শিরোনামহীন

শিরোনামহীন । পেন অন পেপার । এপ্রিল ২০২৪

আমার কথা

অনেকেই বাক্য ও শব্দের বেড়াজালে চিত্রকলাকে দূর্বোধ্য করে তোলেন। যা থেকে বিরত থাকতে চাই। সহজ দৃষ্টিভঙ্গিতে আঁকা আমার স্কেচগুলা অনেকটা দৈনন্দিন কাজের মতো। আমি সুন্দর , সহজ, পরিচ্ছন্ন, দৃষ্টিশোভন চিত্রকলায় বিশ্বাস করি, যদিও সর্বাংশে তা রক্ষিত হয়নি । এটা আমার একটা ত্রুটি। চিত্র প্রদর্শনীর শিরোনাম “রূপ অরূপ অপরূপ” -এ হয়ত এই দিকটা কিছু এসেছে, গ্যালারি কর্তৃপক্ষকে কৃতজ্ঞতা। সবাইকে শুভেচ্ছা।

– কাজী মৃণাল


[শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতে “রূপ অরূপ অপরূপ” শিরোনামে শিল্পী কাজী মৃণালের একক চিত্র প্রদর্শনীর (৫ – ১৫ মে, ২০১৮) ব্রোশিওর থেকে উপরের লেখাটি নেওয়া।]

দেহ, সন্দেহ ও ‘সহজ’ সমীকরণ

কাজী মৃণাল আদ্যোপান্ত শিল্পী – অর্থাৎ তিনি সৃষ্টিশীলতা ভিন্ন অপর কোন কর্মে কখনো নিয়োজিত হন নাই। তবু জীবন এক-রৈখিক নয়, শিল্পী নানান চড়াই-উতড়াই পেছনে ফেলে আজ প্রথম প্রদর্শনী আয়োজন করেছেন। চিত্র রচনার বাসনা, বিদ্যার্জন ও প্রচলিত বিদ্যা ত্যাগ করে ভিন্ন পথ খোঁজার মধ্যে তিনি তার জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছেন। সমাজ-মানুষ-শিল্প এমন ত্রিমাতৃক তত্ত্বের সূত্রে বড় হয়ে ওঠা আমাদের আশির দশকের চারুকলার এই ছাত্র, পরবর্তী সময়ে উৎসাহী হয়ে উঠেছেন প্রকৃতি-মানুষ-শিল্পের সমীকরণে। ক্রমে এই আপাত সহজিয়া জ্ঞানজাত সমীকরণ আরও সহজতর অবয়ব বা দেহ-নির্ভর হয়ে উঠেছে। এক পর্যায়ে নর-নারীর চেয়ে শিশুর শরীর গাছ-গাছালির মাঝে স্থাপন করে তিনি প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্কের সুরাহা করতে প্রয়াস পেয়েছেন। এই প্রদর্শনী শিল্পীর শিল্পভাষার বিবর্তনের সাক্ষ্য ।

সব রকমের সম্পর্কই অধরা, এর কোন ধরাবাধা রিপ্রেজেন্টেশন বা ‘আকারিকরণ’ সম্ভব নয় । একারণেই শিল্পী মৃণালের হাতে নর-নারী, শিশু-মাতা, গাছ-শিশু ইত্যাকার সহজ সম্পর্কগুলো এক প্রকার অপার্থিব বা অতুলনীয় রূপে হাজির হতে দেখি। তিনি রূপ-অরূপের বৈপরীত্য অনুসরণ করে শিল্প গড়েন নাই। এমন সরলীকৃত দার্শনিক ফ্রেম তিনি তার কাজে ব্যবহার করেন নাই। তিনি সহজ হয়েছেন যেহেতু বাস্তবতা, বাস্তবের রূঢ় বিষয়ের উপস্থাপনা, এমনকি শিল্পে নতুনত্ব তৈরির নামে যে আতিশয্য তা আগেভাগেই খারিজ করে দিতে পেরেছেন ।

আশির দশকের অনেক তারকা ছাত্র আজ আর্ট সিনে নেই । যিনি নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কলম-কালি-কাগজের ত্রিমাত্রিক ভবনের মধ্যে অনায়াসে সৃষ্টিশীলতার নানান উপায় বের করে টিকে আছেন তিনি কাজী মৃণাল, যিনি মৌলিকত্ব সন্ধানী । জীবন ও শিল্পের মাঝের দৃূরত্ব হটাতেও এই শিল্পী তৎপর | এই তৎপরতা তার দেহ-মন তাড়িত করে বিধায় উনি শিল্পভাষার আতিশয্য এড়িয়ে চলেন, আঙ্গিক ও বিষয়ের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকেন জীবন বিষয়ক স্বচ্ছ ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে ।

শিল্পের অঙ্গনের বহু অহেতু বিষয়ের প্রতি তাই তার সন্দেহ জন্মায় শিল্পী জীবনের শুরুতেই । খ্যাতি, শিল্পের কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন, এমনকি অতি চাউর হওয়া রূপ-কাঠামো থেকেও তিনি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়াস পেয়েছেন । আবার, সকল সফল বিদ্যা পায়ে ঠেলে “অলটারনেটিভ’ হবার যে বোহেমিয়ান খায়েশ তাও তার নেই।

নব্বই দশকের শুরুতে শিল্পী নকশী-কাঁথার নমুনা নির্ভর একটি পোষ্টার অঙ্কন করেছিলেন । এমন নান্দনিকতা অর্জনের লোভ অনেক সময় শিল্পীদের ঐতিহ্য সন্ধানী ও নকশামূখী করে তুলতে পারে । এমন সহজ পথে এই শিল্পী পা বাড়ান নাই। তিনি তার সহজিয়া তরিকা নির্ধারণ করেছেন প্রত্যক্ষ রূপকে রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে এবং গল্প বলায় আখ্যানধর্মীতা প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। শিল্পী তার প্রদর্শনীর শিরোনাম দিয়েছেন “রূপ অরূপ অপরূপ”, এই তিনের মাজেজা আমাদের জানা । হতে পারে “অপরূপ” হয়ে ওঠা আর রূপক নির্মাণ করা একার্থবাচক। রূপ যদি হয় উপস্থিতি আর অরূপ হয় অনুপস্থিতি তবে, অপরূপ নিশ্চিতভাবেই দুই-এর পরবর্তী নতুন কোন পরিসর । তৃতীয়ের মধ্যে হয়তো নতুনতর এক ‘উপস্থিতি’ হাজির হয়। নয়ন সম্মুখে যে সাম্প্রতিকতার চমক তার বিপরীতে যে কাল-নিরপেক্ষ বিমূর্ত দৃষ্টি, তারও পরে ‘সার’ সন্ধানী পর্ব, হয়তো কাজী মৃণাল এই “তৃতীয়ের’ অনুবর্তী হয়ে ছবি এঁকেছেন।

মোস্তফা জামান
শিল্পী ও সমালোচক

[শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতে “রূপ অরূপ অপরূপ” শিরোনামে শিল্পী কাজী মৃণালের একক চিত্র প্রদর্শনীর (৫-১৫ মে, ২০১৮) ব্রোশিওরের প্রস্তাবনা (ভূমিকা)অংশ থেকে উপরের লেখাটি নেওয়া হয়েছে]

Loading

Leave a Reply

Skip to toolbar