-
পোড়োবাড়ির রহস্য
পর্ব-দুইতালহার বাড়িয়ে দেওয়া হাত থেকে বিজ্ঞাপনের কাগজটা নিল রওশন মজুমদার। ভালো করে লেখাটা আবার পড়ল। তারপর তালহাদের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি দুঃখিত। আসলে আমি বুঝিনাই এই বিজ্ঞাপন দেখে কোন বাচ্চা ছেলেরা কাজটা নিতে আসবে। তাহলে আমরা সেভাবেই বিজ্ঞাপনটা লিখতাম। তোমরা এখন আসতে পার। জায়গাটা সম্পর্কে যা শুনেছি তাতে তোমাদের ওখানে পাঠানো একদমই ঠিক হবেনা।
স্যার সবসময় শুধু অভিজ্ঞতা দিয়ে কাজ হয়না। এসব ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার সাথে বুদ্ধিটাও জরুরী। অনেকক্ষণ পরে কথা বলল মুসায়েব।
তোমাদের কি ধারণা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকেও তোমাদের অনেক বুদ্ধি?
মুসায়েব উত্তর দিতে যাচ্ছিল কিন্তু ওর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে যায়িদ বলল, জ্বি মনে করি।
আমিও মনে করি তোমাদের অনেক বুদ্ধি আছে কিন্তু বুদ্ধির সাথে অভিজ্ঞতাও লাগে। তোমাদের কোন অভিজ্ঞতাই নেই। কিছুক্ষণ চুপ থাকল রওশন মজুমদার। তারপর আবার বললেন, ঠিক আছে আমাকে একদিন ভাবতে দাও।
আমরা কি তবে কালকে আসব? নিঃসংকোচে জিজ্ঞাসা করল তালহা।
এতো তাড়াহুড়োর কি আছে?
মনে হচ্ছে কাজটা করতে যথেষ্ট সময় লাগবে। এখন আমাদের অবসর সময়। আবার পড়ালেখা শুরু হয়ে যাবে। তাই এই সময়টাকে কাজে লাগাতে চাই, বলল তালহা।
ঠিক আছে তোমাদের সাথে যোগাযোগের ঠিকানাটা দিয়ে যাও। আমি জানাবো।
তালহা বলল, কার্ডটাতে আমাদের বিস্তারিত লেখা আছে। একটু থামল তালহা। কিছুক্ষণ পর আবার তাকাল রওশন মজুমদারের দিকে। বিজ্ঞের মত করে বলল, একটা ব্যাপার জানার লোভ সামলাতে পারছিনা।
কি ব্যাপার?
বিজ্ঞাপনে বাড়িটা সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা ছিলনা। নিরাপত্তার জন্যই কি এমন করা হয়েছে?
হ্যা সেরকমটাই। কার্ডটা নিজের পকেটে রেখে দিলেন তিনি। তারপর ওদেরকে লক্ষ্য করে বলল, তোমরা এখন আসতে পার।
ভারাক্রান্ত মনে তালহারা সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
কি, বললাম না, একাজ আমাদের জন্য না। বিশ্বাস হয়নি তখন, এখন দেখলিতো আমার কথা কেমন ঠিক। সুযোগ পেয়ে মুসাও খোঁচা মারতে ভুললনা।
যায়িদ আর তালহা ওর কথায় কোন উত্তর দিলনা। কিছুক্ষণ পর মুসায়েব আবার বলা শুরু করল, এগুলো বাদ দে। কয়দিন পরেই কলেজ শুরু হবে। তার আগে আবার কোচিং সেন্টারে ক্লাস নেওয়ার ব্যস্ততা। সেই ছকবাধা জীবনে প্রবেশ করতে হবে। ছুটি মাত্র পনের দিনের। ছুটির এই সময়টা বরং আমরা ঘোরাঘুরি করে কাটাই। মনও দেখবি ভাল হয়ে যাবে।
তালহা মুসার দিকে তাকাল। মুচকি হাসল। ভাবল ছেলেটা আসলেই খুব সহজ সরল। একটুও রাগলনা। বলল, তোর খুব ঘুরতে যেতে ইচ্ছা করছে, তাইনা? ভাবছি এবার তোদেরকে আমার নানুবাড়ি নিয়ে যাব।
একসাথে যায়িদ ও মুসায়েব দুজনেই হৈ হৈ করে উঠে বলল, সত্যি তালহা? আগে বলিসনিতো। কবে যাবো আমরা?
আগামী পরশু ছোটমামা আসবে আমাদের নিতে। কালকেই আসতে চাচ্ছিল কিন্তু আমি একদিন পরে আসতে বলেছি। তোরা যাবি আমার সাথে?
যাবোনা মানে?
তোদের বাসা থেকে অনুমতি পাওয়া যাবে? ওখান থেকে ছোটমামা সহ সম্পূর্ণ ঝিনেদাটা ঘুরে ঘুরে দেখব।
একদিন পর কেন? মুসায়েব জিজ্ঞাসা করল।
জানি কাজটা পাবনা। তাও একদিন অপেক্ষা করে দেখব ভদ্রলোক আমাদের ডাকে কিনা।
পাগল! ওই কাজ পাওয়ার আশা করা আমাদের ঠিক হবেনা। দেখলিনা ভদ্রলোক আমাদের পাত্তাই দিলনা।
দেখাই যাকনা। এখন বল তোরা যাবি কি না?
দূরে যাওয়া যাবেনা? উৎসুক হয়ে মুসায়েব বলল। আমার খুব পাহাড়ে ঘুরতে যেতে ইচ্ছা করছে।
পাহাড়! সেতো অনেক দূরের পথ। আমাদের বাসা থেকে কি এত দূরে যেতে দিবে? বলল তালহা।
যেতে দিলেও আমি যাবনা। বলল যায়িদ।
কেন তোর কি সমস্যা?
দ্যাখ মুসায়েব ঘোরাঘুরি থেকেও যে ব্যাপারটায় আমি বেশি আগ্রহ পাচ্ছি তা হল বাড়িটার রহস্য উদ্ধার।
উহ্ খুব একজন গোয়েন্দা হয়ে গেছিস। ভেংচি কাটলো মুসায়েব। তোকে ঐ কাজ দেওয়ার জন্য যেন বসে আছে!
কি একটা বলতে গেল যায়িদ তালহা থামিয়ে দিল। আবার ঝগড়া শুরু করেছিস তোরা দুজন। আমার কথার উত্তর দিলিনা তোরা।
কোন কথা? মুসায়েব জিজ্ঞাসা করল।
আমার নানুবাড়ি ঘুরতে যাবি কিনা?
যায়িদ বলল, তোর সাথে যাওয়ার ব্যাপারে আমার বাসা থেকে আটকাবেনা ইনশাআল্লাহ্। তোর সাথে যতই সময় কাটাই আমার মায়ের কোন আপত্তি নেই।
মুসায়েব, তুই অনুমতি পাবি?
তালহা বলেছে আর অনুমতি পাবনা? সকালেই মার সাথে তোকে নিয়ে আলাপ করলাম।
ও। ছোট করে উত্তর দিল তালহা।
কি আলাপ করলাম শুনতে চাইলিনা?
বলার মত হলে নিজেই বলবি। খামোখা জিজ্ঞেস করতে যাব কেন?
তোর এই নির্লিপ্ততা আমার সবসময় ভাল লাগেনা।
শুনতে চাইলেইতো কতগুলো প্রশংসা করে বসবি। প্রশংসার কথা এতো বেশি শুনতে হয়না। তাহলে অহংকার হয়। তারপর কথার মোড় ঘুরিয়ে বলল, তাহলে এটাই ঠিক হল যে, এবার আমরা আমার নানুবাড়ি নলডাঙায় বেড়াতে যাবো।
তালহার মুখে ওর নানিবাড়ির অনেক গল্প শুনে রীতিমত মুগ্ধ মুসায়েব আর যায়িদ।তাই সেখানে বেড়াতে যাওয়ার আনন্দে তারা দুজন আত্মহারা।
মুসায়েবের কথাই ঠিক। একদিন অপেক্ষা করার পরও বাড়িটার ব্যাপারে কোন ফোন না পাওয়ায় বেশ মন খারাপ যায়িদের।
সকাল সাতটায় বাসে করে নলডাংগার উদ্দেশে রওনা দিল তালহারা। শীতের সকাল, তাই রোদটাও বেশ মিষ্টি। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে তালহা। ওর একটা চমৎকার অভ্যাস আছে, রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় যতরকম লেখা আছে তা পড়তে পড়তে যাওয়া। বড় রাস্তার পাশের স্কুলগুলোর দেওয়ালে বড় বড় মনিষীদের উক্তি লেখা আছে, সাথে অনেক হাদিস ও কোরআনের বাণীও।
দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ, শিক্ষার জন্য সুদূর চীনে যাওয়া যায় ইত্যাদি সমাজে প্রচলিত যেসব হাদিস এসব জায়গায় লেখা থাকে, তালহার মেজচা বলেছে এসবের বেশীরভাগই নাকি জাল হাদিস।
এক ঘণ্টা লাগল তাদের নলডাঙায় পৌঁছাতে। এটা ঝিনাইদাহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রাম। নলডাংগা থেকে তালহার নানিবাড়ি পৌঁছাতে ২০ মিনিট লাগল। ঠিক ২০ মিনিট পর নারিকেল , সুপারি আর নানারকম ফল আর ফু্ল গাছ দিয়ে ঘেরা একটা দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাড়াল। বাড়িটার নাম ‘আপন নিবাস’। বাড়িটা যেমন সুন্দর বাড়ির নামটাও তেমন সুন্দর।
সদরগেটে দাড়িয়েই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকল যায়িদ আর মুসায়েব। দুজনেই একসাথে বলে উঠল, এতো সুন্দর!
কিরে এমন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছিস কেন? চল ভেতরে ঢুকি।
তালহার কথায় সম্বিৎ ফিরে পেল যেন তারা । যায়িদ বলল, ও আচ্ছা। আসলে কল্পনার মত সাজানো মনে হচ্ছে বাড়িটাকে। বাড়িটা ঘুরে দেখতে ইচ্ছা করছে।
আগে বিশ্রাম নে। তারপর সব ঘুরে দেখা যাবে।
ঠিক আছে।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর মুসায়েব আর যায়িদকে নিয়ে নানিবাড়ি ঘুরে দেখতে বের হল তালহা। বাড়িটা দেখতে তেমন কোন আহামরি না হলেও বেশ আকর্ষনীয়। স্রেফ কাঠের তৈরি একটা দোতলা বাড়ি। দোতলায় উঠার সিঁড়িটা বাড়ির বাইরের দিকে। সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে তৈরি বাড়িটা সাধারণ হলেও মুসায়েব আর যায়িদের কাছে তা অসাধারণ লাগল। পুকুর পাড়ে এসে দাঁড়াল তালহারা। শীতকাল তাই পুকুরের পানিও কমে গেছে।
সবাই মিলে পুকুর পাড়ে বসে সকালের রোদ পোহাল। সেখানে বসেই তিনজনে তাজা খেজুরের রস আর তালহার নানীর বানানো মজার মজার পিঠা খেল।
আমরা কি শুধু এখানেই বসে থাকব? বলল মুসায়েব। শুনেছি ঝিনাইদাহে দেখার অনেককিছু আছে। আমার খুব সব ঘুরে ঘুরে দেখার ইচ্ছা হচ্ছে।
বড় মামার গাড়িটা পাঠিয়ে দিয়েছে। তাহলে চিন্তা কি? যেখানে খুশি, যতক্ষণ খুশি ঘোরাঘুরি করা যাবে, কি বলিস তোরা? কাছেই নলডাঙ্গা রাজবাড়ি আছে। চল আজকে আমরা সেখানে যাই, বলল তালহা।
রাজবাড়ি? আমি আগে কখনও রাজবাড়ি দেখিনি, বলল যায়িদ। বইতে রাজবাড়ির বর্ণনা পড়ে আমার খুব রাজবাড়ি দেখার ইচ্ছা।
তালহার ছোট মামা বলল, রাজবাড়িগুলো এখন আর রাজবাড়ি নেই। সব সরকারের দখলে চলে গেছে। এর অনেকগুলোই সরকারি অফিস হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে এটা একটু অন্যরকম। আমি একবার গিয়েছি, বলল তালহা।
কেমন শুনি, উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করল যায়িদ।
গেলেই দেখতে পাবি। তারপর তার ছোট মামাকে উদ্দেশ্য করে বলল, মামা তুমি কি আমাদের সাথে যেতে পারবে?
ঠিক আছে তোমরা তৈরি হয়ে নাও। আমি তোমাদের সাথে রাজবাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাব কিন্তু রাজবাড়ি ঢুকবোনা। পাশেই আমার এক বন্ধুর বাড়ি। ওর সাথে আমার ব্যবসায়িক কাজ আছে। তাহলে চল যাওয়া যাক।
ঠিক আছে চল বলে সবাই মিলে রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল তারা।
চলবে3 Comments
Friends
Shoriful Shoron
@shoriful-shoron
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
Morsalin Islam Shouradip
@morsalinshouradip
জাস্রা জুমান
@nmafin4gmil-com
Hijbullah hiju
@hijbullah
মোঃ রিদওয়ান আল হাসান
@mridwanalhasan
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam



খুব সুন্দর ও সাবলীল! এভাবেই চলুক!