-
২য় খন্ডঃ
সত্য ঘটনা অবলম্বনে
আমাদের ছোট বেলার একটি মজার গল্পঃ
২.
সাধারণত শীতকালে..শীত নিবারণের জন্য পোষাক পরিচ্ছদের স্বল্পতা যদি না থাকে.. তাহলে শীতের রাতে ঘুরা ফেরা..আড্ডা দেওয়া.. খুবই আনন্দ দায়ক ও মজাদার হয়ে থাকে। বিশেষ করে চাঁদনী রাতে..যদি তাঁরা ভরা আকাশ থাকে.. এবং শীতের হিমেল হাওয়া একটু কম থাকে,..তাহলে সেই রাতটি সবাই.. খুব ভালো করে.. মজা করে..খুব আনন্দে কাটে সবার।চাঁদনী রাতে সন্ধ্যার পর..যৌথ পরিবারের অনেক ছেলে মেয়ে এক সাথে.. মাঝে মধ্যে খেলাধুলা,..আড্ডা,..বিয়ের আসরে বিনোদন মুলক নাচ গান,.. ও গল্পের আসর বসিয়ে সময় কাটে খুব মজা ও আনন্দে। কুত কুত,.. লাঠিখেলা,..ষাড়ের লড়াই, মোরগ যুদ্ধ,.. চেয়ার খেলা,.. রুমাল খেলা,..লুডু, চোর ডাকাত, লুকোচুরি,..বউছি,..গোল্লাছুট,.. খেদাই হাতি,..দাড়িয়াবাঁধা,..কানামাছি,.. ওপেন্টি বায়োস্কোপ,.. সুলতানা বিবিয়ানা,..ইত্যাদি খেলা নিয়ে সবাই মশগুল থাকে।
মাঝে মাঝে যাদের দাদা দাদি, নানা নানি যারা একটু সমাজ সচেতন বেশি ছিলেন তারা এই খেলাধুলার পক্ষপাতি ও পছন্দ করতেন না। কেউ রাতের বেলা খেলাধুলা করলে অথবা কেউ সমালোচনা করলে তারা তাদের ছেলে মেয়েদের খেলাধুলা বন্ধ করে দিতেন। সমাজের কিছু লোক আছে যাদের কাজ হলো অন্যের সমালোচনা করা। এ ধরনের কিছু লোক সব গ্রামেই কম বেশী দেখা যায়। এক সময় গ্রামে যারা নানা বিষয় নিয়ে বেশি সমালোচনা করতো..অন্যের ছেলে মেয়েদের দোষ খুজে বেড়াতো তাদেরকে কুটনি বুড়ি বলা হত.. ও.. তাদেরকে মন্দ লোক আড় চোখে দেখতেন সবাই।
সন্ধ্যার পর বড় বড় গেরস্হ বাড়িতে এক সময়.. শাস্ত্রের আড্ডা বা গল্পের আসর নিয়মিত বসতো। একজন বয়স্ক মুরব্বী গল্প বলতো.. আর বাকি সবাই তার সাথে শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবেশনা করতো। একটি গল্প বা কাহিনী শেষ করতে.. ২/৩ দিন সময় পর্যন্ত লেগে যেত।
তারা জামান বাদশাহ, কালুগাজী ও চম্পাবতী, বাহরাম বাদশাহ, মধুমালা ও মদন কুমার, আলিফ লায়লা হাজার দাস্তান, আলী বাবা ও ৪০ চোর ইত্যাদি কাহিনী তারা.. নেচে গেয়ে নানা ভঙ্গিতে গেয়ে শুনাতো। গ্রামের সবাই সারারাত তা উপভোগ করতেন।
কোন কোন দিন রাতে..পুথির আসর বসতো। হ্যাজাক লাইট বা কুপি, হারিকেন জ্বালিয়ে.. সারা রাত পুথি পাঠ করতেন পাড়ার কিছু লোক। তারা লেখাপড়া খুব একটা বেশি জানতেন না। অথচ সুর করে পুথি পাঠ করতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। এ অভিজ্ঞতা.. তাদের খোদা তায়ালার নিয়ামত হিসেবে বিবেচনা করা হত। তাদের কিসসা কাহিনীর মধ্যে ছিলো.. ইউসুফ জুলেখা,..শিরি ফরহাদ,..লাইলী মজনু,.. চন্ডিদাস ও রজকিনীর মত বিভিন্ন প্রেম কাহিনী।
অন্য দিকে, হাটবাজারে,.মফস্বল,..গ্রামগঞ্জ..শহরে. সার্কাস,..যাত্রা পালা,.. নাটক,.. জারীগান,..সারিগান,..সিনেমা,..প্রেম বিচ্ছেদের গান,.. পালাগান সারা রাত অনুষ্ঠিত হত। এগুলো সাধারণতঃ শিক্ষিত ও এক শ্রেণির আধা শিক্ষিত লোক.. সারা রাত জেগে উপভোগ করতেন।
এদিকে গ্রামের কিছু দুরন্ত ছেলেরা.. দিনের বেলায়.. একত্রে বসে ফন্দি আটতে ব্যস্ত.. তারা আজ রাত্রে.. কোন গাছের ডাব, কোন গাছের আতাফল,..নোনাফল,..সবরি কলা,.. পাকা পেঁপে,..খেজুর গাছের রস চুরি করে খাবে। সাধারনতঃ এগুলো এই চুরি গুলো করতো দুরন্ত ছেলেরা,.. নিজ আত্বীয় স্বজন.. আশে পাশের বাড়ি ঘর ও খেত খামার গুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো.. কারন চুরি করে ধরা খেলে.. যাতে বিচারের সম্মুখীন না হতে হয়। আর সব কাজের সাথে জড়িত থাকতো.. প্রভাবশালী ঘরের ছেলেরা। অর্থাৎ যারা বিত্তবান ক্ষমতা শালী গ্রামের মাথা ও বিচার যারা করবে তাদের সন্তান রা।
চাঁদনী রাতে.. যেখানে একটু আলো আধারী,.. জন সমাগম কম থাকতো, অথবা ঘন গাছ পালা থাকতো.. সেখান দিয়ে গ্রামের দুরন্ত ছেলেরা চলাচল করতো.. তাদের বিশেষ কার্য সম্পাদনের জন্যে.. যাতে তাদের চুরি করার ফন্দি কোনো কাক পক্ষিও টের না পায়। কেউ যেন দেখে না ফেলে যে.. তারা (দুষ্টু ছেলেরা) নারকেল খেজুরের রস চুরি করে খাচ্ছে। খেজুর গাছের কাচা রস চুরি করে খেয়ে.. তারপর হাড়ি লুকিয়ে ফেলা,.. ডাব চুরি করে পুকুর পাড়ে সবাই মিলে কেটে খাওয়া,.. কোনো দিন আবার মাছ চুরির মত ঘটনাও ঘটত।
সকালে জানা জানি হলে,.. সবাই বলতো এ গুলো কে করেছে, কে করতে পারে.. তা আর নাম ধরে প্রকাশ করার প্রয়োজন হতো না..কারন এ গুলো প্রকাশ করলে,.. বেশী সমালোচনা হলে..তার বাড়িতে আবার পরের দিন চুরি হবে,, তাই হজম করে নেওয়াটাই শ্রেয় ছিল।
এছাড়া শীতকালে ছোলা, সীম ( খেসারী), লাড়া/ খড় পুড়িয়ে (ধান কাঁটার পর অবশিষ্ট অংশ) আগুনে সিদ্ধ করে খাওয়ার এক ধরনের আলাদা মজা এক সময় ছিল। তখন এগুলো স্বাভাবিক ঘটনা ছিলো.. কারো কোনো কিছু চুরি করে কেউ খেলে.. সবাই এটাকে স্বাভাবিক ঘটনা মনে করতো.. কিন্তু এখন কার দিনে এগুলো মাথায় আনা বা কল্পনা না করাই শ্রেয় নয়. কারন এ ধরনের ঘটনা হলে বিচার সালিশ মারামারি… থানা পুলিশ, পর্যন্ত নিঃসন্দেহে গড়াবে।
মাঝে মাঝে কৃষক কৃষানীর হাঁস মুরগী চুরি হয়ে গেলে বা কেউ খেয়ে ফেললে তা অনুমান করা হতো যে এর সাথে নিজ পরিবারের কেউ না কেউ জড়িত আছে। আর এধরনের ঘটনা ঘটলে চুপচাপ থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারন বেশী বাড়াবাড়ি করলে আরো বড় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। তাই সবাই মুখ বুজে সহ্য করতেন।
হাঁস মুরগী চুরি করে অন্য বাড়ির হাড়ি পাতিল দিয়ে রান্না বান্না করে খেলে .. সকালে আলামত হিসেবে,.. হাঁস মুরগীর পালক, আর আত্বীয় স্বজনের ঘরে কারা কারা বেশি বেলা করে পরের দিন ঘুমাচ্ছে.. এটা বুঝতে কারো অসুবিধে হত না।
মোঃ আনিছুর রহমান
২৫/০৫/২০২২.(চলবে)
3 Comments
Friends
Shubha-Jit-Datta
@shubha-jit-datta
Raju Barua
@raju-barua
রিফাত মাহমুদ
@rifat-mahmud
ফারুক আব্দুল্লাহ - Faruq Abdullah
@faruq-abdullah
সাকিব-উন-নবী দীপ্ত (নির্বাক)
@sakib-un-nabi-dipto
Kazi Adam
@kaziadam
এম.আর মুহাম্মাদ ইস্রাফীল
@misrafil420
মোঃ আরিফুল ইসলাম
@ammouriful
শাহাদাতুর রহমান সোহেল
@sr-sohel



খুব চমৎকার