Profile Photo

Rahman anisurOffline

  • anisur1969
  • Profile picture of Rahman anisur

    Rahman anisur

    • 4 years, 5 months ago

    একটি ফাউন্টেইন কলম ও একজন সৎ দারোগা সাহেবের গল্পঃ

    ১৯৮১-১৯৮২ সালের ঘটনা….. সে সময় আমি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। তখন ঐ সময়ে গ্রামে অভাব অনাটন ছিল কিছু কিছু পরিবারে। গ্রামে দু’ একটি স্বচ্ছল পরিবার বাদে বেশীর ভাগ পরিবার ছিল অস্বচ্ছল। গ্রামের ছেলে মেয়েরা বেশির ভাগ পেন্সিল ও নিব কলম দিয়ে পড়া লেখা করত। কারন দোয়াত কালির দাম খুব কম ছিলো। একটি নিব কলম থাকলে ৩/৪ মাস অনায়াসে লেখা পড়া করা যেত। স্কুলের অধিকাংশ ছেলে মেয়েরা কম দামী নিব কলম দিয়ে লেখা পড়া করত।…. আর শতকরা ৫-১০ জন ছেলে মেয়ে দামী ফাউন্টেইন ঝর্না কলম ব্যবহার করত। ফাউন্টেইন ঝর্না কলম ছিল কয়েক প্রকার যেমন- ফিদার, উইং সাং, ইউথ ইত্যাদি….।

    …..উপরে যে কলম গুলোর কথা উল্লেখ করেছি সে গুলি ছিল দামী কলম। এই কলম গুলির দাম যথাক্রমে ৩৫,২৫,২০ টাকা ছিল। নিব কলমের দাম ছিল যথাক্রমে ২.৫০ হতে ৩.০০ টাকা পর্যন্ত। এই কম দামী কলমগুলো ব্যবহার করার আগে দোয়াত থেকে কালি ঢেলে অথবা ড্রপারে সাহায্যে কালি ভরে নিয়ে তারপর ব্যবহার করতে হত। কলমে কালি ঢালার সময় হঠাৎ কালি পড়ে গেলে এর জন্য একটি ন্যাকড়া/রুমাল ব্যবহার করা হত কালি মুছার জন্য। মাঝে মাঝে খুবই বিরন্বনা হত কারন হাতে অথবা খাতার উপর হঠাৎ যদি কালি পরে যেত।….. অনেক সময় খাতার উপর কালি পরে গেলে খাতা নষ্ট হয়ে যেত। মাঝে মাঝে কলম থেকে কালি বের না হলে বার বার ঝাকুনী দিয়ে কালি বের করা হত এতে ঘরের মেঝে আসবাব পত্র নষ্ট হয়ে যেত। আরও একটি সমস্যা ছিল সেটা হল পকেটে কলম রাখলে, শার্টের পকেটে কখনও কখনও কালির দাগ লেগে যেত যে কালির দাগ গুলো সহজে সাবান দিয়ে উঠানো বা পরিষ্কার করা যেত না। যদি সে শার্টটি হত সাদা রঙের অথবা চকচকে রঙ বিহীন জামা।

    …..ঝর্না কলম ব্যবহারের ভালো দিক গুলি হলো এই কলমে কালি ভরার সময় কলমের ভিতরে নিচে রাবারের একটি ব্লাটার থাকতো যেটা কালির দোয়াতে কলমের মাথা ডুবিয়ে ব্লাটারে চাপ দিলে স্বয়ংক্রিয় ভাবে কালি ভরে যেত। কলম থেকে কখনও কালি বের হত না বা জামা কাপড় নষ্ট হত না।
    ……বহু দিনের একটা সখ ছিল ঝর্না কলম ব্যবহার করব কিন্তু বাবা কিনে দিতে পারছিলেন না। অভাব অনাটনের সংসার ছিলো পাঁচ ভাইয়ের ভরন পোষন করতেই বাবা হিমশিম খেতেন। তখন কার আমলে একটি দামি সুন্দর কলম ব্যবহার করার শখ তখনকার দিনে অনেক ছাত্র ছাত্রী বা ছেলে মেয়েরই ছিল। বাবা বলেছিল,…. হাতে টাকা কড়ি রোজগার বেশী হলে একটি দামী কলম কিনে দিবেন।

    অনেক দিন পর ( ১৯৮৩ সাল)…. তখন আমি কাশিনাথপুর আঃ লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণি, বিজ্ঞান বিভাগে পড়ি।….. একদিন হঠাৎ সকাল বেলা আমার বাবার পূর্ব পরিচিত বরাট গ্রামের লাল চৌধুরী দারোগা (যোদ্ধাহত অবঃ) আমাদের বাড়িতে আসলেন।…. বাবা আমাকে ডাকলেন ওনার সাথে আমার পরিচয় হলো। আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন, কোন ক্লাশে পড়ি…? কোন স্কুলে পড়ি…,? রোল কত? ইত্যাদি,… ইত্যাদি…। বাবা হতে পারে আগে উনার সাথে আমার লেখাপড়া সম্বন্ধে কথা বার্তা আলাপ চারিতা করেছিলেন।

    …..আলাপ চারিতার এক পর্যায়ে দারোগা সাহেব আমার বাবার কাছে ১০টি টাকা সাহায্য চাইলেন। বাবা কোনো কথা না বলে উনাকে ১০ টাকা দিলেন। টাকা নেওয়ার পর দারোগা সাহেব তাঁর পকেটে থাকা একটি ফাউন্টেইন ঝর্না কলম বাবার হাতে তুলে দিলেন। বললেন,…..এই কলমটি আমি তোমার ছেলেকে দিলাম। সে লেখাপড়া করে… ওকে কলমটি দিও…। তুমি কোনো কথা বা আপত্তি করতে পারবে না। কারন আমি ১০ টি টাকা এমনি এমনি নিতে পারবো না….।

    ….বাবার কাছে পরে শুনেছি দারোগা সাহেব চাকুরী কালীন সময়ে অথবা যুদ্ধ কালীন সময়ে উনার পায়ে হঠাৎ একটি গুলিবিদ্ধ হলে উনি আহত হন এবং চিকিৎসার পর পায়ের রগ শুকিয়ে গেলে তিনি খুরিয়ে খুরিয়ে চলা ফেরা করতে বাধ্য হন এক সময়ে অবশেষে চাকুরী থেকে বাধ্যতা মুলক অবসর নেন। আবার লোক মুখে শুনেছি উনি ফরেষ্টে চাকুরী করতেন হঠাৎ এক বাঘের আক্রমনে তার পা আক্রান্ত হলে তিনি আধা পঙ্গু হয়ে যান এবং কস্ট করে চলাফেরা করতেন।

    যাই হোক, স্বাধীনতার আগে বা পরে যারা সরকারী বা বেসরকারী চাকুরী করতেন তাদের বেতন ভাতা খুব একটা বেশী ছিল না।
    তাই দারোগা সাহেবের সংসারে অভাব অনাটন ছিল বিধায় তিনি কষ্ট করতেন কিন্তু মানুষের কাছে হাত পাততেন না। তাছাড়া তার সংসারে তেমন ঊপার্জন ক্ষম কেউ ছিলেন না। সংসার ও ছিলো বড়। পরে শুনেছি দারোগা সাহেব খুব কষ্টের ভিতর জীবন যাপন করে এক সময় মৃত্যু বরণ করেন….।

    … কলমটি পেয়ে তখন ঐ সময় আমি খু্ব খুশি হয়ে ছিলাম। আমি কলমের উপরে খোদাই করে আমার নাম লিখিয়েছিলাম। বর্তমানে আমার সে কালো ঝর্না কলমটি আমার মেঝ ভাই পুরনো স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এখনও কলমটি ব্যবহার করে…থাকে।

    …কিন্তু আমি লাল চৌধুরী দারোগা সাহেবের সেই স্মৃতি এখনও ভুলতে পারিনি। হয়তো কোনদিন ভুলতেও পারব না….।
    ওনার কথা মনে হলে আমার এখনও অনেক কষ্ট হয়। আবার তাঁর কাছ থেকে শেখার ও জানার অনেক বিষয় আছে, অভাব অনাটনে পড়লে যে সব সময় সবার কাছে হাত পাতা যায় না তার নজির ঐ দারোগা সাহেব।

    কিছু কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসে তারা অভাব গ্রস্হ ঋনগ্রস্হ হলেও ঘুষ দুর্নীতি, অন্যায় ভাবে অর্থ রোজগার ও কারো মুর্খাপেখি হয়ে থাকেন না তার উৎকৃষ্ট প্রমান সেই প্রয়াত সৎচ্চরিত্রের লাল চৌধুরী দারোগা সাহেব।

    আমি তাঁর আত্বার মাগফেরাত কামনা করছি, সৃস্টিকর্তা তাকে যেন সুখে রাখেন এবং বেহেশত নসীব করেন।
    আমিন।

    মোঃ আনিছুর রহমান
    ২৮/০৫/২০২২.

    5
    3 Comments
Skip to toolbar