরা দৌড়ে ছাদের ওপর নানা সবজি গাছের পাতা-ডাল ঢাকা কোনায় লুকায়া থাকতাম। এমন ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকতে হতো, আমরা আমাদের গায়ের গন্ধ পেতাম।
মাকড়শার জালের মতো আটকায়া থাকা আঠালো রোদে পুড়তে পুড়তে বাসার পেছন দিকের লেকটা পার হয়ে চিটগং রেস্টুরেন্ট ফেলে নতুন তৈরি হতে থাকা একটা বিল্ডিংয়ে ভেতরে দৌড়াদৌড়ি, হাসাহাসি খেলা খেলতে খেলতে একবার রক্তাক্ত হয়ে পড়সিলাম। আমাদের দুই জনের হাতেই ছিল পাতলা কাঠ আর তার ভেতর অনেকগুলা সুচালো অংশ বের হয়ে থাকা পেরেগ। সেই কাঠ দিয়া খেলতে খেলতে পেরেগ যে এইরকম রক্তাক্ত করে ফেলবে! আমার পিঠ ভিজে গিয়েছিল আর দীপ্তর হাতের কয়েক জায়গা থেকে রক্ত গড়াতে থাকলো। তখন আমাদের দাদী কী করে যেন বুঝে ফেলসিলো, আমরা এখানেই এবং কী করে যেন এটাও বুঝেছিল যে আমরা নিজেরা আমাদের উদ্ধার করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলসি। যাই হোক, দাদী এসে আমাদের উদ্ধার করে ডাক্তার, হাসপাতাল করে বাসায় নিয়ে আসে, কিন্তু একই সাথে যেই খারাপ কাজটা করে, সেটা হল: দীপ্ত আর আমি কোন এক কারণে দুই দুইজনকে সহ্য করতে পারি না—এই কথা ছড়ায়া দেয়। এতে যেটা হয়, প্রথমবারের মতো আমাকে আর দীপ্তকে আলাদা করার উদ্যোগ নেয়া হয়। ঠিক করা হয়, দীপ্ত চলে যাবে লালমাটিয়ায় বড় ফুপির বাসায়। সেখান থেকে তাকে ক্যাডেট স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য প্রস্তুত করা হবে। সেই সিদ্ধান্তে প্রথম আর তা বাস্তবায়িত হওয়ার পর গভীর ভাবে মনে হৈতে থাকে, দুনিয়াতে সবাই পৃথক পৃথক গ্যাপ নিয়ে বসবাস করতে ভালোবাসে।
এক দুপুরে, এরকম বৃষ্টিতে ভিজে বাপি আসলো। সেটা অনেক বছর পর। অনেক বছর দেখা হলে করনীয় কী হতে পারে—আমি সেই ভাবনার ভেতরেই ঢুকতে পারি নাই। বেগুনীর রঙের পাঞ্জাবি পরা আহমেদ মুনীম ওরফে বাপির ফর্সা মুখে একটা অ্যাঞ্জেল টাইপ হাসি ঝুলে থাকার স্মৃতি মনে আছে। আমি তখন রুমের ভেতর চিট হয়ে শুয়ে আছি, মরা টিকটিকির মতো। কোন কিছুই করতে ইচ্ছা না করার ভঙ্গী আমার পুরা শরীরে। কেবল দীপ্তর সাথে লুকায়ে দেখা করা ছাড়া পৃথিবীর কোন রং, রস, সুধা আমারে টানানে না। আমার ডান দিকে এলোমেলো বই, গাঢ় রঙের অনেকগুলা পেন্সিল, রাফ স্কেচ পেপার…। বাম দিকে কয়েকদিনের ব্যবহৃত জামা কাপড়ের স্তুপ, হোয়াইট বোর্ডে ভারতের উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদে কুম্ভ মেলায় যাওয়ার রুট ডিরেকশন আঁকা। বাপিকে দেখে একদমই উঠতে ইচ্ছা করলো না। আমার কোন নড়ন চড়ন নাই। কেবল হাসি বিনিময় করলাম। বাপি ফ্লোরে, আমার কোমর ঘেঁষে বসলো। আমি খেয়াল করতে থাকলাম তার চোখ। আমার শরীরের চাইতে চোখের তীক্ষ্ণতা প্রখর হয়ে উঠেছিল তখন। ফ্লোরের চারপাশে ছড়ানো ছিটানো সবগুলা উপকরণে তার চোখ লম্বা পজ দিয়ে পর্যবেক্ষণ শেষ করে আমার চোখে এসে স্থির হল। এরপর আমার চোখে অনুভূতি চিকচিক করে উঠলে, আমরা চোখে চোখ রেখেই কথা বলতে থাকলাম। শব্দ উচ্চারণ ছাড়া। বাপি বলল, উপাসী গ্রামের পাশে নদী আর সেই নদীর ওপর বয়ে চলা বাতাস অনেক মিহি।
আমি বললাম, আমার তো ধোঁয়াই ভাল্লাগে।
বাপী বলল, চল, তোকে সমুদ্র দেখায়া নিয়ে আসি।
আমি বললাম, আমি বরং তোমাকে গোলাপি গ্রহে নিয়ে যেতে চাই। মঙ্গল গ্রহের রং কিন্তু গোলাপি। আমরা উচ্চারণহীন কথা বিনিময় করতে করতে উচ্চারণ করলাম, একটা শব্দই—চলো। আমি উঠে বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে জামা কাপড় পরতে পরতে দাদীর গালাগালির শব্দ পাচ্ছিলাম। ডাইনিং রুমে খাবার রেডি করতে করতে আমার নাম ধরে অনেক বকাবকি করছিল। আমরা বাসায় না খেয়ে বের হয়ে পড়লাম। এবং ঘুরতে ঘুরতে বড় ফুপীর বাসায় গেলাম। দীপ্ত তখন সেই বাসা ছেড়ে বন্ধুদের সাথে আলাদা বাসা নিয়ে থাকা শুরু করে।
দীপ্তর সাথে আমার সম্পর্ক চামচে মাপা না। চামচে মাপা জীবন তো প্রুফকের। টু সাম এক্সটেন্ড জীবন বাবুর। টু সাম এক্সটেন্ড ফ্রিদা কাহ্লো, মেক্সিকান পেইন্টার; যে তার বয়সী প্রেমিকের সাবেক স্ত্রীর সাথে জীবনকে চামচ দিয়ে মেপেছিল। কিন্তু আমার চামচ ভাল্লাগে। চামচে যেমন ভগ্নাংশ আছে, তেমনি আছে পূর্ণতা। পূর্ণ মাত্রা। চামচে যখন গুড়া গুড়া বস্তু উঠে আসে, তখন তা একটা পূর্ণতা পায়, শুরুতে তা ভগ্নাংশ মনে হলেও। ছোটবেলা থেকেই আমার রাস্তার পাশে ডাস্টবিন, ডাস্টবিনের চারপাশে ছড়ায়া ছিটায়া থাকা ফেলে দেয়া খাবার আর কাক আমার খুব প্রিয়। ডাস্টবিনের গন্ধ আমাকে একটুও উত্যক্ত করে না। দীপ্তকে আমার উচ্ছিষ্ট খাবারের ভাগাড় আর সেই ভাগাড়ের দিকে তীব্র আকর্ষণে ছুটে চলা কাক মনে হয় নিজেকে।
ও না আমারে কখনোই আপু বা আপুনি ইত্যাদি সম্বোধন করতো না। বা করে নাই। ও ক্যাডেট কলেজ থেকে হায়ার সেকেন্ডারি কমপ্লিট করেছে ঠিকই সবার কথা মতো, এরপর নিজের ইচ্ছামতো পড়াশুনা নামক কোস্টারে চড়ে নাই। আমি অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করসি। ওর যা কিছু ভাল্লাগতো, তার অভিজ্ঞতা আমার সাথে শেয়ার করার এক ধরণের কাস্টমস তৈরি হয়ে গেসিল। যেমন: সাউন্ড রেকর্ডিং। সাউন্ড মানে শব্দ রেকর্ড করা তার প্যাশন। সে হালকা শব্দও স্পষ্ট টের পায়। তার কান সেইরকম! ওপেন সোর্স সাউন্ড রেকর্ডিংয়ের একটা বিশেষ যন্ত্র আছে তার, এটা নিয়ে সে নানা জায়গায়, বিশেষ করে শহরের বাইরে কোন আখড়ায় চলে যেতে পছন্দ করে এবং অডিও রেকর্ড করে। মাঝে মাঝেই সে আমাকে নিয়ে যায়। আমরা একবার তেতুলিয়া বাজারে গেসিলাম, তেতুলিয়া মানে বাংলাদেশের উত্তর দিকের শেষ শহর। যেতে যেতে সে বলতেসিল, তার খুব সাধ একটা অডিও ডকুমেন্টারি বানানোর। এইসব ঘোরাঘুরির ইচ্ছা কাজের মধ্যে মাঝে মাঝে সে নিয়মিত অবসর নেয়। এইটা ঠিক অবসর না, তখন সে অডিও সম্পাদনা করতে থাকে। সেই সময় আমি তার রূপনগরের বাসায় গিয়া চুপচাপ বসে বসে কাজ দেখতে থাকি আর পাঁচ তলা বিল্ডিংয়ের সামনের খোলা লেকে সোডিয়াম বাতির আলোয় পানির তরঙ্গে গোপন সংলাপ করি। অসম্ভব আর সম্ভবের সম্পর্ক ভিজ্যুয়ালাইজ করতে ক্যামন যেন শান্তি শান্তি অনুভব করি।
আমরা ব্যক্তিগত আলাপ খুব একটা দেই না, কারণ প্রয়োজন পড়ে না। শব্দ উচ্চারণ ছাড়াই অনেক কিছু যে বুঝে ফেলি, সেটা তাকানো বিনিময়ে চুড়ান্ত হয়ে যায়। এই কিছুদিন আগের এক সন্ধ্যায়, আমরা দাদীর রুমের পাশের বারান্দায় বসে সূর্যাস্ত দেখছিলাম। আমি পা মেলে বসেছিলাম আর দীপ্ত হাঁটু ভাঁজ করে। আমাকে বলল, মায়া, চল তুই আমি এক সাথে থাকা শুরু করি।
দীপ্তর বলার বাচন ঢঙের মধ্যে ছিল একটা স্বাভাবিকতার টোন, কিন্তু চোখের ভেতর সংকোচ।আমি অবাক হই, এরকম ভাবনা তো আমারও, আমরা একই ভাবনা দুইজনেই ভেবে যাচ্ছি। কতবার যে নিজেরে কতভাবে এই প্রশ্নের মধ্যে আনছি! আমরা তো একসাথে এক ছাদের তলায়, আকাক্সিক্ষত, অরক্ত সম্পর্কীয় নারী-পুরুষের মতো থাকতেই পারি। দাদীর সাথে আমার একলা যাপিত জীবনে- দীপ্ত, আমার সাড়ে ৩ বছরের ছোট দীপ্তকে লালমাটিয়ার ফুপির বাসা থেকে বাইর করে এনে যখন দ্যাখা করতাম, তখনই আমি জানতাম। আমি অনেকবার ভাবছি আমার এই অনুভূতিকে আমি কী বলবো! কী তার ব্যাখ্যা! আমি ব্যাখ্যা জানতাম না কিন্তু অনুভূতিটা চিনতাম, চিনি। আমি কোন উত্তর দিলাম না, একই রকম ভাবনা ভাবার আনন্দে বলা যায় একটা লাল ফড়িংয়ের মতো তখন দীপ্তর চুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমি উড়ে বেড়াচ্ছি। দীপ্তর অনুসন্ধিৎসু ছোট হয়ে আসা চোখ, তীব্রভাবে আমার বাম চোয়াল বরাবর নিক্ষিপ্ত হওয়ার তীব্রতা টের পাচ্ছিলাম।
আমি মনে মনে একটা জার্নি দিতে থাকলাম। আমাদের পৃথক বাসের পর আমরা যেরকম স্কুল বয়স থেকে লুকায়া দেখা করতাম, আমরা যেমন উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করতাম, আমরা দুইজন ছাড়া আমাদের যেমন কোন ঠিকানা নাই বলে মনে করতাম, আমরা যেমন পৃথক হইতে হইতে এক বিন্দুতে এসে মিলতাম, শরীরের ঘাম দিয়ে সংলাপ করতাম-আমি ভাবতে থাকলাম দাদীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আমাদের একেকটা একান্ত আয়োজন। কখনো দার্জিলিং, কখনো শিলং, কখনো শ্রীমঙ্গল, কখনো রাঙ্গামাটির কর্ণফুলী নদী ছুঁয়ে খিয়াং পাড়ায়। দীপ্তর প্রস্তাবে শরীর প্রায় অবশ হয়ে যাইতেসিল। আমি সন্ধ্যার পরের কমলা রঙের মেঘের দিকে চোখ টেনে ধরে রেখেছিলাম এবং দাদি ডাকার পর রুমে চলে যাই।
বৃষ্টি কমে যাইতে যাইতে আবার ঝাঁকি দিয়া বাড়তেসে। রাতও বাড়তেসে। আমার বারান্দা জুড়ে ছোট ছোট প্রায় সবুজ রঙের অনেক ব্যাঙের উল্লাস; যেন ঝাঁপি খুলে বেরিয়ে পড়েছে নিজস্ব মুক্তাঞ্চলে। এই রাত্তিরে আমি আমার জননীকে কী উত্তর দিতে পারি! এই বৃষ্টি চিহ্নিত রাত্তিরে আমি আমার দূরবাসী জননীকে বলতে পারি, পৃথিবীটা কমলা লেবুর মতো গোল। তুমিও কমলা, আমিও ব্যাসার্ধ-সহই আস্ত কমলা।
(ঋত্বিক ঘটকের সুবর্ণরেখার সহিত ইহার কোন সম্পর্ক নাই। নামটা দেয়ার পর মনে হইয়াসে ঋত্বিক ঘটকের কথা, ততক্ষণে আর ফিরিবার উপায় নাই। সেলাম গুরুজী।)
![]()
1 Comment
Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.
Drako Shajib
অসাধারণ একটা গল্প!
এই গল্পে কিছু বিশেষ চমক আছে যা না পড়লে ঠিক ধরা যাবে না। বিশেষ করে, চামচের ব্যাপারটা খুব ভালো লাগলো! হঠাৎ করেই যেন মনে হল, আমাদের এই মেপে চলা, মেপে কথা বলাটা আসলে ঐ গুণে গুণে ঔষধ খাওয়া থেকেই এসেছে!