-
• 3 years, 9 months ago
তুলটে লেখা এটা আমার প্রথম গল্প।জানিনা কেমন হয়েছে।তবে পাঠকের ভালো লাগলে আমার লেখাটা স্বার্থক হবে।
Md Ahsan Ullah Ripon• 3 years, 9 months agoছোট গল্প
সময়প্ল্যাটফর্ম এর সামনের খোলা জায়গাটায় একটু জটলা দেখে এগিয়ে গেলাম।ভীঁড় ঠেলে সামনে যেতেই চোখে পড়লো হাতে ডুগডুগি নিয়ে চল্লিশ পেরুনো একজন উুঁচু গলায় কথা বলছেন।তার সামনেই বসে আাছে পনেরো পেরুনে এক কিশোর।উুঁচু গলায় কথা বলা লোকটির নানাবিধ প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে কিশোরটি।খেয়াল করে দেখলাম,কিশোরের এক হাতে একটি ছোট কাঠের বক্স।সামনে রাখা আছে আরো কিছু কাঠের বক্স।বুঝলাম এরা সাপুড়ে।সাপ খেলা দেখাচ্ছে।ছোট বেলায় গ্রামের বাজারে অনেকবার এ সাপ খেলা দেখেছি।এখন আর এসবে তেমন কোনো আগ্রহবোধ করিনা।
মূলতঃ এ সাপ খেলা দেখানোর মূলে থাকে তাবিজ কবোজ বিক্রি করা। শরৎচন্দ্রের বিলাসী গল্পে এ সাপ খেলা দেখানোর আদি অন্ত ভালোভাবেই বিশ্লষণ করেছেন শরৎ বাবু।কলেজ জীবনে গল্পটি পড়েই মূলতঃ এ ধরণের সাপখেলা গুলো থেকে আগ্রহটা উঠে গেছে।অবশ্য সময়ের আবর্তে গ্রামের বাজারের এই জনপ্রিয় সাপখেলা এখন হারাতে বসেছে।গ্রামের বাজারে এখন আর এসব সাপখেলার আসর জমতে দেখা যায় না।
সাপখেলার পাশাপাশি আরো একটা অত্যন্ত জনপ্রিয় আসর এখন বর জমেনা বললেই চলে,তাহলো যাদুর আসর।আগে গ্রামের হাট বারে প্রায়শঃই দেখা মিলতো এই যাদুর আসর।এখানে যাদুর পাশাপাশি বিভিন্ন খেলাধুলা হতো।বিশেষ করে সার্কাসের খেলাগুলোর দেখা মিলতো এ সব যাদুর আসরে।সাথে থাকতো গান।মাঝে মাঝে নাচও হতো এসব আসরের আকর্ষন।এখন আর এসব চোখে পড়েনা।সার্কাসটাতো হারাতে বসেছে।আর গান নাচটাও যেন ক্রমশঃ বিলুপ্তির পথে হাঁটছে।
ভিঁড় ঠেলে বেরুতে যাব,হঠাৎই চোখ পড়লো উঁচু গলায় কথা বলা লোকটির দিকে।মাথার পাগড়ীটা খোলাতে এখন তার দাঁড়ি ভরা মুখটি দেখে কেন যেন খুব চেনা মনে হচ্ছে।ভালো করে দেখতেই মুখটা স্পষ্ট হলো।হ্যাঁ,এ যে দবির।আমার এক সময়ের সহপাঠী দবিরুল ইসলাম।কলেজ জীবনে আমরা একই সাথে পড়েছি।দু’জনেই বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলাম।আমি অবশ্য দবিরের মত এতটা ব্রিলিয়ান্ট ছিলাম না।তথাপিও দবিরের সাথে আমার সম্পর্কটা ছিলো অনেক সাবলীল।এর একটা কারণও অবশ্য ছিলো।বলা যায় কারণটা সেই শরৎ বাবুর বিলাসী নির্ভর।
মূলতঃ দবির ছিলো বেদে সম্প্রদায়ের।তার বাবা ছিলেন বেদে সম্প্রদায়ের একজন সর্দার।আমাদের এলাকায় বর্ষায় নৌকায় করে এসে বসতি গাঁড়েন। কবির সর্দার নামের এ মানুষটি খুব সহজেই এলাকায় নিজের একটা জায়গা তৈরি করে নেন।ওঁজা হিসেবে শুধু নামই কামান নি বরং কামিয়েছেন জমি জিরাতও।বাড়ী করেছেন আমাদের গ্রামেই।কবির সর্দারের বাড়ী হিসেবে নিজের বাড়ীর নামটি প্রতিষ্ঠিত করার অনেক চেষ্টা করেও সফল হন নি।বাড়ীটি এলাকায় পরিচিত হয়েছে ওঁজার বাড়ী হিসেবে।এলাকার প্রভাবশালীরা অবশ্য এ নামটিও ব্যবহার করতো না।অনেকটা তিরস্কার করে বলতো বেয়াইজ্জা ওঁজার বাড়ী।
কবির সর্দার সাপ নিয়ে কাজ করলেও তাঁর চার ছেলের একজনকেও এই পেশায় আনতে চান নি।ফলে একেকজনকে একেকটা পেশার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। বড় ছেলে সগিরকে গ্রামের বাজারে ক্রোকারীজের দোকানি বানিয়েছেন।মেজ ছেলে আবির টেইলার্স হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।সেজ ছেলে জাবির হয়েছে সিকিউরিটি গার্ড।ছোট ছেলে দবিরের মেধা দেখে তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।মূল ধারার পড়ালেখায় পড়তে দবিরকে এলাকার একটি নামী কিন্ডারগার্টেন এ পারতে পড়তে দিয়েছিলেন।দবিরের এস এস সি টা মূলতঃ ঐ কিন্ডারগার্টেন স্কুল থেকেই পাশ করা।ফলাফলটা মোটামুটি ভালোই ছিলো তার।
আমার সাথে দবিরের পরিচয় কলেজ জীবনে।কলেজের প্রভাবশালী ছাত্রগুলো দবিরের সাথে খুব একটা মিশতো না বলেই হয়তো আমার মেশার সুযোগ তৈরী হয়েছিলো।একই স্যারের কাছে পড়ার সুবাধপই আমাদের কাছাকাছি আসা।কবির সে সময় আমাকে খুব সহযোগীতা করতো।হয়তো নিজের একাকীত্ব গোঁছানোর প্রয়োজনেই।
শরৎ বাবুর বিলাসী গল্পের খুঁটি নাটি বিষয়গুলো আমাকে হাতে নাতে বুঝিয়ে দিয়েছিলো দবিরই।সে সময় বেশ ক’বার গিয়েছিলাম দবিরদের বাড়ীতে।সরাসরি সাপ দেখা,ধরা সব ওখান থেকেই।আমার সাপের ভয়টা কেটেছে দবিরের জন্যই।সাপখেলা নামক ব্যবসাটির প্রতি শ্রদ্ধাও কমেছে দবিরের কারণেই।দবির প্রায়শঃই বলতো,”সাপ ধরা,সাপখেলা দেখানো,তাবিজ কবোজ বিক্রি এ সবই এক ধরণের ধোঁকাবাজি। সাপ ধরায় সাহস লাগলেও মন্ত্র টন্ত্র বলে কিচ্ছু নেই।এগুলো হচ্ছে মানুষকে ধোকা দেয়ার একটা ফর্মূলা মাত্র।আর তাবিজ কবোজ? এতো পুরাই ভাওতাবাজি।রাস্তার পাশ থেকে তুলে আনা কিছু গাছের শেকড় দেখে সাপ ভয় পায়,এটা একটা চুড়ান্ত ধোঁকাবাজি। ”
সেই দবিরই আজ শহরের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সাপখেলা দেখাচ্ছে? অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে বিষয়টা।অথচ কলেজ শেষ করে ডাক্তারী পড়ার স্বপ্ন বুকে নিয়েই গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়েছিলো দবির।তাহলে ও কেন আজ আবার সেই পৈত্রিক ব্যবসায়?কৌতুহল থেকেই চুপ চাপ দাঁড়িয়ে থেকে অপক্ষায় রইলাম দবিরের সাপখেলা শেষ হওয়ার।
প্রায় দু,যুগেরও বেশী সনয় পর দবিরকে দেখেও চিনতে খুব একটা কষ্ট হয়নি।কবিরও আমাকে চিনেছে সহজে তা বুঝলাম ওর মুখের হাসি দেখে।জড়িয়ে ধরে বললো,”তুই? এখানে?”বললাম,”আমিতে এ শহরেই থাকি।ছোট একটা চাকুরী করি।কিন্তু তুই?আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না।”দবির আমার কাঁধে হাত রেখে বললো,”পৃথিবীতে এমন অনেক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে যা আমরা সহজে বিশ্বাস করতে পারি না।তাই বলে ওসব ঘটনা অসত্য হয়ে যায় না।”
———– কিন্তু, তোর তো ডাক্তার হওয়ার কথা ছিলো।তুই আজ ফুটপাতে কেন?
———– সবই সময়ের খেলারে।সময়ই আমাদেরকে মাঝে মাঝে লাইনচুত্য করে পথে নামিয়ে দেয়।আমিও সেই সময়ের কাছেই পরাজিত একজন।
———– পড়ালেখা ছাড়লি কেন?
———– ছেড়েছি বললে ভুল বলা হবে।বলতে পারিস ছাড়তে বাধ্য হয়েছি।
———– মানে?
———– সে অনেক কথা।আরেক দিন শুণিস।
———– নাহ্,আমি আজই শুণতে চাই।
———— বেশ,তাহলে চল।
———— কোথায়?
———— আমার বাসায়।হাঁটতে হাঁটতে দবিরের কাছ থেকে জানলাম তার আজকের জায়গায় এসে দাঁড়ানোর গল্প।
“শহরে যাবার কয়েকদিনের মাথায় বাবার অসুস্থতার কথা শুণে গাঁয়ে ফিরে যাই।বাবাকে শহরে নিয়ে এসে হাসপাতালে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়িতে কেটে যায় কয়েক মাস।মেডিকেলে ভর্তির চেষ্টার চাইতে বাবাকে সুস্থ্য করে তোলাটাকেই সময় সাপেক্ষ মনে হয়।মা আর আমি দীর্ঘ এক বছর অনেক চেষ্টা, চিকিৎসা করেও বাঁচাতে পারিনি বাবাকে।গ্রামের সহায় সম্পত্তি ভাইয়েরা নিজেদের নামে করে নেয়ায় বাবা মারা যাওয়ার পর আমি একেবারে নিঃশ্ব হয়ে পড়ি।বাবার নামের ভিটামাটি টুকু বিক্রি করে মাকে নিয়ে শহরে থাকতে শুরু করি।লেখাপড়া করার ইচ্ছা মাথা থেকে তাড়িয়ে মাকে নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামটাই সময়ানুগ বলে মনে হয়।কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও একটা চাকুরী জোগাড় করতে ব্যর্থ হই।কোনো মতে খেয়ে না খেয়ে কাটতে থাকে সময়।
বছর দুয়েক কোন মত কাটিয়ে হাঁপিয়ে উঠি।মা ও ক্রমশঃ অসুস্থ হয়ে পড়েন।সংসারের খরচ জোগাতে গিয়ে যেন আর পেরে উঠছিলাম না।সে সময়ই পরিচয় তৃষিতার সাথে।ওর বাবার সাথে কথা বলে জানলাম সম্পর্কে তিনি আমাদের আত্নীয় হন।আমার বাবাকে তিনি গুরু বলেন।এই সাপখেলা বাবার কাছেই শিখেন তিনি।যদিও তিনি কোন বেদে পরিবার থেকে আসেন নি।বরং সময়ের প্রয়োজনে বেদেদের এই সাপখেলাটাকে পেশা করে নিয়েছেন।বলতে পারিস তিনিই আমাকে উৎসাহিত করেন এ ধোকাবাজিকে পেশা হিসেবে নিতে।সময়ের কাছে পরাজিত আমিও অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাম লেখাই এই পেশায়।হয়ে উঠি দবির সর্দার।”
খালাম্মা আমাকে দেখে চিনলেন। কাছে ডেকে আদর করলেন।প্রাণ খুলে কথা বললেন।পরিচয় করিয়ে দিলেন তৃষিতার সাথে
কথা প্রসঙ্গে জানলাম,দবিরের দু’সন্তান। ছেলেটা এবার এস এস সি দিচ্ছে। আর মেয়েটা মেডিকেলে পড়ছে।
বাসা থেকে বেরুনোর সময় দবির আমার হাত ধরে বললো,”সময়ের কাছে একেবারে যে হেরে গেছি,তা নয়রপ।নিজের নীতি আর আদর্শ কে জলাঞ্জলি দিয়ে স্বপ্নকে কোরবানি করে দবির সর্দার হয়ে গেলেও আমি আমার স্বপ্ন ভুলে যাইনিরে।সময়ের কাছে হার মেনে পৈত্রিক পেশায় ফিরে গেলেও আমার সন্তানদের সময়কে পাড়ি দেয়ার যোগ্য করে গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছি।আমার বাবার দেখা স্বপ্নটা আমি পুরণ করতে না পারলেও সে স্বপ্ন পুরণের চেষ্টা কিন্তু থেমে থাকেনি।আর কয়েক বছর পর আমার মেয়েটা যখন ডাক্তার হয়ে বেরুবে,তখন আমি গর্বের হাসি হেসে বলতে পারবো,সময়কে টপকাতে পেরেছি আমি।স্বপ্নকে জয় করতে পেরেছি আমি।জয় করতে পেরেছি সময়কেও।”