শিল্পী স্মরণে

এবারের প্রচ্ছদ-চিত্র অকাল-প্রয়াত শিল্পী ‘সোলায়মান কবীর ঋষি’র আঁকা। তুলটের এবারের সংখ্যাটি এই মহান শিল্পীর স্মৃতির প্রতি নিবেদিত হলো; সেইসাথে তাকে নিয়ে তিনজন লেখকের স্মৃতিকথা প্রকাশ করা হলো। শিল্পীর অনুপস্থিতিতে শিল্প চির-জাগরুক থাকুক।

তার অসংকোচ ছিল তুলনাহীন। প্রিয় ঋষি

কাজী মৃণাল


প্রিয় ঋষি…
নিরাময়কেন্দ্র ( সবাই জানে কি) থেকে বেরোনোর দুদিন পরই ঋষি মৃত্যুবরণ করে।
সে নিজে এবং অন্যরা নিরাময়কেন্দ্রের জানালা ভেঙ্গে
বেরিয়ে এসেছিল দেয়াল টপকে।
বলেছিল আমাকে নিজেই।
তার স্বাস্থ্য ছিল ভঙ্গুর এবং কৃশকায়।
সে ভেঙ্গে পড়েছিল।
বলত, ওকে বন্দী করা হয়েছিল।
সে জোরে নিশ্বাস নিত।
অনেকদিন নেয়নি।
সে মুক্তির কথাই বলছিল।
আমি শুনেছি এই আর্তি অনেক বার।
পরে মৃত্যু তাকে আর্তিমুক্ত করে।
সে অনেক বেশী শিল্পী ছিল।
ও বেশ কিছুদিন আমেরিকাতেও ছিল।
সেটা সুখকর ছিল না।
আমেরিকার ৯/১১ ওকে ওখানে থাকবার বিপর্যস্ততা তৈরি করে।
সে নিজ দেশে ফিরে এলো।
তার মেধা ছিল।
শিখেছিল অনেক কিছু।
অনেক কথা শুনেছি; ও গল্প করত।
বলেছিল আমেরিকায় রাস্তায় বসে ছবি আঁকত।
আর্থিক অবস্থা ছিল দুর্বল।
৯০-২০০০ এর দিকে সে নিজ ধর্মীয় বিধির প্রতি আকৃষ্ট হয়।
এই মনোভাব তার আমেরিকা বসবাসে শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দেশে ফেরত আসার সময়টা ছিল এটাই।
সে আর্ট কলেজের ছাত্র ছিল।

শুরুতে বলেছিল “আমেরিকায় যাবো” এই মনোভাব নিয়ে সে আমেরিকা প্রবাসী হয়।
কিন্তু সে ফিরে এসে বলেছিল নিজ দেশে সে মুক্তির নিশ্বাস নিচ্ছে।
মূলত: আমেরিকাতেও সে বন্দি হয়ে পড়েছিল।
গাড়ী-বাড়ির কথা বলছিল সে।
পারতো।
কিন্তু ওটা তার ভাল লাগেনি।
সে পুরো শিল্পে ঝুঁকে পড়ে।
এতে সম্মান পেয়েছিল সে।
অল্প আয় হতো এতে।
তার নারীসঙ্গ ছিল।
কিন্তু সম্পর্কে অবনতি ঘটে।
সে নিজেই বলেছিল।
ছবি আঁকাও হয়ে উঠেছিল দুর্বোধ্য এবং বর্ণনাতীত।
এতে জটিলতা তৈরি হয়।
নারীসঙ্গ ভেঙ্গে পড়ে।
সে ট্যাক্সিও চালাতো মাঝেমধ্যে।
এতে আয় ভালো।
কিন্তু ও দোটানায় ছিল।
ছবি আঁকা সে ধ্যান-সম করে তুলেছিল।
সৃষ্টিশীল শিল্পীর রূপ নেয় তার আচার আচরণ ও কর্মকাণ্ড।
দেশে দীর্ঘদিন না থাকার কারণে তার কিছু আচরণগত সমস্যাও হচ্ছিল।
সে মুক্ত মনের ছিল।
ছবি আঁকা-কে সে শ্রমকর্মের রূপ দিয়েছিল।
সে ছবি আঁকায় নিমগ্ন হয়ে যেত।
তার অসংকোচ ছিল তুলনাহীন।


গুডবাই মায়েস্ত্রো ঋষি ভাই

মনজুরুল আহসান ওলী

ঋষি ভাই আমার মায়েস্ত্রো আছিলেন। আদর করতেন কিন্তু গায়ে পড়তেন না। সবসময় প্র্যাকটিক্যাল বুদ্ধি দিতেন। মাঝেমাঝে ঝগড়াও করতেন কিন্তু সেইসব ঝগড়া বাধাইতাম মূলত আমিই। উদ্ভট সব কথা বলতেন হিরোইন খাওয়ার পরে। তখনকার দিনে সেগুলি আরো বেশি উদ্ভট লাগতো, আগামাথা পাইতাম না, মধ্যেমধ্যে বোরিং লাগতো। তবু শুনতাম। কারণ ছিল উনার আঁকা ছবিগুলি এবং উনার ক্যারিশম্যাটিক আর্টিস্টগিরি (এক্সপ্রেশন আর লাইফস্টাইলের কথা বলতেছি), দুইটাই।

আই ওয়াজ আ বিগ ফ্যান অব হিম।

কয়েকটা ছবি তো আমি কখনোই ভুলব না। একটার নাম হইলো ‘ইন দ্য গার্ডেন’। প্রচুর অন্ধকারাচ্ছন্ন অথচ কেমন অত্যন্ত সুখী-সুখী একটা ছবি। কয়েকটা পোর্ট্রেইট ছিল ঐটাতে, কিশোর কিশোরীদের মুখের মত দেখতে। যেন বাগানের অন্ধকারে, সন্ধ্যার পরে-পরে খেলাশেষে ওদের সন্তুষ্ট মরমী মুখগুলি ফুটে আছে।

আরেকটা ছবি, ঐটার নাম ফিয়ার অব নাথিংনেস বা এই-টাইপের কিছু। বেশ ভয়-ভয় লাগতেছিল ছবিটা প্রথমবার দেখার পর। নাথিংনেসের ধারালো আতঙ্ক সেইটা, এক্সিসটেনশিয়াল।

তো আমরা মাঝেমাঝে একসাথে একজিবিশন দেখতে যাইতাম কারো। ভুংভাং ছবি আমি সহ্য করতে পারতাম না। কিন্তু ঋষি ভাই যেকোনো ছবির সামনে দাঁড়াইতে পারতেন। দাঁড়ায়ে, থাকতে পারতেন। আমি উনাকে বলতাম এইসব বালের ছবি আপনি দাঁড়ায়ে দেখতেছেন, কী বাল দেখতেছেন এইসব বালের ছবি ?

উনি হাসতে-হাসতে আমারে বুঝানোর চেষ্টা করতেন, যে, যে কোনোকিছুই দেখা যায়। নকল ছবি, ললিপপ ছবি, এক্সট্রিমলি লো-কোয়ালিটি আইক্যান্ডি, মূর্খ ছবি, জ্ঞানের জঞ্জালে ভর্তি ছবি। সব ছবি। যেকোনো ছবি।

যেকোনো চিত্রকর্ম দেখলেই কিছু ব্যাপার রিয়েলাইজ করা যায়। সেইসব ব্যাপার হয়তো আর্টের জগতের না। সামাজিক বা রাজনৈতিক বা নৈতিক বা অন্য কোনো জগতের। কিন্তু এই জীবজগতের তো বটে।

তো সেই লোক, সমাজ-প্রদত্ত নাম নাকি একসময় ‘লিটন’ ছিলো, পরে নিজে দিছিলেন ‘ঋষি’; এই জীবজগত হইতে সেই আর্টিস্ট নিষ্ক্রান্ত হইছেন।

উনার নিউইয়র্ক-ইয়ার্সের এক গার্লফ্রেন্ডরে খুব মিস করতেন দেখতাম। তার সেই এক্স-গার্লফ্রেন্ড এই খবর পাইছেন বা পাবেন কিনা আল্লাই জানে।

গুডবাই মায়েস্ত্রো। গুডবাই।

দুটা প্রকাশনার প্রচ্ছদ নিই ঋষি ভায়ের কাছ থেকে

রাদ আহমদ

ঋষি ভাইয়ের সাথে প্রথম পরিচয় হয়, যতদূর মনে আছে, আমাদের ফ্লুটিস্ট শিল্পী-বন্ধু যুবায়ের মালিকের মাধ্যমে। যুবায়ের মাঝেমধ্যে ঢাকা ভার্সিটি ক্যাম্পাসে আসত। আর নজরুলের মাজার থেকে শাহবাগের দিকে যেতে যেতে, চারুকলার সামনে, কিছুটা যাদুঘরের দিক ঘেঁষে, ঋষি ভাইকে মাঝেমধ্যেই দেখা যেত চারুকলার দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন। সাথে আঁকাআঁকির নানা সরঞ্জাম, একটা হ্যাভারস্যাক ধরণের ব্যাগ (যতদূর মনে পড়ে), স্মার্ট কিন্তু অসম্ভব ভদ্র আর বিনয়ী কথাবার্তা , আর চোখে মুখে একটা বুদ্ধিদীপ্ত হাসি।

ফলে গল্প জমানো খুব সহজ হয়ে উঠত। সাম্প্রতিক যেকোনো প্রসঙ্গ তুলেই উনার সাথে গল্প জমানো যেত, আর কিছু দিনের মধ্যেই বন্ধুত্বপূর্ণ, আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে উনার সাথে। উনার সাথে থাকা খাতায় সবচেয়ে নতুন আঁকাগুলি দেখতে পেতাম। উনি নিজেই দেখাতেন। বল পয়েন্টে কাগজের উপর প্রচুর সামঞ্জস্যপূর্ণ টানের মাধ্যমে ধীরে ধীরে মূর্ত হয়ে ওঠা একেকটা ছবি। ঐ সময়গুলিতে উনি এরকমের স্কেচ-ই বেশি আঁকতেন।

ঐ সময়ের বেশ কয়মাস আগে উনি নিউ ইয়র্ক থেকে ফিরে আসেন। নিউ ইয়র্কের গল্প করতেন। রাস্তায় অসে ছবি আঁকতেন। মিউনিসিপালিটির খপ্পরে পড়ে একদা এক জাজের কোর্টেও উপস্থিত হয়েছিলেন। আবার সেইরকম একটা প্রেস্টিজিয়াস ভেন্যুতে একাধিক শিল্পীদের আঁকা-আঁকি নিয়ে করা একটা যৌথ ‘শো’-তে উনার অংশগ্রহণ ছিল। উনার সেই বিদেশী বান্ধবীর কথা বলতেন , যেই সম্পর্ক পরে আর সম্ভবত ক্যারি-অন করে নিয়ে যাওয়া হয় নাই। ঐ সময়টাতে উনার বেশ কিছু কালারফুল এক্রিলিক কাজ দেখতে পাওয়া যায়। যেগুলি আসলেই খুব সুন্দর। সম্ভবত ছবিগুলি উনি দেশে নিয়ে আসতে পারেন নাই (আমি ঠিক শিওর না) – তবে সেগুলির কয়েকটি ছবির ডিজিটাল ইমেজ সংরক্ষিত ছিল উনার কাছে রাখা একটা সিডি তে।

সিডি টা উনি প্রায়-ই আমি বা অন্য আরও কাওকে কাওকে দিতেন, যেন ছবিগুলি উদ্ধার করে অনলাইনে সংরক্ষণ করা যায়। তখন ফেইসবুক নতুন এসেছে বলা যায়। একটা ছোটো পেইজের মতো করে আমি নিজে ওখান থেকে কিছু কিছু ছবি আপলোড করে রাখি। তখনও জানতাম না ঋষি ভাই এত দ্রুত হঠাৎ করে মারা যাবেন।

চিকন এক-হারা শরীর, থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরা, মাথায় কাঁচাপাকা লম্বা চুল ঝুঁটি করে পিছে বেঁধে রাখা, ঋষি ভাইয়ের এই চেহারা ছিল ইউনিক। যে কেউ দেখলেই দূর থেকে চিনতে পারতেন। একদিন জিজ্ঞাসা করি উনার আঁকাআঁকির ফিলোসফি নিয়ে। ঠিক সেই সময়টাতে উনি কি যেন একটা ব্যাখ্যা করেন, যেটা আমি আর্ট একাডেমিশিয়ান না বলে পুরাটা বুঝতে পারি নি। তবে, যতদূর মনে আছে, উনি এক ধরণের আধ্যাত্মিকতার সাথে এলিয়েন (ভিনগ্রহবাসী, কাল্পনিক) সম্প্রদায়ের মিশেলে কিছু একটা কাজ করছিলেন। অনেকে হয়ত এই ‘এলিয়েন’ শুনে হাসবেন, কিন্তু আমার জানা মতে, ইউরোপ আমেরিকায় শিল্প, সাহিত্য আর্টে এলিয়েন বা ভিনগ্রহবাসী নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার একটা সুযোগ বা ধারা ইদানীং, বা ঐ সময় সুপ্রতিষ্ঠিত আছে বা ছিল।

ঋষি ভাই চলনে ছিলেন নন-ট্রেডিশনাল। একজন শিল্পী কতটুকুই বা আর সামাজিক জীবন যাপন করতে পারেন? প্রায় সারাদিনই হয়ত চারুকলার সামনে , ছবির হাটে উনাকে দেখা যেত; ভুতের গলির ঐদিকে ছিল বাসা (সম্ভবত)। সেই সময়টাতে খুব চমৎকার নানা ক্রিয়েটিভ মানুষদের আনাগোনায় মুখরিত থাকত ছবির হাট বা সোহরাওয়ার্দি উদ্যান। অথচ ঋষি ভাইয়ের এই উন্মুক্ত জীবন-যাপন শিল্পী হিসাবে উনার দায়িত্ব কর্তব্য ভুলিয়ে দেন নাই। আগেই বলছিলাম, উনার সাথে কিছু ড্রইং করার সরঞ্জাম থাকত। আর যেসব মুহূর্তে কোনো সঙ্গী সাথী নাই, সেই সময়গুলিতে উনি স্কেচ করতে থাকতেন।

আবার, আরেকদিন, এর সাথে সাথে বেশ কয় মাস পরে দেখি, উনি ঢাকা শহরে একটা একক ‘শো’ এর আয়োজন করেছেন। তেজগাঁ লিংক রোডে নতুন গড়ে ওঠা একটা স্টুডিও-তে বেশ বড়ো একটা ফ্লোরে উনার সেই শো-এর আয়োজন করা হয়। শো-টা ছিল কালো কালিতে আঁকা নানারকমের স্কেচে সমৃদ্ধ। দেশীয় নৌকা, সাথে অন্ধকার, এই ধরণের ছবিগুলি সবচেয়ে বেশি প্রোজেক্ট করছিলেন ঐ শো তে। উনার কাছ থেকে আহবান পেয়ে আমি নিজেও এক সন্ধ্যায় ঘুরে এসেছিলাম।

ঋষি ভাইয়ের ছবি , দর্শন, চিন্তা আমার ভালো লাগত। আর তাই দুই দুই বার আমি উনার ছবি উনার পারমিশন নিয়ে ব্যবহার করি। একবার আমাদের প্রকাশিত ‘বৈঠকখানা’ সাহিত্য পত্রিকার কভারে (সম্ভবত ২০১১ কি ১২ সালের দিকে)। আর আরেকবার আমার নিজের একটা বইয়ের কভারে। “মিষ্টি বসন্তদিনে আমি অলৌকিক” (প্রকাশক, বাঙলায়ন) – সেই বইয়ের কভারে আমি ব্যবহার করি উনার আরেকটা স্কেচ।

উনার চলে যাবার সংবাদ ছিল অকস্মাৎ। যেদিন শুনতে পাই সেদিন বিশ্বাস করাটা কঠিন হয়ে ওঠে। এমন জলজ্যান্ত মানুষ এমন ভাবে চলে যাবেন। আরও অনেক কাজ , অনেক কিছু পাওয়ার ছিল উনার কাছ থেকে। যেখানেই থাকুন, শান্তিতে থাকুন ঋষি ভাই। এই কামনা , প্রার্থনা করি।

Loading

Leave a Reply

Skip to toolbar