-
”শ্মশানের নিঃসঙ্গ শব্দেরা”
নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে গান শুনতাম বেশি। কবিতার প্রতি তেমন ঝোঁক ছিল না । তখন আসলে প্রেমে পড়ার বয়স। কলেজ জীবন শুরু হলে কবিতার প্রতি ঝোঁক বাড়তে থাকে, কারণ তখন সময়টা ছিল বিরহের! কবিতা লেখার চেষ্টাও করতে থাকি। মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য শব্দ খুঁজে পাই না। এ এক মহা বিপত্তি! কিছু বলতে চাই, বলতে পারি না। কিছু লিখতে চাই, শব্দ খুঁজে পাই না। বাড়ি থেকে বহু দূরে, বন্ধু নেই, নিঃসঙ্গ সময়। পাবনা শহরের অনতি দূরে শিঙ্গা নামক একটি এলাকা। সেখানে ইছামতি নদীর ধারে ছিল এক শ্মশান ঘাট (এখনও রয়েছে)। নদীর তীর ঘেষে বিরাট এক বট গাছ। সাইকেল চালিয়ে সেই শ্মশানে গিয়ে শান বাঁধানো বট গাছের নিচে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতাম । মৃত্যু দেখেছি, মৃত্যুর গন্ধ পেয়েছি, শব দেখেছি- সময়টা ছিল অদ্ভুত এক একাকীত্বের, নিজেকে চেনার, উপলব্ধির। নিঃসঙ্গতা থেকে বের হয়ে আসার জন্য রাজনীতিতে জড়িয়েছি, বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছি, সে স্বপ্নভঙ্গে হতাশ হয়েছি। রাজনীতি থেকে আবার ফিরে গিয়েছি শ্মশানের সেই একাকীত্বে। নিজের ভুলগুলো নিয়ে ভেবেছি, কখনও বট গাছটির নিচে শুয়ে মৃতপ্রায় ইছামতির মন্থরতা দেখেছি, কখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেছি, ভেসেছি কল্পনার রাজ্যে। সন্ধ্যে হলে ফিরেছি স্যাঁতস্যাঁতে মেস বাড়িতে। দু’টো বছর এভাবেই কেটেছে। এরই মাঝে শব্দেরা আমার কাছে ধরা দিয়েছে সেই মৃতপ্রায় ইছামতির পাড়ের বটগাছটার নিচে। শব্দেরা ধরা দিয়েছে, কিন্তু রাজনীতি পিছু ছাড়েনি। রাজনীতিকে ত্যাগ করেছি, সে ছেড়ে কথা কইবে কেন! এবার তার প্রতিশোধের পালা! সে ভিন্ন গল্প। তাদের গল্পে ফিরে আসি যারা আমার কাছে ধরা দিয়েছিল। শব্দেরা তখন আমার সাথে কথা বলতো। মনে হতো শব্দেরা সেই বট গাছের ডালে ডালে ঝুলে আছে। নিজের ইচ্ছে মতো তাদের আহরণ করার অধিকার তারাই আমাকে দিয়েছিল। নিঃসঙ্গ একজন মানুষের বন্ধু হিসেবে দেখা দিয়েছিল সেই শব্দেরা। তাদের সাথে কী কথা হতো? চলুন ঘুরে আসি সেই রাজ্যে—
– কী, ভাইসাব! এখানে প্রতিদিন বসে থাকেন, লেখাপড়া, কাজ-কর্ম কিছু নাই?
– আছে তো! ভালো লাগে না। এখানে ভালো লাগে, তাই আসি। তা, আপনি কে? আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?
– আমি শব্দরাজ। আমাকে দেখা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। অনুভব করতে পারছেন তো, না কি?
– হ্যাঁ, তা পারছি। মনে হচ্ছে, গাছের ডাল থেকে এক বর্ণের, দুই বর্ণের, তিন বর্ণের, আরও বড় বড় অনেক শব্দ চারিদিকে ঝুলে আছে! অপেক্ষায় আছে তারা, কেউ তাদের আহরণ করবে।
– বাহ! বেশ ভালো বলেছেন ব্রাদার। এরা সব আমার সাঙ্গপাঙ্গ। এদেরও কাজকর্ম নেই। তাই অপেক্ষায় আছে।
– এই অপেক্ষাটা কেন? কার জন্য এদের এই অপেক্ষা?
– দেখুন, সে একটা সময় ছিল বটে! পারস্যে, এরপর মুঘল আমলে, এমনকি এই আপনাদের এখানে গত শতাব্দীতেও কিছু মানুষ ছিল যাঁরা আমাদেরকে কাজে লাগাতে পারতো। তাঁরা গত হয়েছেন। আমরাও এখন বেকার। আমাদেরকে কেউ খুঁজে পায় না। তাই আমাদেরও কোনও কাজ নেই! দলবল নিয়ে তাই অপেক্ষায় আছি। বাংলা শব্দ বলে অনেকে আর খোঁজারও প্রয়োজন মনে করে না। আমরাও তো একবারে গণ্ডমুর্খ নই! পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের কিছু শব্দ আমরা নিজেদের করে নিয়েছি! তাতেও খুব একটা কাজ যে হচ্ছে, তা বলা যায় না। কদাচিৎ কোনও লেখক বা কবি ডাক দেন, তখন কিছুটা কাজ জোটে!
– আপনাদেরকে খূঁজতে হবে কেন! সমাজের মানুষেরা তো আপনাদেরকেই সব সময়ে ব্যবহার করছে। খুঁজে পেয়েছে বলেই তো সব সময় ব্যবহার করছে। এই শব্দ দিয়েই তো তারা ভাষা সৃষ্টি করেছে, সেই ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করছে! কী সব আবোল তাবোল বলছেন!
– এই যে! আপনিও খুঁজে পাননি। খুঁজে পাননি বলেই তো শুধু প্রচলিত ও আক্ষরিক অর্থ দিয়ে বিচার করছেন এই “খুঁজে পাওয়া” বিষটিকে।
– সময়ের তো অভাব নেই! তা, বুঝিয়ে বলুন। দেখি আপনার বক্তব্য বুঝতে পারি কি না!
– প্রেমে পড়েছেন কখনও? কিংবা বিরহে? তবে বিরহ যে আছে তা তো বুঝতেই পারছি! নইলে এই মরার শ্মশানে এসে বসে থাকে কেউ!
– হ্যাঁ। প্রেমে তো পড়েছিই। প্রেম আর বিরহ তো একই মূদ্রার এপিঠ-ওপিঠ!
– তা, ভায়া প্রেয়সীর মাথায় কেমন চুল ছিল? বলুন দেখি!
– কেমন আবার! ঘন, কালো কেশ!
– জীবনানন্দ কিন্তু ভিন্নভাবে বলেছেন! তিনি আমাদের খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই প্রিয়ার চুলের রূপ প্রকাশে তিনি ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করেছেন।
– ও, তা বটে! চুল তার কবেকার…
– হয়েছে, আর বলেতে হবে না! আপনার চিন্তার গভীরতা দেখে আমার লজ্জাই হচ্ছে মশাই! নেহায়েত একাকী ভালো লাগছিল না, তাই আপনার সাথে কথা বলতে আসা। নইলে আপনার মতো বোম্বেটে ধরনের মানুষের কাছে আমরা আসি না! যাকগে, এই যে এখানে দুই-এক দিন পরপর শবদেহ আসে, এগুলো দেখলে কী মনে হয়?
– মনে হয় যেন, খাটিয়ায় চড়ে আমিই আসছি। লাশগুলো দেখলে মনে হয় নিজেকে দেখছি। আয়না মনে হয়।
– ওরে বাপস্! উন্নতির চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি! বট গাছটাকে কী মনে হয়?
– মনে হয়, যেন নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ একজন মানুষ অপেক্ষায় আছে, মৃত্যুর।
– না! এটা কেমন গুরুচণ্ডালী ভাব হয়ে গেলো। আরে মশাই সহজ করে ভাবা যায় না?
– সহজ করেই তো ভেবেছি! বট গাছ একটা বিশাল ব্যাপার! বিশাল আকৃতি! বয়সও হয়েছে, একদিন তো থাকবে না, তাই না? নাকি এই বটগাছ অনন্ত কাল ধরে এখানে থাকবে!
– শব্দের পেছনে ছুটবেন না মশাই! তাহলে খুঁজে পাবেন না। আপনার নিজেরই ছায়া যদি আপনার সামনে পড়ে, আর সেই ছায়াকে যদি আপনি ধরতে চান তাহলে সে আপনার কাছ থেকে পালাবে, সামনে সামনে ছুটতে থাকবে। আবার ছায়াটি যদি আপনার পিছনে থাকে তাহলে আপনি তাকে ত্যাগ করতে চাইলেও সে আপনার পিছু পিছু আসবে।
– আরও খোলাসা করুন!
– আপনার মনের ভাব প্রকাশের জন্য ব্যতিক্রমী শব্দ খুঁজবেন না। আপনার হৃদয়ের আনন্দ, বেদনা, বিস্ময়, আবেদন-এগুলো অন্যদের সাথে মিলবে তা তো নয়। আর শব্দেরা সৃষ্টি হয়েছে সাধারণে ব্যবহৃত হওয়ার জন্যই। ব্যক্তি আপনার অনুভুতির জন্য তো আলাদা করে শব্দ তৈরি হয়নি। কাজেই চারিপাশে যেসব সাধরণ শব্দ ঘুরে বেড়াচ্ছে সেগুলো থেকেই খপ্ করে দু’চারটে ধরে এনে তার উপর আপনার মনের ভাবটা সেঁটে দেবেন! এক্ষেত্রে একটু সাবধান হতে হবে! খেয়াল রাখতে হবে আপনি যেন “ছাগল দিয়ে হাল-চাষের” চেষ্টা না করেন। জুতসই শব্দ ধরতে হবে। শব্দেরা কিন্তু পুরোনো অর্থ বা “মানে” ধারণ করতে করতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছে। কিছু নতুন অর্থ বা “মানে” পেলে তারা আপনার জন্য জান দিয়ে দেবে।
– কিছুটা বুঝতে পারছি বোধ হয়।
– কচু বুঝেছেন! ধরুন, একটা শব্দ একটা পুরোনো বা বংশীয় “মানে” ধারণ করে আছে। এদিকে আপনার মনের ভাবটা প্রকাশের জন্য একটা শব্দ দরকার। এখন ঐ নির্দিষ্ট শব্দটিকে আপনি খুঁজে পেলেন যার “মানে” বা অর্থটা অন্য কোথাও অন্যভাবে প্রকাশিত। তাতে আপনার সমস্যা নেই। সেই শব্দটিকে ধরে এনে বলুন, “ভায়া, আমার কবিতার এই চরণে তোমার পুরোনো অর্থ চাই না। তোমার জন্য নতুন একটা ‘মানে’ বা অর্থ দিলাম আমি। এখন থেকে এই কবিতায় তুমি আমার দেওয়া এই মানেটাই ধারণ করো। অন্যেরা তোমার কী অর্থ করবে জানি না, তবে এখানে তোমার অর্থ কিন্তু এটাই! কেউ হয়ত কখনও ঠিকই আসল (আমি যে অর্থ তোমায় দিলাম) ‘মানে’টা বুঝবে।”
– বুঝতে পারছি। এখন জটগুলো খুলতে শুরু করেছে।
– এর পরে আপনি যখন লিখবেন তখন শব্দেরা আপনার সামনে হাত পেতে থাকবে। বলবে, “আমায় একটি নতুন অর্থ বা মানে দিন। আমি যে বহুদিন ধরে বড্ড নিঃসঙ্গ। আমায় একটি নতুন শব্দার্থ ভিক্ষা দিন।”
দাদা, দাদা…. ও দাদা। ডাক শুনে আমি বট গাছের বেদির উপরে উঠে বসি। মনোজ দা আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
– সেই কখন থেকে দেখছি ঘুমের মধ্যে বিড় বিড় কইরে কী সব বাতচিত বকছেন। বাড়ি যাইবেক না?
– যাবো। বেলা অনেক হয়েছে। একটা বিড়ি হবে মনোজ দা?
– হামার কাচে বিড়ি হবেক না। মগার সিদ্ধি আচে। লিবেন?
– না। ওসব আমার চলে না। আচ্ছা মনোজ দা, তোমার ভয় করে না? এই শ্মশানে একা একা থাকো।
– না! ভোয় আবার কীসের! কভি কভি উয়োলোগ পাছ আতা হে। মগার সিদ্ধির খুশবুছে দূর ভাগ যাতা হে!
– কারা আসে মনোজ দা?
– উরি বাবা, নাম মুকে লিতে পারবো না। একন সন্ধ্যে হচ্ছে। তুমি বাড়ি যাও। দিনের বেলা বলব অওর এক দিন।4 Comments
Friends
MuhammadMusa
@muhammadmusa
Mohosen-Hossain
@mohosen-hossain
Hira Araaf
@hir-araaf
Tabassum-Ferdous-Taslima
@tabassum-ferdous-taslima
আতাউর রহমান
@ataurrahman
Sumaiya Rimu
@sumaiyareegmail-com
Himal-Debsharma
@himal-debsharma
Akash-Talukder-Akash
@akash-talukder-akash
Mohammad-Mamun-Hossen
@mohammad-mamun-hossen



স্মৃতিধর্মী গদ্য। অনেক শুভকামনা।