-
“স্কুলের পাশেই ছিলো গুণবতীদের বাড়ি। গগন ঠাকুরের ছোট মেয়ে গুণবতী। গুণবতীর কোনো গুণ না থাকলেও রূপের আগুন ছিলো জ্বলসে দেবার মতন।”
দাগ
( ছোটগল্প )
-শেখ মোহাম্মদ হাসানূর কবীর
গল্পগ্রন্থ: কৃষ্ণতিথি
অনেকদিন পর আব্বাছকে দেখে চমকে ওঠলাম। ওর কোটরাগত চোখে-মুখে সীমাহীন বিষন্নতার ছাপ। ময়মনসিংহ স্টেশনে আব্বাছ লোকাল ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলো। আমিও সেদিন জমিজমার কাজে বাহাদুরাবাদ যাওয়ার উদ্দেশ্যে স্টেশনে এসেছিলাম। স্টেশনের ওয়েটিং রুমের দিকে এগুতেই আব্বাছের সঙ্গে দেখা। আব্বাছ আমার ছেলেবেলার বন্ধু। কৈশোর আর যৌবনের দুর্দান্ত সময়গুলো আমরা একসাথে কাটিয়েছি। মুখোমুখি হতেই ভূত দেখার মতন আব্বাছ আমাকে দেখে থমকে দাঁড়ালো। তখন ঠিক দুপুর বেলা। স্টেশন প্রায় জনশূন্য। একজন অন্ধ ভিখারি করুণ সুরে একটানা একটা শ্যামা সঙ্গীত আদ্যোপান্ত গেয়ে যাচ্ছে-
মন রে কৃষিকাজ জানো না
এমন মানব জমিন রইলো পতিত
আবাদ করলে ফলতো সোনা।
কালী নামে দাও রে বেড়া
ফসলে তছরূপ হবে না,
সে যে মুক্তকেশীর শক্ত বেড়া
তার কাছেতে যম ঘেঁষে না।
অদ্য কিংবা শতাব্দান্তে
বাজাপ্ত হবে জানো না,
আপন একতারে মন রে
চুটিয়ে ফসল কেটে নে না।
গুরুদত্ত বীজ রোপণ করে
ভক্তি বারি সেঁচে দে না,
একা যদি না পারিস মন রে
রামপ্রসাদকে সঙ্গে নে না।
আব্বাছের সাথে আমার প্রায় কুড়ি বছর পর দেখা। ওর সাথে এভাবে দেখা হবে কখনো ভাবিনি। আমি বজ্রাহতের মতো আব্বাছের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম; সহাস্যমুখে হাত বাড়িয়ে দিয়ে একদমে অনেক কথা জানতে চাইলাম-
আব্বাছ তুই? কোথা থেকে এলি? একি হাল হয়েছে তোর? আব্বাছ সম্বিত ফিরে আমার দিকে নিরাসক্ত দৃষ্টিতে খানিক্ষণ চেয়ে থেকে তারপর বিষন্ন মুখে বললো-
মোকদ্দমার কাজে ময়মনসিংহ এসেছিলাম।
এটুকু বলেই আব্বাছ চুপ করে রইলো। আমার প্রতি আব্বাছের কোনো আগ্রহ দেখতে না পেয়ে আমি আর কথা বাড়ালাম না। ঘণ্টাখানেক বিলম্বের পর ট্রেন আসলো। দুজনেই ভিড় ঠেলে একই কামরায় মুখোমুখি আসনে বসে বাহাদুরাবাদ অভিমুখে যাত্রা করলাম।
বাহাদুরাবাদ হাই স্কুলে আব্বাছ আর আমি একই ক্লাসে পড়তাম। পড়াশোনায় ভীষণ অমনোযোগী থাকায় আব্বাছ স্কুলে প্রতিদিন শিক্ষকের হাতে বেদম মার খেতো; লাঞ্ছিত হতো। আব্বাছ নিরীহ গাধার মতন সমস্ত অসম্মান মাথা বুঝে সহ্য করতো। পড়াশোনায় খুব একটা ভালো না থাকলেও গ্রামে ফুটবল খেলায় আব্বাছের বেশ সুনাম ছিলো। স্কুলের পাশেই ছিলো গুণবতীদের বাড়ি। গগন ঠাকুরের ছোট মেয়ে গুণবতী। গুণবতীর কোনো গুণ না থাকলেও রূপের আগুন ছিলো জ্বলসে দেবার মতন। বিকেলে আমরা যখন স্কুল মাঠে খেলতে যেতাম, গুণবতী তখন জানালার ধারে বসে আব্বাছের দিকে আগ্রহ ভরা চোখে তাকিয়ে থাকতো। এভাবে কখন যে গুণবতীর সঙ্গে আব্বাছের মন দেয়া-নেয়ার পালা চলছিলো তা আমরা আগে থেকে কেউ ক্ষুণাক্ষরেও টের পাইনি। একদিন আমাদের কাউকে কোনো কিছু না জানিয়েই রাতের আঁধারে আব্বাছ গুণবতীকে নিয়ে পালিয়ে গেলো। পরদিন গগন ঠাকুর বাদী হয়ে সদরে গিয়ে আব্বাছের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করে এসে গ্রামে রটিয়ে দিলো, আব্বাছ তার কিশোরী মেয়েকে ফুসলিয়ে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। প্রায় মাস ছয়েক পর আব্বাছ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। আব্বাছ ভেবে ছিলো যতো কঠিন বিপদই আসুক না কেনো গুণবতী তার পাশে থাকবে; কিন্তু গুণবতী আব্বাছের সমস্ত বিশ্বাসকে পদদলিত করে তার বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দেয়। গুণবতীকে অপহরণের দায়ে আব্বাছের জেল হয়। সাত বছর জেলখাটার পর আব্বাছ গ্রামে ফিরে আসে। এসময় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আব্বাছও গ্রামের অন্যান্যদের সাথে যুদ্ধে যোগ দিয়ে ট্রেনিংয়ের জন্য ওপারে চলে যায়।
দেশ তখন সবেমাত্র স্বাধীন হয়েছে। চারদিকে থমথমে অবস্থা। বিভিন্ন নিষিদ্ধ সংগঠনের অত্যাচারে মানুষের প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত। যুদ্ধফেরত আব্বাছের অবস্থাও তখন অনেকটা কোণঠাসা। আব্বাছ এ গুমট অবস্থা থেকে রেহাই পেতে গণবাহিনীতে নাম লেখায়। সাহস আর বেপরোয়ার কারণে অল্পদিনেই সংগঠনে তার অবস্থার উন্নতি ঘটে। একসময় খুনখারাবি আর নানা অপকর্ম করা আব্বাছের নেশা হয়ে দাঁড়ায়।
বিএ পাস করার পর জীবন-জীবিকার তাগিদে আমি ময়মনসিংহে চলে আসি। আব্বাছের সঙ্গে দেখা হয়নি অনেক দিন। তবে শুনেছিলাম প্রতিপক্ষের হামলায় কোনো রকমে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে আব্বাছ। তারপন দীর্ঘদিন আর আব্বাছের কোনো খবর নেয়া হয়নি।
ট্রেন চলছিলো শম্বুকগতিতে। পাশাপাশি আসনে বসেও কোনো কথা হচ্ছিলোনা দুজনের মধ্যে। অবস্থাটা এমন, যেনো অপরিচিত দুজন আগন্তুক মুখোমুখি বসে আছি। নীরবতা ভাঙতে আমি উপযাচক হয়ে বললাম-
আব্বাছ, আমাকে চিনতে পেরেছিস? আমি যতিন। আব্বাছ আমার কথার কোনো উত্তর দিলোনা। কেবল ফেলফেল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। পুনরায় প্রশ্ন করলে আব্বাছ বিরক্ত হয়ে বললো-
ভাই সাহেব, মাফ করবেন। আমি আপনাকে চিনতে পারছিনা।
আমি বেশ বিব্রত হলাম। খানিকটা কষ্টও পেলাম। কারণ আব্বাছ ছেলে বেলায় আমার খুব ভালো বন্ধু ছিলো। তাই হঠাৎ ওর এমন বদলে যাওয়া আমাকে সেদিন কষ্ট দিয়েছিলো খুব। আমি আর কথা বাড়ালাম না। ভাবলাম, অন্তরে কঠিন দাগ লেগে আস্তে আস্তে শক্ত হয়ে গেছে আব্বাছ, কিংবা দুঃসময়ে পাশে না পেয়ে অভিমানে আমাকে ভুলে থাকতে চাইছে হয়তোবা।
শেষরাতের দিকে ট্রেন এসে বাহাদুরাবাদ স্টেশনে থামলো। আমি আব্বাছের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে এলাম। তারপর ঘাটে এসে নৌকায় চড়ে সারাটা পথ আব্বাছের কথা ভাবতে ভাবতে বিষন্ন মনে বাড়ি এসে পৌঁছলাম।3 Comments
Friends
অনিক ভট্টাচার্য্য
@cholechi-udoyer-pathdhore
নিশাত আনজুম
@nishathunzom
ISMAT JAHAN LIPI
@ismatjahanlipi
নাজমুল হক জুয়েল
@nazmulhoqjewel
পৌষী পাল
@poushee-paul
Jubayer Al Mahmud
@jubayer
মোখলেসুর রহমান
@mokhles
Nipun Chandra
@nipunch
মোঃ বায়েজীদ
@bayejid


দারুন!!