-
ভবিষ্যতের এ্যানি
অরন্য হিল্লোল
বেলা বাজে ১২টা। টার্কিশ এয়ারওয়েজ যখন ফ্রাঙ্কফুর্ট এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করলো তখনও নাজিয়ার চোখ ঘুমে প্রায় ঢুলু ঢুলু। বাংলাদেশ থেকে টার্কিশ এয়ারওয়েজ ছেরেছিল রাত আনুমানিক ২টার দিকে। শেষ মুহূর্তে আবার রাতুল একটা সারপ্রাইজ দিয়েছিল নাজিয়াকে তাদেরই সাথে তাদেরই একি ফ্লাইটে যখন নাজিয়া জানতে পারলো যে রাতুলও যাচ্ছে তখন বিস্ময়ের চাইতে আনন্দের পরিমাণটাই ছিল নাজিয়ার মনের মাঝে বেশি।
নাজিয়া যতটা না এক্সাইটেড ছিল তার চাইতে এক্সাইটেড ঢের গুনে বেশি ছিল অদিতি যদিও বিশাখা আন্টি এটাতে মোটেও এক্সাইটেড ছিলেন না কারন এই সারপ্রাইজমেন্টের পুরো প্ল্যান করেছিল রাতুল বিশাখাঁ আন্টির সাথে আলাপ করেই। বিশাখা আন্টি নিজেই তাদের সিট প্ল্যানের সাথে মিলিয়ে রাতুলে সিটের টিকিট কেটেছিলেন আরও এক মাস আগেই যখন রাতুলের সাথে নাজিয়া, অদিতি, প্রিয়া আর আরজুর শত্রুতা প্রায় তুঙ্গে পৌঁছেছিল। বিশাখা আন্টিই তখন ছিল রাতুলের জন্য একমাত্র ভরসা কারন তার আপন ফ্রেন্ড সার্কেল যেখানে মোবাইলে তার কন্ট্যাক্ট নাম্বার ব্লক করে রেখেছিল তখন বিশাখা আন্টি প্রতিনিয়ত প্রতি মুহূর্তে রাতুলের খোঁজ খবর নিতেন এবং মানসিক ভাবে রাতুল জাতে ভেঙ্গে না পরে যে জন্য বিভিন্নভাবে রাতুলকে পরামর্শ দিতেন এবং আশ্বাস দিয়েছিলেন তাদের ৫ জনের ফ্রেন্ড সার্কেলকে আবারও এক ছাদের তলায় নিয়ে আসবেন তিনি যদিও তিনি নিজে নাজিয়াকে এই বিষয়ে কিছুই বুঝতে দেননি কারন সেটা তিনি বুঝতে দিলে নাজিয়াই তাকে ভুল বুঝতো হয়তো অদিতির আপন মা বলে মুখে সেটা প্রকাশ করতো না কিন্তু মনে মনে তো ঠিকই তাকে ঘৃণা করতো আর তিনি সেটা কিছুতেই হতে দিতে চান না কারন আফটার অল নাজিয়া তারই অন্টারিওর বাসায় অদিতির ছায়া সঙ্গি হয়ে থাকবে যতোদিন অদিতি চাইবে ততদিন। কিন্তু তিনি মনে মনে চাইছিলেন রাতুলও তাদের সাথেই একি ফ্লাইটে আসুক কানাডায় যখন তিনি জানতে পেরেছিলেন রাতুল হাফ ফ্রি স্কলারশিপ পেয়েছে অন্টারিওর একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
নাজিয়ার প্লেনে এক্সপেরিয়ান্স অবশ্য নতুন নয়। সে যখন ক্লাস সেভেনে পড়ে তখন তার বাবা মুরাদ সাহেব এবং তার মা মোট তারা তিনজন মিলে সিঙ্গাপুরে ঘুরতে গিয়েছিল ১ সপ্তাহের জন্য সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে করে। সেই এক্সপেরিয়ান্সটা ছিল নাজিয়ার জন্য আরও মধুর একটা এক্সপেরিয়ান্স। তারা কয়েকটা জায়গায় ঘুরাঘুরি করেছিল সেবার। লিটল ইন্ডিয়া, মারিনা বে, সান্তসা, সি লো সো বিচ, চায়না টাউন, ম্যারলায়ন পার্ক, ইউনিভার্সাল স্টুদিওস থিম পার্ক, ডলফিন আইল্যান্ড, সি একুরিয়াম, মাদাম তুসো মিউজিয়াম এবং আরও অনেক জায়গায় ঘুরাঘুরি করেছিল সেবার আব্বু আম্মুর সাথে তবে সব চাইতে বেশি এক্সাইটেড ছিল সে যখন ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে ঢুকে সেভেন ডি থিয়েটারের রাইডে চড়ে বিখ্যাত মুভি ট্রান্সফরমারের ওপ্টিমাস প্রাইম আর মেগাট্রিনের ফাইট একদম চোখের সামনে জীবন্ত ভাবে দেখেছিল। মানুষ প্রজুক্তির দিক থেকে কতটাই না এগিয়ে গেছে সেটা নিঃসন্দেহে স্বীকার করতেই হয়। সেই সেভেন ডির আনন্দের স্বাদ নাজিয়া আজও ভুলতে পারেনি আর ভুলতে পারবেও না কারন সেখানে রিয়েল টাইম এন্টারটেইনমেন্ট এর এনভায়রনমেন্ট ক্রিয়েট করা হয়েছিল মেশিন আর কম্পিউটারের প্রজুক্তি খাটিয়ে এবং এতটাই জীবন্ত করা হয়েছিল সেটা যে মনে হচ্ছিল চোখের সামনে মেগাট্রন আর প্রাইমের মারামারি শুরু হয়ে গেছে আর মেগাট্রনের ছুরা মিসাইল প্রাইমের গায়ে না লেগে যখন ফসকে গিয়ে পাশের পানির টিম্বারে লেগে সেটা ফেটে পানি বেরিয়ে আসছিল তখন সেই পানির ঝাপ্টা নাজিয়ার গায়েও এসে পড়েছিল এবং পুরো ভিজিয়ে দিয়েছিল নাজিয়া জামা কাপড়, এমন কি আইস হোলের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় প্রাইমের ছুরা গুলিতে যখন বিষাক্ত চেম্বারের সিলিন্ডার ফেটে সমস্ত গ্যাস বেরুচ্ছিল সেটারও ঘ্রান নাজিয়ার নাকে এসে বার বার ঠেকছিল, সব মিলিয়ে পুরো এনভায়রনমেন্টটাই ছিল যেন এক কল্প জগতের মতন এবং নাজিয়ার বারে বারে ইচ্ছা করছিল সেখানেই সারা জীবন থেকে যেতে। কানাডাতে সে রকম এন্টারটেইন্মেন্ট স্টুডিও আছে কিনা নাজিয়ার জানা নেই তবে থাকলে তার খুব ইচ্ছা বিশাখা আন্টি, অদিতি আর রাতুলের সাথে সেই স্টুডিওতে একবার হলেও যাওয়া। বেচারি অদিতি এখনো পুরোপুরি তার মা বিশাখা আন্টির সাথে সেরকমভাবে ফ্রি হতে পারেনি কারন দীর্ঘ কালের একটি গ্যাপ পড়ে গিয়েছিল তাদের মা মেয়ের সম্পর্কের উপরে। সে রকম একটা এন্টারটেইন্মেন্ট স্টুডিওতে যদি অদিতিকে একবার নিয়ে যাওয়া যায় তবে বোধ করি অদিতির কিছুটা হলেও তার নিজের আপন মায়ের প্রতি অনেকদিনের চাপা ক্ষোভ একটু একটু করে হলেও গলবে।
টার্কিশ এয়ারওয়েজে যে প্রতিটা সিটের পেছনে একটা করে মনিটর ফিট করা আর তাতে যে হরেক রকম চ্যানেলের পাশাপাশি বিভিন্ন রকম মুভি সাইটে গিয়ে মুভি দেখারও ব্যাবস্থা রয়েছে নাজিয়া তা প্রথমে জানতো না কিন্তু এয়ার হস্টেজ যখন ইংলিশে নাজিয়াকে জিজ্ঞেস করলো সে বোরিং ফিল করছে কিনা এবং কোন মুভি দেখতে চায় কিনা তখন নাজিয়া সাথে সাথেই সম্মতিসুচক মাথা নারতেই সেই হস্টেজ তাকে শিখিয়ে দিল কিভাবে সেই মনিটর অন করতে হয়, কিভাবে মুভি সাইটে গিয়ে মুভি ব্রাউজ করতে হয়। এগুলো শিখে নেয়ার পর নাজিয়া ব্রাউজ করতে করতে দেখতে পেল জেমস বন্ডের লেটেস্ত মুভি নো টাইম টু ডাই ফ্রি ডাউনলোড অথবা ফ্রি দেখার সুযোগ। সাথে সাথেই কানে প্লেনের সিটের সাথে লাগানো হেড ফোন লাগিয়ে সে ওই মুভিতে আইকনে ব্রাউজার এনে ক্লিক করলো আর মুভিও স্টার্ট হয়ে গেল। মুভির মাঝ পথে একবার রাতুল এসে তাকে বিরক্ত করতে চেয়েছিল আর রাতুলের দেখা দেখি অদিতিও বিরক্ত করার একটা এটেম্পট নিতে চেয়েছিল কিন্তু নাজিয়া যেই বিশাখা আন্টির দিকে তাকাল বিশাখা আন্টিও বুঝতে পেরেছিল নাজিয়া এখন একটু একান্তভাবেই মুভি দেখার প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী আর তাই রাতুল এবং অদিতি দুজনকেই ধমকে আবার সিটে বসাল সে।
জেমস বন্ডের মুভি দেখতে দেখতেই নাজিয়া খেয়াল করলো প্লেনের সর্ব উত্তরে টাঙ্গানো ডিজিট্যাল ঘরিতে তখন ভোর ৫ টা বেজে গেছে এবং প্লেন এখন এই মুহূর্তে ভারত সাগর পাড়ি দিয়ে আরব আমিরাতের শারজাহের উপর দিয়ে যাচ্ছে। নাজিয়া বুঝতে পারলো তার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে টাই মুভি দেখা অবস্থাতেই সে দেখল রাতুল আর অদিতি তাদের সিটের সাথে দেয়া পাতলা কম্বল গায়ে জরিয়ে বেঘোরে ঘুমুচ্ছে শুধু বিশাখা আন্টি মোবাইলে কি যেন করছে, খুব সম্ভবত সে মোবাইলে গেমস খেলছে। নাজিয়া বন্ডের মুভি দেখতে দেখতেই নিজের অজান্তে চোখ দুটি বন্ধ করার সাথে সাথেই একরাশ ঘুমের মাঝে তলিয়ে গেল। আর কি আশ্চর্য ঘুমের মাঝেই সে দেখতে পেল ভয়ংকর এক দুঃস্বপ্, প্রথমে সে যদিও টের পায়নি যে দুঃস্বপ্ন দেখতে যাচ্ছে কিন্তু যখন সে দেখতে পায় একটা ছোট্ট ধব ধবে ফর্সা পরীর মতন সুন্দর একটা মেয়ে তার হাত ধরে তীব্র গতিতে দোউরাচ্ছে আর পেছন ফিরে তার দিকে পিট পিট করে তাকিয়ে বেশ জোড়ে বারে বারে বলছে – “ Mommy, hurry, hurry, fast fast, keep running “ তখন নাজিয়া বুঝতে পারলো কিছু একটা হতে যাচ্ছে কিন্তু সে অবাক হয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখলো তার হুইল চেয়ারটি তার সাথে নেই এবং বাচ্চা মেয়েটির সাথে সেও তীব্র গতিতে দোউরাচ্ছে নিজের পায়ের উপর ভর করেই এবং বেশ ভাল ভাবেই দৌড়াতে পারছে এবং আচমকাই পেছন থেকে অনেক হই চই এর আওয়াজ কানে আসতেই সে দেখতে পেল অনেক গুলো মুখোশ পরিহিত এবং লেংটি পরিহিত পুরুষ এবং তাদের পাশাপাশি অনেক মহিলাও ধারালো তলওয়ার এবং বল্লম হাতে তার দিকেই ছুটে আসছে আর তাদের পেছন থেকেই বেশ তীব্র গতিতে ঘোড়ার পিঠে চড়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ শুধু লেংটি পরিহিত সমস্ত মুখে রঙ আর কালি মাখা এক ফর্সা বিদেশিনীও হাতে খুব অত্যাধুনিক এক মারনাস্ত্র নাজিয়া আর বাচ্চা মেয়েটির দিকে তাক করে তাদেরই দিকে ধেয়ে আসছে, নাজিয়া দৌড়াতে দৌড়াতেই হটাত করে বাচ্চাটির হাত ছেড়ে দিয়ে পড়ে গেল মাটিতে আর বাচ্চাটিও পেছনে তাকিয়ে চিৎকার করে একবার মাম্মি বলার সাথে সাথেই নাজিয়ার ঘুম ভেঙ্গে গেল আর সে রিতিমতন হাফাতে লাগলো। সে টের পেল সে ভীষণ ঘেমে গেছে যদিও পুরো প্লেনে এসির হাওয়াতে বেশ শীত শীত লাগবারই কথা।
চলবে ————————-
3 Comments
Friends
Cr-Abdullah
@cr-abdullah
Ashaduzzaman-Khokon
@ashaduzzaman-khokon
Rokail Diluk
@diluk
Rashedul Hasan
@rashedul-hasan
Anup Dey
@anup-dey
Anika
@anikaa
নন্দিনী
@nandini-chowdhuri
ডা মো ফরিদ-উজ-জামান খান
@drfaridtgl
Soumaya-Islam-Rimi
@soumaya-islam-rimi


সুন্দর গল্প। অভিনন্দন।