আবিদ আজাদের কবিতায় ছন্দ

আবিদ আজাদের কবিতায় ছন্দ

অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি নরহরি চক্রবর্তীর ভাষায়—

                                    “ছন্দ জ্ঞান বিনা কাব্য রচে যেই জন।
                               পন্ডিত সভায় সেই লজ্জার ভাজন ”

            কবিতার বাক্যকে রসাত্মক, ভাষাকে সুষমা্মন্ডিত ও শ্রুতিমধুর করার জন্য যে বিন্যাসরীতির বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়, তা-ই ছন্দের গতি ও স্থিতি এবং ঐক্য ও বৈচিত্র্য। পদবিন্যাসের যে পরিমিত ধ্বনির সুসমঞ্জস্য, সঙ্গীতমধুরতা, তা রবীন্দ্রনাথের হাতে তার পূর্ণরূপ ও বিকাশ হয়েছে বাংলা ছন্দে। যদিও তিনি কিছু গদ্য কবিতা লিখেছিলেন পরিণত বয়সে। বিশ শতকে ছন্দ চিন্তার অঙ্গে অঙ্গে ছিল নবযৌবনের রূপ, তার শক্তিও ছিল গতিশীল। তিরিশি কবিদের মাঝেও ছিল সে যৌবনের নানান তরঙ্গঝঙ্কৃত ভঙ্গি। সামান্য কিছু গদ্য কবিতা বাদে তিরিশি কবিদের সকলেই প্রচলিত বাংলা ছন্দের রীতিকে মান্য করেই লিখেছেন।

               তিরিশি পঞ্চপ্রধান কবি পরবর্তী আবির্ভূত বড়ো কবিদের মধ্যে আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সু নীল গঙ্গোপাধ্যায় অলোকরঞ্জন দাসগুপ্ত, শঙ্খ ঘোষ, আবদুল মান্নান সৈয়দ প্রমুখ কবি গদ্যরীতিকে তাদের লেখার চলন করেন নি। প্রকরণের বৈচিত্র্যের প্রয়োজনে তারাও কিছু গদ্য কবিতা লিখেছেন, তাও যৎসামান্য।

                 সত্তর দশকে আবির্ভূত ‘ঘাসের ঘটনা’র কবি আবিদ আজাদও তাঁর ব্যতিক্রম নয়; যদিও ষাটের দশকের ছন্দে অবহেলা ও মনোযোগ তাঁকেও প্রভাবিত করেছিল ভীষণভাবে। তাই গদ্য কবিতার সংখ্যা বেশি না হলেও তাঁর কবিতায় ছন্দ, শব্দযোজনা, উপমার নির্মাণ ও প্রকরণের কলাকৌশলে বাক্য সৃষ্টির অনন্য ঝংকারে দিন-রাত্রির স্পষ্ট বা অস্পষ্ট চেতনা ও অবচেতনার শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠেন একজন এক্সপ্রেসনিস্ট চিত্রকরের মতো।

                   বাংলা কবিতার মৌলিক শিল্পের পথ ধরেই নতুন ভাষা ভঙ্গির সন্ধানে কবি আবিদ আজাদ নিরন্তন কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে অগ্রসর হয়েছেন ছন্দকে অস্বীকার করে নয়। গদ্য ছন্দেও তিনি ছিলেন সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য। কারণ, ছন্দের ওপর দক্ষ ছিলেন বলেই নিশ্চিত অধিকারে আসে তার স্বাভাবিক চলন। হয়তো এ কারণেই তাঁর গদ্যকবিতা অতিরিক্ত মসৃণ ও সচল তরঙ্গের ঝংকার। তাঁর কবিতা রূপক, উপমা ও উৎপ্রেক্ষায় অক্ষরবৃত্তের নানা প্রকরণেরই শুধু আটকে থাকেনি, মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্তের চলনেও আমরা আলাদা জীবনবোধ, শিল্প-সৌন্দর্য উপভোগ করি—অদ্ভুত স্বাচ্ছন্দে।

                     শুধু গদ্য কবিতা বাদ দিয়ে তাঁর কয়েকটি কবিতার শাস্ত্রীয় ছন্দের আলাদা স্বর ও দ্যোতনার ধরণ এখানে দেখা যেতে পারে :-

অক্ষরবৃত্তে পর্যায়সম মহাপয়ার—

                     মৃত্যুর হাতকে আজ / পরিচ্ছন্ন মনে হলো খুব

                      জীবন, প্রতিষ্ঠা, গ্লানি / সব তার মুঠোয় লুকালো

                       কৃতি, খ্যাতি, সম্ভবনা, / পুরষ্কার সব আজ চুপ

                       তিনি পুত্র, বাবার শ / রীরে নুয়ে কাফন পরালো। [মৃত্যুর হাত : হাসপাতালে লেখা]

  • পর্যায়সম মহাপয়ার দুই পর্বের ৮+১০= ১৮ অক্ষরের চরণ। প্রথম ও তৃতীয় চরণে এক ধরণের অন্ত্যমিল, দ্বিতীয় ও চতুর্থ চরণে অন্য প্রকার অন্ত্যমিল। এখানে একটি মধ্যখন্ডণে অর্ধযতিলোপ… শ / রীরে।

            এই কবিতার শেষ দুই চরণ পর্যায়সম মহাপয়ারের বৈশিষ্ট্যকে ভেঙে ফেলেছেন ছন্দ জানার প্রাবল্যে, দেখি তা কেমন করে…

                        এই সাদা জামা / এই স্কুল ড্রেস / গায়ে পরে কবিতার/ খাতা ফেলে ভুলে

                        আব্বু তুমি যাচ্ছ আজ / স্বচ্ছ কোন নতুন ইস্কুলে? — [মৃত্যুর হাত : হাসপাতালে লেখা]

অক্ষরবৃত্তে সমিল মহাপয়ার—

                          একটি হৃদয় চাই- / না হোক নতুন-আনকোরা

                           না হোক ঝকঝকে-হোক/ ব্যবহৃত-হোক ভাঙাচোরা

                           জোড়াতালিমারা হোক / খুদকুঁড়োমাখা ঝরঝর

                           ছেঁড়াফাড়া কলাপাতা- / পায়ে হেঁটে লক্কড়ঝক্কড় — [কাকতাড়ড়ুয়ার গান : ছন্দের বাড়ি ও অন্যান্য কবিতা]

  • ৮+১০= ১৮ মাত্রার সমিল মহাপয়ারে দ্বিপদী মিল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

অক্ষরবৃত্তে অমিল মহাপয়ার—

                                শব্দে ভুল হয়েছিল তাই / আমি পাইনি তোমাকে

                                শব্দে ভুল হলে এত কিছু / হয়? এত অনুতাপ?

                                অনুতাপে পুড়ে যায় সব / তোমাকে গভীরভাবে

                                 চেয়েছিলে আমার হৃদয় / তুমি তা জানোনি আজো।— [শব্দ ভুল হলে : ঘাসের ঘটনা]

  • অমিল মহাপয়ারে এখানে ১০+৮= ১৮ মাত্রার চরণ, প্রবাহটাও বেশ সচল। 

অক্ষরবৃত্তে প্রবাহমান পয়ার—

                                   ফাল্গুন, বাঘের মতো / লাফ দিয়ে পড়ে

                                   রাস্তায়, গলির মোড়ে, / বাসের ভিতরে

                                   নারীর নিরবচ্ছিন্ন / গ্রীবায়, শাড়ির

                                   পাড়ে, পায়ের স্লিপারে, নতুন গাড়ির

                                    বনেটে, পেট্রোল পোড়া / গন্ধে, চোখে-মুখে

                                    মাগির দালালদের / ব্যথিত চিবুকে — [ফাল্গুন : খুচরো কবিতা]

  •  ৮+৬= ১৪ মাত্রার প্রবাহমান পয়ার, নিখুঁত ও সুন্দর।

অক্ষরবৃত্তে মুক্তকে লেখা—

                                      পরিকল্পনার মতো / একখন্ড নিবিষ্ট জমিতে

                                      প্রাণপণে কাজ চলে, / পরিশ্রম চলে-

                                       প্রতিদিন আমি এসে / ঘুরে-ঘুরে দেখি,

                                       ডেকে-ডেকে বলি, / অনন্ত অনন্ত / কতদূর হলো?

                                       চারিদিকে প্রতিষ্ঠার শব্দ / চারিদিকে স্থাপনের / ওঠে ধুম

                                       আমার বাড়িটা তৈরী হয়ে / চলে নিজের গঠনে।

  • মুক্তকের গঠনে প্রতি পর্বে অসম পর্বের প্রবহমানতা এক চরণ থেকে অন্য চরণে সার্থক হয়ে উঠেছে অমিত্রাক্ষরের মতো। 

অক্ষরবৃত্ত থেকে দুটি লেখা—

            ১) ঢাকায় এখন শীতকাল / বিকেল বেলায় থান-থান / ভয়েল রৌদ্রের সাথে

                রমনার গাছগুলি / তাঁতিদের মতো / নিজেদের সব তাঁত / ছড়িয়ে-ছড়িয়ে চলে যায়

                 ছায়া পড়ে… এমন নিঝুম / অন্যমনস্কতা… মনে হয় / ছিলে কোনোদিন / নেই                       আর… শুধু এই

                 থাকা না-থাকার মাঝে / ঘুচে গেছে ব্রতহীন পথ…

                                                           — [এলিজি : আবুল হাসানের স্মৃতির উদ্দেশ্যে : ঘাসের ঘটনা]

                ২)  মানুষ সমুদ্রে গিয়ে / সমুদ্র দেখে না

                                                  নিজেদের দেখে

                                                               এই দেখা সামান্য আলাদা

                       মানুষ সমুদ্রে গিয়ে / আলাদা দৃষ্টিতে শুধু / নিজেদের দেখে আসে

                                                                                           সমুদ্র দেখে না।

— [সমুদ্রের ভিতরে মানুষ মানুষের ভিতরে সমুদ্র ঘুরে-ঘুরে আসে : আমার মন কেমন করে]

  • ছন্দের পাঁড় কবি- ছন্দকে নানানভাবে ভেঙেচুরে অক্ষরবৃত্তে চাঁদের ¯্রােতের মতো উজ্জ্বল ও স্বতন্ত্র।

পর্যায়সম মাত্রাবৃত্তের লেখা—

                            আকাশে ভোর / উঠেছে দেখে / একাকী তার / দৈন্য

                            নম্র হাতে / ঢেলেছে জল / ভাবেনি এক /বারও

                             দেয়াল জুড়ে / মর্মগ্লানি / হয়নি উত্ / তীর্ণ

                               পটভূমিকা / রেখেছে শুধু / তারই কিছু / টুকরো — [ বোকার ভূমিকা : ঘাসের ঘটনা]

  • ৫ মাত্রার পর্যায়সম মাত্রাবৃত্তে অতিপর্ব সহ লেখা কবিতাটির চলন অতি মসৃণ ও নিখুঁত নির্মাণ। 

অমিল মাত্রাবৃত্তের আরও একটি লেখা—

                                 রোদ্দুরে দোলে / রোদ্দুরে দোলে

                                 অলস মিথুন- / মূর্তি

                                 নির্লিপ্তির / নিখুঁত পারস্ / পর্য। — [নিদাঘে : ঘাসের ঘটনা]

  • ৬ মাত্রার অমিল মাত্রাবৃত্তের লয় স্বরবৃত্তের একটা দোলা মনে দোল খেতে থাকে।

মাত্রাবৃত্তের দ্বিপদী লেখা থেকে—

                                    বালিশে মুখ / গুঁজেই আছি / উপুড় হয়ে / পড়ে

                                    ঘাস জাগেরে / শেওলা লাগে / মলিন অন্ / তরে।

                                    হৃদয়ভার / কঠিন হলো, / সহে না সন্ /চয়

                                     ঘুমের স্বাদ / নোনা এবং / আঁশটে মনে / হয়।

                                     যেখানে যাই / আমার আজ / নিজের সাথে / দেখা

                                     যেপথে যাই / আজকে আমি / আমার সাথে একা। — [অবেলা : ঘাসের ঘটনা]

  • ৫ মাত্রার সার্থক অন্ত্যমিলের দ্বিপদী; এখানে মাত্র তিনটি শব্দ (হৃদয়ভার, ঘুমের স্বাদ ও আমার আজ) একটু এদিক-ওদিক করলেই এ কবিতাটির ছন্দ- ‘স্বরমাত্রিক’ বলা যেত। কবি হয়তো ইচ্ছে করেই সে পথে যাননি।

প্রবাহমান মাত্রাবৃত্তে লেখা—

                                          অনেকদিন পরে / হঠাৎ মাঝ পথে

                                          লাগেজহীন হাতে / তোমাকে নিয়ে নেমে

                                          নিজের সাথে নিজে / লোকটা কী যে একা

                                          তাকিয়েছিল দূরে / তোমার হাত ধরে :

                                          পাথরকুচি গাছ / সরিয়ে দিয়ে পাশে

                                          সহজ হবে বলে / দাঁড়ালে যেই তুমি

                                          চমকে দেখি নেই /- নতুন করে নেই

                                          কোথাও কোনোদিকে / নেই তো তুমি, নেই।

                                          মনে কি পড়ে প্রিয়? / মনে কি পড়ে সব? — [কুহক : ঘাসের ঘটনা]

  • ৭ মাত্রার প্রবাহমান মাত্রাবৃত্তেও কবির অসাধারণ দখল মুগ্ধ করে সর্বদা।

মাত্রাবৃত্তে মুক্তকে লেখা—

                সকালের মুখ / টগর-পাতায়

                আবেগের বুটি;

                 ছেলেটি মেয়েটি

                 ফুটি-ফুটি

                 জুটি।

                ছেলেটি দুহাত / জড়িয়ে ধরেছে

               বলছে কেবল / চাঁপা ফুল দুটি

                তোর না।

                মেয়েটি ঝিলিক / বলল, ছেড়ে দে,

                একটি চিলতে / রৌদ্র আমার

                ওড়না।

                এইভাবে ওরা / ঝগড়া করল

                বিবাদ করল / মিটিমিটি

                তারপর হেসে / ভেসে চলে গেল

                রয়ে গেল শুধু / খিটিমিটি। — [একটি সকাল : ঘাসের ঘটনা]

  • ৬ মাত্রার মাত্রাবৃত্তে অতিপর্বের সাথে প্রবাহমানতায় লেখা একটি সার্থক মুক্তক।

স্বরবৃত্তে দ্বিপদী লেখা থেকে—

              মাথার ভিতর / আগুন ছিল, / খাতাতে তার / ছাই

              এখন দেখি / দরজা আছে / বাড়িটি আর / নাই।

              বাড়ির মধ্যে / ছিলেন যারা / এখন তারা / ছায়া

              হঠাৎ ডাকে / কে যে কখন, / কোথায় তুমি / মায়া? — [বাড়ি ও কুহক : হাসপাতালে লেখা]

  • প্রতি পর্বে ৪ মাত্রার দ্বিপদী স্বরবৃত্তে অন্ত্যমিলে প্রথম চরণের সাথে দ্বিতীয় চরণের মিল। অতিপর্বে ২ মাত্রায় একটা তরঙ্গঝংকৃত ভঙ্গি।

স্বরবৃত্তে মুক্তকে লেখা—

               আগে আঁকব / হলুদ ঠোঁট

                                           পরে ঘাড়ের / শাল

               স্কেচের বনে / নিঝুম পাখি- / জন্ম তারই / ঝুঁটি

               মৃত্যু তুমি / উড়িয়ে দিলে / সুদূর হাতের

                                                 লম্বা-দুলু / নিতে

              ছন্দে আমি / হবো সঙ্গী / নিঃসঙ্গের

                                                 সুপারি-সর / নিতে।  

               তখন আমি / আঁকব বসে

              পাখির কালো / চোখের দুটি

                                           কিরণমাখা / ফিতে।

              দিবাবসান, / তোমার মুখে

              বিচ্ছেদের / বিজলি-চমক / দেখব আমার

                                                      আর্তনাদে / লাল। — [কবি-কিশোর : আমার মন কেমন করে]

  •  মুক্তক সাধারণত অক্ষরবৃত্তেই মানানসই। যদিও রবীন্দ্রনাথ স্বরবৃত্তে মুক্তক পরীক্ষামূলক লিখেছিলেন।

অমিল প্রবাহমান স্বরবৃত্তে লেখা—

                  এখন তুমি / সবচে নীল / সবচে মিহি / শাড়ি পরে

                 দাঁড়িয়ে আছ : / তুমি যেন / জ্যোৎস্নাজ্বলা / সবুজ তরু

                 এখন তোমার / নাভি যেন / মৌমাছিদের / মিলাদ মাহ / ফিলের মতো / রাত্রিবেলা

                 আগারবাতির / ধোঁয়ায় ভরে / তুলছে এবং / গুঞ্জরিত / বনভূমির

                 একটু নিচেই / তলপেটে সেই / কালো লোমশ / বাঁকা চাঁদের / উদ্ধৃতি দেয়

                 অট্টালিকা / বহুল এই / শহর যেমন / উদ্ধৃতি দেয় / বস্তিগুলোর; — [অন্যঘরে : বনতরুদের মর্ম]

  •  স্বরবৃত্তে এক চরণ থেকে আর এক চরণে এমন প্রবহমানতা দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের কারণে হয়েছে।

৩৬ মাত্রার একটি চরণ—

তেরছা বৃষ্টির মধ্যে / ক্রিমসন কালারের গাড়ি / সন্তান প্রসব করে / রেখে যায় নির্জন ফুটপাতে।

— [এলিজি : আবুল হাসানের স্মৃতির উদ্দেশ্যে : ঘাসের ঘটনা]

৪৪ মাত্রার একটি চরণ—

সিমেন্টের মায়া মম / তার ভিতরে জীবন / জীবনের ভিতর মৃত্যুর / কীট, ভেন্টিলেটরের / ফাঁক-ফোকর, অন্ধকার।

— [এলিজি : আবুল হাসানের স্মৃতির উদ্দেশ্যে : ঘাসের ঘটনা]

  • তাঁর অক্ষরবৃত্তে লেখা কবিতায় এরূপ অনেকানেক দীর্ঘমাত্রার চরণ দেখা যায় বিস্তৃত সিঁড়িময় স্রোতের মতো।

           ষাটের দশকের তাত্ত্বিক কবির ভূমিকা পালনকারী হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, “আগামীকালের কবি তাঁর বিষয় স্থির করবেন যত্নে, হঠাৎ-জাগা প্রেরণার প্রাবল্যে নয়… আমাদের কবিদের হাতুড়ি ঠুকতে হবে বাক্য সৃষ্টি কৌশলেরও পর… স্তবক বিন্যাসের দিকে চোখ ফেরাতে হবে… বাংলা কবিতায় ছন্দ [যেন] একটি-অক্ষরবৃত্ত; অপর দুটি- স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত শোভা: তবু ওই শোভা দুটির কাছে যেতে হবে ঘনঘন; অক্ষরবৃত্তের ওপর চাপ বর্তমানে মারাত্মক হয়ে উঠেছে…অন্ত্যমিল সাম্প্রতিক কবিতার সর্বাধিক অবহেলিত ও অব্যবহৃত সোনা।” —[আধার ও আধেয়, পৃ. ৩৬-৩৯]

         কবি আবিদ আজাদ একজন পাঁড় ছান্দিক কবি, ছন্দের নানা প্রকরণে ও বৈচিত্র্যে তাঁর অবাধ যাতায়াত। সে কারণেই ছন্দকে নিজের মতো ভেঙেচুরে একটা নিজস্ব রূপ দিতে সক্ষম হয়েছেন। একজন প্রকৃত কবি ছন্দ নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন, তাঁ র প্রকাশিত ১৬ টি কাব্যগ্রন্থে তার স্মারক হয়ে আছে বিষয়ের প্রতি স্থির যত্ন, হঠাৎ জাগা প্রেরণার প্রাবল্য নয়, বাক্য সৃষ্টির কৌশল ও বিন্যাস এবং শুধু অক্ষরবৃত্তের শোভায় শোভিত না হয়ে মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্তের নানা প্রকরণের পরীক্ষা-নীরিক্ষায়ও কবি আবিদ আজাদ চিরায়ত সাধনার নিমজ্জন কবি। তাঁ র চিত্রকল্প ও ছন্দের দখল এবং স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যের জন্য কালের কবি হিসাবে তিনি সুপ্রতিষ্ঠিত।

                                                  —-সমাপ্ত—-

Loading

ঋজু রেজওয়ান, কবি ও প্রাবন্ধিক। জন্ম : ০১-০৩-১৯৭২খ্রিঃ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ। গ্রামের বাড়ি : প্রিয়কাঠি, শরীয়তপুর। কর্মস্থল : সোনারগাঁও, নারায়নগঞ্জ। প্রকাশিত গ্রন্থ : ৪টি। সম্পাদনা : ছন্দ কবিতার অনুশীলন।

Leave a Reply

Skip to toolbar