Profile Photo

Md Joynul AbedhinOffline

  • J.A.Sagor
  • Profile picture of Md Joynul Abedhin

    Md Joynul Abedhin

    3 years, 8 months ago

    গল্পঃ এক জনমের দেখা
    মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে গেল শামিম । ভ্যাপসা গরমে গা বেয়ে ঘাম নিংড়ে আসছে। গায়ের স্যান্ডো গেঞ্জি জব জব করছে। মোবাইল চেক করে দেখলো মোটে দুটো একত্রিশ। ঘাড়ের পিছনে পিন পিনে ব্যথা করেই যাচ্ছে। গতকাল সারাদিন এ অফিস থেকে ও অফিস হেটে হেটে কার্ড বিক্রির চেষ্টা করেছে। শরীর ভীষণ ক্লান্ত। আগামীকাল অনেক হাটা । শরীরের আরাম দরকার। স্যান্ডো গেঞ্জি খুলে আবার ঘুমিয়ে গেল শামিম। এ শহরে যাদের টেনে তোলার কেউ নেই, তাদের অনেক হাটতে হয়, ঘামতে হয়। আহামরি মেধাবীও নয় শামিম। ফলাফল- ত্রিশ পেরিয়েও আজো স্থায়ী কোন চাকুরী হয়নি। তার চেয়েও বেশি যাতনায় আছে মামিয়া। নেহাত কপাল খারাপ মেয়েটার। নইলে হত দরিদ্র এক প্রাইভেট টিউটরের প্রেমে কেউ পড়েনা। তা প্রায় আট বছর আগের কথা। এরপর থেকে মামিয়ার একটাই চাওয়া শুধু বলার মত ছোট কিছু একটা হলেই সে তার বাবাকে ম্যানেজ করতে পারবে। শামিম বলার মত কিছু একটা এখনো পায়নি। একটা প্রাইভেট ব্যাঙ্কের কার্ড ডিভিশনে চাকুরি ঠিক বলার মত কিছু নয়। পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ৬০ জনের মধ্যে মাত্র ১৫ জনকে রাখবে ব্যাঙ্ক। বেশ শক্ত কাজ।

    মাসের এই শেষ পাঁচ দিনে অন্তত দশজন ক্লায়েন্টকে কার্ড বিলাতে হবে। নইলে ছাটাই লিস্টে নাম পোক্ত হবার সম্ভাবনা জোড় বাড়বে। ওদিকে মামিয়ার নাকি বিয়ের কথা চলছে। সে কয়েক বছর ধরেই চলছে, ঠেকিয়ে রেখেছে সে, আর সব প্রেমিকারা যা করে কিন্তু অনেক তো হল। এখন অবস্থা এতদুর খোদ শামিম নিজেই বিরক্ত – একটা মেয়ে আর কত অপেক্ষা করে, আর কত করানো উচিৎ! শামিমের মনে হয় সরকারের যেমন ৫ বছরের সময় হাতে থাকে কিছু করে দেখানোর তেমনই প্রেমিকদেরও থাকা উচিৎ। শামিম সেখানে আট বছর পেয়েছে এবং সে ব্যর্থ । অর্থাৎ ৩ বছর ধরে সে অবৈধ প্রেমিক। এ সব শুনে মামিয়া হেসেছিল খুব। কিন্তু শামিম হাসেনি, মজা করে হলেও সে সত্যটাই বলেছে। তার ইদানিং বেশ ভাল করেই মনে হয়- ঢাকার মত শহরে টিকে থাকার মত যথেষ্ঠ ছলাকলা সে শেখেনি। আট বছর তো কম নয়। যেহেতু এই লম্বা সময়ে যে মানিয়ে নিতে পারেনি তবে আর দোষ ঢাকা শহরের নয়, দোষ তার।

    সকাল।

    আজ যাদের কাছে কার্ড অফার নিয়ে যাবার কথা তারা গুলশান এবং এর আশেপাশের অফিসে বসে।আজিমপুর থেকে উইনারে চেপে গুলশান-১। এখানে আসলে শামিম অবাক হয়। বাড়িগুলো কি দারুন দেখতে! বাস থেকে নেমে খচখচ আরম্ভ হল- পুরনো রোগ। মানুষকে ডিস্টার্ব দেয়া খুব জঘন্য কাজ, আর নিয়তি দেখ সে রকম কাজই কপালে জুটেছে।

    প্রথম ক্লায়েন্ট’র অফিস গুলশান ১’র ৮ নাম্বার রোডে। মোড় থেকে বেশি দূরে নয়। কিন্তু অফিস আওয়ারের শুরুতেই যাওয়া ঠিক নয়। আশরাফুল নামের সেই ভদ্রলোক ১১টার দিকে যেতে বলেছেন।

    এই ফাঁকে গুলশানে অলিগলি ঘুরে বেড়ানো খারাপ না। দরিদ্র -অতি হতদরিদ্রও অভিজাত এলাকায় হেটে একটা সুখ অনুভব করে, তারপর সেই সুখ পরশ্রীকাতরতা তৈরি করে আর তারপর আসে দুঃখ , সবশেষে সে দুঃখ নিয়ে বাড়ি ফেরে।

    ১১টার কাছাকাছি সময়ে আশরাফুল নামের ভদ্রলোককে ফোন দিল শামিম। তিনি অফিসে আসতে বললেন। সিকিউরিটি, রিসেপশন পেরিয়ে লিফট বেয়ে তিন তলায় অফিস। কি দুর্দান্ত অফিসের ডিজাইন! তিন তলার গ্লাস ঠেলে ভিতরে ঢুকেই টিবয় গোছের একটি ছেলেকে বললো,

    ”আচ্ছা, এখানে আশরাফুল স্যার কোথায় বসে মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের?’’

    ছেলেটি দেখিয়ে দিল ”সোজা যান , শেষের টেবিলটাই আশরাফুল স্যারের”।

    বেশ ঝকঝকে অফিস, বিশাল ফ্লোর, কম করে হলেও চল্লিশ জন কাজ করছে।

    ”স্যার, সালাম আলাইকুম, আপনি মনে হয় আশরাফুল স্যার? আমি আপনাকে ফোন করেছিলাম।’’

    ”ও হ্যা, আপনি শামিম, তাইতো?’’

    “ভাল আছেন স্যার”

    ”আছি আর কি, বলেন তো ভাই, কি বিষয়?’’

    ”স্যার, আমাদের ব্যাংক যাদের স্যালারি ত্রিশের উপরে তাদের জন্য স্পেশাল ক্রেডিট কার্ড দিচ্ছে।’’

    কথা কেড়ে নিয়ে আশরাফুল সাহেব বললেন,

    ”ভাই রে ভাই, ক্রেডিট কার্ড নিলে নাকি হাত চুলকায়, খরচ বেড়ে যায় কিন্তু নেওয়া তো একটা দরকার, কাজে লাগে।’’

    ”স্যার, স্যার, একদম ঠিক বলেছেন স্যার, একটু সামলে চললে ক্রেডিট কার্ড খারাপ না।’’

    ”কি করতে বলেন?’’

    ”ছোট একটা ফর্ম পূরণ করলেই হবে স্যার।’’

    ”আচ্ছা দেন।’’

    একটা ফর্ম ব্যাগ থেকে বের করে টেবিলে রাখল শামিম। আশরাফুল নামের সেই ভদ্রলোক যতক্ষন ফর্ম পূরণ করছেন পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ক্রেডিট কার্ডের আরো কি কি সুবিধা আছে বলে যাচ্ছিল শামিম । এমন সময় শামিম দেখল ফ্লোরের সবাই দাঁড়িয়ে গেল। পাশের টেবিলের একজন ফিসফিস করে আশরাফুল ভদ্রলোককে বললো- ”এমডি আসছে, এমডি স্যার। ফ্লোর ভিজিট।’’ সবাই সটান দাঁড়িয়ে সালাম দিচ্ছে। আর সেই এমডি উত্তর দিচ্ছেন। আশরাফুল সাহেবের ডেস্কের কাছে এসেও সালামের উত্তর দিলেন। আর শামিমের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,

    হু ইজ দিস ম্যান।? আগে কখনো দেখেছি বলে মনে হয় না।”

    আশরাফুল সাহেব কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন তার আগেই শামিম বললো,

    ”স্যার আমি ব্যাঙ্কের ক্রেডিট কার্ড সেল করি।’’

    ”ইন্টাররেস্টিং, নাম কি ?’’

    স্যার, শামিম মিয়া।

    নামের শেষে এখনও মিয়া আছে শুনে স্যার হয়তো একটু হাসলেন, কিন্তু হার্ড ফেইস হয়ে গেল একটু পরেই,

    ”ইউ আর ওয়েস্টিং মাই এম্পলয়িস’ অফিস টাইম, ডু ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড দ্যাট?’’

    শামিম কোন উত্তর খুজে পাচ্ছেনা। ফ্লোরের সবাই কেমন করে তাকিয়ে আছে। খুব দিশেহারা লাগছে।

    এক কর্তা পাশ থেকে শামিমের দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠল-

    ” কিভাবে এখানে ঢুকলেন? কে ডেকেছে? কে ডেকেছে?”

    এত উচু স্বর! শামিম আবার ভাষাহীন, এত দ্রুত সবকিছু ঘটছে যে শামিম ঠিক কুলিয়ে উঠতে পারছেনা কি বলা উচিত।

    আশরাফুল সাহেব পরিস্থিতি সুবিধার নয় দেখে বললো,

    ”স্যার আমাদের কোম্পানির জন্য ডিল আছে বলে জানিয়েছিল, পরে দেখি এই কান্ড। আমি স্যার ওনাকে বের হয়ে যেতেই বলছিলাম।’’

    ”আর ডাকবেন না।’’ সেই কর্তার হুঙ্কার।

    এমডি স্যার এবার পাশের সেই কর্তাকে বললেন,

    ”দেখ ও কোন ব্যাংকে জব করে, সেখানে কথা বলে কমপ্লেইন কর। দিস ম্যান ইজ সিয়ার স্টুপিড।’’

    এ শুনে আশরাফুল সাহেব উৎসাহী হয়ে শামিমের পিঠে হাত দিয়ে ঠেলে বলতে লাগলো,

    ”যান এখান থেকে যান ।’’

    গ্লাস ডোর পেরিয়েও আশরাফুল সাহেব লিফট পর্যন্ত এলেন। শামিমের শরীর অপমানে এতই অবশ যে আশরাফুল সাহেব যে পিঠে হাত দিয়ে গলা ধাক্কার ভঙ্গিতে এই এদ্দুর নিয়ে এলেন তার কিছুই যেন সে অনুভব করলো না। এতগুলো লোক তাকিয়ে ছিল!

    লিফটের গোড়ায় দাঁড়িয়ে আশরাফুল সাহেব লবণ ঘষে দিলেন,

    ”বলার দরকার ছিল ব্যাংকে জব করেন? আমি বলতেই গেছিলাম আপনি আমার ফ্রেন্ড, পাশের অফিসে জব করেন মার্কেটিং পারপাজে এসেছেন। আপনাকে দিয়ে কর্পোরেট জব হবেনা , সিএনজি চালান গিয়ে, আর স্যার যখন ক্ষেপেছে আপনার ব্যাংকের জব আজকেই শেষ।’’

    বলেই অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে ফিরে যাবার সময় একটু নীচু স্বরে বলদ সম্বোধন শামিমের কান পর্যন্ত এল।

    এই কার্ড বিক্রির জেরে এর আগে যে ছোটখাট বাজে অবস্থায় পড়েনি তা নয়, কিন্তু আজ যেন সবকিছুর চূড়ান্ত ।

    শামিম যখন রাস্তায় তখন অপমানে মাথা ভনভন করছে, মনে হচ্ছে পৃথিবী তার কক্ষপথ থেকে ছিটকে দিশাহীন ভেসে যাচ্ছে।

    এমন সময়েই মামিয়ার ফোন এল।

    মানুষের ক্ষোভ উর্ধমুখী, রাগ নিম্নমুখী; মানুষের রাগ তার অধীনের উপর দিয়ে যায়।

    আট বছরে যা কোনদিন কল্পনায় ছিলনা, সে রকম অকথনীয় কথন উগড়ে শামিম গুলশানের নিকেতন ঘেষা পার্কে বসে একটু শান্তি পেল। পৃথিবীর সবাই তাকে অপমান করতে পারলে সেও পারে কাউকে ইচ্ছেমত কথা শোনাতে। এতে প্রকৃতিতে একটা ভারসাম্য থাকে। পার্কে বসে অবসন্ন মনে উদয় হল গুলশানের অভিজাত বাড়ী আর বহুতল বিল্ডিংগুলি যেন শামিমকে চিৎকার করে বলছে- গেট আউট অফ দিস সিটি, ইউ ডোন্ট ফিট হিয়ার। গেট লস্ট। যাওয়াই উচিৎ, আর কত? চোখ বন্ধ করে মনে হয় তার গ্রামের নদী ঘাঘট তাকে ডাকছে। মধুসুধন তো প্যারিস ছেড়ে কপোতাক্ষের ডাকে ফিরে এসেছিলেন তাহলে তার ঘাঘটের কাছে ফিরতে বাঁধা কি? আছে, বাঁধা- মামিয়া। কেটে দিলেই হয়। সম্পর্ক পাশাপাশি হলে একসাথে চলা যায়, কাঁধে নিলে তা ভার হয়ে যায়- তাতে চলা যায় তবে বেশিদূর যাওয়া চলেনা। মামিয়াকে এখন নামাতেই হবে। তারপক্ষে আর সম্ভব নয়।

    সে রাতে সম্পর্কের ইতিটানার নিষ্ঠুর ঘোষণা দিয়ে নিজে কাঁদেনি শামিম, কান্নার কাজটা সে নিকেতন পার্কে বসেই করেছিল। মামিয়া শুধু দেখার করার জন্য বলেছে। শামিম জানে মামিয়া অন্তত ফোনে বিচ্ছেদকে বিশ্বাস করবেনা। আমাদের দেশের সরকারগুলি যেমন জনগণ রাস্তায় নেমে বিস্তর ভাংচুর না চালানো পর্যন্ত বুঝতে পারেনা জনগণ ক্ষুব্ধ, তেমনই বিচ্ছেদের সময় কষে গালাগাল না দিলে অপরপক্ষ বুঝতেই পারেনা বিষয়টা আসলেই চূড়ান্ত। কিন্তু সাক্ষাতে শামিমের চোখের ভাষা দেখেই মামিয়া বুঝে গেল- শামিম তার শেষ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। তার হাজার আকুতি মিনতি কোন ফল বয়ে আনবেনা। চোখের জল শুধু গড়াল শামিম যেন শেষ হিসাব নিকেশ করে নিয়েছে। সম্পর্কের ইতি এবং ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া শামিমের আর কিছু করার নেই। অনেক অপমান হজম করা হয়েছে, থাকলে আরো অপমান দেখতে হবে। একপদের লোক আছে যাদের ঢাকা শহর নিত্য অপমান করে, তবু তারা সয়ে যায়। শামিম আর পারছেনা।

    শুধু আবেগী মেয়ে নয় মামিয়া, বাস্তব বোঝার মত যথেষ্ঠ বয়স তার।

    -তাহলে তুমি গ্রামে ফিরে যাবে?

    -আর উপায় কি? আমাকে দিয়ে এই শহরে কিছু হবেনা।

    -যাবার আগে আমার একটা কাজ করে যাও। মামিয়ার কন্ঠে নিজের ভাগ্যকে মেনে নেবার রেশ চলে এসেছে। এই সম্পর্কের আর কোন আশা নেই তা যেন মামিয়ার কণ্ঠে উচ্চারিত। শুধু শেষ করে দেবার টানটাই স্পষ্ট।

    -তুমি না কার্ড বিক্রি করো, আমার কাছে তোমার জন্য একটা খণ্ডকালীন চাকুরী আছে। কাল আরেকটি ছেলে দেখতে আসবে। এবার আমি রাজি হব। আমি রাজি হলেই বাবা দুই একদিনের মধ্যেই কার্ড ছাপিয়ে ফেলবেন, বিয়েও হবে খুব দ্রুত। আমি চাই আমার বিয়ের কার্ড তুমি বিতরণ করো।একদিন অথবা দুইদিন লাগবে। বিনিময়ে পাবে বিশ হাজার টাকা। আমার জমানো টাকা। কাজটা খুব সহজ, কি পারবেনা?

    শামিম ভাবল মেসে কিছু ধারদেনা আছে। সেসব না চুকিয়ে ঢাকা ছাড়া ঠিক নয়। অন্যের কাছে অপমানিত হবার চেয়ে মামিয়ার কাছে অপমানিত হওয়াই ভাল। আর যাই হোক এটাই ঢাকা শহরের শেষ অপমান।

    -এত কি ভাবছ? এডভান্সড পাবে ৫ হাজার, আর এই কার্ডগুলিতে যে এড্রেসগুলি থাকবে সেই বাসাগুলিতে আমি নিজে ফোন দেব। এদের মধ্যে যদি একজনও বলে সে কার্ড পেয়েছে তাহলে তুমি পুরো টাকা পাবে।

    শামিম দেখল মামিয়া পাঁচটি হাজার টাকার নোট তার সামনে নিয়ে বাতাস করছে।

    -কি ভাবছ, আমার সাথে কিন্তু ভাব নিতে যেওনা, আমি জানি তোমার টাকা খুব দরকার, বিশ হাজার টাকায় অনেকদিন চলতে পারবে। বেশি চিন্তা না করে রাজি হও। আর আমাকে সরাসরি হ্যা রাজি বলতে লজ্জা লাগলে, আমি কার্ড তোমার মেসের রুমমেইটকে দিয়ে দেব।

    -ঠিক আছে, কার্ড ছাপা হলে জানিও। আজ তাহলে যাও। তোমার কাজ করে দেব।

    মামিয়া ঘাসের বিছানা ছেড়ে উঠে গেল। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, তবুও দৃষ্টির সীমায় মামিয়াকে কয়েকবার চোখ মুছতে দেখল শামিম। যতদূর মামিয়াকে জানে আজ হয়ত সারা রাত মেয়েটি কাঁদবে।

    ৫-৬ দিন পর সকালে যখন খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছিল শামিম তখন বাইরে থেকে এসে রফিক একটা মোটা খাম ধরিয়ে বললো-

    -শামিম ভাই, মামিয়া আপু দিয়ে গেল। বললো হাতে সময় নেই , তোমার ভাইকে দিও।

    রফিক ওয়াশ রুমে গেলে খাম খুলে কার্ড হাতে নিল শামিম। ‘’শুভ বিবাহ’’ বিস্কিট কালার ব্যাকগ্রাউন্ডের উপর কি সুন্দর ফন্টে লেখা। চোখে জল আসতে চায়, হৃদয়হীন না হলে হৃদয় শাসন করা দুষ্কর। তবু দৃষ্টি জলাটে হলে শামিম চাঞ্চল্যকর কোন খবর আছে কিনা তা বের করার জন্য চেষ্টা করল।

    প্রথম কার্ড ইস্কাটনের এক বাসায়। আজিমপুর থেকে কাছে। বাসা বহুতল ভবনে, দারোয়ানের সওয়াল জবাব পেরিয়ে উপড়ে উঠে শামিম যে ফ্ল্যাটে এল, তার ভিতরে প্রবেশ করে শামীমের মনে হল আভিজাত্যের উদাহরণ কাকে বলে। এসব বাসায় আসলে শামিমের খুব অসস্ত্বি হয়। কোথায় সে থাকে একটা বস্তি ঘরানার জায়গায় আর কোথায় এমন আলিশান ফ্ল্যাট। শামিম যখন আভিজাত্য উপভোগ করছিল সেই আন্টি ততোক্ষণে মামিয়াকে ফোন দিলেন-

    -হেলো মামিয়া, তোর বিয়ের কার্ড হাতে পেলাম রে, অনেক সুন্দর হয়েছে কার্ডটা, হ্যা হ্যা, যাব তো অবশ্যই, কি যে বলিস, হ্যা, কি? মানে ছেলেটা, আমার পাশেই আছে তো, কথা বলবি, আচ্ছা দিচ্ছি।

    মামিয়ার সাথে এই মুহুর্তে কথা বলার ইচ্ছে ছিল না, এ রকম একটা সিচুয়েশনে পড়তে হবে ভাবেনি শামিম।

    কিন্তু সেই আন্টি ততক্ষনে ফোনটা তার সামনে ধরে রেখেছে। নিরুপায় হয়ে বলতেই হল-

    -হেলো,

    কি ডেলিভারি ম্যান, গ্রেইট জব। টাকা পেয়ে যাবে। ক্যারি অন।

    ফোন কেটে দিল মামিয়া।

    নাশতা জোর করেই করালেন আন্টি।

    পনেরোটা বাসায় কার্ড দিয়ে যখন মেসে ফিরল শামিম তখন রাত প্রায় দশটা। মেসে ফিরে সে দেখল সে অনেকটাই অনুভুতিশুন্য। কোন বোধ নেই। ৮ বছরের সম্পর্ক অথচ শামিম মশারীর ভিতরে মশা আছে কিনা সেটাই ভাল করে দেখতে লাগলো। দিনের বাসি পেপারটা একবার চোখ বুলিয়ে নিল। রুমমেইট রফিককে বলে দিল ‘’আজ খাব নারে, ঘুমাব, সারাদিন ঘুরেছি।’’

    সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইল হাতে নিতেই শামিম দেখল ম্যাসেজ,

    ”সকালে দেখা করতে চাই, রয়ালের সামনে, ৯ টায় থাকবো।’’

    আজ আবার নতুন করে কি মামিয়া অপমান করবে? করলে করুক। নিশ্চিত রয়ালে বসিয়ে নাশ্তা করাবে। এটাই কম কি!

    নটার একটু আগে গিয়েও শামিম দেখল মামিয়া রয়ালের অপোজিটে দাঁড়িয়ে আছে। শামিমকে দেখে কিছু না বলে রয়ালে ঢুকে দুই তলায়।

    – কি খাবে বল? হয়তো এটা শেষবারের মত। তাই চান্স মিস কইরো না, ভাল কিছু বল।

    বমিভাবের মত করে প্রাচীনকালের সন্মানবোধটা জাগতে যাচ্ছিল, শামিম সামলে নিয়ে বললো,

    – পরাটার সাথে কোন আইটেম হলেই হবে।

    এই বলার সাথে সাথে আত্মিক বমিভাব উবে গেল।

    -তা কাল মনে হয় তোমার বিস্তর খাওয়া দাওয়া হয়েছে।

    -হুম, তোমার রিলাটিভসরা অনেক অতিথিপরায়ণ আর সবার রান্নার হাতও চমৎকার।

    -তবে খাওয়া দাওয়া কিন্তু এখানেই শেষ নয়, আমার বিয়ের দিন তোমায় থাকতে হবে, তোমার পছন্দের তিন চারটি ডিশ আমি রান্না করাব। তুমি খাবে আর দেখব । চিন্তা করনা, এর জন্য তুমি এক্সট্রা ১০ হাজার পাবে। সব মিলিয়ে ত্রিশ-চল্লিশ, খারাপ না কিন্তু। ভাব নিতে গিয়ে এত টাকা মিস কইরনা আর সাথে একবেলা খাবার, জানোই তো বিয়ের খাবার কি টেস্টি হয়। কি যাবে তো?

    -দেখি, যেতেও পারি ।

    -তোমার লজ্জা করেনা, লজ্জা করেনা তোমার, কুকুর, আট বছরের সম্পর্ক আর তুমি কিনা আমার বিয়েতে গিয়ে খাবার খাবে!

    শামিম দেখল মামিয়ার চোখ বেয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে, শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে । দুইহাত টেবিলে, মুখ হাতের উপর রেখে কাঁদছে ।

    চোখ দুটো কেমন করে উঠতে চায়। কিন্তু এ সময় কি করতে হয় জানা আছে শামিমের। চোখ দুটো আশেপাশে ঘোরাও আর পাতা খুব দ্রুত নাড়িয়ে ব্যস্ত রাখো আর যদি তাতেও সমস্যা হয় তবে ওয়াশরুমে যাবার ভান করে টেপ ছেড়ে মুখ ধুয়ে আসো। টেপের পানির সাথে কষ্ট মিশে পাইপ গড়িয়ে নালায় মিশে যায়, কেউ বোঝে না।

    খাবার টেবিলে রাখার শব্দে মামিয়া স্বাভাবিক হবার জন্যে টিস্যু দিয়ে চোখ মুছে নিল।

    -তোমার বিয়েতে না গেলে হয়না?

    -হাদারাম তুমি বোঝনা, আমি তোমাকে অপমান না করে থাকতে পারছিনা, বোঝোনা তুমি? এত কষ্ট সহ্য করতে পারছিনা কিন্তু তোমাকে অপমান করলে কিছু জ্বালা কমে, একটু শান্তি লাগে। তোমাকে অপমান করে বেঁচে আছি, বিয়ে অবধি অপমান করতে দাও।

    শামিম জানে, নিজের ভাগ্যকে মেনে নিতে পারছেনা মামিয়া। টেস্টি খাবারের জন্য না হলেও অন্তত মামিয়ার জন্য ওর বিয়েতে যাওয়া উচিৎ। তার পরাজয়ে যদি মামিয়ার দুঃখ লাঘব হয়, তবে তাই হোক।

    খাওয়া শেষে মামিয়া বললো-

    -চল তোমার চুল কাটিয়ে দিই।

    -থাক আমি কেটে নেব।

    -গত ক বছর ধরে আমি অনেকবার তোমার চুল কাটার সময় সাথে ছিলাম, আজো থাকবো, আমার জন্য সবকিছু শেষবারের জন্য। প্লিজ আসো।

    ভাল একটা পশ সেলুন বকশীবাজার মোড়ে। চুল কাঁটা হলে শামিম বাইরে এসে দেখে, দুটি ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে মামিয়া।

    -এই ব্যাগ গুলিতে তোমার জন্য জিন্স, টিশার্ট বেল্ট আর কেডস আছে। আর এগুলোই আমার শেষ গিফট, তাই না বলনা প্লিজ।, বলেই গাড়িতে উঠে চলে গেল মামিয়া।

    ব্যাগ নিয়ে মেসে এল শামিম।

    শামিম বিছানায় শুয়ে ভাবল, এক জীবনে এত অপমান! তা মামিয়ার জ্বালা যদি কমে তাহলে অপমানিত হতে দোষ কি? আজকাল প্রেমিকার শোকে কাউকে সেভাবে কাঁদতে দেখেনা শামিম। কিন্তু সে গায়ের ছেলে, ঢাকা শহর তাকে তেমন নির্মমতা শেখাতে পারেনি তাই সারল্য আগের মতই। মনের খচখচ অনুভুতি তাই ফিরেফিরে আসতে চায়। চোখের জলামুখীতে পাথর বসিয়ে, ঠেস দিয়ে বসে আছে শামিম।

    বিয়ে সন্ধ্যায়। ভিকারুন্নিসা স্কুলের পাশের একটা কমিউনিটি সেন্টারে। কাছেই। শেভ করে শামিম শার্ট প্যান্ট পরে নিল। মামিয়ার দুটো ম্যাসেজ এসেছে। ”চলে আসো’’, ”কই?’’

    শামিম নিজেকেই বোঝাল- এটা এই শহরের শেষ অপমান। কাল ভোরেই এই শহর ছেড়ে যাব। শুধু আজ শেষ বারের মত সয়ে যেতে হবে।

    গেট বেশ ঝকমক করে সাজানো, যেমনটা হয়। ভিতরে ঢুকে শামিম দেখল সে বেশ তাড়াতাড়িই এসেছে বোধ হয়। কমিউনিটির সদর দরজায় মামিয়ার দুই বান্ধবী দাঁড়িয়ে। শামিমকে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হল দুইজনই।

    স্বাভাবিক হওয়ার জন্য শামিমই জিজ্ঞ্যেস করলো,

    -কি খবর তোমাদের? কেমন আছো? জিজ্ঞাসার সাথে কমার্সল হাসি। এই হাসি কষ্ট চেপে রাখতে পারে।

    -জি , ভাল ভাইয়া উত্তর পজ দিয়ে দিয়ে এসেছে , মানুষ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়লে যে স্বর নিয়ে আসে।

    একধারে মঞ্চ আর সামনে আমন্ত্রিতদের বসার আসন আর তারপর খাবার টেবিল সাজানো। কর্নারের একটা চেয়ারে বসে গেল শামিম। বর-বধুর মঞ্চের আরেঞ্জমেন্ট নিয়ে দুই একজনকে ব্যস্ত দেখল শামিম। প্রথমবার পতিতাবৃত্তিতে নামার আগে একটা মেয়ের যতখানি অপমান হয় ঠিক তেমন অপমান বোধ হচ্ছে প্রতিটা মুহুর্তে । সয়ে যাও মন সয়ে যাও।

    পিছন থেকে একটি মেয়ে বলে উঠলো,

    শামিম ভাই।

    শামিম পিছন ফিরে দেখলো একটি শাড়ি পড়া মেয়ে দাঁড়িয়ে। নীলিমা। মামিয়ার বান্ধবী।

    -আরে নীলিমা, কি খবর তোমার।

    -একটু আসেন প্লিজ।

    মোটামুটি ফাঁকা একটা জায়গা।

    -কি ব্যাপার নীলিমা ?

    -শামিম ভাই,আমরা তিন জন বান্ধবী মামিয়াদের বাসায় আছি কদিন ধরে। অনেক কেঁদেছে। আমরা জানি মামিয়া আপনাকে কত ভালবাসে, আপনি দয়া করে ওকে ক্ষমা করে দিয়েন। ও আপনাকে ডেকেছে কারণ এই কষ্টটা মনে হয় ও এবজর্ব করতে পারছেনা।ও আপনাকে দেখবে আর নিজের ভাগ্য নিয়ে পরিহাস করবে। না চাইতেই পরিবারের কাছ থেকে সব পেয়েছে , বিনিময়ে যে জিনিসটা নিজের করে চেয়েছে সেটার বলি দিতে হয়েছে পরিবারের কাছে।জানেনই তো মেয়েদের বলি হয়ে যাবার ইতিহাস বহু প্রাচীন।

    -আমি বুঝি নীলিমা, তুমি কেঁদোনা। বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখের পাতা দ্রুত ওঠানামা করানোর কলা কাজে লাগালো শামিম, বেশ কাজ করে।

    এরই মধ্যে পার্লার থেকে মামিয়া এসে পড়ায় বেশ একটা শোরগোল পড়ে গেল।

    -আমি ও দিকে যাই শামিম ভাই। আপনি ভাল থাকবেন।

    ঠিক আছে নীলিমা। যাবার আগে নীলিমা একটা প্যাকেট দিল। হাতে নিয়েই শামিম বুঝল ভিতরে টাকা আছে।

    মঞ্চে পালা করে সবাই মামিয়ার সাথে ছবি তুলছে। মামিয়া বিয়ের সাজে আরো সুন্দর। শামিম অবশ্য আশেপাশের লোকেদের গল্পে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করলো। পাশের কেউ একজন বরের বায়োডাটা বলে যাচ্ছিল। আরেকজন মেয়ের ভাগ্য কত ভাল তার জন্য আফসোস করলো, এই মেয়ে কেন অযোগ্য আর তার এক শালী কত যোগ্য সেই গল্প শুনিয়ে দিল। এত সব গল্প, এত সব আয়োজন, এতসব হাকডাক- তবু মনের ভিতর কি যেন ঝিম ধরে আছে। বৃষ্টিতে ভেজা কাকের মত মন দুরে কোথায় তাকিয়ে আছে কখন বৃষ্টি থামবে এই আশায়।

    ম্যাসেজ টোন বেজে উঠল।

    ”তোমাকে এখানে ডেকে এনেছি তোমাকে অপমান করবার জন্য নয়। শুধু দেখার জন্য। আজকের পর থেকে তোমাকে দেখার আর কোন নৈতিক অধিকার থাকবেনা, আর তোমাকে যতদুর জানি তুমি আমাকে ছাড়া এই শহরে থাকবেনা, এমনও হতে পারে তুমি আর ঢাকাতেই আসবেনা। যে বিশ্বাসে বিশ্বাস সেখানে পুনর্জন্ম নেই, থাকলে পরজন্মে দেখা হবার একটা আশা থাকতো। এই দেখা হয়তোবা এক জনমের শেষ দেখা।’’

    খাওয়া পর্ব শুরু হলে শামিম দেখল ওর হাত-পা কাঁপছে। ভেবেছিল শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে কিন্তু এখন যদি দ্রুত এখান থেকে না বের হয় তবে অজ্ঞান হয়ে যাবার আশঙ্কা আছে, সেটা মামিয়ার জন্য বেশ লজ্জার হবে। উঠে দাঁড়াল শামিম , মামিয়াকে ঘিরে কিছু ছেলেমেয়ে ছবি তুলছে। শেষ দেখা!

    বের হয়ে রাস্তায়। গলির রাস্তা ধরে হাটছে শামিম। আর ছলাকলা শেখার দরকার নেই, চোখের জন্য সুবিধা হল- সে এবার অঝরে কাঁদতে পারে।

    আজ রাতেই ঢাকা ছাড়তে হবে।

    রাতের বাস যখন গাবতলী ব্রিজ পেরিয়ে যাচ্ছে তখন উঠে দাঁড়িয়ে বাসের পিছনের জানালা দিয়ে রাতের ঢাকাকে একবার দেখে নিল শামিম। এত যে নির্দয় শহর ঢাকা তবুও তাকে গালি দেওয়া যায়না, সবারই প্রিয় কেউনা কেউ এই শহরে থাকে, কারো কারো হৃদয়ের খুব কাছের কেউ থাকে, তার যেমন মামিয়া ছিল। থাক ঢাকা শহরও ভাল থাক।

    7
    1 Comment
Skip to toolbar