Profile Photo

Rakib JoyOffline

  • Rakibjoy28
  • Profile picture of Rakib Joy

    Rakib Joy

    3 years, 8 months ago

    “অপয়া নারী”

    সবে মাত্র ১৫পেরিয়ে ১৬তে পা দিয়েছে ছোট মেয়েটি লামিয়া। ১০ম শ্রেণির ছাত্রী সে। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হওয়াতে বাবা-মার ইচ্ছে পড়া চলাকালীন তেমন ভালো ছেলে পেলে বিয়ে দিয়ে দিবে তাকে। দেখতে শুনতে এবং সভ্যতায় ভালো হওয়াতে, প্রায়ই বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে। সবে মাত্র এসএসসি পরীক্ষায় উর্ত্তীন্ন হয়েছে সে। এরি মধ্যে একটি সম্বন্ধ তার বাবার ভালো লাগাতে মোটামুটি বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে তার।
    ছেলে প্রাইমারী স্কুল শিক্ষক, বয়স একটু বেশি হলেও, এযুগে সরকারি চাকরির বাজার খুবই চৌড়া। তাই তার বাবা আর বেশি কিছু না ভেবে বিয়ের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করে দিয়েছে। বর্তমানে মেয়েদের চলাফেরার স্বাধীনতা থাকলেও, বিয়ের ক্ষেত্রে বাবা সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত।
    যেই কথা সেই কাজ ১সপ্তাহের মাথায় লামিয়ার বিয়ের কাজ শেষ এবং জামাই হাফেজের বাসায়।
    সংসারে নতুন ছোট্ট একটি মেয়ে লামিয়া, দুনিয়া কেবল মাত্র বুঝা শুরু হয়েছে। দিন ১৫ যেতেই হাফেজের একটি এক্সিডেন্টে দুর্ভাগ্য বষত হাফেজের মৃত্যু ঘটে। শুরু হয়ে যায় লামিয়ার জীবনের একটি অভিশপ্ত ডায়েরি। গ্রাম বাংলার কুসংস্কার অনুসারে আশেপাশে বলা শুরু হয়ে যায়, এই বিয়েই হয়তো হাফেজের জীবন নিয়েছে, এই কথাটি ছোট হতে হতে একটি সময় শুরু হয়ে যায়, লামিয়াই হয়তো হাফেজের জীবনটা নিয়েছে। মেয়ের বয়স কম হওয়াতে লামিয়ার বাবা তাকে নিজেদের বাসায় নিয়ে চলে আসে। শুরু হয় লামিয়ার নতুন জীবনের পথ চলা….

    লামিয়া কলেজে ভর্তি হয়, তার বাবা এখন আর তাকে বিয়ে দিতে চায় না, লামিয়াও চাই পড়াশোনা করতে। কিন্তু সমাজ বলে আমাদের প্রকৃতিতে একটি বিষ বস্তু আছে, যারা ভালো কে ভালো বলতে লজ্জা পেলেও, সৃষ্টি হতে প্রদত্ত খারাপকে ব্যাক্তি সত্তার উপর চাপিয়ে দিয়ে, টিটকারি মারতে পছন্দ করে। সমাজের এই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে, কিছুদিন এর মধ্যে হার্ডএট্যাক এ মারা যায় লামিয়ার বাবা। নেমে আসে লামিয়ার জীবনে দ্বিতীয় কালো অধ্যায়। সমাজ তাকে এবার যেনো সত্যিই অপয়া নামে আখ্যায়িত করলো। কিন্তু তার বাবার মৃত্যুর জন্য যে সমাজদায়ী সে বিষয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। সমাজের এই তীব্র সমালোচনায় একটি সময় লামিয়ার মা ও তাকে অপয়া ভাবা শুরু করলো। যদিও গর্বধারণী মা, তিনি সব ই বুঝেন, কিন্তু যখন ই উত্তেজিত হয়ে পড়েন, মেয়েকে অপয়া বলতে ২বার ভাবেন না। লামিয়া মাত্র কলেজে ১ম বর্ষের ছাত্রী। কিন্তু অপয়া শব্দে সে এমন ভাবে অভ্যস্ত হয়েছে যেনো তার নাম লামিয়া না তার নাম অপয়া।
    এদিকে তার বাবা নেই, মা মেয়ের সংসারে দেখবার মতো কেউ নেই, অত্মীয়রা সমাজের মধ্যেই পড়ে, তাই লামিয়াকে সমাজের দৈত্যদের মতো আত্মীয়রাও অপয়া ভাবে। যার ফলে মা আর মেয়েকেই নিজেদের সংসার রক্ষা করতে হয়। এভাবেই চলতে থাকে তাদের সময়।
    কলেজের ২য় বর্ষে লামিয়া আর তার কলেজেরই একটি ছেলে রিমেলের মধ্যে একটি ভাব সৃষ্টি হয়। সেই ভাবটি একটি সময় ভালোবাসায় পরিনত হয়। রিমেল আগে থেকেই জানতো লামিয়ার সম্বন্ধে, তার পরিবারের সম্বন্ধে, কারণ তারা পাশাপাশি গ্রামের প্রতিবেশী। এ বিষয় নিয়ে রিমেলের খুব একটা মাথা ব্যাথা ছিলো না। চলতে থাকে তাদের সময়।
    এরি মধ্যে তাদের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল বেরিয়েছে, লামিয়া ভালো রেজাল্ট করেছে, সেটাতে মা খুশি হলেও সমাজের চোখে সে অপয়া। লামিয়ার ইচ্ছে সে শহরে যেয়ে পড়াশনা করবে, কিন্তু তার বাবা না থাকাতে খরচ চালানো যে সম্ভব না সেটা লামিয়া জানতো, তাই নিজের ইচ্ছে নিজের মধ্যে চাপা রেখে সেই কলেজেই অনার্স এ ভর্তি হয়ে যায়। এদিকে রিমেল উচ্চ মধ্যবৃত্ত পরিবারের ছেলে হওয়াতে তাকে শহরে ভর্তি করে দেয়া হয়। রিমেল শহরে চলে যায় কিন্তু তাদের মধ্যে যোগাযোগ, দেখা সাক্ষাৎ চলতে থাকে। এদিকে লামিয়ার সাথে ঘটে যাওয়া ২টি ঘটানার জন্য তার মা ও আর তাকে বিয়ে দেয়ার কথা ভাবে না। লামিয়ার সবকিছু এখন তার নিজের সিদ্ধান্তে হয়, কারণ, এখন সে অপয়া, এখন তার পুরপুরি দ্বায়িত্ব নিজের। এভাবে চলতে থাকে অনেক সময়।
    হাঠাৎ ই একদিন কোনো ভাবে লামিয়া এবং রিমেলের সম্পর্কের কথা জানতে পারে রিমেলের পরিবার। রিমেলের বাবা এলাকার একজন বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী, ছেলেকে কিছু না জানিয়ে, বাসায় ডেকে পাঠানো হলো লামিয়া ও তার মা কে। যথেষ্ট অপমান এবং লাঞ্ছিত করা হলো তাদের।
    এদেশে বিধবা বিবাহ প্রথা চালু থাকলেও, সেটি যেনো কল্পনা, পুরুষের স্বইচ্ছায় একাধিক বিয়ে সভ্য হলেও, একজন বিধবার বিয়ে যেনো অসভ্য।
    লামিয়ার মা বাসায় ফিরে এসে, লামিয়াকে যথেষ্ট কথা শুনিয়ে নিজেই যেনো হতাশ হয়ে পড়লেন। সমাজের মুখে নানান লাঞ্ছনা ছড়িয়ে পড়েছে, নতুন ভাবে অপয়া শব্দটি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, সবকিছু লামিয়া মেনে নিলেও, তার মা একটি সময় আর মেনে নিতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেই। এক্ষেত্রেও যেনো দোষটা লামিয়ার। সমাজের এখানেও কোনো হাত নেই। সমাজের মতে, লামিয়া একে একে তার প্রাক্তন স্বামী, পিতা এবং মাতা কে খুন করেছে। লামিয়া অসহায় হয়ে পড়ে, সে সময়ে তার পাশে দাঁড়ানোর মত কেউ ছিলো না, ছিলো শুধু দূর থেকে সঙ্গ দেয়া রিমেল।
    কয়েকদিন এর মধ্যে লামিয়া বুঝতে পারে, এ সমাজ তার জন্য না, সে চলে যায় শহরে, সেখানে রিমেল তার জন্য একটি টিউশনি এর ব্যাবস্থা করে রেখেছে, একটি ছোট রুম নিয়ে শহরে থাকা শুরু হয় লামিয়ার, ভরসা শুধুই রিমেল। লামিয়া রিমেলকে এতোটা ভরসা করতো যে রিমেল যা বলে সেটাই তার জন্য যথেষ্ট, কেনোনা তার সকল কষ্টের সময় গুলোতে রিমেল তার সাথে ছিলো, পৃথিবীতে বিশ্বস্ত বলতে এই এক রিমেল ই আছে তার, তাদের এই বিশ্বাস এবং ভালেবাসা থেকে একটি সময় সৃষ্টি হয় তাদের মধ্যে শারীরিক আবদ্ধতা। দু’জন ই সমবয়সী হওয়াতে তাদের চাহিদা গুলো একে উপরের যেনো পৃষ্ঠপোষকতা ছিলো। এভাবে চলতে থাকে তাদের সময়, আস্তে আস্তে সমাজের দেয়া অপয়া নামটি যেনো লামিয়া ভুলে গেছে, ভালেবাসার আরাধনায় যেনো নতুন পৃথিবী সৃষ্টির স্বপ্ন দেখছে সে। বেশ কিছু দিন যেতেই, লামিয়ার সাথে রিমেলের মিলামেশাটা কমতে থাকে, লামিয়া লক্ষ করে রিমেল তাকে যথেষ্ট এভোয়েড করছে, সে ব্যাপারটি নিয়ে শঙ্কিত বোধ করে। কিছুদিন পরে লামিয়া জানতে পারে রিমেল গ্রামের বাসায় গেছে এবং তার বিয়ে ঠিক হয়েছে তার কলেজ জীবনের এক বান্ধবীর সাথে। লামিয়া ভাবে হয়তো রিমেলকে জোরপূর্বক বিয়ে দেয়া হচ্ছে, কিন্তু সে রিমেলের বন্ধু সাহেদ এর মধ্যেমে জানতে পারে, মেয়েটির সাথে রিমেলের ২বছর ধরে সম্পর্ক আছে। এটি শোনার পরে এবার লামিয়ার নিজের প্রতি নিজের একটি ক্রোধ সৃষ্টি হয়, এবং সে নিজেকেই অপয়া ভাবতে থাকে। সে জানেনা সে কি করবে। এভাবে কিছুদিন কেটে যায়, লামিয়া উপরন্তু শক্ত থাকলেও, ভেতরে যেনো সে আর জীবিত নেই। হটাৎ লামিয়ার ফোনে একটি ম্যাসেজ, সে ভেবেছিলো হয়তো রিমেল পাঠিয়েছে, হয়তো কিছু বলবে রিমেল তাকে। কিন্তু না সে ম্যাসেজটি রিমেলের বন্ধু সাহেদ-এর।
    “দেখ, লামিয়া, আমি রিমেল না, আমি জানি রিমেল তোমার সাথে কি কি করেছে, কিন্তু আমি রিমেলের মতো না, তোমাকে আমি অনেকদিন ধরে পছন্দ করি, কিন্তু রিমেলের জন্য কিছু বলতে পারি নি, তুমি একটি বার আমাকে বিশ্বাস করে দেখতে পারো”
    ম্যাসেজটি পড়ে, লামিয়ার মুখে একটি মুচকি হাসি!
    সে এবার নিশ্চিত হয়েছে, পৃথিবীকে চিনতে তার আর বাকি নেই! লামিয়া ফোনটি বন্ধ করে দেয়। অতঃপর একটি পাতা আর কলম নিয়ে বসে-

    এই সমাজ আমাকে বিয়ে দিয়েছে, এই সমাজ আমার থেকে আমার স্বামীকে কেড়ে নিয়েছে, এই সমাজ আমাকে অপয়া বানিয়েছে, এই সমাজ আমার থেকে আমার বাবা কে কেড়ে নিয়েছে, এই সমাজ আমাকে মিথ্যে ভালোবাসায় আবদ্ধ করেছে, এই সমাজ আমার মা কে কেড়ে নিয়েছে, এই সমাজ আমাকে ভালেবাসার নামে ধর্ষণ করেছে আর সবশেষে এই সমাজ আমাকে আবারো ধর্ষণের প্রস্তাব দিয়েছে। তাহলে আমি কে? আমার পরিচয় কী? আমি অপয়া! নাকি এ সমাজ অপয়া? আমি তো একটু বাঁচতে চেয়েছিলাম কিন্তু এই অপয়া সমাজ আমাকে বাঁচতে দেয়নি। এই সমাজে মানুষ না মানুষরূপী ভক্ষণকারী বসবাস করে। আমি ভক্ষণ করতে পারিনি, তাই হয়তো ভক্ষণের স্বীকার হয়েছি। আমি নিজেকে আর ধর্ষণ হতে দিতে চাইনা, তাই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলাম, আমার বিদায়ে কেউ দায়ী নয়, আমার মৃত্যুতে আমি দ্বায়ী, কারণ আমি অপয়া, এ সমাজ নয়।

    8
    5 Comments
Skip to toolbar