-
ইউক্রেনিয়ান ফকটেইল
নাগকন্যা
ভাষান্তর : শেখ আবদুল্লাহ নূর
ছেলেটি ভদ্র, অমায়িক। গ্রামের এক নোবলম্যানের নওকর সে। চাকর আর কি। মনিবের বাড়িতেই থাকে, কাজকাম করে। ফাই-ফরমায়েশ খাটে। মনিবকে বড় সম্মান করে। কাজেও কোনো আলসেমি নেই নওকরের। কিন্তু তাকে নিয়ে বড় সমস্যায় আছেন মনিব। আলসেমি নেই ঠিকই, কিন্তু কাজকাম করতেই চায় না সে।
অন্য চাকর-বাকরদের সাথে মাঠে কাজে পাঠালে, কখন যে সবার চোখকে ফাকি দিয়ে সে চলে যাবে, কেউ টেরও পাবে না। অবশ্য যতক্ষন কাজ করে সে, বেশ ভালোভাবেই করে। কিন্তু ফাক পেলেই ফুরুৎ। তাকে আর দেখা পাবে না কেউ। সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে সে চলে যাবে দূরে। কোনো বনে বাদাড়ে বা অন্য কোনোখানে। অল্প বয়স তো। মনের খেয়ালি ভাবটা এখনো কেটে ওঠেনি তার।নোবলম্যানের আরো অনেক চাকর-বাকর আছে। অনেক দাস-দাসি আছে। কিন্তু সবার চেয়ে এই সুঠামদেহী যুবক নওকরকেই তিনি বেশি ভালোবাসেন। নোবলম্যান তাকে কাজে কর্মে খুব একটা পাঠায়ও না। যদিও বা কখনো সখনো পাঠায়, অন্য চাকর-বাকরদের সাথে পাঠায়। মাঠের ভারি কোনো কাজে একা পাঠায় না তাকে। অন্যদের সাথে যুবকটিও মাঠে যায়, কিন্তু কাজ করে না। কখন যে চোখের আড়াল হবে, কেউ টেরও পাবে না। চোখের আড়াল একবার হতে পারলেই হলো, চলে যাবে সে বনে বাদাড়ে, নদীর কিনারে বা বিজন কোনো মরুতে।
একদিনের ঘটনা। নওকরটি অন্যদের সাথে মাঠে গিয়েছে এবং যথারীতি সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে কোথাও। রীতিমতো হারিয়ে গেছে। এবার সে চলে গেছে গহীন এক বনে। অজানা, অচেনা বনের ভিতর দিয়ে হাঁটছে সে। উদাস মনে হাঁটছে। হাঁটছে আর ভাবছে, পৃথিবীতে সে বড় একা। মা নেই, বাবা নেই। ভাই-বোন কেউ নেই। সহায় সম্পত্তিও নেই তার। কী উদ্দেশ্য এ জীবনের? কী উদ্দেশ্য বেঁচে থাকা?
পৃথিবীতে এতো মানুষ, এতো কাজ, এতো আয়োজন! কিন্তু তার কিছু নেই। না আছে নিজের কোনো কাজ, না আছে জীবনের কোনো লক্ষ্য। পৃথিবীতে কেনই বা আসা, কেন-ই বা বেঁচে থাকা। কথাগুলো দার্শনিকের মতো হলেও এই বিজন বনে সে এমন কিছুই ভাবছে। ভাবছে আর হাঁটছে।
গহীন বনের ভিতর দিয়ে হাঁটছে সে। হঠাৎ বাতাসের অস্বাভাবিক হুঁস হুঁস শব্দ। ভয় পেয়ে চমকে উঠে সে। সামনে তাকিয়ে দেখে প্রকাÐ এক সাপ। মাথা সমান উঁচু হয়ে ফনা তুলে পথ আগলে আছে। মনে হচ্ছে, সাপটি তাকে সামনে এগুতে দিবে না। নওকরটি ভয়ে অবস হয়ে যায়। নির্বাক তাকিয়ে থাকে। নাক বরাবর লিকলিক করছে সাপের জিহবা। দৌড় দিবে? সেই শক্তিও নেই তার। পা দুটো যেন পাথরের মতো ভারি হয়ে আছে। মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে সে। এমন সময় সে বুঝতে পারে, সাপটি বুঝি তার সাথে কথা বলছে। তাকে প্রশ্ন করছে, কোথায় যাও ওহে নোবলম্যানের নওকর?
সাপ যে কথা বলতে পারে, এমনটিও ভাবেনি যুবকটি। সাপের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার শক্তিও নেই তার। সে তো কাজে ফাঁকি দিয়ে এসেছে। উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে। কোথায় যাই, এ প্রশ্নের তো কোনো উত্তর নেই।সাপটি আবার কথা বলে। কথা বলছো না যে? কাজে ফাঁকি দেয়ার ফল টের পাবে এবার। তোমাকে গিলে খাবো আমি। নাও, মরনের প্রস্তুতি নাও।
কোনো কিছু না ভেবেই নওকরের মুখ থেকে উচ্চারিত হলো, ঠিক আছে, খেয়ে ফেলো আমায়।
নওকরের কাছ থেকে এমন ভ্যাবলা ধরণের উত্তর আশা করেনি সাপ। এমন আজদাহা একটি সাপ দেখে সে কিনা ভয়ে চিৎকার দিবে, তারপর লুটেপুটে দিবে দৌড়। না হয় হাত জোড় করে প্রাণ ভিক্ষা চাবে। এসব কিছু না করে সে কিনা বলে, মন চাইলে গিলে খেয়ে ফেলো আমায়!
সাপটি মনে মনে বলে, আরে বোকা, আমি কি তোমাকে খেয়ে ফেলার জন্য পথ আগলে আছি? আমার উদ্দেশ্য যে ভিন্ন। কিন্তু মুখে সুস্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করে, ভয় নেই তোমার? আমার লিকলিকে জিহবা দেখেও কি ভয় পাচ্ছো না তুমি?
: ভয় পেলেই কী? এই বিজন বনে তোমার হাত থেকে তো আর বাঁচার উপায় নেই। বরং চলে যাওয়াই ভালো।
সাপটি বলে, নাহ, খাবো না তোমায়, যদি তুমি আমার একটি কাজ করে দাও।
: কী কাজ?
: কাজের কথা খুলে বলা যাবে না। তুমি বরং বাড়ি ফিরে যাও। দেখবে তোমার মনিব প্রচÐ রকমের ক্ষেপে আছেন। তুমি তার কাছে গিয়ে সরি বলো। সরি বলাতেই মন নরম হবে তার। সে তোমাকে আবার মাঠে কাজে পাঠাবে।
: আমার কাজে মন বসে না।
: এবার যাও, মন বসবে তোমার। মাঠে গিয়ে দেখবে অন্য শ্র্রমিকেরা শস্য কেটে রেখেছে। তুমি শস্যগুলো ওয়াগনে তোলতে সাহায্য করো তাদের। তারপর নিজে গাড়ি চালিয়ে মনিবের বাড়ি নিয়ে যাও শস্যগুলো। মনিব তোমার কাজে খুশি হবেন। তোমাকে পুরস্কৃত করতে চাইবেন। কিন্তু- – -।
: কিন্তু কি?
: তুমি পুরস্কার নিবে না।
: কী করবো তা হলে?
: তুমি এক গোছা শস্যের আঁটি চেয়ে নিবে নোবলম্যানের কাছ থেকে। তুমি যে ওয়াগন গাড়িটি চালিয়ে শস্যগুলো বাড়ি নিয়ে এসেছো, সেই শস্যগোছাগুলো থেকে এক গোছা শস্য চেয়ে নিবে তুমি। এটাই হবে তোমার পুরস্কার।
: তারপর?
: শস্যের আঁটিখানি নিয়ে তুমি চলে যাবে মনিবের বাড়ির পাশের যে ফাঁকা জায়গাটুকু আছে, সেখানে। তোমার এহেন কাজে সবার মনে কোতুহল জন্মাবে। মনিবও অবাক হবেন। তিনি তোমার পিছু পিছু আসবেন। অন্য চাকর-বাকরেরাও তোমাকে অনুসরণ করবে। তুমি বাড়ির ফাঁকা জায়গাটিতে যেয়ে শস্যের আঁটিতে আগুন ধরিযে দিবে। আগুনের লেলিহান ওঠবে ওপরে। সবাই অবাক হয়ে দেখবে।
: কি দেখবে?
: দেখবে, সেই আগুণের ফুলকি থেকে এক অপরূপা সুন্দরী হেঁটে হেঁটে বের হয়ে আসছে। আগুনের লেলিহান শিখা থেকে মেয়েটি হেঁটে তোমার সামনে চলে আসবে। তাকেই তুমি বিয়ে করো। তোমার স্ত্রী বানিয়ে নাও। নিঃসঙ্গ পৃথিবীতে তোমার একজন আপন মানুষ হবে।নওকর বাড়ি ফিরে এলো। তাকে দেখে নোবলম্যান রেখে গেলেন। কিন্তু নওকর ’সরি’ বলায় তার রাগ যেন পানি হয়ে গেল। মনিব তাকে আবার মাঠে পাঠালেন কাজ করতে। এবার আর আলসেমি করছে না নওকর। অন্যদের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে মাঠে শস্য কাঁটছে। শস্য-আঁটিগুলো ওয়াগনে তুলতে সাহায্য করছে। তারপর, সেই ওয়াগন চালিয়ে মনিবের বাড়ি নিয়ে আসে সে।
মনিব এবার খুব খুশি। তার প্রিয় চাকরটি আজ এতো কাজ করেছে। শস্যভর্তি ওয়াগন চালিয়ে বাড়ি নিয়ে এসেছে।এবার সন্তুষ্ট হয়ে মনিব তার প্রিয় নওকরকে পুরস্কৃত করতে চাইলেন।
কিন্তু না, সাপের কথা মতো নওকর কোনো পুরস্কার নিলো না। সে তার মনিবকে বললো, পুরস্কার নয়, আমাকে একআঁটি শস্য দিন। এটাই হবে আমার জন্য বড় পুরস্কার।
মনিব তখন বলে, শস্যআঁটি নিয়ে তুমি কী করবে? তুমি তো আমার বাড়িতেই থাকছো, আমার বাড়িতেই খাবার খাচ্ছো। তোমার তো আর বাইরে রান্না করে খেতে হবে না। কেউ নেই-ও তোমার।
নওকার কোনো কথা বলে না। তার একগোছা শস্যআঁটিই চাই।
অবশেষে মনিব তার বাড়ির আঙ্গিনায় স্তুপ করে রাখা হাজারো শস্যের আঁটি থেকে এক আঁটি শস্য এনে তার নওকরকে দিলেন। নওকর সেই শস্যগোছা নিয়ে বাড়ির পাশের খোলা জায়গায় চলে গেল। মনিবও কোতুহল বসত তার পিছু নিলেন। মনিবের পিছু পিছু অন্য চাকর-বাকরেরাও সেখানে গেল। সবার চোখেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টি। যুবকটি কী করবে এই শস্যআঁটি নিয়ে।এদিকে বাড়ির পাশের খোলা জায়গায় গিয়ে সাপের কথা মতো শস্যের গোছায় আগুন ধরিয়ে দিল নওকর। দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠলো আগুনের শিখা।
এর কিছুক্ষণ পর। আগুন যখন লিক লিক করে আকাশমুখে ওঠে যেতে লাগলো, তখনি ঘটলো ঘটনাটি। সবাই অবাক বিস্ময়ে দেখে আগুনের সেই শিখা থেকে এক অপরূপা সুন্দরী বেরিয়ে আসছে। মেয়েটি হেঁটে হেঁটে ওই নওকরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপরে বলে, আমি নাগকন্যা, আমাকে তোমার স্ত্রী বানিয়ে নাও।এর পরের ঘটনা। মহা ধুমধামে বিয়ের আয়োজন হতে লাগলো। মনিব নিজেই সব আয়োজন করতে লাগলেন। তিনি বললেন, এ বিয়ে হবে মহা ধুমধামে। ব্যান্ডপার্টি আনা হলো। গায়কল আনা হলো। শত শত লোকের খাবারের ্আয়োজন হলো।
বিয়ে হয়ে গেল নওকরের সাথে আগুনের শিখা থেকে ওঠে আসা নাগকন্যার। নোবলম্যানের আগ্রহে তার বাড়ির পাশেই নওকরকে এক টুকরো জমি দেয়া হলো। সেখানে ঘর বেঁধে থাকবে তারা।
জমি টুকরো পেয়ে নাগকন্যার আনন্দ আর ধরে না। ঘর বাঁধার সমস্ত কাজ যেন সে একাই করে ফেলছে। নওকরকে কোনো কাজে হাতই লাগাতে দিচ্ছে না। ঘরের দেয়াল গাঁথা, রান্নার চুলো বানানো, ঘরের আসবাবপত্র, খাট-পালঙ্ক, সবই এই নাগকন্যাই করে যাচ্ছে। নাগকন্যার হেন কাজের উৎসাহে বড় ভালো লাগে নওকরের। যাক তা হলে, সংসারি এক মেয়েকে নিয়ে সংসার পাতা গেল। এ মেয়ে সংসারের জন্য উপযুক্তই বটে। এমন তড়িৎকর্মা সুনিপুণা বধূ এ তল্লাটে আর নেই। নওকর ভাবছে, সত্যিই সে বড় ভাগ্যবান।বেশিক্ষন লাগেনি ঘর বানাতে, আসবাবপত্র জোগাড় করে নিতে। উৎসাহ নিয়ে মনের আনন্দে কাজ করলে অতি তাড়াতাড়িই কাজ শেষ হয়ে যায়। ঘর বাঁধা হলো। চুলা বানানো হলো। আসবাবপত্র, থালা-বাসন সাজানো হলো ঘরে। সব কাজ নাগকন্যা একাই করছে। নওকর বুঝে ওঠতে পারছে না, এটা কী করে সম্ভব! এমন কোনো কাজ বাকি নেই, যা এই নাগকন্যা পারে না। নওকর শুধু কাজের তদারকি করছে, দেখছে আর অবাক হচ্ছে। যেদিকেই তাকায় সে, সবকিছু সুন্দর পরিপাটি।
নওকর ভাবে, পৃথিবীতে কেউ ছিল না তার। আজ তার সব আাছে। বিশ্বস্ত স্ত্রী আছে। নোবলম্যানের মতো আপনজন আছে। পাড়া প্রতিবেশীর ভালোবাসা আছে। এমন বিশ্বস্ত, এমন সুন্দর পরিপাটি, এমন সুনিপুণা বধূ থাকলে তার আর কী-ই প্রয়োজন? এই মেয়েটার সাথেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেয়া যাবে।দিনগুলো বড় সুখেই কাঁটতে লাগলো নওকরের। এতো সুখ, এতো শান্তি, এতো প্রাপ্তি। নওকর ভাবছে। কী শুভক্ষনেই না বনপথে সেদিন হাঁটতে গিয়েছিল সে। কী শুভক্ষনেই না নাগকন্যা আগলে ধরেছিল পথ। এখন ঘরে সুখ, বাইরেও সুখ।
কালক্রমে দু’বছর পার হলো তাদের। এই নওকর এখন গ্রামের সমৃদ্ধশালী কৃষক। গ্রামের বাইরে তাদের তিনখÐ ফসলি জমি। সেসব জমিতে ’যব’ চাষ করা হয়েছে। মাঠের কাজেও নাগকন্যার জুড়ি নেই। জমিতে যব চাষের সব কাজই যেন সে একাই করেছে। শস্যক্ষেতের আল বেয়ে হাঁটছে আর কথাগুলো ভাবছে নওকর। এমন সময় এক কিষাণীর সাথে দেখা হলো তার।
কিষাণী বলে, কী ব্যাপার হে নওকার, তোমার ক্ষেতের যব যে পেকে নু্যুয়ে পড়ছে। ঘরে তুলছো না কেন?
: হ্যাঁ, তুলবো।
: আমাকে কাজে রাখবে? এতো শস্য তুমি তো একা কেটে নিতে পারবে না। তোমার বউটিও বেশ কাজের। সেও পারবে না। এতো যব, কারো পক্ষে একা তোলা সম্ভব না। এই যে দেখো, তোমার এই ক্ষেতের যবগুলো পেকে মাটিতে ঝরে যাচ্ছে। কবে ঘরে তুলবে হে?
কিষাণীর কথা শুনে নওকর ভাবছে, সত্যিই তো। যব যে আসলেই বেশি পেকে গেছে। মাটিতে ঝরে পড়তে শুরু করেছে। নাগকন্যা কি এসব দেখেনি? কবে যব কাটবে সে? রাগে গজরাতে গজরাতে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, সাপ চিরকাল সাপই থাকে। ”ওয়ান্স এ সার্পেন্ট, অলওয়েজ এ সার্পেন্ট”। মুখ থেকে ফস করে বের হয়ে গেল কথাটি। মুখে আরো বললো সে, ওই সার্পেন্ট বুঝি এবার আমার শস্য কাটবে না। এই কৃষাণীর আগ্রহ আছে বেশ। শেষে কি না এই কিষাণীকে রাখতে হয় শস্য কাটার জন্য।ভীষন রাগ হলো নওকরের। নাগকন্যার প্রতি রাগে ফুসছে সে এখন। মুখে বিড় বিড় করতে করতে নওকর দ্রæত পায়ে বাড়ি ফিরে আসে। যব পেকে মাটিতে ঝরছে। অথচ কেটে ঘরে তোলার নাম নেই। বাড়িতে এসেই নওকর খুঁজতে থাকে নাগকন্যাকে। কিন্তু কই? তার নাগবউ কই?
সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খোঁজে বেড়ালো। নেই, কোথাও নাগকন্যার দেখা নেই। অবশেষে শোবার ঘরে চলে এলো সে। সেখানেও নেই! রাগে মাথা যেন ঠিক নেই তার। ঘরের জিনিসপত্র, আসবাব, বিছানা, বালিশ সব উলোট-পালট করতে লাগলো রাগে।এক সময় বিছানার ওপরে রাখা বালিশটা ছুড়ে ফেলে দিল দূরে। হঠাৎ বালিশের নিচে চোখ পড়ে তার। কুÐলি পাকিয়ে শুয়ে আছে একটি সাপ! ভয়ে চিৎকার দিতে যাবে, তখন সাপটি নিজেই কথা বলে ওঠলো। ভয় পেও না, প্রিয় নওকর। আমিই তোমার সেই নাগবধূ।
একথা শুনে নওকরের মনে পড়ে গেলো সবকিছু। কী ভুলটাই না সে করে ফেলেছে! নিজের প্রতি রাগে দুঃখে চিৎকার দিয়ে বললো, আহা, কী ভুলটাই না আমি করে ফেলেছি। এখন উপায়! কীভাবে এই নাগকন্যাকে মানুষরূপে ফিরিয়ে আনবো! একদিন এই নাগকন্যা তাকে বলেছিল, সাবধান, আমাকে কখনো ‘সাপ’ বলবে না। ”বিওয়ার, ডন্ট এভার কল মি এ সার্পেন্ট”। আমি তোমাকে এমন কোনো কষ্ট দেবো না যে রাগের মাথায় আমাকে ’সাপ’ বলতে হবে তোমার। যদি কখনো বলেই ফেলো, তোমার এই নাগবধূকে হারাবে তুমি।
পেছনের সব কথা মনে পড়ে গেলো তার। এখন উপায়? মুখের কথা তো আর ফিরিয়ে আনা যায় না। ”হোয়াট ওয়াজ সেইড কান্ট বি আনসেইড”।
তার পেছনের কথা ও স্মৃতিগুলো মনে পড়তে লাগলো। আহা, কতোই না ভালো স্ত্রী ছিল সে। কীভাবে সে তাকে আগলিয়ে রেখেছিল এতোদিন। বাড়ির বাইরে গেলে তার জন্য পথ চেয়ে বসে থাকতো। কতো ভালো ভালো খাবার রান্না করে রাখতো। কোনো কাজই তাকে করতে দিতো না। বাড়ির ও ক্ষেতের সমস্ত কাজই যেন সে একাই নিজ হাতে করে ফেলতো।
আহা, তবুও নিজের মুখটাকে সে সামলাতে পারে নি। জিহবার দোষে হয়তো সারা জীবন তাকে একাই কাটাতে হবে। দুর্ভাগ্য যেন সে নিজেই হাত বািিড়য়ে ডেকে নিয়ে এসেছে। এমন ভাবনায় নিজেকে আর সামলিয়ে রাখতে পারেনি সে। সাপটির সামনে কেঁদে ফেললো নওকর।
নওকরের এমন কান্না দেখে সাপটি বলে, আর কেঁদো না প্রিয় নওকর। যা হওয়ার, তা তো হবেই। ”হোয়াট ইজ টু বি, মাস্ট বি”। দুঃখ করে কী লাভ? আমি চলে যাচ্ছি আগের জায়গায়, বনে। যেখানে তুমি আমাকে প্রথম দেখেছিলে।
এ কথা বলে নাগকন্যা কুন্ডলি পাকানো থেকে বের হলো। তারপর বুকে ভর দিয়ে চলে যেতে লাগলো বনের দিকে। নওকর তাকে আর ফিরাতে পারছে না। সে কাঁদছে, আর সাপের পিছু পিছু হাঁটছে। কী করবে সে আর? কীভাবে ফিরাবে নাগকন্যাকে। আর যে কোনো উপায় নেই।
তারা যখন বনের মধ্যে সেই আগের স্থানে পৌছালো, সাপটি থামলো। নিজেকে আবার কুন্ডলি পাকিয়ে মাথা ওপরে তুললো। এবার ফনা তুললো না। মাথা তুলে সাপটি বলে, তুমি তো আমাকে ’সাপ’ বলেছিলে। কারণ, যবগুলো কেটে আনতে দেরি করেছিলাম বলে? এবার বাড়ি ফিরে যাও। দেখো গিয়ে তোমার সব শস্য আমি এতোক্ষনে কেটে এনেছি। তোমার ঘরের শস্যভাÐারে গিয়ে দেখো, মাঠের সব যব কেটে এনে গোলায় তুলে রেখেছি। এটা তো আমারই কাজ ছিল, প্রিয় নওকর। কিন্তু এর পর জানি না, কে করে দিবে তোমার কাজ। কে বুনবে তোমার শস্য, কে তুলবে ঘরে। যাহোক, তুমি বাড়ি ফিরে যাও।
সাপের কথগুলো শুনে নওকরের মন ব্যথায় আরো ভারি হয়ে গেল। সে বললো, তোমাকে এই বিজন বনে রেখে আমি কীভাবে বাড়ি যাই, কীভাবে তোমার নিজ হাতে তৈরি ঘরে বাস করি? আমি পারবো না, ওহে প্রিয় নাগকন্যা। আজ থেকে এই বনেই থেকে যাবো আমি। থেকে যাবো তোমার কাছে, তোমার পাশে।সে আর সম্ভব নয় নওকর। এখন আমি তো আর মানুষ নই। কোনো দিনও আর মানুষ হতে পারবো না। সে সুযোগ একবারই এসেছিল আমার। ভাগ্যদোষে আবার স্বজাতিকূলেই ফিরে এলাম। তুমি এখানে থেকে না প্রিয়। সাপের জাতিকে বিশ্বাস নেই। যে কোনো সময় তোমাকে ছোবল মেরে বসতে পারি আমি। তুমি বরং ফিরে যাও। তোমার কথা স্মরণে রেখে বাকি জীবনটা আমি সাপ হয়েই কাটিয়ে দিবো।
নওকর আর কী করবে। সে ফিরে যাবার জন্য মনস্থির করে। এমন সময় নাগকন্যা বলে, শুনো হে প্রিয়তম নওকর। যাবার বেলায় আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দাও। তবে সাবধান, তোমার হাতে যেন আমি ছোবল দিয়ে না বসি! সাপের জাতি আপন পর বুঝে না। ”এ স্নেক ডাজন্ট ইভেন নো ইটস বিলাভড”।
এ কথা শুনে নওকরের মন কিছুটা শান্ত হয়। শেষবেলায় হয়তো তার প্রিয় স্ত্রীকে আরেকবার আদর দিয়ে যেতে পারবে। সে ধীরে ধীরে সাপটির আরো কাছে চলে আসে। তারপর সাপের মাথার ওপর থেকে তার হাতখানি ধীরে ধীরে নামিয়ে আনে সাপের মাথার ওপর। আলতো করে ছুয়ে দেয় সে সাপের মাথা। বরফের মতো ঠাÐা মাথা তার।
নওকরের হাতে ছোয়া পেয়ে সাপটি নিজেকে আর সামলিয়ে রাখতে পারে না। ছোবল মারার সুতীব্র প্রেরণা জাগে গায়ে। তাই, মাটিতে পড়ে থাকা গাছের একটি ডালে শরীরটাকে পেঁচিয়ে ধরে নিজেকে ক্ষত বিক্ষত করে সে। নওকর সাপের মাথা থেকে হাতখানি সরিয়ে নেয়ার পর সাপ জিজ্ঞেস করে, প্রিয়তম নওকর, আমার মাথায় হাত রাখার সময় তুমি নিজের ভিতরে কেমন অনুভব করেছিলে?
নওকর বলে, আমার কাছে মনে হচ্ছিল সমস্ত পৃথিবীতে কী কী ঘটে চলেছে আমি যেন তার সব কিছুই জেনে ফেলেছি। সাপটি তখন বলে, তুমি আবার আমার মাথায় আদরের হাতখানি ছুয়ে দাও। নওকর দ্বিতীয়বার সাপের মাথায় ওপর থেকে হাতখানি নামিয়ে আনে। ছুঁয়ে দেয় আবার তার প্রিয় নাগকন্যাকে। তারপর হাত সরাতেই সাপটি বলে, এবার তোমার কী অনুভূতি হয়েছিল, প্রিয়তম?
নওকর বলে, এবার আমার কাছে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত মানবজাতির ভাষা যেন আমি শিখে ফেলেছি।
এবার তুমি তৃতীয়বার আমার মাথায় তোমার আদরের হাতখানি বুলিয়ে দাও। সাবধান প্রিয়তম। আমি কিন্তু অতি কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে রাখছি তোমাকে ছোবল মারা থেকে বাঁচাতে। সাবধান হও, ভুলে যেও না আমি কিন্তু এখন একটি সাপ, কালনাগিনী। অন্য কেউ নই। সাবধানে আমার মাথায় আরেকটি বার হাত বুলিয়ে দাও। সতর্ক থেকে, ভুলেও যেন তোমার হাতে ছোবল মেরে না বসি।
সাপের কথায় সে আরো সতর্ক হয়। আরো সচেতন হয়। বাস্তবে ফিরে আসে। এতোক্ষন যেন সে একটা মোহের মধ্যে ছিল। কাÐজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল সে। সে কি বেঁচে আছে, নাকি মরে গেছে, সেই বোধটুকুও যেন ছিল না তার। সাপের সাবধান বাণী শুনে সে আবার স্ব¯েœহে তার আবেগঘন হাতখানি তৃতীয় বারের মতো সাপের মাথায় বুলিয়ে দেয়।
সাপ এবার জিজ্ঞেস করে, এবার তুমি কী অনুভব করছো?
নওকর বলে, আমার কাছে মনে হচ্ছে পৃথিবীর অভ্যন্তরের সমস্ত সম্পদ ও খনির সন্ধান যেন আমি পেয়ে গেছি।
: হ্যাঁ, তোমার প্রতি আমার ভালোবাসার দায় মেটাতে নিজের শরীরটাকে বার বার ক্ষত-বিক্ষত করে আজ আমি সব জানিয়ে দিলাম তোমায়। এবার তুমি সোজা চলে যাও রাশিয়ার সম্রাট জারের কাছে। তার এক সুন্দরী কন্যা আছে। তাকে বিয়ের প্রস্তাব দাও।
প্রস্তাব পেয়ে সম্রাট জার তোমার জ্ঞানের পরীক্ষা নেবেন। আশা করি, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যাবে তুমি। কারণ, তোমার চেয়ে জ্ঞানী বর্তমান পৃথিবীতে আর কাউকে সে খুঁজে পাবে না। সম্রাটের মেয়েকে বিয়ে করে সুখী হও। তবে, বিদায় বেলায় আমার একটা অনুরোধ, যতকাল বেঁচে থাকবে, আমাকে মনে রেখো প্রিয়তম। যতদিন বেঁচে থাকি এই সাপের জীবন নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে আমাকে।
একথা বলে সাপটি কুÐলি পাকানো শরীরটাকে প্রশস্ত করে চলে যেতে লাগলো অন্ধকার ঝোপের ভিতর।
>>সমাপ্ত<<2 Comments
Friends
Era532006
@era532006
মোঃ সাব্বির হোসেন
@sabbirshaheb
Rahul-Islam
@rahul-islam
Kausar Ahmed supto
@kausar
tasnova toj tasrifa
@tasnova
Sumon-Chandro
@sumon-chandro
আকিব ইবনে হক
@akib2004
উজ্জল রায়
@anthony6
Dhumketu
@dhumketu


সুন্দর অনুবাদ। আরো গল্প হোক।