Profile Photo

mahamuda khaunOffline

  • mahamuda
  • Profile picture of mahamuda khaun

    mahamuda khaun

    3 years, 11 months ago

    পোড়োবাড়ির রহস্য
    পর্ব_এক
    পাচিলঘেরা বাড়িটার সামনে এসে থামল মুসায়েব। মুসায়েবকে দেখেই গেটটা খুলে দিল দারোয়ান। সাইকেল নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল সে। এটা তালহার দাদীবাড়ি। এ বাড়িতেই তালহারা চাচাদের সাথে যৌথভাবে বাস করে। প্রায় ২০ কাঠা জমি জুড়ে বাড়িটা বানিয়েছেন তালহার দাদা। তার দাদীর নাম আয়েশা ছিল, তাই বাড়ির নামও দিয়েছে আয়েশা ভিলা।
    তালহার ইদানিং গোয়েন্দা হওয়ার ইচ্ছা জেগেছে। তার শখের কথা শুনে মুসায়েব একটু গাঁই গুঁই করলেও যায়িদের তাতে বেশ আগ্রহ আছে। গোয়েন্দা হওয়ার প্রাথমিক সবরকম কাজ সেরে ফেলেছে তালহা। তার দাদুবাড়ির সামনের দিকে অনেকগুলো ঘর খালিই পড়ে ছিল। সেখান থেকে দুইটা ঘর নিয়ে একটা অফিসও দিয়েছে তালহা। নামটাও দিয়েছে চমৎকার। ‘গোধূলি গোয়েন্দা সংস্থা’।
    গেট পেড়িয়ে কোনদিকে না তাকিয়ে অফিসে ঢুকে পড়ল মুসায়েব। ঢুকেই যায়িদকে দেখতে পেল। একটা টেবিলের উপর খুব মনযোগ দিয়ে কি যেন করছে। খুব বুদ্ধিমান ছেলে। চেহারাটাই বুদ্ধিদীপ্ত। চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। বাবা একজন কৃষিবিদ। পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকিয়ে মুসায়েবকে দেখতে পেল যায়িদ। ওমনি টিপ্পনী কাটল।
    কিরে, আসতে এতো দেরী করলি কেন? ঘুম থেকে দেরী করে উঠেছিস, না?
    আর বলিসনা, ঘুম থেকে উঠে দেখি ১১ টা বেজে গেছে। মা এখানে আসার কথা বলতে ভুলেই গেছে। যখন বলল তখন দেখি ১১:৩০ বেজে গেছে। কী আর করা সাইকেল নিয়ে ছুটে আসলাম।
    দ্যাখতো মুসায়েব, এটা কেমন হয়েছে? একটা ভিজিটিং কার্ড দেখিয়ে তালহা জিজ্ঞাসা করল।
    কার্ডটা হাতে নিল মুসায়েব। অবাক হয়ে বলল, কার্ড! আমাদের নামে কার্ড ছাপিয়েছিস?
    পড়ে দেখ কোন পরিবর্তন লাগবে কিনা।
    তালহার দিক থেকে চোখ ঘুরিয়ে কার্ডটা পড়া শুরু করল মুসায়েব। রহস্য সমাধানে আমরা- তালহা বিন জুবায়ের, মুসায়েব বিন আসাদ, যায়িদ বিন ইয়াসির। এক নিমিষেই কার্ডের লেখাটা পড়ে ফেলল মুসায়েব।
    কেমন হয়েছে? যায়িদ জিজ্ঞাসা করল।
    মাশাআল্লাহ, খুব ভাল হয়েছে।
    এখন থেকে কারও সাথে পরিচয় হলে এই কার্ডটা দিব আমরা, বলল তালহা।
    তাতে কি কোন লাভ হবে? মানুষ কার্ডটা নিয়ে কিছুদূর গিয়ে ফেলে দিবে। ভাববে এই বাচ্চাছেলেগুলো আবার কি রহস্য সমাধান করবে।
    দেখাই যাকনা, বলল তালহা। কাজে নামার আগে নিগেটিভ ধারণা ঠিকনা। হতাশা মুমিননকে মানায়না।
    মুসায়েব বলল, কাজ শুরু করার আগেই কার্ড বানানো কি ঠিক হল?
    যায়িদ বলল, প্রস্তুতি নিয়েই কাজে নামতে হয়। খুশির কথা হল আমরা খুব শীঘ্রই কাজ শুরু করতে যাচ্ছি।
    কাজ শুরু করতে যাচ্ছি?
    কাগজের বিজ্ঞাপনটা মুসায়েবের দিকে এগিয়ে দিল তালহা।
    বিজ্ঞাপনটা পড়ে কপাল কুঁচকে ফেলল মুসায়েব। বলল, বাড়ি উদ্ধার সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন? এগুলো আমাদের জন্য না তালহা। সরকারী, বেসরকারি কত গোয়েন্দা সংস্থা আছে। ওরাই পাবে কাজটা। এখানেতো দেখছি পুরস্কারের কথাও লেখা আছে। পুরষ্কারের কথা জানলে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়বে। আমাদের মত পুচকেরা ওখানে ঢোকার চান্স পাবে কিনা সন্দেহ।
    তোর এই এক বাতিক। আগেই নিগেটিভ ধারণা করে বসিস। গোয়েন্দা হিসাবে পরিচয় পাওয়ার জন্য এটাই আমাদের মোক্ষম সুযোগ। বেশ কড়া করেই বলল তালহা। তোকে দশটার সময় আসতে বলেছি আর তুই দুই ঘণ্টা দেরী করলি। সাড়ে দশটার সময় বের হওয়ার ইচ্ছা ছিল। এখন বারোটা বেজে গেছে। কাজটা হাতছাড়া হয়ে গেল কিনা কে জানে। আর দেরী নয় আমাদের এখনই বের হতে হবে। সাইকেল একটু জোরে চালালে আধঘণ্টার মধ্যে অফিসটাতে পৌঁছে যাব ইনশাআল্লহ। কথা না বলে চল আমরা এখুনি রওনা হই।
    সেটা নাহয় বুঝলাম, কিন্তু তার আগে আমার পেটে যে ছুচো দৌড়াচ্ছে তার কি হবে?
    নাস্তা করে আসিসনি? তালহা জিজ্ঞাসা করল।
    তার আর সময় কোথায় পেলাম। ঘুম থেকে উঠেইতো চলে আসলাম।
    ঠিক আছে দাড়া তোর জন্য খাবার নিয়ে আসছি। কিছুক্ষণ পর তালহা দুইটা স্যান্ডউইচ নিয়ে বলল, নে, যেতে যেতে খাবি চল।
    স্যান্ডউইচ দুইটা হাতে নিল মুসায়েব। সাইকেল চালাতে চালাতেই গপাগপ খেয়ে ফেলল।
    তালহারা যখন পেপারে দেওয়া ঠিকানাটায় পৌঁছা্ল তখন দুপুর দুটা বাজে। ঠিকানা অনুযায়ী তারা একটা দোতলা বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাড়ির চারপাশ উঁচু পাচিল দিয়ে ঘেরা। পাচিলটা সাধারনের তুলনায় একটু বেশিই উঁচু। প্রধান ফটকের সামনে এসে দাড়ালো তালহারা। কয়েকবার টোকা দিতেই ফটকটা একটু ফাঁক হয়ে গেল। ফাঁক গলে দারোয়ানের মুখ বেরিয়ে আসল।
    কপাল কুঁচকে ওদেরকে দেখতে লাগল লোকটা। তারপর কর্কশ কণ্ঠে করে জিজ্ঞাসা করল, কি চাই?
    আমরা পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে এসেছি।
    পত্রিকার বিজ্ঞাপন? কিসের বিজ্ঞাপন?
    পকেট থেকে কাগজটা বের করে ঠিকানাটা দেখাল তালহা।
    কাগজটা হাতে নিল লোকটা। বিজ্ঞাপনটা পড়ল। তারপর কিছুক্ষণ তালহাদের দিকে তাকিয়ে দরজাটা খুলে দিল।
    প্রধান ফটক পেড়িয়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল তালহারা। তাদেরকে দাড় করিয়ে রেখে দারোয়ান ভিতরে চলে গেল।
    বাড়ির ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেল তালহা। বলল, ভেবেছিলাম লম্বা লাইন থাকবে কই কেউইতো আসলনা।
    আমিও তাই ভাবছি ? পুরষ্কারের লোভেও কেউ আসলনা? যায়িদও সুর মেলাল।
    মুসায়েব বলল, আমি ভেবেছিলাম এই কেস নেওয়ার জন্য লোকের অভাব হবেনা। এখন দেখি কারোরই আগ্রহ নেই। মনে হচ্ছে খামোখাই আসা। নিজেকে বোকা বোকা লাগছে।
    বোকাদের আবার কি চালাক লাগে নাকি? খোঁচা দিয়ে বলল, যায়িদ।
    যায়িদের কথায় রেগে গেল মুসায়েব। ছেলেটা সবসময় ওর পেছনে লেগে থাকে। মৃদু ধমক দিয়ে যায়িদকে বলল, একথা বললি কেন তুই?
    বলবো না? লোক থাকলে বলতি এতো লোক! এখানে আমরা পাত্তা পাবোনা। আর এখন বলছিস কেউ আসেনি বলে তোর লজ্জা করছে।
    মুসায়েব বলল, ঠিকইতো খবরটা আরও অনেকে দেখেছে। কিন্তু কই কেউ কি আসল? একমাত্র আমরাই বোকার মত আসলাম। আমার মনে হচ্ছে খবরটাই একটা ধোঁকা।
    তালহা ক্ষেপে গেল। কখন থেকে ঝগড়া করছিস তোরা।এবার একটু থাম ।
    প্রায় আধঘণ্টা পর দারোয়ান লোকটা ফেরত আসল। ওদেরকে উদ্দেশ্য করে বলল, এসো, স্যার তোমাদের ভেতরে নিয়ে যেতে বলেছে।
    দারোয়ানের সাথে একটা কার্পেট মোড়া রুমে প্রবেশ করল তালহারা। সাধারণ মানের কিছু আসবাব দিয়ে ঘরটা সাজানো। একপাশে একটা বেতের ডিভান আর দেওয়াল ঘেঁসে চারিপাশে অনেকগুলো মোড়া সাজানো আছে। কয়েকরকমের পাতাবাহারের গাছ শোভা পাচ্ছে ঘরের কোণাগুলোতে। দেওয়ালে ঝুলানো আছে মানিপ্লান্টের নানারকম গাছ। একটা দেওয়াল আলমারিও আছে। নানারকম বই আছে তাতে।
    মানুষটার রুচি আছে। ঘরের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে তালহা বলল।
    মুসায়েব বলল,আসলেই।
    বইয়ের আলমারির কাছে এগিয়ে গেল তালহা। বইগুলোর উপর চোখ বুলাল। প্রবন্ধ, গল্প আর ইতিহাসের বই দিয়ে ঠাসা আলমারিটা।
    আর কতক্ষণ দাড়িয়ে থাকব? বিরক্ত হয়ে মুসায়েব জিজ্ঞাসা করল।
    অপেক্ষাতো করতে হবে। চল বসি। তিনজন তিনটা মোড়ায় বসে পড়ল।
    তোমরা বিজ্ঞাপন দেখে এসেছো?
    তিনজনই তিনটা বই নিয়ে পড়ায় ব্যস্ত ছিল। কণ্ঠটা শুনে ঘুরে তাকাল তারা। দরজার কাছে বুকে হাত গুজে মাঝবয়সী একজন লোক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। লম্বায় প্রায় ছয় ফুট। গায়ের রঙ শ্যামলা। মুখে সাদা-কালো দাড়ি। কথা বলতে বলতে একটা মোড়া টেনে তাদের পাশে বসে পড়ল লোকটা। চোখ ঘুরিয়ে তাদের তিনজনকে একবার ভাল করে দেখে নিল। নিজের হাতটা বাড়িয়ে একে একে তিনজনের সাথে করমর্দন করে বলল, আমি রওশন মজুমদার। তারপর ভ্রু নাচিয়ে আবারও জিজ্ঞাসা করল, বিজ্ঞাপন দেখে এসেছো তোমরা?
    তালহাই উত্তর দিল, জ্বি আমরা পত্রিকায় আপনার দেওয়া বিজ্ঞাপনটা দেখেই এসেছি।
    লোকটা জিজ্ঞাসা করার আগেই তালহার কথার মাঝখানে যায়িদ বলল, আমরা গোয়েন্দা তারপর নিজেদের কার্ডটা এগিয়ে দিল সে।
    কার্ডটা হাতে নিল লোকটা।তারপর ওদের দিকে তাকিয়ে বলল,
    গোয়েন্দা? লেখাপড়া কতটুকু?
    এবার এসএস সি পরীক্ষা দিয়েছি। কিছুক্ষণ চুপ থেকে যায়িদ উত্তর দিল।
    তা পড়ালেখা বাদ দিয়ে হঠাৎ গোয়েন্দা হওয়ার শখ জাগলো কেন?
    বাদ দিয়েছি কে বলল? পড়ালেখার পাশাপাশি করবো। বেশ দৃঢ় চিত্তে উত্তর দিল যায়িদ।
    এর আগে কোথাও কোন কাজ করেছো?
    না, এখনও কোথাও কোন কাজ করিনি। মাত্র পরিকল্পনা করেছি। বিজ্ঞাপনটা দেখে আমরা খুবই আনন্দিত। আমাদের হাতে খড়ির একটা সুযোগ হল।
    তালহার কথাটা শুনে তার দিকে ফিরল রওশন মজুমদার। কপাল কুঁচকে বেশ অবাকের শুরে বলল, হাতে খড়ি? বাঘা বাঘা অভিজ্ঞ গোয়েন্দারা হার মেনে গেল আর তোমরা বলছ তোমরা হাতে খড়ি নিবে। বিজ্ঞাপনে অনেক টাকা পুরস্কার দেখে লোভ সামলাতে পারনি, না? তাই একটা কার্ড বানিয়ে এখানে চলে এসেছো।
    যা ইচ্ছা ভাবতে পারেন?
    দেখেতো ভদ্র ছেলে মনে হচ্ছে। এ বয়সে মুখে বেশ দাড়িও রেখেছো ।
    স্যার আপনিওতো দাড়ি রেখেছেন, বলল তালহা।
    তোমাদের বয়সেতো আর রাখিনি।
    আসলে যখন থেকে দাড়ি উঠবে তখন থেকে রাখাই নিয়ম।
    তোমাদের দেখে কিন্তু আমি মুগ্ধ।
    আমরা তাহলে কাজটা পাচ্ছি, তাইনা? বেশ দৃঢ়তার সাথে বলল তালহা।
    তোমার স্বভাবে বেশ দৃঢ়তা আছে। কিন্তু এখনও তোমরা বয়সে অনেক ছোট।
    ছোট বলে অবজ্ঞা করা ঠিকনা।
    ঠিক অবজ্ঞা না। কাজটা আমি আরও দক্ষ কাউকে দিয়ে করাতে চাই। আর বিজ্ঞাপন দেখে তোমাদের মত ছোটরা আসবে এটা ভাবতে পারিনি।
    কেন স্যার? এইযে এটা দেখেন। বিজ্ঞাপনের কাটা অংশটা এগিয়ে দিল তালহা।
    কি এটা?
    আপনার বিজ্ঞাপনটা।
    এটা দিয়ে কি করব?
    পড়ে দেখেন এতে কি লেখা আছে। কোন ধরণের লোক যোগাযোগ করবে এমন কোন কথা বিজ্ঞাপনে লেখা ছিলনা বলে বিজ্ঞাপনটা লোকটার দিকে বাড়িয়ে দিল তালহা।
    চলবে

    7
    2 Comments
Skip to toolbar