Profile Photo

Mahzabin-ShantaOffline

  • Mahzabin-Shanta
  • Profile picture of Mahzabin-Shanta

    Mahzabin-Shanta

    3 years, 10 months ago

    মা
    মা যখন শেষবারের মতো হাসপাতালে গেলো,
    আমি তখন সবেমাত্র প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়েছি।
    শীর্ণ হাতদুটি দিয়ে মা যখন আমায় জড়িয়ে ধরলো নীল শিরাগুলো যেন চামড়া ফুড়ে বেরিয়ে যেতে চাইছিলো।
    মা শেষবারের মতো আমার কপালে চুমু এঁকে দিয়েছিলো।
    আর চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো বাড়িটা খুব ভালোমত দেখে নিচ্ছিলো যেন আর কোনদিন দেখার সুযোগ পাবেনা।
    গেলো বছর শ্রাবণ মাসের এক বর্ষণমুখর দুপুরে মায়ের মুখের হাসি উবে গিয়েছিলো।
    বাবা টেষ্ট রিপোর্ট গুলো মায়ের হাতে দিতেই মায়ের মুখে জমেছিলো শ্রাবনের মেঘ আর চোখ দুটিতে জমা হয়েছিলো বৃষ্টির পানির মতোই স্বচ্ছ টলটলে পানি।
    এরপর শ্রাবণ ফুরিয়ে ভাদ্র এলো,পৌষ গেলো ,মাঘ এলো,চলেও গেলো কিন্তু মায়ের মুখের মেঘ কাটলো না।
    মায়ের শরীর দিন দিন ভেঙ্গে পড়তে লাগলো।
    অল্পতেই হাপিয়ে যেত।
    আমি দৌড়ে গিয়ে যখন মায়ের বুকে ঝাপিয়ে পড়তাম, মায়ের বুকটা ধড়ফড় করে উঠতো।
    শ্বাস পড়তো খুব জোরে জোরে।
    আমি অস্থির হয়ে উঠতাম।
    বাবা জোর করে আমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেত।
    দাদীর কাছে যেদিন জানতে পারলাম মায়ের রক্ত নাকি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সেদিন বাবার কাছে গিয়ে খুব অনুরোধ করেছিলাম আমার সব রক্ত নিয়ে মাকে যেন ভালো করে দেয়।
    বাবা বলেছিলো আমার রক্ত নিলেও নাকি মা আর ভালো হবেনা!
    মায়ের মুখের সেই হাসি ফিরে এসেছিলো ঠিক এক বছর পরে, শ্রাবণ মাসের আরেক বর্ষণমুখর দুপুরে।
    সাদা চাদরে ঢাকা আমার মাকে এম্বুলেন্স থেকে নামানো হয়েছিলো।
    মাকে যখন কাফন পরিয়ে আনা হলো মায়ের মুখ থেকে যেন হাসি সরছিলোনা।
    মা আমাকে বুকে জরিয়ে আদর করার সময় যেরকম মিটিমিটি হাসতো ঠিক সেরকম হাসি।
    মায়ের তেলতেলে মুখ থেকে যেন আলো ঠিকরে পড়ছিলো।
    কে বলবে যে এই শরীরটাই এতদিন যমের সাথে যুদ্ধ করছিলো?
    নিজে কে সামলে নিতে আমার বেশ সময় লাগলো।
    মায়ের হাতের মাখা ভাতের অভাবে যে শরীরটা আগেই লিকলিকে হয়ে গিয়েছিলো মায়ের মৃত্যুতে তা আরো ভেঙ্গে পড়লো।
    শুনেছি আমি নাকি আবার মায়ের হাতের মাখা ভাত খেতে পারবো।
    আমার আবার তরতাজা হবার আশায় সবাই বেশ খুশি।
    আচ্ছা,তরতাজা হয় কিভাবে?
    শরীরটা প্রস্থে বাড়লে,গালগুলো ফুলে উঠলে,চোখের কালি উবে গেলেই বুঝি মানুষ তরতাজা হয়?
    তবে তো পাড়ার মোড়ে বসে বিড়বিড় করে কথা বলা পাগলীটাও বেশ তরতাজা!
    লোকে যা খাবার দেয় তা দিব্যি খেয়ে নেয়।
    শুনেছি ওর স্বামী নাকি ওর সামনেই ট্রেনে কাটা পড়েছিলো। এরপর থেকেই ওর মনের অসুখ।
    দাদীর ধারণা আমারও মনের অসুখ করেছে।
    মায়ের গন্ধ পেলেই ভালো হয়ে যাবো।
    বাবার এখন আর মায়ের জন্য আগের মতো মন খারাপ করেনা।
    বাবা নতুন সঙ্গী পাবে,দাদী পাবে বউমা।
    আমিই শুধু আমার মা পাবোনা।
    আমার এখন পাড়ার মোড়ে বসে পাগলীটার সাথে খুব ভাব জমাতে ইচ্ছে করে।
    আমিও হয়তো তাহলে একদিন পাগলীটার মতো তরতাজা হয়ে যাবো।

Skip to toolbar