Profile Photo

mahamuda khaunOffline

  • mahamuda
  • Profile picture of mahamuda khaun

    mahamuda khaun

    3 years, 11 months ago

    পোড়োবাড়ির_রহস্য
    পর্ব_ছয়
    বুধবার রাতেই ওমর শরীফ এসে হাজির হলো।তাদেরকে নিয়ে বৃহস্পতিবার নলডাংগায় যাবে। এখনও কলেজ জীবন শুরু হয়নি। তাই ব্যস্ততাও অনেকটা কম। তালহা ফজরের নামাজ পড়ে কখনও ঘুমায়না। মসজিদ থেকে বের হয়ে কিছুক্ষণ হাটাহাটি করে বাসায় চলে আসে। তারপর পড়ার টেবিলে বসে কোরআন পড়ে। আজও ফজরের নামাজ পড়ে পড়ার টেবিলে বসে আছে তালহা। একটা বই পড়ছিল কিন্তু তাতে মন বসাতে পারছেনা। পোড়োবাড়িটা মাথা জুড়ে বসে আছে। আনমনে জানালা দিয়ে উঠানের তাকিয়ে আছে তালহা। যৌথভাবে থাকার কারণে এমনিতেই বাড়িটা সবসময় জমজমাট হয়ে থাকে। জমজমাট রাখার জন্য তালহার ছোট চাচার ছেলে আলিই যথেষ্ট। সারাদিন বাড়িটা মাতিয়ে রাখে। দুই বছর বয়স। ঘরে থাকতেই চায়না। সুযোগ পেলেই উঠানে চলে যায়। তালহার পড়ার ঘর থেকে উঠানটা খুব ভাল দেখা যায়।পড়ার টেবিলে বসে মাঝে মাঝে ওর দুষ্টুমি উপভোগ করে তালহা। আজকে ভোরেই ঘুম থেকে উঠে গেছে সে। উঠানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বই বন্ধ করে ওর কান্ড-কারখানা দেখছে তালহা। উঠানে এ মাথা থেকে ঐ মাথা দৌড়ে বেড়াচ্ছে সে। ওর পেছনে ছোট চাচীর খাদেমাটাও দৌড়াচ্ছে। বড় চাচারা এখনও ঘুমাচ্ছে। জেট ল্যাগ কাটিয়ে উঠতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগে। পড়ার ঘর থেকে বেড়িয়ে অফিস রুমে চলে গেল তালহা। কম্পিউটারটা চালাল। বসে না থেকে গোয়েন্দাগিরির জন্য একটা ই-মেইল আইডি খুলে ফেলল। নামটা আগেই সিলেক্ট করা ছিল। তাই কার্ডে আগেভাগেই দিয়ে রেখেছে। কাল নলডাংগায় যাবে। তিনদিন থাকবে সেখানে। তালহা ভাবল মুসায়েব আর যায়িদকে নিয়ে কিছুক্ষণ পরামর্শ করলে ভাল হত। যেই ভাবা সেই কাজ। নাস্তা না খেয়েই বেরিয়ে গেল তালহা। আজ শুক্রবার। যায়িদদের বাসায় গিয়ে ঘিয়ে ভাঁজা পরাটা খাবে বলেই নাস্তা করলনা। সাইকেলে গেলে যায়িদদের বাসায় যেতে ১০ মিনিট লাগে আর হেঁটে গেলে আধঘণ্টা।তালহা হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।সকালের শীতল বাতাসে হাঁটতে খারাপ লাগবেনা। একটু জোরেই হাটল তাই আধঘণ্টার আগেই পৌঁছে গেল যায়িদদের মহল্লায়। এই এলাকাটা খুব গোছানো। আবাসিক গোছের। সব প্রকৃতি প্রেমিকরা যেন এখানে বাস করে। সবার বাড়িতেই বাগান। যায়িদদের গেট জুড়ে লাগানো কামিনী গাছটা থেকে মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। বিকাল নেমে সন্ধ্যা এলেই এই ফুল ফোঁটা শুরু করে। গত রাতের ফোঁটা ফুল এখন গন্ধ বিলোচ্ছে।
    কলিং বেল টিপল তালহা। যায়িদের ছোট ভাই জুনায়েদ এসে দরজাটা খুলে দিল। খুব দুরন্ত ছেলে। তবে বুদ্ধিদীপ্তও বটে। এই বয়সেই কোরআনে হাফেজ। আন্তর্জাতিক খেতাবও ছিনিয়ে এনেছে। বাসায় দুষ্টামী করলেও বাইরের লোকের সামনে সে খুব ভদ্র। ওর যত দুষ্টামীর গল্প যায়িদের কাছে শোনা যায়। তালহাকে দেখে কোনমতে সালাম দিয়ে পড়িমরি করে দৌড় দিল। তালহা যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণ ও এদিকে পা মাড়াবে না। বসার ঘরটা যায়িদই খুলে দিল। ঘরে ঢুকে বসল তালহা।
    কিরে এতো সকালে কি মনে করে? জিজ্ঞাসা করল যায়িদ
    কেন হঠাৎ আসতে নেই নাকি?
    তা কেন হবে? কিন্তু কখনও এভাবে আসিসনি তাই।
    তুই চমকে যাবি তাই আসলাম।
    সকালের নাস্তা করেছিস?
    না, চাচীর হাতের পরাটা খাব বলে না খেয়েই এসেছি।
    তুই জানলি কিভাবে আমরা আজকে পরাটা খাব।
    গোয়েন্দাগিরি করে।
    হেঁয়ালি করিসনা। বলনা কিভাবে বুঝলি মা আজকে পরাটা বানাচ্ছে।
    তালহা নাক টেনে ঘ্রাণ নেওয়ার মত করে দেখাল।
    ততক্ষণে যায়িদের নাকেও ঘিয়ে ভাঁজা পরাটার ঘ্রাণ চলে এসেছে। ও এই তাহলে কারণ। কিন্তু বাসা থেকেতো আর ঘ্রাণটা পাসনি।
    কিরে তোর পরাটায় ভাগ বসাবো তাই এতো জেরা করছিস?
    আরে তা কেন হবে?
    তাহলে বারবার এককথা বলছিস কেন?
    কৌতূহল। শ্রেফ কৌতূহল। গোয়েন্দা হয়েছিনা? তাই কৌতূহলও বেড়ে গেছে। চল, আগে নাস্তা করি তারপর শোনা যাবে তুই কেন এসেছিস।
    যায়িদের মায়ের যেকোন রান্নাই অসাধারণ। তালহার নিজের মার রান্নাও অনেক প্রিয়। মায়েদের রান্নাই মনে হয় এমন হয়। ওদের আজকের নাস্তা ঘিয়ে ভাঁজা তুলতুলে পরোটা, সাথে আলু ভাজি আর ডিম ভাজি। তালহার কাছে অসাধারণ লাগল খাবারটা।
    নাস্তা করেই বেরিয়ে গেল তালহা আর যায়িদ। মুসায়েবদের বাসায় যাবে। যায়িদদের বাসার কাছেই ওদের বাসা। দুই মিনিটের রাস্তা। তালহাদের মত মুসায়েবরাও দাদী বাড়ি থাকে। ওর দুই চাচা আর এক ফুফু।ওর ফুফুও এবাড়িতেই থাকে। দাদী বাড়ির পাশেই মুসায়েবের নানি বাড়ি।মুসায়েবের মা-বাবা খালাতো ভাই বোন। বিশাল জায়গা নিয়ে ওর দাদী বাড়ি। সবই টিনের একতলা ঘর। বাড়ির চারপাশে উঁচু পাচিল। পাচিল ঘেঁসে নানারকম গাছ শোভা পাচ্ছে। বাড়ির গেটে সবসময় একজন দারোয়ান থাকে। গেটের সাথেই তার ঘর।পরিবার নিয়ে থাকে। দারোয়ানের বউ ভিতরে খাদেমা হিসাবে নিয়োজিত। কলিং বেলের শব্দ পেয়ে দরজা খুলে দিল দারোয়ান জহিরউদ্দিন। তালহাদের দেখেই একগাল হাসি উপহার দিল। সবসময় মুখের মধ্যে একটা হাসি লেগেই থাকে। জহিরউদ্দিন চাচাকে হাসি ছাড়া কোনদিন দেখেনি তালহা। তালহা ভাবল, লোকটার কি কোন দুঃখ নাই নাকি। তবে হাসতে পারাটাও একটা নিয়ামত। হাসি একটা সাদাকাও বটে।
    সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল তালহারা। জহিরউদ্দিনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কেমন আছেন জহির চাচা? শরীর ভালো?
    হ্যা আলহামদুলিল্লাহ। তা বাবারা তোমরা কেমন আছো?
    আমরাও আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালো আছি? মুসায়েব আছে বাসায়?
    হ্যা বাসাতেই আছে। ভেতরে যাবেনা তোমরা? না-কি ডেকে দিব?
    তালহা বলল, ডেকে দিলেই ভালো হত। এই সাত সকালে বাসার ভিতর ঢুকতে ইচ্ছা করছেনা। লজ্জা লাগছে।
    লজ্জা কীসের? ঠিক আছে, তোমরা এই চেয়ারটায় বস। আমি ডেকে দিচ্ছি বলে জহির চাচা মুসায়েবকে ডাকতে চলে গেল।
    দারোয়ান হলে কি হবে জহির চাচা কিন্তু খুব পরিপাটী হয়ে থাকে, তাইনারে তালহা?
    অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল তালহা। নানারকম চিন্তা খেলছে তার মাথায়। পোড়ো বাড়িটা মাথা থেকে যাচ্ছেইনা। এর পরের বার গিয়ে কি করবে তা নিয়ে মনে নানারকম পরিকল্পনা ভিড় জমাচ্ছে তার মাথায়।
    কিরে আমার কথা শুনতে পাসনি? সকাল থেকে দেখছি বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিস। কি এতো ভাবছিস?
    বাড়িটার রহস্য বের না করা পর্যন্ত আমার শান্তি পাচ্ছিনা।
    হয়েছে সারাক্ষণ এসব নিয়ে চিন্তা করতে হবেনা। চল মুসায়েব না আসা পর্যন্ত ঐ চেয়ারটাতে বসি।
    ঠিক আছে চল।
    বাগানের পাশে অনেকগুলো সিমেন্টের চেয়ার পাতানো আছে, তার একটাতে বসে পড়ল তারা দুজন।
    কিছুক্ষণ পরে চোখ ডলতে ডলতে মুসায়েবের আগমন ঘটল। বাগানের বেঞ্চে বন্ধুদ্বয়কে দেখে চোখ কপালে উঠে গেল। এতো সকালে ওরা এখানে কি করছে? জহিরউদ্দিন চাচা ঘুম থেকে ডেকে তুলে নিয়ে আসার সময় কি বলেছে ঘুমের জন্য ঠিকমত বুঝতে পারেনি মুসায়েব। চোখ রগড়ে ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, কিরে কোন সুসংবাদ আছে নাকি?
    সুসংবাদ? কিসের সুসংবাদ? নাক মুখ কুঁচকে যায়িদ জিজ্ঞাসা করল।
    না এত সকালে তোদের দেখে ভাবলাম কোন সুসংবাদ নিয়ে এসেছিস।
    না এমনিই এসেছি। তালহা বলল। কালকে পড়োবাড়ি যাবো সেই ব্যপার নিয়ে কিছু কাজ আছে । তোরা দুজন এখন আমার সাথে অফিসে যাবি।
    এ্যা, আমি এখনও খাইনি।
    যা, খাওয়ার জন্য দশ মিনিট সময় দিলাম।
    তোরা খাবিনা।
    আমরা খেয়ে এসেছি। তোর মত অলস নাকি! খোঁচা দিয়ে মুসায়েবকে কথাটা বলল যায়িদ। যা খেয়ে আয়।
    মুসায়েবের খাওয়া শেষ হলে তারা সোজা তাদের গোয়েন্দা অফিসে চলে আসে।
    গত রাতে ‘ সিকিউরিটি ইনটেলিজেন্স সংস্থা’ সম্পর্কে কিছু তথ্য ডাউনলোড করে রেখেছিল। রবিনকে সেটা থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো টুকে নিতে বলল। ও আর মুসা মিলে প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যাগে ভরে নিল।
    ‘ সিকিউরিটি ইনটেলিজেন্স সংস্থা’ নিয়ে নোট করা শেষ হলে নোটবুকটা নিয়ে তালহার দিকে ঘুরে বসল যায়িদ। তারপর জোরে জোরেই পড়া শুরু করল। তথ্য অনুযায়ী এই সংস্থা দেশে বিদেশে গোয়েন্দা কাজে বেশ সফলতা অর্জন করেছে, বলল যায়িদ। এদের সাথে টেক্কা দেওয়া অত সহজ হবেনা। এদের চাহিদাও অনেক। এই সংস্থাকে নিয়োগ দিতে গিয়ে সরকারকে বেশ মোটা অংকের টাকা গুনতে হবে। বাংলাদেশের বাইরে বিদেশে বিভিন্ন রকম গোয়েন্দা কাজে এদের সফলতা চোখে পড়ার মত। শেষ কাজটা ওদের বাংলাদেশেই ছিল। এখানেও তারা বেশ সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। গত বছর ধানমন্ডির একটা স্কুলে বাচ্চা হারানো সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে সেখানে হুলুস্থুল পড়ে যায়। স্কুল কর্তৃপক্ষের সতর্কতা সত্ত্বেও প্রতিদিন কোন কোন বাচ্চা নিখোঁজ হচ্ছিল। উপায়ান্ত না দেখে এই সংস্থাকে নিয়োগ দেয়। এক সপ্তাহের মধ্যে তারা রহস্য উৎঘাটন করে। শর্ত ছিল সব বাচ্চা ফিরিয়ে আনতে পারলে মোটা অংকের টাকা দিবে। পেরেছেও তারা। হারিয়ে যাওয়া বিশটা বাচ্চাকেই তারা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। কাজ শেষে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা দাবি করে বসে। ধনীদের স্কুল বলে টাকাটা দিতে কারোরই বেগ পেতে হয়নি। অভিভাবকরা সবাই মিলেই টাকাটা পরিশোধ করে দেয়। পড়া থামিয়ে বলল, এতটুকুই পেলাম।
    তালহাকে একটু চিন্তিত দেখাল। চোখে মুখে চিন্তার রেখা ফুটিয়ে বলল, ঠিক আছে এতেই হবে।
    একটা তথ্য পেলে ভাল হত। বেশ আগ্রহের সাথে বলল মুসায়েব।
    কি তথ্য? অবাকের স্বরে যায়িদ বলল।
    পোড়োবাড়িতে ওরা কবে থেকে কাজ শুরু করে করবে এই তথ্য।
    ওটাতো সিক্রেট, বলল তালহা। আমাদের গোছগাছ শেষ। কাল সকালেই আমরা রওনা হচ্ছি ইনশাআল্লাহ্‌।

    চলবে

    8
    2 Comments
Skip to toolbar