-
ভোরের শিশির
মাহামুদা খাতুনসকাল বেলা ঘুম থেকে উঠতে একদম ইচ্ছা করছেনা আমার, কিন্তু উঠতেই হবে। ফজরের সালাত মিস একদমই সহ্য করবেনা বাবা। মসজিদে যাওয়ার সময় বাবা ডেকে দিয়ে গেছে। এরপর মা এসে কয়েকবার ডেকে গেছে। কিন্তু আমার কিছুতেই উঠতে মন চাইছেনা। লেপ টেনে আবার আয়েশ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। শীতের সকালে ঘুম যেন আরও জেঁকে বসতে চাচ্ছে। হঠাৎ লেপে টান অনুভব করলাম। ভয়ে গলা শুকিয়ে গেল। নিশ্চয় বাবা মসজিদ থেকে ফিরে এসে আমাকে এভাবে দেখে রেগে গিয়ে এমন করছে। লেপ থেকে মুখ বের করার সাহস হলোনা।
কি ব্যাপার বাইরে আলো হয়ে যাচ্ছে আর তুমি এখনও ফজর না পড়ে শুয়ে আছো?
বাবার দরাজ কন্ঠ শুনে প্রাণ বের হবার যোগাড়। এক লাফে উঠে পড়লাম।
রাকিব, কাল থেকে তুমি আমার সাথে মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করবে।
বুঝলাম আমার আরাম করার দিন শেষ। কাল থেকে আরও ভোরে উঠে এই শীতের সকালে ঘরের বাইরে যেতে হবে। ভাবতেই আমার গা শিউড়ে উঠলো।
এই শীতে ছেলেটাকে টেনে আবার মসজিদে নিয়ে যাওয়ার কি দরকার। মায়ের আদুরে কন্ঠ শোনা গেল। মাত্রতো ১২ বছর, সাবালক হোক তখন নাহয় সবসময় যাবে।
সাত বছর থেকে এসব অভ্যাস করার কথা। আর তুমি বলছো সবে ১২ বছর। এখন থেকে মসজিদে না গেলে অভ্যাসটা কীভাবে হবে শুনি? তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, যাও, আর মাত্র ১২ মিনিট আছে। নামাজটা পড়ে নাও।
কলপাড়ে অজু করতে গিয়ে মায়ের উষ্মা টের পেলাম। একভাবে বাবার উপর রাগ ঝাড়ছে। একমাত্র ছেলের উপর বাবার এহেন অত্যাচার মেনে নিতে পারছেনা। অজু করে বারান্দা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম বাবা একটা চেয়ারে বসে বই পড়ছে। বইয়ের আড়াল থেকে বাবার চিরাচরিত স্নিগ্ধ হাসিটা আমার চোখ এড়ালোনা।বাবার এই একটা অসাধারণ গুণ। মা যখন রেগে যায় উনি একটা স্নিগ্ধ হাসি মুখের এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত ঝুলিয়ে রাখে। রুমে গিয়ে নামজ পড়ে বাবার পাশে গিয়ে বসলাম। মা এখনও কথা বলে যাচ্ছে। বাবার হাসিটার কারণে মা আরও বেশি রেগে যায়। আরও কিছুক্ষণ এমন চলবে তারপর কোন উপায় না দেখে মা থেমে যাবে। আমাকে নিয়ে বাবা মায়ের ঝগড়াটা আমি বেশ উপভোগ করি।
রাতে পড়ার টেবিলে বসে আছি। বাবা এসে বলল, আজকে ১০ টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়বে রাকিব। কালকে আজানের সময় উঠে মসজিদে যেতে হবে।
ঠিক আছে বলে স্কুলের কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে শুয়ে পড়লাম। বাবা এসে ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে মাথার কাছে রেখে গেল। ঘুম আসতে কিছুটা সময় লাগল। এলার্মের কটকটা আওয়াজে সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেল। মসজিদের আজান কানে আসল। বাবা এসে ডাকার আগেই উঠে পড়লাম। সুন্নাত পড়ে ভালভাবে শীতের পোশাক পড়ে বাবার সাথে বেরিয়ে পড়লাম। সদর দরজা খুলে বের হওয়ার সাথে সাথেই একটা মন ভালো করা বাতাস এসে গায়ে-মুখে পরশ বুলিয়ে গেল। অন্য ওয়াক্তে গেলেও ফজরের নামাজের জন্য জীবনে প্রথম মসজিদে যাচ্ছি। এর আগে অনেকবার বাবা নিতে চাইলেও মায়ের বাঁধার কারণে ফজরে আমার কখনও মসজিদে যাওয়া হয়নি। বাবার পাশে হাটছি। রাস্তা দিয়ে আরও কিছু মানুষকে মসজিদে যেতে দেখলাম। নামাজ পড়ে কিছুক্ষণ দোআ পড়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে পড়লাম।বাইরে এসে দেখি এক অসাধারণ সকাল আমার জন্য অপেক্ষা করছে।আলো আধারির একটা খেলা চলছে বাইরের জগতে। কনক্রিটের রাস্তা দিয়ে না হেঁটে মাঠের মধ্যে দিয়ে হাটা শুরু করলাম।মাঠের ঘাসের শিশিরের শীতল স্পর্শ পেলাম। মনে হচ্ছে ঘাসের উপরের শিশিরগুলো আমাকে কিছু বলতে চাইছে। আমি বসে পড়লাম। ঘাসগুলোর উপর থেকে একটা শিশিরের ফোঁটা নিয়ে বললাম, এই তুমি এমন করে হাসছো কেন? কি বললে? ফজরের নামাজ পড়ে আমার অবয়বের স্নিগ্ধতা বেড়েছে। দুই হাত দিয়ে ঘাস থেকে শিশির নিয়ে সমস্ত মুখে পরশ বুলিয়ে দিলাম।না, এমন সৌভাগ্য থেকে আমি আর নিজেকে বঞ্চিত করবেনা। এখন প্রতিদিনই ভোরের শিশিরে স্নাত হবো আমি।
আমাকে রেখে বাবা একটু সামনে চলে গিয়েছিল। পেছনে তাকিয়ে আমার এহেন কাজ দেখে মিষ্টি হাসি দিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলেন। উঠে দাঁড়ালাম, দৌড়ে বাবাকে ধরলাম। বাবার হাত জড়িয়ে বললাম, এখন থেকে প্রতিদিনই তোমার সাথে ফজরের সালাত আদায় করবো।
মুখে কিছু বললেন না বাবা, সেই স্নিগ্ধ মন কাড়ানো হাসি দিয়ে জানিয়ে দিলেন আমি এতোদিন এই দিনের অপেক্ষাতেই ছিলাম।
বাবার এই হাসিটা আমার খুব প্রিয় কিন্তু সচরাচর দেখা যায়না। ভোরের শিশিরের শীতল পরশে সিক্ত হওয়া আমার হৃদয় অজান্তেই আমার বাবার হৃদয়কেও স্পর্শ করেছে। অন্তরে প্রশান্তি অনুভব করলাম। নিচু হয়ে ছুঁয়ে নিলাম ঘাসের উপর চকচক করতে থাকে শিশির বিন্দুটাকে। শিশিরে ভেজা আঙ্গুলের ডগা ঠোঁটে স্পর্শ করলাম। মনে মনে বললাম, ধন্যবাদ তোমায় ভোরের শিশির। তার জন্যই তো বাবাকে খুশি করতে পারলাম।
সমাপ্ত6 Comments
Friends
Shoriful Shoron
@shoriful-shoron
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
Morsalin Islam Shouradip
@morsalinshouradip
জাস্রা জুমান
@nmafin4gmil-com
Hijbullah hiju
@hijbullah
মোঃ রিদওয়ান আল হাসান
@mridwanalhasan
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam



ভালো লাগল।