Profile Photo

আবু হুরাইরাOffline

  • Ibnenazzar824
  • Profile picture of আবু হুরাইরা

    আবু হুরাইরা

    • 4 years, 3 months ago

    “বার বার যেই নামাজির খোঁজে ফেরে পৃথিবী….”

    — ইবনে নাজ্জার।

    সুন্দর এই ভূগোলকের ইতিবৃত্ত আর কালের আবর্তন হিন্দুস্তানের পরতে পরতে ইসলামি শক্তির এমন তোজোদৃপ্ত ঝলক দেখেছে যে, শত শত বছর কেটে গেছে কিন্তু আজও ইতিহাসের চোখ ছানাবড়া হয়ে আছে। এমনকি এই তো সেদিন ভারতের মায়সুরের এলাকার সাবেক মন্ত্রী ড. এল হনুমানতিয়া সাহেব যখন মুসলিমদের জনসভায় একটা ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তার কণ্ঠে ইসলামের স্বর্গীয় ইমানি শক্তির প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধার শত শত বছরের পুরনো সেই ঐতিহাসিক সুর ভেসে উঠেছিল। 

    ঘটনাটি এমন…
    আজ থেকে কয়েকশ বছর আগের ঘটনা। স্বৈরতন্ত্রের মহা প্রতীক হায়দরাবাদের ‘গোলকোন্ডা’ দূর্গের দানবাকৃতির বিশাল প্রাচীর চোখ বড় বড় করে দেখছিল যে, আকাশছোঁয়া উঁচু দেওয়ালের উপর থেকে ছোড়া তিরবৃষ্টির মধ্যেও বাদশাহ আলমগীর রহ.-এর মুসলিম বাহিনী এক অনন্য শান-শওকত, জৌলুস, ঐশ্বর্য, ঠাট-কাট ও নিরুপম দৃঢ়তার সাথে দাঁড়িয়ে আছে। ভয় ও রক্তঝড়ের অসংখ্য দমকা হাওয়া পাহাড়ের মতো অবিচল, সুদৃঢ় ও মজবুত মুসলিম সেনাবাহিনীকে এক চুলও নড়াতে পারছে না। রক্ত মাংসে গড়া আর নরম চামড়ায় ঢাকা শরীরগুলো আঘাতের পর আঘাত খেয়েও বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছিল, রক্তের লাল সমুদ্রে বড় কোনো দ্বীপ জেগে উঠেছে অথবা কোনো ভূখণ্ডে মৃত্যুর শিলা বৃষ্টির মাঝেও বড় এক পাথর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

    বিভিন্ন রঙের ছোট বড় পাথরে নির্মিত এই দূর্গের উঁচু দেওয়াল। যার দিকে শত্রুরা কখনো চোখ তুলেও তাকাতো না—বজ্রপাত আর ভারী বর্ষণের ঝড়-তুফান যাকে মাথা নিচু করে শ্রদ্ধা নিবেদন করতো—পাহাড় কাঁপানো ভূমিকম্পরা যার পাশ কাটিয়ে চলে যেতো—যার ঝুলি মাহাত্ম্য, আভিজাত্য, শ্রেষ্ঠত্ব, ঐতিহ্য ও গৌরবে ভরা ছিল—যেই দেওয়াল কখনো ভুলেও ভাবেনি যে, রক্ত মাংসে গড়া মানুষের নরম শরীরে কখনো তির-বৃষ্টি আর পাথর-বন্যার মোকাবেলা করার সাহস জাগতে পারে—মজবুত ভারী পাথরের নির্মিত হওয়া সত্ত্বেও আজ তার ভিত্তি থরথরে কাঁপছিল। রক্ত মাংসে গড়া মুষ্টিময় কিছু মানুষের কঙ্কাল নিজেদের ইমানি সাহসিকতা, মজবুতি ও দৃঢ়তার জোরে তার শতবর্ষী পুরানো সেই গৌরব ও ঐতিহ্য মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছিল। মুসলিম বাহিনীর তির-কামানের আঘাতে কেল্লার প্রাচীর ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছিল। অথচ বহু দিন যাবত চতুর্দিক থেকে তাদের অবরোধ করে রাখা হয়েছিল। জীবন-মৃত্যুর বুক চিরে বয়ে চলা আশংকা ও আতংকের খরস্রোতা নদীর মধ্যখানে আটকে ছিল। শত শত রক্তঝরা তাজা ঘা-ক্ষত নিয়েও তারা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে শান্ত-শিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, তাদের বুকের ভিতর খোদাপ্রেমে মত্ত আত্মাগুলোকে ছুঁয়ে দেখার সাহসও কারো নেই। 

    মানবতার ইতিহাস চোখ বড়বড় করে দেখছিল—দূর্গের উঁচু উঁচু দেওয়ালেরা চিন্তার সাগরে ডুবে গিয়েছিল—দেওয়ালের উপর দক্ষ তিরন্দাজের প্লাটুনগুলো বিভ্রান্তিতে দিশেহারা হয়ে ভাবছিল যে, অবশেষে তাদের শরীরে কোন জিনিসের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছে, যা রক্তের বন্যায় ভেসে যায় না আবার তির-বর্শার ভয়ঙ্কর ঝড়ো হাওয়ায় নিভে না। তবে বিস্ময়াভিভূত উৎসুক সেনাদের জন্য রুদ্ধশ্বাস এই যুদ্ধের ময়দানে এর চেয়ে আরো ভয়াবহ একটি সংঘর্ষ অপেক্ষা করছিল।

    অবশেষে সেই মূহুর্ত ঘনিয়ে এল। মুজাহিদ বাহিনী সপ্তাহ ধরে জীবন বাজি রেখে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করে বিজয়ের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল—তির-বর্শার অমানবিক আঘাতের রক্তঝরা ক্ষতগুলোতে বিজয়ের নরম ও মিষ্টি হাত পটি বাঁধার প্রস্তুতি নিচ্ছিল—দুনিয়া তার সমস্ত সৌন্দর্য, চাকচিক্য আর যশ-খ্যাতি মাথায় নিয়ে আত্মসমর্পণের জন্য মুজাহিদদের পায়ে লুটিয়ে পড়েছিল—কেল্লার বাহিরে রক্ত ও ঘামের সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়া সৈন্যদের সামনে এই সুবর্ণ সুযোগ এল যে, লোহার ফটক ভেঙে দৌড়ে দূর্গের মাথায় চড়ে বসবে আর তিরের বৃষ্টি বর্ষণকারী নিষ্ঠুর হিংস্র তীরন্দাজদের উপর বজ্রপাতের ন্যায় হঠাৎ আক্রমণ করবে। ঠিক সেই মুহূর্তে। হ্যাঁ ঠিক সেই সময়, ঠিক তখনই মানুষেরা শুনতে পেল, মহান রবের ডাক! “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার!” আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে বড় সত্তা। “হাইয়া আলাস সালাহ, হাইয়া আলাল ফালাহ!” সুতরাং ক্ষনস্থায়ী এই রঙিন দুনিয়ার সমস্ত রঙ-তামাশা ছেড়ে দিয়ে নামাজ পড়তে আসো। কামিয়াবী ও সফলতার দিকে আসো। দ্রুত দৌড়ে যাও মহান রবের ডাকে সাড়া দিতে।

    ততক্ষনাৎ তারা এই শব্দগুলোকে বাস্তবে রুপ দিল। সব কিছু ভুলে মহান রবের ডাকে সাড়া দিল। মুখ ফিরিয়ে নিল পার্থিব সকল রঙ-তামাশা থেকে। হাতের নাগালে থাকা গোলকোন্ডা দূর্গের মতো দুনিয়াবি এতো বড় ও দামী সম্পদ থেকে মুখ ফিরিয়ে ‘নামাজ ও সফলতা’র ডাকে সাড়া দিতে দারুন উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে দৌড় দিল—বহুদিনের স্বপ্নীল আশাগুলো, সুস্বাদু ও লোভনীয় খাবারের মজাদার স্বাদেরা, রোমাঞ্চময় শারীরিক চাহিদাগুলো মোট কথা পুরো পার্থিব জীবনটাই তাদের পিছু পিছু ডাকতে ডাকতে দৌড়ে দৌড়ে আসতেছিল—কিন্তু তারা সব দিক থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে একাগ্রতার সাথে সারা বিশ্বের একমাত্র পালনকর্তা মহা পরাক্রমশালী সেই খোদার সামনে অত্যন্ত নম্র, ভদ্র ও শালীন হয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেল—হিরে-মতির স্তূপ গুলো তাদের করাগত হতে চিৎকার করে কাঁদছিল কিন্তু তারা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে নিজেদের রবকে খুশি করতে মূল্যহীন তুচ্ছ মাটিতে মাথা রাখতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল—স্বৈরাচার নিষ্ঠুর সৈন্যরা তাদের দাসত্ব,গোলামি আর আনুগত্যের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল কিন্তু তারা স্বীয় রবের গোলামি ও বন্দেগির আবেগে নিবেদিত প্রাণ হয়ে সকল বাদশাহর বাদশাহের সামনে মাটিতে চুমু খাচ্ছিল—লোহা-পাথরের নির্মিত সোনা-দানার খাজানায় ভর্তি শাহী কেল্লার চাবির ছড়াগুলো তাদের হাতে এসে পড়ছিল কিন্তু তারা সেগুলো ফেলে দিয়ে হাত ঝেড়ে-ঝুড়ে সাফ করে জীবনের শেষ পরিণতির চিন্তায় হাশরের মাঠে ইনসাফ ও ন্যায় প্রদানকারী মহান রবের সামনে মাগফিরাত ও ক্ষমার জন্য ভিক্ষার হাত পাতছিল। কেমন জানি মহান রবের ঐ ডাকের গুটিকয়েক শব্দের এতো দাম যে, রাজমুকুট ও সিংহাসন, রাজদরবার ও প্রাসাদও তার কাছে অনর্থক মূল্যহীন—মনে হচ্ছিল তারা ভালো-মন্দ, লাভ-ক্ষতি আর সুখ-দুঃখের চাদরে ঢাকা এই পৃথিবী মাড়িয়ে ছুটে চলছিল এক অন্য পৃথিবীর দিকে। যার মনজিল-এ-মকসুদ ছিল এই আসমান জমিন পেরিয়ে আরো দূরে। জীবন-মৃত্যুর খেলাঘর থেকেও বহুদূরে। দূরে অনেক দূরে। 

    জীবন উৎসর্গের এই দৃশ্য কতই না আশ্চর্যকর, সুন্দর ও আকর্ষণীয় ছিল! যা দেখে শুধু ইসলামই নয় বরং কুফর-শিরকেরও মাথা ঘুরে গিয়েছিল। গোলকোন্ডার বাদশাহ ও তার দক্ষ তিরন্দাজরা এই ঘটনা দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। স্বচক্ষে দেখার পরও তারা বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, এরাও মানুষ হতে পারে! যারা রঙ-তামাশায় ঘেরা মনোরম আকর্ষণীয় বস্তুবাদী এই পার্থিব জগতে বসবাস করেও অদৃশ্য চিরস্থায়ী সেই জগতের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। যারা এক অদৃশ্য খোদার অস্তিত্ব ও অদৃষ্ট জগতের বিদ্যমানতায় এতো বিশ্বাসি যে, হাজারো সুযোগ-সুবিধায় ঘেরা চাকচিক্যময় এই দুনিয়া আর বিভিন্ন রকমের ধন-দৌলতে ভরা লক্ষ লক্ষ খাজানাও তাদের কাছে অনর্থক অপদার্থ মনে হচ্ছে। তবে গোলকোন্ডার বাদশাহ ‘তানাশাহ’ এখনো এটাই ভাবছিল যে, ইবাদাতের এই আবেগ ও জযবা বর্শা, তলোয়ার আর তির-ধনুকের সামনে এক খোদার পবিত্র কদমে সেজদা করার ভয়ঙ্কর পরিণতি জানে না। কেল্লার উপর থেকে নামাজরত অবস্থায় তাদের উপর ‘তীক্ষ্ণ ছুঁচোলো তিরের অনবরত বর্ষণ’ যখন এর ভয়াবহতা বুঝাবে, তখন ভক্তি ও শ্রদ্ধায় নত এই মাথাগুলো ভয় ও আতংকে দিক-বিদিক দৌড়ে পালাবে। দল বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা ঐক্যবদ্ধ ‘খোদার সৈনিকরা’ মানুষের আক্রমণের ভয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে। 

    ইতিমধ্যে ইকামাত হয়ে গেল। ইমাম সাহেব পৌঁছে গেলেন জায়নামাজে। ইসলামের জন্য দুনিয়াকে বাজি রেখে দাঁড়িয়ে গেলেন নামাজে। জীবন-মৃত্যুর আশা ও ভয় ভুলে হাত বেঁধে নমনীয়তা প্রর্দশন করলেন স্বীয় রবের সামনে। সাক্ষ্য দিলেন এক মহা সত্য ও বাস্তবতার। বললেন, “আমার দেহ ও প্রাণ, আত্মা ও শরীর সব কিছুই আপনার আমানত। তাই আপনার ডাকে সাড়া দিতে সব কিছুই উৎসর্গ করলাম।” 

    এদিকে সেনাবাহিনীর এক সাধারণ মানুষ এই পবিত্র সাক্ষ্য দিল আর জামাতের একই কাতারে দাঁড়িয়ে বাদশাহ ও প্রজা তার সুরে নিজেদের হৃদস্পন্দনের সুর মেলাল। অন্যদিকে দূর্গের উঁচু প্রাচীরের ফাঁক থেকে একটা তির শোঁ শোঁ করে এগিয়ে এল আর ইমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণের দাবিদার কলিজাটা চিরে পৃষ্ঠদেশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। ইমাম লাশ মহান রবের নাম নিতে নিতে জায়নামাজের পাশে ঢলে পড়ল। তৎক্ষণাৎ পিছন থেকে ‘দ্বিতীয় ইমাম’ এসে জীবন উৎসর্গ করতে জায়নামাজে এগিয়ে এল। বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন মৃত্যুর রক্তাক্ত মুখের ধারালো দাঁতের সামনে। ইমান ও একিনের এই মানবমূর্তি পাহাড়ের মতো দৃঢ়তা ও অবিচলতা আর অনন্য শান-শওকত নিয়ে নামাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেন। হঠাৎ ধনুক থেকে আরেকটা তির বের হলো আর ‘দ্বিতীয় ইমাম’কে কাত করে ফেলে দিল রক্ত ও ধুলোর মাঝে। 

    কিছুক্ষণ জায়নামাজ খালি রইল। আকাশ-বাতাস শ্বাস বন্ধ করে এই বিস্ময়কর দৃশ্য অবলোকন করছিল। দূর্গের উপর থেকে বাদশাহ ‘তানাশাহ’ আর তিরন্দাজরাও আল্লাহপ্রেমের এই খেলা দেখছিল আর বিস্ময়াভিভূত হয়ে মূর্তির মতো নিরব নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে ছিল। মুসল্লিরা ভাবছিল, এখন ‘তৃতীয় ইমাম’ কে হবে? তিরন্দাজরা নতুন শিকারের অপেক্ষা করছিল আর দেখছিল, এই ‘নিশ্চিত মৃত্যুর’ মুখে কে লাফিয়ে পড়ে? ‘তানাশাহ’ অপলক নেত্রে তাকিয়ে ছিল আর ভাবছিল, হয়তো কুফরের আক্রমণ প্রভাব ফেলেছে। ইমান ও একিনে পরিপূর্ণ অন্তরগুলো অতর্কিত এই হামলার কোপ খেয়ে আজীবনের জন্য নিঝুম নিরব নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। কেল্লার উঁচু প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে থাকা হিংস্র পশুর মতো সৈন্যরা খুশি ও অহংকারের বুনো উল্লাস করছিল।

    তবে পরবর্তী মুহূর্তেই তাদের হিসাব গড়মিল হয়ে গেল। তাদের চিন্তার আকাশে হঠাৎ বজ্রপাত হলো। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। হা করে চেয়ে রইল তানাশাহ ও তার রক্তপিপাসু সৈন্যরা। তিরন্দাজদের হাত কেঁপে উঠল। তিরগুলো নিশানা ভুলে এদিক ওদিক মুখ থুবড়ে পড়ল বালুময় মাটিতে। সবার চোখে তাক লাগিয়ে খোদার রাহে জীবন উৎসর্গ করতে এবার কোনো সৈনিক নয় বরং এগিয়ে এলেন স্বয়ং ‘বাদশাহ আলমগীর’। শত শত কেল্লা ও হাজার হাজার সৈন্যের মালিক বাদশাহ শাহেনশাহ নিজের সমস্ত ধন-সম্পদ, মান-সম্মান ও এতো বড় জনশক্তির সমন্বয়ে গঠিত সম্রাজ্যকে শুধু মাত্র একটা সেজদার বিনিময়ে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। 

    ‘তানাশাহ’ ও তার তিরন্দাজরা কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি যে, জমিনে রাজত্বকারী একজন মানুষ নিজের ঘোর শত্রুকে মারতে মারতে হঠাৎ যখন ‘রবে’র পবিত্র ডাকের আওয়াজ কানে আসে; সাথে সাথেই থেমে যায়, হাত গুটিয়ে নেয় আর শত্রুদের হাজারো তিরের সামনে নিজেকে পেশ করে দেয়। ফলে তাদের শরীরের পশম দাঁড়িয়ে গেল—পুরো দেহে বয়ে গেল আবেগের অন্য রকম ঢেউ—ঘৃণা ও প্রতিশোধের নেশায় নিক্ষিপ্ত পাথরগুলোতে ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বিদ্যুৎ চমকে উঠল—মানবতার মর্যাদা ও মহত্ব ভূমিকম্প হয়ে কেল্লার সাথে কেল্লার বাদশাহকেও থরথরে কাঁপিয়ে তুলল—দারুন উত্তেজনায় ভরে গেল ‘তানাশাহ’র মন—মূহুর্তেই ভুলে গেল নিজের এতো দিনের সিদ্ধান্ত—বহু কষ্টে সাজানো এতো সুন্দর পরিকল্পনা পাল্টে ফেলল—থামিয়ে দিল তাক করে থাকা সঠিক নিশানাবাজ তিরন্দাজদের—গলা ফাটিয়ে সজোরে চিৎকার করে বললেন, “না! না! শাহেনশাহর উপর তির নিক্ষেপ করো না। ইনি মানুষ নন, ‘মহান দেবতা’।” তবে শাহেনশাহ সদলবলে জামায়াতের সাথে নিজ রবের সামনে মাটিতে সেজদা করে জানিয়ে দিলেন ‘তিনি কোনো দেবতা নন—শুধু মাত্র একজন মানুষ—আল্লাহর একজন গোলাম ও বান্দা—একেবারে দুর্বল এক মানুষ—যিনি কুসংস্কার আর অন্ধভক্তির দেবতাদের ধারে কাছেও ঘেষেন না’। 

    ইতিহাস সাক্ষি রয়েছে মানুষ যখন নিজের কাজে-কর্মে, ইবাদাত-বন্দেগিতে মহান ‘রব আল্লাহ’র দাসত্ব ও গোলামির প্রমাণ দিয়েছে; তখন শুধু গোলকোন্ডার দূর্গ নয় বরং আসমান-জমিনের সকল খাজানা আল্লাহ তাআলা তার পায়ে ঢেলে দিয়েছেন। তবে আমাদের দূর্ভাগ্য! আমাদের নিকটবর্তী ইতিহাসে এর নজির খুবই দুষ্প্রাপ্য, দুঃসাধ্য ও দুর্লভ। আর বর্তমান তো এমন ঘটনা থেকে একেবারেই খালি। ফলে ইতিহাস আজ এমন নামাজিদের খুঁজে ফেরে আর আমাদের মতো খোদাভোলা ধর্মভোলা জাতিকে জিজ্ঞাসা করে, “হে ইসলামের দাবিদারেরা! তোমাদের কপালেও কি এমন কোনো সেজদা আছে, যা এক আল্লাহর দোরগোড়ায় নত হতে বাধ্য করে?

    7
    3 Comments
Skip to toolbar